Skip to main content

Posts

Showing posts from July, 2026
🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান, আর প্রতিদিনের নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফিস শু...

বিশ্বাস

অধ্যায়–৭ পর্ব–২ বিশ্বাস ঠিক তখনই পিছন থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল— — অর্ণিবানবাবু... অর্ণিবান ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকাল। নন্দিতা। জানালার ধারের আসনে বসে আছে। মুখে সেই চিরচেনা শান্ত হাসি। হাতের ইশারায় পাশের খালি আসনটা দেখিয়ে বলল— — এখানে বসুন... জায়গা আছে। অন্য সময় হলে অর্ণিবান হয়তো ইতস্তত করত। চারপাশে একবার তাকাত। কে কী ভাববে, সেই অদৃশ্য হিসাবটা কষে নিত। কিন্তু আজ তার ভেতরের মানুষটা যেন বদলে যেতে শুরু করেছে। সমাজকে ভয় পেয়েও যে সব অপবাদ এড়ানো যায় না, সেই শিক্ষা আজ সকালেই পেয়ে গেছে। সে আর কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে গিয়ে নন্দিতার পাশের আসনে বসল। কিছুক্ষণ দু'জনেই চুপ। ট্রেনের চাকার ছন্দ যেন সেই নীরবতারই ভাষা হয়ে উঠেছিল। হঠাৎ নন্দিতা খুব শান্ত গলায় বলল— — সকালের ঘটনাটা আমি দেখেছি। অর্ণিবানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে মাথা নিচু করে বলল— — খুব খারাপ একটা পরিস্থিতি হয়ে গিয়েছিল... নন্দিতা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল— — পরিস্থিতি খারাপ ছিল। আপনি ...

ভয়ের ওপারে

অধ্যায়–৭ পর্ব–১ ভয়ের ওপারে ট্রেনটা নিজের গতিতেই ছুটে চলেছে। জানালার বাইরে একের পর এক গাছ, মাঠ, ছোট্ট স্টেশন পিছিয়ে যাচ্ছে। অথচ অর্ণিবানের মনে হচ্ছিল, সময় যেন কোথাও থমকে আছে। সকালের ঘটনাটা বারবার ফিরে আসছে। সে জানে, তার কোনো দোষ ছিল না। তবু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কত সহজে তাকে অভিযুক্ত করে ফেলেছিল চারপাশের মানুষ। কেউ জানতে চায়নি, ঘটনাটা কীভাবে ঘটল। কেউ শোনার চেষ্টা করেনি, সে কী বলতে চাইছে। মানুষের বিচার বড় অদ্ভুত। সেখানে সত্যের চেয়ে দৃশ্যটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্ণিবানের হঠাৎ লাফার কথা মনে পড়ে গেল। মেসের বারান্দায় একদিন গভীর রাতে চা খেতে খেতে লাফা বলেছিল— "সমাজ কোনোদিন তোমাকে বলবে না, একটা মহৎ কাজ করো। কিন্তু সমাজের অদৃশ্য নিয়মের বাইরে যদি কখনও এক পা ফেলো—সে তোমাকে সহজে ক্ষমা করবে না।" তখন কথাটা শুনে সবাই নিরুত্তর ছিল। আজ অর্ণিবান বুঝল, কথাটার ভেতরে কতটা তিক্ত সত্যি লুকিয়ে ছিল। মানুষ সারাজীবন সৎ থাকতে পারে। অসংখ্য ভালো কাজ করতে পারে। সেগুলোর হিসেব সমাজ খুব কমই রাখে। কিন্তু এক মুহূর্তের ভুল বোঝাবুঝি......

ভুল বোঝাবুঝি

অধ্যায়–৬ ভুল বোঝাবুঝি ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে একবার চোখাচোখি হয়েছিল নন্দিতা আর অর্ণিবানের। কেউ কিছু বলেনি। শুধু দু'জনেই মৃদু হেসেছিল। সেই হাসিতে সংকোচ ছিল, নতুন পরিচয়ের মৃদু উষ্ণতা ছিল, আর ছিল অজান্তেই জন্ম নিতে থাকা একটুখানি ভালো লাগা। গত কয়েকদিনে চায়ের দোকানে দু-একবার কথাও হয়েছে। প্রথম পরিচয় অবশ্য করিয়ে দিয়েছিলেন গোপাল কাকু। মাঝে মাঝে অর্ণিবানের মনে হয়, বুড়ো মানুষটা যেন দু'জনের মনের কথাই আগেই বুঝে ফেলেছিলেন। আজ ট্রেনে ভিড়টা একটু বেশি। নন্দিতা উঠেছে পাশের কামরায়। অর্ণিবান দাঁড়িয়ে আছে নিজের কামরার দরজার কাছে। ট্রেন একটা স্টেশনে থামতেই হুড়োহুড়ি করে অনেক যাত্রী একসঙ্গে উঠে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হলো ধাক্কাধাক্কি। কেউ ভেতরে ঢুকতে চাইছে, কেউ নামতে চাইছে। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন জোরে ধাক্কা দিল। অর্ণিবান নিজের ভারসাম্য রাখতে পারল না। এক ঝটকায় সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। ঠিক সামনে জানালার ধারে বসেছিলেন এক তরুণী। এক মুহূর্তের জন্য অর্ণিবানের শরীর প্রায় ...

