Skip to main content

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প

প্রথম অধ্যায়


ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ।

ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে।

ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ।

এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল।

বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল।

দিনটা আবার শুরু হলো।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা।

সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি।

রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন,

— অনি, খেয়ে যা। রুটি ঠান্ডা হয়ে যাবে।

থালায় দুটো রুটি আর আলুর তরকারি সাজিয়ে রাখলেন তিনি।

— আজ ফিরতে দেরি হবে?

অনির্বাণ জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে হেসে বলল,

— চেষ্টা করব না হতে।

মা আর কিছু বললেন না।

এই "চেষ্টা করব" কথাটার মানে দুজনেই জানেন। অফিসে কাজ বাড়তে পারে। ট্রেন লেট হতে পারে। কিংবা অন্য কারও কাজ নিজের ঘাড়ে এসে পড়তে পারে।

বাবা ওষুধ খেয়ে চুপচাপ বসেছিলেন।

অনির্বাণ বেরোনোর আগে তাঁর হাতে এক গ্লাস জল দিল।

— প্রেসারটা কেমন?

বাবা একটু হেসে বললেন,

— বুড়ো মানুষের প্রেসার আর দেশের দামের মতো... কখন বাড়ে, কখন কমে, কেউ জানে না।

দুজনেই হেসে ফেলল।

হাসিটা ছোট ছিল। কিন্তু সংসারে এই ছোট ছোট হাসিই অনেক বড় সান্ত্বনা।

অনির্বাণ ব্যাগটা কাঁধে তুলে দরজার দিকে এগোতেই বাবা আবার ডাকলেন।

— শোন তো...

— বলো।

বাবা একটু ইতস্তত করলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন,

— ভাবছিলাম... যদি আবার দু-একটা টিউশন...

কথাটা শেষ করতে পারলেন না।

অনির্বাণ বুঝে গেল। এই কথাটা নতুন নয়। গত কয়েক মাসে বহুবার বাবা একই ইচ্ছের কথা বলেছেন।

সে মৃদু হেসে বাবার পাশে গিয়ে বসল।

— আবার সেই কথা?

— সারাদিন বাড়িতে বসে থাকতে ভালো লাগে না রে। শরীরটা যতটা পারে... দুটো বাচ্চা পড়ালে অন্তত নিজের ওষুধের খরচটা...

অনির্বাণ বাবার কথা শেষ হতে দিল না।

— ওসব নিয়ে আর ভাবতে হবে না।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— সারাজীবন অন্যের ছেলেমেয়েকে মানুষ করলাম। নিজের ছেলেটার কাঁধে একদিন এভাবে বসে থাকব, কোনোদিন ভাবিনি। জানিস, এই কষ্টটা শরীরের নয়... মনের।

ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দেওয়ালের ঘড়িটার টিকটিক শব্দ যেন আরও স্পষ্ট শোনা যেতে লাগল...

ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দেওয়ালের ঘড়িটার টিকটিক শব্দ যেন আরও স্পষ্ট শোনা যেতে লাগল।

অনির্বাণ বাবার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল।

— তুমি আমাকে ছোটবেলায় একটা কথা বলতে...

— কী?

— "বাবা-মায়ের ঋণ কোনোদিন শোধ হয় না।"

বাবা মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।

— বলতাম।

— তাহলে আজ শোধ করতে যাচ্ছি কে বলল? আমি তো শুধু একটু একটু করে ফেরত দিচ্ছি।

বাবা কিছু বললেন না। চোখদুটো ধীরে ধীরে ভিজে উঠল।

অনির্বাণ বাবার হাতটা নিজের হাতে শক্ত করে ধরে বলল-

— জানো বাবা, একটা চাকরি পাওয়ার জন্য আমি যতটা লড়েছি, তার অর্ধেকও যদি শুধু নিজের জন্য লড়তাম, অনেক আগেই ভেঙে পড়তাম।

বাবা চুপ করে শুনছিলেন।

— আমি লড়েছি এই দিনটার জন্য। যাতে তোমাকে আর কোনোদিন বলতে না হয়— "দুটো টিউশন করলে নিজের ওষুধটা কিনতে পারতাম।"

বাবার চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল জল।

তিনি মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন—

— তবু... মানুষটা মাঝে মাঝে নিজেকেই বোঝাতে পারে না।

অনির্বাণ উঠে দাঁড়াল।

দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

— আর একটা কথা...

