দ্বিতীয় অধ্যায়
পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি।
স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন—
— এসো বাবা, আজও কম চিনি তো?
অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল।
চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল।
কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল।
সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে।
ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে।
কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল।
গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন।
— দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প?
মেয়েটি মৃদু হেসে বলল—
— হ্যাঁ কাকু।
চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল।
মাঝখানে সেই একই দূরত্ব।
কথা আজও হলো না।
তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়।
কখনও আড়চোখে তাকানো...
চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া...
এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে।
অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীকার করে না, তবু কোনোদিন যদি মেয়েটিকে দেখা না যায়, সারাদিন কোথায় যেন একটা অপূর্ণতা থেকে যায়।
মনে হয়, সকালের চায়ের স্বাদটা আজ ঠিক জমল না।
গোপাল কাকু কেটলিতে আবার জল চাপাতে চাপাতে মুচকি হেসে দুজনের দিকেই একবার তাকালেন।
অর্নিবান ব্যাগের ফিতেটা ঠিক করতে গিয়ে হঠাৎ দেখল — সেই নীল ছাতাটা আজও ভাঁজ করাই ছিল। কথা হয়নি, তবু যেন কিছু একটা রয়ে গেল সঙ্গে।
ট্রেন থেকে নেমে বাস, তারপর টোটো — routine পথটা পেরিয়ে যখন অনির্বাণ ব্লক অফিসের গেটের সামনে পৌঁছাল, ঘড়িতে তখন সকাল দশটা।
ব্লক অফিসের গেটের সামনে আজও লম্বা লাইন।
কেউ লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে।
কেউ পুরোনো একটা ফাইল বুকে জড়িয়ে বসে আছেন।
কারও হাতে আধার কার্ড।
কারও হাতে ব্যাঙ্কের পাসবই।
কেউ আবার কাঁপা হাতে বারবার কাগজগুলো মিলিয়ে দেখছেন—সব ঠিক আছে তো?
বেশিরভাগেরই চুল সাদা।
চোখের কোণের ভাঁজগুলো যেন শুধু বয়সের নয়, বছরের পর বছর পরিশ্রমের ইতিহাস।
অনির্বাণ গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে গিয়েও একবার থেমে গেল।
প্রায় প্রতিদিনই এই দৃশ্যটা দেখে।
তবু কোনোদিন অভ্যেস হয় না।
মনে হয়, বার্ধক্য শুধু মানুষের শরীরে আসে না; কখনও কখনও সমাজের বিবেকেও নেমে আসে।
এই মানুষগুলোর অনেকেই হয়তো সারাজীবন নিজের কথা ভাবেননি।
কারও পড়াশোনার জন্য জমি বিক্রি করেছেন।
কারও মেয়ের বিয়ের জন্য ধার করেছেন।
কেউ নিজের নতুন জামা না কিনে সন্তানের স্কুলের ফি দিয়েছেন।
কেউ রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে মাঠে নেমে ফসল ফলিয়েছেন।
কেউ ইট, বালি আর সিমেন্টের বোঝা কাঁধে তুলে শহরের পর শহর গড়েছেন।
কেউ রিকশার প্যাডেলে পা চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন।
কেউ কারখানার ভেতর ঘাম ঝরিয়েছেন।
কেউ ছোট্ট স্কুলে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অ আ ক খ শিখিয়েছেন।
কেউ সরকারি দপ্তরেরই এক কোণে সারাজীবন নীরবে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
দেশের উন্নয়নের বড় বড় হিসাবের মধ্যে তাঁদের নাম হয়তো কোথাও লেখা থাকে না।
কিন্তু তাঁদের ঘাম, শ্রম আর ত্যাগ ছাড়া সেই উন্নয়নের ইতিহাসও কোনোদিন সম্পূর্ণ হতো না।
আজ সেই মানুষগুলোর হাতেই একটা পুরোনো ব্যাগ।
তার ভেতরে কয়েকটা কাগজ।
আর একটুখানি আশার ভরসা।
একটা বার্ধক্যভাতা।
যেটা পেলে হয়তো মাসের ওষুধটা কেনা যাবে।
অনির্বাণের হঠাৎ নিজের বাবার কথা মনে পড়ে গেল।
"আবার যদি দু-একটা টিউশন..."