একটি অদৃশ্য ক্ষত -৮

উৎপলবাবু অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইলেন। টিফিন রুমে তখন প্রায় কেউ নেই। জানালার বাইরে বিকেলের আলো একটু একটু করে নরম হয়ে আসছে। হঠাৎ তিনি খুব আস্তে বললেন— — জানো অর্ণিবান, আজও মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। মনে হয়, আমি কি সত্যিই আমার কর্তব্য শেষ করেছিলাম? সরকারি কর্মচারী হিসেবে হয়তো করেছিলাম। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে? সেই প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজে পাই না। সেদিন যদি সমাজের ভয়টাকে একটু দূরে সরিয়ে রাখতে পারতাম... যদি একদিন অদিতিকে বলতাম— "ভয় পেও না। মন খারাপ হলে ফোন করবে। আমি বড় ভাইয়ের মতো তোমার কথা শুনব।" যদি মাসে একদিন শুধু খোঁজ নিতাম— "কেমন আছ?" যদি শুধু এইটুকু বিশ্বাস দিতে পারতাম যে পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ তার কথা মন দিয়ে শুনবে... তাহলে হয়তো... হয়তো অদিতির জীবনটা অন্যরকম হতে পারত। আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু এই 'হয়তো' শব্দটাই আমার সারাজীবনের শাস্তি হয়ে গেছে। আমরা সমাজকে খুব ভয় পাই, অর্ণিবান। কিন্তু সমাজ কি কোনোদিন এসে একজন একা মানুষের চোখের জল মুছে দেয়? সমাজ কি কোনোদিন গভ...

একটি অদৃশ্য ক্ষত -৭

শেষ বার্তাটি উৎপলবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। টিফিন রুমের ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো বাজতে চলেছে। সহকর্মীরা একজন একজন করে উঠে নিজের ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। কিন্তু অর্ণিবান আর উৎপলবাবুর যেন সময়ের কোনো হিসেব নেই। উৎপলবাবু ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন— — তারপর আমার বিয়ে হয়ে গেল। নতুন সংসার... নতুন দায়িত্ব... অফিসের কাজও তখন অনেক বেড়ে গেছে। জীবন অদ্ভুত জিনিস, অর্ণিবান। সে কাউকে ভুলিয়ে দেয় না, কিন্তু ব্যস্ত করে দেয়। আমিও ভেবেছিলাম, অদিতি নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিচ্ছে। হয়তো কোথাও একটা কাজ পেয়ে গেছে। হয়তো নতুন করে বাঁচতে শিখছে। এই ভেবেই আর তেমন খোঁজ নেওয়া হয়নি। অদিতির বার্তাও ধীরে ধীরে কমে গেল। আগে সপ্তাহে দু-তিনবার লিখত। তারপর মাসে একবার। শেষদিকে শুধু উৎসবের দিনে একটি ছোট্ট শুভেচ্ছা। আর আমি... আমিও শুধু লিখতাম— "ভালো থাকবেন।" আজ ভাবি, মানুষ কখন যে শুধু কথার উত্তর দেয়, মানুষের নয়—তা সে নিজেও বুঝতে পারে না। প্রায় এক বছর কেটে গেল। একদিন অন্য একটি সরকারি তদন্তের কাজে আবার সেই গ্রামে যেতে হল...

