কয়েক দিন পর আবার এল অদিতি।
এবার তার মুখে আগের দিনের সেই অসহায় আতঙ্কটা একটু কম। মনে হলো, সরকারি অফিসের এই ঘরটা অন্তত তার কাছে আর সম্পূর্ণ অচেনা নয়।
হাতে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা একটা ফাইল।
— স্যার, আপনি যেগুলো বলেছিলেন... সব নিয়ে এসেছি।
আমি কাগজগুলো একে একে দেখতে লাগলাম।
প্রতিটি কাগজ খুব যত্ন করে প্লাস্টিক ফোল্ডারে ভরে এনেছে।
যে মানুষ জীবনকে যত্ন করে বাঁচাতে চায়, সে কাগজও যত্ন করেই রাখে।
কাগজ দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করলাম—
— বাড়িতে আর কে আছেন?
প্রশ্নটা শুনে অদিতি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল—
— কেউ নেই, স্যার।
আমি একটু ইতস্তত করে আবার জিজ্ঞেস করলাম—
— আত্মীয়স্বজন? মামা, কাকা, মাসি... কেউ নেই?
অদিতি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
সেই হাসিটা ছিল বড় অদ্ভুত।
অভিমান আর অসহায়তার মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃশব্দ হাসি।
— সবাই আছেন স্যার... মামা আছেন, মামি আছেন, কাকা আছেন, দূর সম্পর্কের আত্মীয়ও আছেন। কিন্তু মানুষ শুধু রক্তের সম্পর্ক থাকলেই আপন হয় না।
সে একটু থামল।
জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল—
— মা চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন সবাই এসেছিলেন। সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। তারপর একে একে সবাই নিজের নিজের জীবনে ফিরে গেলেন। এখন উৎসবের দিনেও কেউ দরজায় কড়া নাড়ে না। ফোনও আসে না।
তার গলায় অভিযোগ ছিল না।
বরং অভিযোগ করার শক্তিটুকুও যেন শেষ হয়ে গিয়েছিল।
খুব আস্তে বলল—
— জানেন স্যার, একা বাড়িতে রাত নামার শব্দও শোনা যায়।
আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি।
সেদিন প্রথম মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ংকর দারিদ্র্য হয়তো অর্থের নয়—মানুষের।
কয়েকটি শব্দ।
কিন্তু সেই কয়েকটি শব্দ যেন পুরো ঘরটাকে নিঃশব্দ করে দিল।
আমি আর কোনো প্রশ্ন করিনি।
কিছু নীরবতা থাকে, যেগুলোকে সম্মান করাই সবচেয়ে বড় মানবিকতা।
লিগ্যাল হেয়ার এনকোয়ারির নিয়ম অনুযায়ী বাড়িতে গিয়ে তদন্ত করতেই হবে।
দিন ঠিক হলো।
পরের সপ্তাহের এক বিকেলে পৌঁছে গেলাম অদিতিদের বাড়িতে।
ছোট্ট একতলা বাড়ি।
লোহার গেটের রং উঠে গেছে।
উঠোনে একটা শিউলি গাছ।
সাদা ফুলে ভরে আছে মাটি।
দরজার পাশে এখনও ঝুলছে নামফলক—
"শ্রীমতী সুচরিতা মুখোপাধ্যায় সহকারী শিক্ষিকা"
মনে হলো, মানুষ চলে যায়...
নাম থেকে যায়।
অদিতি দরজা খুলে বলল—
— আসুন স্যার।
আজ তার মুখে একটুখানি হাসি।
হয়তো বহুদিন পরে বাড়িতে একজন অতিথি এসেছে।
ঘরের ভেতরে ঢুকে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
অত্যন্ত সাধারণ বাড়ি।
তবু কী অসাধারণ পরিচ্ছন্ন।
দেওয়ালে বাবা-মায়ের বাঁধানো ছবি।
ছবির সামনে শুকিয়ে যাওয়া রজনীগন্ধার মালা।
এক কোণে কাঠের বুকশেলফ।
সেখানে রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, শরৎচন্দ্রের বই।
তার পাশেই চাকরির পরীক্ষার গাইড।
আমি বইগুলোর দিকে তাকিয়ে বললাম—
— বই পড়তে ভালোবাসেন?
অদিতি বইগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল—
— আগে খুব পড়তাম। এখন বই খুলে বসি... কিন্তু পড়া হয় না। শব্দগুলো দেখি, গল্পটা আর মনে ঢোকে না।
তার উত্তর শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গেল।
এমন সময় পাশের বাড়ির এক কাকিমা এলেন।
সরকারি নিয়মমতো প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বললাম।
সব তথ্য মিলিয়ে নিলাম।
প্রায় এক ঘণ্টা পর কাজ শেষ হলো।
আমি বেরিয়ে আসছি।
ঠিক তখনই অদিতি একটু ইতস্তত করে বলল—
— স্যার... একটা কথা বলব?
— নিশ্চয়ই।
— আপনার ফোন নম্বরটা দেবেন?
আমি একটু অবাক হলেও নম্বর লিখে দিলাম।
বললাম—
— অফিসের কাজের দরকার হলে ফোন করবেন।
সে নম্বরটা খুব যত্ন করে মোবাইলে সেভ করল।
তারপর নিচু গলায় বলল—
— জানেন স্যার... আজকাল ফোনটা আর বাজে না। তাই একটা নম্বরও অনেক সময় সাহস দেয়।
আমি কী উত্তর দেব বুঝতে পারলাম না।
শুধু বললাম—
— প্রয়োজনে অবশ্যই যোগাযোগ করবেন।
আমি বেরিয়ে এলাম।
গেট পার হয়ে হঠাৎ কী মনে হতে পিছন ফিরে তাকালাম।
দেখলাম...
অদিতি এখনও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
চুপচাপ।
আমি রাস্তার মোড় ঘুরে না যাওয়া পর্যন্ত সে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
সেদিন প্রথমবার আমার মনে হলো—
মেয়েটা হয়তো কোনো সরকারি অফিসারকে বিদায় জানাচ্ছিল না।
সে বিদায় জানাচ্ছিল এমন একজন মানুষকে, যার সঙ্গে দু'টো কথা বললে তার নিঃশব্দ বাড়িটা কয়েক মিনিটের জন্য হলেও মানুষের শব্দে ভরে ওঠে।
কিন্তু তখনও বুঝিনি...
সেই একটি ফোন নম্বর একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে ভারী স্মৃতি হয়ে থাকবে।
(চলবে... CH-..)

Comments
Post a Comment