Skip to main content

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প


প্রথম অধ্যায়

ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ

ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল।

জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ। 

আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ।

সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি।

আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড়িটা বাবার দেওয়া। বছরের পর বছর কত পরীক্ষা, কত ইন্টারভিউ, কত ব্যর্থতার দিন— সবকিছুরই নীরব সাক্ষী এই ঘড়ি। এখন চাকরি হয়েছে, তবু ঘড়িটা বদলানোর কথা তার কোনোদিন মনে হয়নি।

রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন—

— অনি, খেয়ে যা। রুটি ঠান্ডা হয়ে যাবে।

থালায় দুটো রুটি আর আলুর তরকারি।

— আজ ফিরতে দেরি হবে?

জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে অনির্বাণ হাসল।

— চেষ্টা করব না হতে।

মা আর কিছু বললেন না। "চেষ্টা করব" কথাটার মানে দুজনেই জানেন। অফিসে কাজ বাড়তে পারে, ট্রেন লেট হতে পারে, কিংবা অন্য কারও কাজ নিজের ঘাড়ে এসে পড়তে পারে।

টিফিনের ডিব্বাটা ব্যাগে রাখতে রাখতে মা শুধু বললেন—

— দুপুরে সময় পেলে খেয়ে নিস।

— আচ্ছা।

বাবা ওষুধ খেয়ে চুপচাপ বসেছিলেন। বেরোনোর আগে অনির্বাণ তাঁর হাতে এক গ্লাস জল দিল।

— প্রেসারটা কেমন?

বাবা হেসে বললেন—

— বুড়ো মানুষের প্রেসার আর সবজির বাজারদর— দুটোই কখন বাড়ে, কখন কমে, আগে থেকে বলা মুশকিল।

দুজনেই হেসে ফেলল।

হাসিটা ছোট, কিন্তু সংসারে এই ছোট্ট হাসিগুলোই অনেক বড় সান্ত্বনা।

ব্যাগ কাঁধে তুলে দরজার দিকে এগোতেই বাবা বললেন—

— ভাবছিলাম, যদি আবার দু-একটা টিউশন শুরু করি...

নতুন কিছু নয়। গত কয়েক মাসে বহুবার এই ইচ্ছের কথা বলেছেন তিনি। একসময় সকাল-বিকেল বাড়িতে ছাত্র পড়াতেন। পাড়ার অনেকেই এখনও তাঁকে "মাস্টারমশাই" বলেই চেনে।

অনির্বাণ মৃদু হেসে বাবার পাশে বসল।

— আবার সেই কথা?

এই মানুষটাকে সে ছোটবেলা থেকে কোনোদিন খালি বসে থাকতে দেখেনি। সকাল থেকে রাত— কখনও স্কুলপড়ুয়া, কখনও কলেজের ছাত্র, কখনও আবার চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া ছেলেমেয়েরা আসত পড়তে। সন্ধ্যা হলেই উঠোন ভরে যেত সাইকেলে। ঘরের ভেতর থেকে শোনা যেত বাবার পরিচিত গলা—

— উত্তরটা মুখস্থ করো না, আগে বুঝে নাও। অঙ্ক কখনও মুখস্থে হয় না।

পাড়ার অনেকেই এখনও তাঁকে নামে চেনে না। সবার মুখে একটাই পরিচয়— "মাস্টারমশাই"।

একবার পাড়ার এক ছাত্র চাকরি পেয়ে মিষ্টির বাক্স নিয়ে বাড়িতে এসেছিল। বাবার পা ছুঁয়ে বলেছিল—

— আপনি না থাকলে আমি কোনোদিন পারতাম না, মাস্টারমশাই।

বাবা শুধু হেসে আশীর্বাদ করেছিলেন। কিন্তু সেদিন রাতে অনির্বাণ দেখেছিল, টেবিলের ওপর রাখা মিষ্টির বাক্সটার দিকে বাবা অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে ছিলেন। মুখে কিছু বলেননি, তবু চোখের কোণে জমে থাকা তৃপ্তিটুকু লুকিয়ে রাখতে পারেননি।