একটি অদৃশ্য ক্ষত -৬

সমাজের ভয় উৎপলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। টিফিন রুমের কোলাহল যেন অনেক দূরে সরে গেছে। অর্ণিবান বুঝতে পারছিল, মানুষটা শুধু একটা গল্প বলছেন না—নিজের বুকের ভেতরে বহু বছর ধরে লুকিয়ে রাখা একটা ক্ষত ধীরে ধীরে খুলে দেখাচ্ছেন। উৎপলবাবু আবার বলতে শুরু করলেন— — সেদিন অদিতির কথা শুনে সত্যিই চেষ্টা করেছিলাম। আমার পরিচিত দু-একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, একটি বেসরকারি স্কুল, এমনকি একজন বন্ধুর অফিসেও কথা বলেছিলাম। প্রতিবারই একই উত্তর— "অভিজ্ঞতা চাই।" "এখন লোক নেওয়া হচ্ছে না।" "পরে যোগাযোগ করুন।" প্রতিবার অদিতিকে ফোন করে বা বার্তা দিয়ে বলতাম— "আরও একটু অপেক্ষা করুন। আমি চেষ্টা করছি।" ও প্রতিবারই একই উত্তর দিত— "আপনি চেষ্টা করছেন, এটাই আমার কাছে অনেক স্যার।" কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম, কথাগুলো বলার সময়ও ওর ভেতরের আলো একটু একটু করে নিভে যাচ্ছে। একদিন রাত প্রায় সাড়ে দশটা। মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপের শব্দ হলো। অদিতির বার্তা। "ঘুমিয়ে পড়েছেন?" আমি লিখলাম— "না। বলুন।...

একটি অদৃশ্য ক্ষত -৫

একটি নম্বর, কিছু বার্তা সেই দিনের পর থেকে অদিতির সঙ্গে আমার যোগাযোগটা খুব ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। না, তাকে যোগাযোগ বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, একজন সরকারি আধিকারিক আর এক অসহায় মেয়ের মধ্যে প্রয়োজনের সূত্র ধরে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের মধ্যে কোনো গোপনীয়তা ছিল না। ছিল না কোনো প্রেমের ইঙ্গিতও। ছিল শুধু একা হয়ে যাওয়া একটা মানুষের একটু ভরসা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা। লিগ্যাল হেয়ার এনকোয়ারির কাজ চলছিল। কখনও কোনো নথিতে ভুল। কখনও নতুন কাগজের প্রয়োজন। তাই মাঝেমধ্যে ফোন করতেই হতো। কখনও আমি করতাম। কখনও অদিতি। একদিন দুপুরে অফিসে বসে ফাইল দেখছি। হঠাৎ মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপের শব্দ। স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "স্যার, বিরক্ত করছি না তো?" আমি উত্তর দিলাম— "না, বলুন।" কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল— "আজ সারাদিন কারও সঙ্গে একটা কথাও হয়নি। তাই আপনাকে লিখলাম।" মেসেজটা পড়ে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। একজন মানুষ কতটা একা হলে এমন কথা লিখতে পারে? শেষে শুধু লিখলাম— "নিজেকে ...

একটি অদৃশ্য ক্ষত -৪

কয়েক দিন পর আবার এল অদিতি। এবার তার মুখে আগের দিনের সেই অসহায় আতঙ্কটা একটু কম। মনে হলো, সরকারি অফিসের এই ঘরটা অন্তত তার কাছে আর সম্পূর্ণ অচেনা নয়। হাতে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা একটা ফাইল। — স্যার, আপনি যেগুলো বলেছিলেন... সব নিয়ে এসেছি। আমি কাগজগুলো একে একে দেখতে লাগলাম। প্রতিটি কাগজ খুব যত্ন করে প্লাস্টিক ফোল্ডারে ভরে এনেছে। যে মানুষ জীবনকে যত্ন করে বাঁচাতে চায়, সে কাগজও যত্ন করেই রাখে। কাগজ দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করলাম— — বাড়িতে আর কে আছেন? প্রশ্নটা শুনে অদিতি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল— — কেউ নেই, স্যার। আমি একটু ইতস্তত করে আবার জিজ্ঞেস করলাম— — আত্মীয়স্বজন? মামা, কাকা, মাসি... কেউ নেই? অদিতি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। সেই হাসিটা ছিল বড় অদ্ভুত। অভিমান আর অসহায়তার মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃশব্দ হাসি। — সবাই আছেন স্যার... মামা আছেন, মামি আছেন, কাকা আছেন, দূর সম্পর্কের আত্মীয়ও আছেন। কিন্তু মানুষ শুধু রক্তের সম্পর্ক থাকলেই আপন হয় না। সে একটু থামল। জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব শ...