— বল।

— এ বাড়িতে আজ থেকে "ভার" শব্দটা কেউ বলবে না। তুমি আর মা যদি ভার হও, তাহলে আমার এই চাকরিটা পাওয়ার জন্য এত বছরের লড়াইয়েরই কোনো মানে থাকে না।

বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।

ভোরের আলো একটু একটু করে ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ছিল।

অনির্বাণ দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।

উঠোনের দরজাটা আস্তে করে বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনা গেল।

ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল।

বাবা অনেকক্ষণ সেই বন্ধ দরজার দিকেই তাকিয়ে রইলেন।

তারপর খুব আস্তে, যেন নিজের মনেই বললেন—

"ভগবান... আমার জন্য আর কিছু চাই না। শুধু ছেলেটার কাঁধে যেন দায়িত্বের চেয়ে আনন্দটা একদিন একটু বেশি হয়।"

বাড়ি থেকে স্টেশনে পৌঁছাতে হাঁটাপথে বারো মিনিট লাগে।

এই বারো মিনিটও যেন অনির্বাণের দিনের একটা আলাদা অধ্যায়।

রাস্তার দুপাশে দোকানগুলো তখনও পুরো খোলেনি। ফুলওয়ালা গাঁদার মালা গাঁথছে। সবজির ভ্যানগুলো বাজারের দিকে যাচ্ছে। একটা সাইকেলে দুধওয়ালা ঘণ্টা বাজিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।

মোড়ের মাথায় পুরোনো বটগাছটার নিচে কয়েকজন রিকশাওয়ালা চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছে। দেশ বদলানোর খবর প্রতিদিনই বেরোয়। কিন্তু তাদের রোজকার ভাড়াটা খুব একটা বদলায় না।

অনির্বাণ হাঁটছিল ধীরে ধীরে। তার কোনো তাড়া নেই। কারণ সে জানে, দৌড়ে পাঁচ মিনিট বাঁচানো যায়, জীবন নয়।

স্টেশনের বাইরে সেই চেনা চায়ের দোকান।

টিনের চাল। বাঁশের বেড়া। সামনে তিনটে পুরোনো কাঠের বেঞ্চ। চুলোর ওপর কালচে কেটলিতে চা ফুটছে। সেই ফুটন্ত চায়ের গন্ধে যেন সকালটা আরও একটু জেগে ওঠে।

দোকানদার গোপাল কাকু অনির্বাণকে দেখেই হেসে বললেন,

— আজও আগের মতো?

— হ্যাঁ কাকু। কম চিনি।

গোপাল কাকু আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। বহু বছরের খদ্দের। কার কাপে কতটা চিনি, কে বিস্কুট ভিজিয়ে খায়, কে ট্রেনের তাড়ায় আধকাপ চা ফেলে রেখে চলে যায়—সব তাঁর মুখস্থ।

চা হাতে নিয়ে অনির্বাণ বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল।

দিনের এই দশ মিনিট সে খুব ভালোবাসে।

এখানে কেউ অফিসের ফাইল নিয়ে কথা বলে না। কেউ সংসারের হিসাব চায় না। শুধু কেটলির সোঁদা গন্ধ, ভাঁড়ে ধোঁয়া ওঠা চা আর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢোকার ঘোষণা।

ঠিক তখনই দোকানের সামনে একটা নীল রঙের ছাতা ভাঁজ করে রাখল কেউ।

অনির্বাণ না তাকিয়েও বুঝে গেল। সে এসেছে।

এ যেন প্রতিদিনের একটা নির্দিষ্ট সময়। ঘড়ির কাঁটার মতোই নির্ভুল। সকাল, লোকাল ট্রেন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান... আর সেই মেয়েটি।

হালকা রঙের সুতির শাড়ি। কাঁধে পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ। হাতে কয়েকটা খাতা। চুলগুলো খোঁপা করা, তবু কপালের পাশে দু-এক গোছা চুল বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে।

তার মধ্যে এমন কিছু ছিল না, যাকে সিনেমার ভাষায় "অসাধারণ সুন্দর" বলা যায়। তবু তাকে না দেখলে যেন সকালের ছবিটা সম্পূর্ণ হতো না।

গোপাল কাকু তাকে দেখেই হেসে বললেন,

— দিদিমণি, আজও লিকার চা?