আজ সেই মানুষটাই বলছেন—

— সারাদিন বাড়িতে বসে থাকতে ভালো লাগে না রে। দুটো বাচ্চা পড়ালে অন্তত নিজের ওষুধের খরচটা নিজেই চালাতে পারব।

কথাটা শুনে অনির্বাণের বুকের ভেতরটা হালকা মোচড় দিয়ে উঠল। সে বাবার হাতটা নিজের হাতে নিল।

— ওসব নিয়ে আর ভাবতে হবে না।

বাবা মৃদু হেসে বললেন—

— তোকে ভাবাতে চাই না রে। কিন্তু সারাদিন বসে থাকলে নিজেকেই কেমন অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। আগে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়িটা ছাত্রদের আনাগোনায় ভরে থাকত। এখন দিনগুলো বড় দীর্ঘ লাগে।

অনির্বাণ চুপ করে শুনছিল।

সে জানে, বাবার কষ্টটা শুধু টাকার জন্য নয়। একজন শিক্ষক যখন পড়ানো ছেড়ে দেন, তখন শুধু রোজগার বন্ধ হয় না; তাঁর প্রতিদিনের পরিচয়টাও যেন একটু একটু করে ফিকে হয়ে যায়।

— জানিস, এখনও মাঝে মাঝে বিকেল হলেই মনে হয়, এই বুঝি কলিংবেলটা বাজল। কেউ খাতা নিয়ে এসে বলবে, "মাস্টারমশাই, আজ একটু আগে শুরু করব?"

ঘরটা কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে রইল। বাইরে একটা কাক ডেকে উড়ে গেল। রান্নাঘর থেকে ভাতের হাঁড়ির ফুটন্ত শব্দ ভেসে আসছে।

— বাবা, ছোটো থেকেই শুনে আসছি, বাবা-মায়ের ঋণ কোনোদিন শোধ করা যায় না। তোমরা যে ভালোবাসা দিয়ে আমাকে বড় করেছ, তার দাম দেওয়ার ক্ষমতা আমার কোনোদিন হবে না। আমি শুধু চাই, তোমাদের জীবনের এই সময়টায় যেন আনন্দে কাটে।

বাবার চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল জল। তিনি মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকালেন।

— তবু... মানুষটা মাঝে মাঝে নিজেকেই বোঝাতে পারে না।

অনির্বাণ উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

— আর একটা কথা...

— এই বাড়িতে আজ থেকে কেউ আর "ভার" শব্দটা উচ্চারণ করবে না।

— একটা কথা বলো তো। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন কি কোনোদিন তোমাদের মনে হয়েছিল আমি তোমাদের ভার?

বাবা যেন প্রশ্নটা শুনেই চমকে উঠলেন।

— কী যে বলিস! কোনো সন্তান কখনও বাবা-মায়ের ভার হয় নাকি?

অনির্বাণ মৃদু হেসে বলল—

— তাহলে আজ কেন মনে হচ্ছে তুমি আমার ভার?জ্ঞান হওয়ার পর থেকে যা দেখেছি, তোমরা নিজেরা নতুন জামা কেনোনি, আমার বই কিনেছ। নিজেরা ভালো খাওনি, আমার জন্য দুধ-ডিম জুগিয়েছ। পরীক্ষার আগের রাতগুলোতে তুমি আমার সঙ্গে জেগে থেকেছ, মা ভোরবেলা উঠে খাবার বানিয়ে দিয়েছে। আমি অসুস্থ হলে তোমাদের দুজনের চোখেই ঘুম থাকত না।

— তখন তো কোনোদিন শুনিনি, আমি সংসারের ভার।

ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। বাইরে সকালের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

— সন্তান বাবা-মায়ের ভার হয় না। বাবা-মাও সন্তানের ভার হয় না। সংসারে দায়িত্ব থাকে, ভালোবাসা থাকে, ত্যাগ থাকে। কিন্তু "ভার" বলে কিছু থাকে না।

— আজ আমি যদি তোমাদের জন্য দুটো দায়িত্ব নিতে পারি, তাহলে সেটা কোনো বোঝা নয়। বরং এটাই আমার সৌভাগ্য। তোমরা আমাকে মানুষ করেছ বলেই আজ আমি তোমাদের পাশে দাঁড়াতে পারছি।