একটি অদৃশ্য ক্ষত - ৩

অদিতি টিফিন রুমের ভেতরটা হঠাৎ যেন অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে গেল। জানালার বাইরে কৃষ্ণচূড়ার ডালগুলো বাতাসে দুলছে। দূরে অফিসের করিডোরে মানুষের পায়ের শব্দ ভেসে আসছে, কিন্তু সেই শব্দ যেন এই ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারছে না। উৎপলবাবু কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইলেন। মনে হচ্ছিল, তিনি যেন অফিসে নন—বহু বছর আগের কোনো বিকেলে ফিরে গেছেন। ধীরে ধীরে তিনি বলতে শুরু করলেন— — বছরটা ছিল ২০২০। চারদিকে করোনার আতঙ্ক। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই শুধু মৃত্যু, হাসপাতাল, অক্সিজেন, কান্না। সেই সময় আমাদের অফিসেও একের পর এক লিগ্যাল হেয়ার এনকোয়ারির ফাইল আসছিল। একদিন দুপুরে আমার টেবিলে একটি ফাইল এসে পৌঁছাল। অন্য দিনের মতোই খুললাম। প্রথম পাতায় লেখা ছিল— মৃত কর্মচারী : শ্রীমতী সুচরিতা মুখোপাধ্যায় পদ : প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা একমাত্র উত্তরাধিকারী : অদিতি মুখোপাধ্যায় বয়স : ২৫ বছর সরকারি কাগজে মানুষের পরিচয় এতটুকুই। সেখানে লেখা থাকে না— শৈশবে বাবা মারা গেছেন। তারপর একমাত্র দিদিও চলে গেছে। আর শেষ আশ্রয়, মা—করোনায় হারিয়ে গেলেন। সরকারি ফা...

একটি অদৃশ্য ক্ষত -২

দুপুর একটা বাজতেই অফিসের করিডোরে যেন অন্যরকম একটা প্রাণ ফিরে এল। কেউ টিফিন ক্যারিয়ার হাতে বেরিয়ে এল নিজের ঘর থেকে, কেউ আবার ক্যান্টিনের দিকে হাঁটতে লাগল। সরকারি অফিসে দুপুরের এই এক ঘণ্টা যেন কাজের ফাঁকে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়। হাসি, গল্প, খুনসুটি—সব মিলিয়ে পরিবেশটা হালকা হয়ে ওঠে। অর্ণিবানও ধীরে ধীরে টিফিন রুমে ঢুকল। ঘরটা খুব বড় নয়। এক পাশে বড় জানালা। জানালার ওপারে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। লাল ফুলে ভরে আছে ডালগুলো। বাতাস এলেই দু-একটা ফুল মাটিতে ঝরে পড়ছে। মাঝখানে লম্বা টেবিল। চারদিকে সহকর্মীদের ভিড়। কেউ হাসতে হাসতে বলছে— — আরে, কাল আবার ভারত হারল! আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলেন— — ক্রিকেট নিয়ে তোকে দিয়ে আর হবে না! এক কোণে বাজারদর নিয়ে তর্ক চলছে। অন্যদিকে একজন ছেলের স্কুলে ভর্তি নিয়ে পরামর্শ চাইছে। জীবনের ছোট ছোট গল্পে ভরে উঠেছে ঘরটা। শুধু অর্ণিবানের চারপাশে যেন অদৃশ্য একটা নীরবতা। সে চুপচাপ একটা চেয়ার টেনে বসল। টিফিনের বাক্স খুলল। মা সকালে যত্ন করে আলু-পোস্ত আর ডাল দিয়ে ভাত বেঁধে দিয়েছিলেন। অন্যদিন এই খাব...

একটি অদৃশ্য ক্ষত

🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান আর নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফি...

টাক

টাকতত্ত্ব (একটি ব্যঙ্গ-রম্য প্রবন্ধ) মানুষের মাথায় চুল থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু চুল কমতে শুরু করলেই সমাজের আচরণ আর স্বাভাবিক থাকে না। পৃথিবীতে এমন কোনো সমস্যা আছে কি না জানি না, যার এত বিশেষজ্ঞ আছে। কিন্তু টাক? আহা! এ বিষয়ে সবাই ডক্টরেট করে বসে আছেন। বাড়ির কাকিমা বলবেন, "নারকেল তেল গরম করে লাগাও।" পাশের বাড়ির কাকু বলবেন, "না না, পেঁয়াজের রসই আসল ওষুধ।" অফিসের সহকর্মী বলবেন, "একটা নতুন তেল এসেছে, এক মাসে জঙ্গল হয়ে যাবে!" শুধু সেই জঙ্গলটা আজ পর্যন্ত কেউ চোখে দেখেনি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, বহুদিন পরে কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হলে তিনি জিজ্ঞেস করবেন না— প্রথম প্রশ্ন "আরে! চুলগুলো গেল কোথায়?" মনে হয়, মাথার চুল হারিয়ে যাওয়া জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় উঠে গেছে। টাক নিয়ে সমাজের কৌতূহল এমন পর্যায়ে যে, মানুষ আপনার চাকরি, বেতন, স্বাস্থ্য—এসব নিয়ে যতটা না ভাবে, তার চেয়ে বেশি ভাবে আপনার মাথা নিয়ে। আর সমাজের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে—মানুষের আসল নাম যেন কেউ মনে রাখতেই চায় না। তার বদলে একটা বিশেষণ...