সেদিন সে বুঝেছিল—
বাবা টাকার জন্য কাজ করতে চাননি।
চেয়েছিলেন নিজের আত্মসম্মানটুকু বাঁচিয়ে রাখতে।
মানুষের বয়স বাড়ে।
শরীর দুর্বল হয়।
কিন্তু নিজের সন্তানের কাছে বারবার হাত পাততে কারওই ভালো লাগে না।
ঠিক তখনই লাইনের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ পকেট থেকে কাঁপা হাতে একটা দশ টাকার নোট বের করে বারবার গুনতে লাগলেন।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক বৃদ্ধ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
— কী দেখছেন?
বৃদ্ধ মানুষটা ম্লান হেসে বললেন—
— ফিরতি বাসভাড়া আছে কি না দেখছি। কাজটা যদি আজ না হয়... আবার আসতে হবে।
কথাটা বলার সময় তাঁর গলায় কোনো অভিযোগ ছিল না।
ছিল শুধু একরাশ ক্লান্তি।
অনির্বাণের বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
একটা মানুষের সারাজীবনের পরিশ্রমের শেষ হিসাব কি তবে এই—ফিরে যাওয়ার বাসভাড়াটা আছে কি না, সেটাও গুনে দেখতে হয়?
সে জানে, সে একজন সামান্য গ্রুপ-ডি কর্মী।
তার হাতে কোনো বড় ক্ষমতা নেই।
একটা ফাইল এগিয়ে দেওয়া ছাড়া অনেক সময় আর কিছুই করার থাকে না।
এই অসহায়ত্বটাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
তবু যখন খুব অসহায় কোনো বৃদ্ধ মানুষকে দেখে, যার পকেটে ফিরতি ভাড়াটুকুও নেই, তখন নিজের টিফিনের জন্য রাখা কয়েকটা টাকা চুপচাপ তাঁর হাতে গুঁজে দেয়।
কখনও বলে—
— দাদু, এটা রাখুন।
কখনও আবার হেসে বলে—
— ফিরে যাওয়ার ভাড়াটা অন্তত থাকুক।
লোকটা অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
কেউ মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেন।
কেউ কাঁপা গলায় শুধু বলেন—
— ভালো থাকিস বাবা।
অনির্বাণ জানে, এতে কারও অভাব দূর হবে না।
তবু কখনও কখনও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মূল্য টাকার অঙ্কে মাপা যায় না।
একটা আন্তরিক কথা...
একটা সম্মানের স্পর্শ...
কিংবা ফেরার বাসভাড়াটুকুও অনেক সময় একজন মানুষের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সহায়তা হয়ে ওঠে।
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে অনির্বাণ মনে মনে শুধু একটা কথাই ভাবল—
"সারা জীবন যারা সমাজের ভরসা হয়ে বেঁচেছেন,
শেষ বয়সে তাঁদের যেন নিজের মর্যাদাটুকুর জন্য অপেক্ষার লাইনে দাঁড়িয়ে না থাকতে হয়।"
একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে অনির্বাণ সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এল।
ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা ১৪।
করিডোরে পা রাখতেই নিচ থেকে দারোয়ান রমেশদার গলা ভেসে এল—
— এই যে অনির্বাণবাবু! আজও এক মিনিট আগে!
অনির্বাণ হেসে নিচের দিকে তাকাল।
— এক মিনিট আগে না এলে তো আপনি আবার খোঁজ শুরু করে দেন!