বাবা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। কাঁপা হাতে ছেলের মাথায় হাত রেখে শুধু বললেন—

— সুখে থাকিস বাবা... মানুষ হয়ে থাকিস।

অনির্বাণ বাবার হাতটা দুহাতে চেপে ধরল। এই আশীর্বাদের চেয়ে বড় সম্পদ তার জীবনে আর কিছু নেই।

ভোরের আলো ততক্ষণে ঘরের মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। অনির্বাণ ব্যাগটা কাঁধে তুলে দরজার দিকে এগোল।

বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকাল। মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। বাবা চুপচাপ তাকিয়ে আছেন তার দিকে।

দরজাটা আস্তে বন্ধ হয়ে গেল।

বাবা অনেকক্ষণ সেই বন্ধ দরজার দিকেই তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব আস্তে, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বললেন—

"ভগবান... আমার জন্য আর কিছু চাই না। শুধু ছেলেটার কাঁধে দায়িত্বের চেয়ে আনন্দটা যেন একদিন একটু বেশি হয়।"

বাড়ি থেকে স্টেশন— হাঁটাপথে বড়জোর বারো মিনিট।

মফস্বলের এই সময়টা অনির্বাণের খুব প্রিয়। শহরটা তখন সবে ঘুম ভাঙছে। কোথাও দোকানের শাটার উঠছে, কোথাও উঠোনে ঝাঁটা দেওয়ার শব্দ। ধূপের গন্ধে মিশে আছে ফুটন্ত চায়ের গন্ধ।

রাস্তার মোড়ের পুরোনো বটগাছটার নীচে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ খবরের কাগজ হাতে দিনের প্রথম আড্ডা জমিয়েছেন। সবজি বিক্রেতা সাইকেলের ঘণ্টা বাজিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। স্কুলপড়ুয়া দু-একটা ছেলে-মেয়ে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটছে।

এত বছরের যাতায়াতে এই পথের অনেক মুখই চেনা হয়ে গেছে। কারও নাম জানে না, তবু রোজ দেখা হলে এক চিলতে হাসি বিনিময় হয়। ছোট শহরের সম্পর্কগুলো বোধহয় এমনই— পরিচয় কম, আপনত্ব বেশি।

অনির্বাণ ধীরে হাঁটছিল। তাড়া নেই। সে জানে, দৌড়ে কয়েক মিনিট বাঁচানো যায়, কিন্তু জীবনকে নয়।

স্টেশনের সামনে পৌঁছতেই সেই চেনা চায়ের গন্ধ নাকে এল।  কেটলিতে চা ফুটছে। ভাঁড়গুলো সারি করে সাজানো। ছোট্ট দোকানটা নিয়ে সকাল থেকেই ব্যস্ত মানুষটা। সবাই তাঁকে "মামা" বলেই ডাকে। কেন ডাকে, সেটা ঠিক কেউ জানে না।

বছর সাতেক আগে স্টেশনে প্রথম এসেছিলেন তিনি। অনেক অনুরোধ, অনেক দৌড়ঝাঁপের পর রেলের এক কর্মচারীর সাহায্যে এই ছোট্ট চায়ের দোকানটা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তারপর থেকে ভোরের প্রথম লোকাল থেকে রাতের শেষ ট্রেন— এই দোকানটাই যেন তাঁর সংসার।

অনির্বাণকে দেখেই মামা হেসে বললেন—

আজও আগের মতো?

হ্যাঁ । কম চিনি।

মামা চা ছেঁকে ভাঁড়টা এগিয়ে দিতে দিতে বললেন—

— এত বছরেও তোমার পছন্দ বদলাল না দেখছি।

অনির্বাণ হেসে উত্তর দিল—

— তোমার চা তো বদলায়নি, মামা । আমার জন্য দামটাও এখনও সেই আগের মতোই।

মামা মুচকি হেসে আর কিছু বললেন না। এই ছেলেটাকে তিনি বহু বছর ধরে দেখছেন। চাকরির প্রস্তুতির দিন থেকে আজ পর্যন্ত। অনেক মানুষের মতো অনির্বাণও যেন তাঁর দোকানের গল্পেরই একটা অংশ।