রম্য রচনা:লিপস্টিক

লিপস্টিক (একটি রম্য রচনা) লিপস্টিক কবে আবিষ্কার হয়েছিল, কে প্রথম ঠোঁটে রং মেখে পৃথিবীকে তাক লাগিয়েছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে আজও কোনো আন্তর্জাতিক গবেষণা হয়নি—মহিলারা এত লিপস্টিক কেন পরেন, আর সত্যিই কি পুরুষরা তাতে আকৃষ্ট হন? পুরুষদের জিজ্ঞেস করলে বেশিরভাগই বুক ফুলিয়ে বলেন, "আমরা এসব দেখি না। আমরা মানুষের মন দেখি।" কিন্তু সেই ভদ্রলোকই স্ত্রী বা প্রেমিকার প্রশ্ন— "আজ আমার নতুন লিপস্টিকটা কেমন?" —শুনে এমনভাবে উত্তর খুঁজতে থাকেন, যেন UPSC-র ইন্টারভিউ চলছে। কারণ এখানে ভুল উত্তর দিলে নম্বর কাটা নয়, রাতের খাবার কাটার সম্ভাবনাই বেশি! লিপস্টিকেরও আবার কী সব নাম! আগে ছিল লাল, গোলাপি, মেরুন। এখন নাম শুনলে মনে হয় কোনো কবি নতুন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন— "রোজ ড্রিম", "বারগান্ডি সিক্রেট", "চেরি ব্লিস", "মিস্টিক নিউড", "সানসেট কিস"। ঠোঁটে রং লাগাবেন, না প্রেমপত্র লিখবেন—বোঝাই দায়! একসময় মানুষ আয়নায় নিজের মুখ দেখত। এখন অনেকের কাছে মনে হয়, আয়নাটা যেন...

আমারও পরানো যাহা চায়

ষষ্ঠ অধ্যায় :  মাসের ক্যালেন্ডারে অতিরিক্ত একটি ছুটি দেখে নন্দিতা ভেবেছিল, আজ হয়তো একটু নিশ্চিন্তে থাকা যাবে। আজ তাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস । সেই উপলক্ষে স্কুল বন্ধ। প্রতিদিনের মতো ভোরবেলা বেরোতে হবে না ভেবে আগের রাতে বেশ নিশ্চিন্ত মনেই ঘুমিয়েছিল সে। কিন্তু ছুটির দিনের সকালটা অন্যরকম হয়ে উঠল। ঘুম ভাঙল চিৎকার আর তর্কের শব্দে। দাদা আর বৌদির ঝগড়া। ছোট্ট ঈশানের জন্য বাজার থেকে যে ফল আর খাবার আনা হয়েছিল, সেগুলোর কয়েকটা ঠিকমতো পাকা ছিল না। সেই সামান্য বিষয় নিয়েই শুরু হয়েছে তুমুল অশান্তি। বৌদির গলায় অভিমান। — একটা ছোট্ট বাচ্চার জন্য জিনিস আনতে বললেও তোমার একটু খেয়াল থাকে না? দাদাও চুপ করে থাকার মানুষ নয়। — যা পেয়েছি, তাই এনেছি। সবকিছু কি আমার হাতে থাকে? কথার পর কথা বাড়তেই লাগল। নন্দিতা বিছানা থেকে উঠে দরজার ফাঁক দিয়ে একবার তাকাল। তারপর আবার নিঃশব্দে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। এই দৃশ্য তার কাছে নতুন নয়। ছোটবেলা থেকেই সংসারের নানা টানাপোড়েন, অভাব, অভিমান আর ঝগড়া দেখে বড় হয়েছে সে। দাম্পত্য জীবনে মতের অমিল হ...

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...