রমেশদা হেসে বললেন—
— আরে বাবা, তোমাকে নিয়ে চিন্তা নেই। তোমার ঘড়িটা তো অফিসের ঘড়ির থেকেও ঠিক চলে।
দুজনেই হেসে ফেলল।
নিজের ঘরের সামনে পৌঁছাতেই ভেতর থেকে সুশান্তদার গলা ভেসে এল—
— এই অনির্বাণ, আগে চা খাবি, না আবার কম্পিউটারের সামনে বসে যাবি?
অনির্বাণ ব্যাগটা চেয়ারে রেখে বলল—
— আগে কম্পিউটারটা চালু করি দাদা। তারপর আসছি।
সুশান্তদা ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে মাথা নাড়লেন।
— তোকে আমি চিনি। পাঁচ মিনিট পরে আর চায়ের সময় পাবি না।
ঠিক তখনই পাশের টেবিল থেকে প্রদীপদা ফাইল হাতে হেসে বললেন—
— কম্পিউটারটা চালু হতে দাও আগে। তারপর শুরু হবে...
"অনির্বাণ, এটা একটু দেখে দে তো..."
"অনির্বাণ, প্রিন্টারটা কেন চলছে না?"
"অনির্বাণ, এই পোর্টালটা খুলছে না!"
"অনির্বাণ, এই রিপোর্টটা একবার দেখে দেবে?"
ঘরের সবাই হেসে উঠল।
অনির্বাণও হেসে মাথা নিচু করল।
— আপনারাই তো সব শিখিয়েছেন।
প্রদীপদা সঙ্গে সঙ্গে বললেন—
— আরে না, আমরা শিখিয়েছি ঠিকই... কিন্তু এখন তো তুই-ই আমাদের শিক্ষক হয়ে গেছিস!
আবার এক দফা হাসির রোল উঠল।
অনির্বাণ এই হাসিটাই ভালোবাসে।
বাইরে থেকে সরকারি অফিসকে যতই কাঠখোট্টা মনে হোক, এই চার দেওয়ালের ভেতরে প্রতিদিন কত রকমের জীবন বেঁচে থাকে, তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই।
এখানে কেউ শুধু সহকর্মী নয়।
কেউ বড়দার মতো।
কেউ বন্ধুর মতো।
কেউ আবার প্রয়োজনে অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়ান।
কারও বাড়িতে অসুখ হলে সবাই খবর নেয়।
কারও মেয়ের বিয়ে মানেই পুরো অফিসের ব্যস্ততা।
কেউ অবসর নিলে বিদায়বেলায় অনেকেরই চোখ ভিজে ওঠে।
অনির্বাণ প্রায়ই ভাবে—
রক্তের সম্পর্কেই শুধু পরিবার হয় না।
একসঙ্গে দায়িত্ব, হাসি আর দুঃখ ভাগ করে নিলেও মানুষ পরিবার হয়ে ওঠে।
তার পদবী গ্রুপ-ডি কর্মী।
কিন্তু অফিসে খুব কম মানুষই তাকে সেই পরিচয়ে চেনে।
গণিতে এম.এসসি., সঙ্গে বি.এড., আর কম্পিউটারের কাজে দক্ষতা দেখে যোগদানের কয়েক দিনের মধ্যেই বড়বাবু বলেছিলেন—
— তোমাকে শুধু গ্রুপ-ডির কাজ করালে অফিসেরই ক্ষতি হবে।
সেই থেকেই অনির্বাণের কাজের ধরন বদলে যায়।
ফাইল তৈরি করা...
রিপোর্ট বানানো...
অনলাইন পোর্টালে তথ্য আপলোড করা...
বিভিন্ন প্রকল্পের তথ্য মিলিয়ে দেওয়া...
প্রয়োজন পড়লে অফিসারদের নোট তৈরি করে দেওয়া...
কাজ বেশি।
দায়িত্বও কম নয়।
তবু অনির্বাণের খারাপ লাগে না।
কারণ সে বিশ্বাস করে—
মানুষের পরিচয় তার পদবীতে নয়...
তার কাজে।


Comments
Post a Comment