চা হাতে বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল অনির্বাণ। দিনের এই মিনিট দশেক সময় সে খুব যত্ন করে নিজের জন্য রেখে দেয়।  শুধু এক কাপ গরম চা, প্ল্যাটফর্মের কোলাহল আর সকালবেলার শান্তি।

ঠিক তখনই দোকানের সামনে একটা নীল ছাতা ভাঁজ করার শব্দ হলো।

অনির্বাণ মুখ না তুলেও বুঝে গেল।

সে এসেছে।

কেন যে বুঝতে পারে, সে নিজেও জানে না। চারপাশে এত মানুষের ভিড়, এত শব্দের মাঝেও তার পায়ের শব্দ যেন অনির্বাণের কানে আলাদা করেই পৌঁছায়। বুকের ভেতর কোথাও অকারণ এক ঝংকার বেজে ওঠে।

ভাঁড়ে এক চুমুক চা খেয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আড়চোখে তাকাল সে...



হালকা নীল সুতির শাড়ি। কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। হাতে কয়েকটা খাতা। প্রতিদিনের মতোই তাড়াহুড়ো নেই। যেন নিজের ছন্দে হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়াল চায়ের দোকানের সামনে।

মামা তাকিয়ে হেসে বললেন—

— দিদিমণি, আজও লিকার চা?

মেয়েটিও হেসে মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ , চিনি কম।

মেয়েটিও মৃদু হেসে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল।

মাঝখানে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। সেই দূরত্ব কেউ কমানোর চেষ্টা করল না।

অনির্বাণ ভাঁড়ের দিকে তাকিয়েই চা খাচ্ছিল।

তবু অজান্তেই তার চোখ বারবার বেঞ্চের অন্য প্রান্তে চলে যাচ্ছিল।

সে নিজেই যেন নিজের চোখকে বারণ করতে পারছিল না।

মামা একবার আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হেসে আবার কেটলির দিকে মন দিলেন।


ঠিক তখনই স্টেশনের লাউডস্পিকারে ঘোষণা ভেসে এল—

"যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে..."

ঘোষণার বাকি অংশ কোলাহলের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

প্ল্যাটফর্মে হঠাৎ ব্যস্ততা বেড়ে গেল। কেউ ভাঁড় নামিয়ে রাখল, কেউ ব্যাগের চেন টেনে বন্ধ করল, কেউ আবার দৌড়ে ওভারব্রিজের দিকে ছুটল।

অনির্বাণও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ভাঁড়টা ডাস্টবিনে ফেলে প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

ঠিক সেই সময়, অজান্তেই দুজনের চোখ একবার মিলল।

এক মুহূর্ত।

তার বেশি নয়।

তারপর দুজনেই যেন কিছুই ঘটেনি এমন ভঙ্গিতে অন্যদিকে তাকিয়ে নিল।

মামা দূর থেকে সব দেখছিলেন। মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।

দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

লোহার চাকার শব্দ ক্রমশ স্পষ্ট হতে লাগল।

সকালের লোকাল ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ল।

ভিড়টা একটু কমতেই অনির্বাণ ধীরে ধীরে কামরায় উঠে পড়ল। বহু বছরের অভ্যাসে জানালার ধারের একটা জায়গা খুঁজে নিল। বসার সুযোগ না পেলেও জানালার পাশে দাঁড়াতে পারল।

ট্রেনটা ধীরে ধীরে স্টেশন ছেড়ে দিল। প্ল্যাটফর্ম, চায়ের দোকান, মামা টিনের চাল— সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে পিছিয়ে যেতে লাগল।

কামরার ভেতর তখনও পুরোপুরি কোলাহল জমেনি। কেউ খবরের কাগজ খুলেছে, কেউ মোবাইলে চোখ রেখে দিনের প্রথম খবর পড়ছে। দু-একজন চোখ বন্ধ করে বসে আছে। হয়তো রাতের ঘুম এখনও পুরোটা কাটেনি।

অনির্বাণের চোখ হঠাৎ গিয়ে থামল দরজার কাছে। মেয়েটি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে এখনও সেই কাপড়ের ব্যাগ আর খাতাগুলো।

সে আর তাকাল না। শুধু মনে মনে হাসল।

অদ্ভুত ব্যাপার! কয়েক মাস আগেও এই ট্রেনযাত্রা ছিল একেবারে নিরস। এখন না চাইলেও প্রতিদিন একটা পরিচিত মুখ খুঁজে নেয় চোখ।

নিজের এই পরিবর্তনটা ভেবে তারই একটু হাসি পেল।

— কী রে, একা একা হাসছিস কেন?

পাশ থেকে পরিচিত গলা শুনে চমকে তাকাল অনির্বাণ।

দেবাশিস— অফিসের সহকর্মী। একই ট্রেনে যাতায়াত করে।

আরে, কিছু না। এমনি।

দেবাশিস একবার অনির্বাণের দিকে তাকাল। তারপর দরজার দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকেও একঝলক চোখ বুলিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।

বুঝেছি। সকালের হাওয়াটা আজ বেশ ভালো, তাই না?

অনির্বাণ শুধু হেসে মাথা নাড়ল।

দেবাশিস ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে বলল—

— আজ অফিসে কিন্তু ভিড় হবে। কাল শুনলাম নতুন প্রকল্পের ফাইল এসেছে।

— হ্যাঁ, কাজও বাড়বে।

— সরকারি চাকরি করতে এসেছিলাম শান্তিতে থাকব বলে। এখন তো মনে হয় অফিসটাই আরেকটা সংসার।

দুজনেই হেসে ফেলল।

ট্রেন তখন একের পর এক ছোট স্টেশন পার করে এগিয়ে চলেছে। প্রতিটি স্টেশনে কিছু মানুষ নামছে, কিছু মানুষ উঠছে। প্রত্যেকের হাতে আলাদা ব্যাগ, আলাদা গন্তব্য, আলাদা গল্প।

হয়তো জীবনও একটা দীর্ঘ ট্রেনযাত্রার মতো।

কেউ মাঝপথে নেমে যায়, কেউ শেষ পর্যন্ত পাশে থাকে।

ট্রেনটা নির্দিষ্ট সময়ের কয়েক মিনিট পর স্টেশনে ঢুকল।

নেমেই শুরু হলো প্রতিদিনের চেনা ব্যস্ততা। কেউ তাড়াহুড়ো করে অটো ধরছে, কেউ বাসস্ট্যান্ডের দিকে দৌড়চ্ছে। চায়ের দোকান, পত্রিকার স্টল, ফল বিক্রেতা— সকালের ভিড়ে চারপাশ যেন মুহূর্তের মধ্যেই জেগে উঠেছে।

অটো থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে অনির্বাণ ব্যাগটা কাঁধে তুলে অফিসের ভেতরে ঢুকল।

দুজনেই হেসে ফেলল।

নিজের ঘরের সামনে পৌঁছাতেই ভেতর থেকে সুশান্তদার গলা ভেসে এল—

— এই অনির্বাণ, আগে চা খাবি, না আবার কম্পিউটারের সামনে বসে যাবি?

অনির্বাণ ব্যাগটা চেয়ারে রেখে বলল—

— আগে কম্পিউটারটা চালু করি দাদা। তারপর আসছি।

সুশান্তদা ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে মাথা নাড়লেন।

— তোকে আমি চিনি। পাঁচ মিনিট পরে আর চায়ের সময় পাবি না।

ঠিক তখনই পাশের টেবিল থেকে প্রদীপদা ফাইল হাতে হেসে বললেন—

— কম্পিউটারটা চালু হতে দাও আগে। তারপর শুরু হবে...

"অনির্বাণ, এটা একটু দেখে দে তো..."

"অনির্বাণ, প্রিন্টারটা কেন চলছে না?"

"অনির্বাণ, এই পোর্টালটা খুলছে না!"

"অনির্বাণ, এই রিপোর্টটা একবার দেখে দেবে?"

ঘরের সবাই হেসে উঠল।

অনির্বাণও হেসে মাথা নিচু করল।

— আপনারাই তো সব শিখিয়েছেন।

প্রদীপদা সঙ্গে সঙ্গে বললেন—

— আরে না, আমরা শিখিয়েছি ঠিকই... কিন্তু এখন তো তুই-ই আমাদের শিক্ষক হয়ে গেছিস!

আবার এক দফা হাসির রোল উঠল।

অনির্বাণ এই হাসিটাই ভালোবাসে।

বাইরে থেকে সরকারি অফিসকে যতই কাঠখোট্টা মনে হোক, এই চার দেওয়ালের ভেতরে প্রতিদিন কত রকমের জীবন বেঁচে থাকে, তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই।

এখানে কেউ শুধু সহকর্মী নয়।

কেউ বড়দার মতো।

কেউ বন্ধুর মতো।

কেউ আবার প্রয়োজনে অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়ান।

কারও বাড়িতে অসুখ হলে সবাই খবর নেয়।

কারও মেয়ের বিয়ে মানেই পুরো অফিসের ব্যস্ততা।

কেউ অবসর নিলে বিদায়বেলায় অনেকেরই চোখ ভিজে ওঠে।

অনির্বাণ প্রায়ই ভাবে—

রক্তের সম্পর্কেই শুধু পরিবার হয় না।
একসঙ্গে দায়িত্ব, হাসি আর দুঃখ ভাগ করে নিলেও মানুষ পরিবার হয়ে ওঠে।

তার পদবী গ্রুপ-ডি কর্মী।

কিন্তু অফিসে খুব কম মানুষই তাকে সেই পরিচয়ে চেনে।

গণিতে এম.এসসি., সঙ্গে বি.এড., আর কম্পিউটারের কাজে দক্ষতা দেখে যোগদানের কয়েক দিনের মধ্যেই বড়বাবু বলেছিলেন—

— তোমাকে শুধু গ্রুপ-ডির কাজ করালে অফিসেরই ক্ষতি হবে।

সেই থেকেই অনির্বাণের কাজের ধরন বদলে যায়।

ফাইল তৈরি করা...

রিপোর্ট বানানো...

অনলাইন পোর্টালে তথ্য আপলোড করা...

বিভিন্ন প্রকল্পের তথ্য মিলিয়ে দেওয়া...

প্রয়োজন পড়লে অফিসারদের নোট তৈরি করে দেওয়া...

কাজ বেশি।

দায়িত্বও কম নয়।

তবু অনির্বাণের খারাপ লাগে না।

কারণ সে বিশ্বাস করে—

মানুষের পরিচয় তার পদবীতে নয়...
তার কাজে।

Comments

Popular posts from this blog

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

পর্ব – ১৮ : সাহসের সকাল

পর্ব – ৮ : সাহসের সকাল ইন্টারভিউয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ঈশিতার ফোন কলের সংখ্যা ততই একটু একটু করে বাড়ছিল। খুব দীর্ঘ কথা নয়। নিতান্তই প্রয়োজনের কথা। কখনো কোনো নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন, কখনো যাতায়াতের সময় নিয়ে আলোচনা, কখনো বা শুধু নিশ্চিত হওয়া— — "আপনি তো আসছেন, তাই না?" প্রতিবারই অরিন্দমের একই উত্তর— — "হ্যাঁ, আসছি।" ইন্টারভিউয়ের তিন দিন আগেই সে অফিসে ছুটির আবেদন করে রেখেছিল। কারণ হিসেবে লিখেছিল— 'Personal Work'। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় তার নিজেরই মনে হয়েছিল, বহু বছর পর কোনো ছুটি সে সত্যিই নিজের ইচ্ছায় নিচ্ছে। ইন্টারভিউয়ের আগের দিন দুপুরে অফিসে কাজ করছিল অরিন্দম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "ঈশিতা"। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। তবে আজ সেই কণ্ঠে যেন এক অচেনা অস্থিরতা মিশে আছে। — "ব্যস্ত আছেন?" — "না, বলুন।" কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ঈশিতা ধীরে বলল— — "জানেন, আজ বড় অদ্ভুত লাগছে। এতদিন এই দিনটার জন্যই তো প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন দিনটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আর মনে হচ্ছে সব যেন গু...