— হ্যাঁ কাকু। আর চিনি অল্প।

— তোমাদের দুজনের জন্যই আলাদা করে মনে রাখতে হয় না। হাত নিজে থেকেই ঠিক কাপে ঠিক চা ঢেলে দেয়।

কথাটা বলে গোপাল কাকু হেসে ফেললেন। মেয়েটিও মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে বেঞ্চের অন্য পাশে গিয়ে বসল।

দুজনের মাঝখানে প্রায় চার হাত দূরত্ব।

কেউ কারও দিকে তাকাল না। কেউ কোনো কথা বলল না।

তবু এই নীরবতাটাও যেন বহুদিনের পরিচিত। কিছু কিছু মানুষের সঙ্গে আলাপ হওয়ার আগেই একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়। এও যেন তেমনই।

অনির্বাণ ধীরে ধীরে চায়ে চুমুক দিল। ভাঁড় থেকে ওঠা ধোঁয়ার ফাঁক দিয়ে সকালের প্ল্যাটফর্মটা ঝাপসা লাগছিল।

হঠাৎ পাশ থেকে ভেসে এল মেয়েটির নরম গলা—

— কাকু, আজ ট্রেনটা আবার লেট হবে নাকি?

— শুনলাম পাঁচ মিনিট।

— প্রথম পিরিয়ডটা আবার মিস হবে।

গলায় বিরক্তির চেয়ে দায়িত্ববোধই বেশি ছিল। যেন নিজের জন্য নয়, ক্লাসে অপেক্ষা করা ছাত্রছাত্রীদের জন্যই চিন্তা।

অনির্বাণ অজান্তেই মুখ তুলে তাকাল।

ঠিক সেই সময় মেয়েটিও চোখ তুলেছিল।

দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল।

একটা মাত্র মুহূর্ত।

তারপর দুজনেই অপ্রস্তুত হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে নিল।

অদ্ভুত ব্যাপার...

প্রতিদিন দেখা হয়। প্রতিদিন একই ট্রেনে ওঠা। একই স্টেশনে চা খাওয়া।

তবু এখনও তারা একে অপরের নাম জানে না।

হয়তো জানার প্রয়োজনও পড়েনি। অথবা... দুজনেই অপেক্ষা করছে, প্রথম কথাটা কে বলবে।

ঠিক তখনই স্টেশনের মাইকে ঘোষণা ভেসে এল—

"আপ লোকাল কয়েক মিনিটের মধ্যেই এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করবে।"

গোপাল কাকু কেটলিটা নামাতে নামাতে বললেন—

— চা শেষ করুন। আজ কিন্তু ভিড় একটু বেশি হবে।

অনির্বাণ ভাঁড়টা নামিয়ে রাখল।

মেয়েটিও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

ভোরের আলো তখন পুরো প্ল্যাটফর্ম জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। দুজনেই ভিড়ের সঙ্গে একই দিকে হাঁটতে শুরু করল।

লোকাল ট্রেনটা ধীরে ধীরে স্টেশন ছেড়ে দিল।

জানালার ধারে দাঁড়িয়ে রইল অনির্বাণ। সকালের ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগছে। একটার পর একটা স্টেশন পিছিয়ে যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো মুহূর্তের মধ্যেই ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে।

এই ট্রেনে উঠলেই তার পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে।

এই চাকরিটা...

এই সামান্য গ্রুপ-ডি চাকরিটা...

এত সহজে তার জীবনে আসেনি।

বরং এই নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার আগেই জীবনের অনেকটা সময় যেন বুড়িয়ে গিয়েছিল।

গণিতে এম.এসসি।

তারপর বি.এড।

ছোটবেলায় পাড়ার সবাই বলত—

— এই ছেলেটা একদিন অনেক বড় কিছু করবে।

অনির্বাণও বিশ্বাস করত। নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল। বাবার চোখেও স্বপ্ন ছিল। মা পাড়ার কারও সঙ্গে দেখা হলেই গর্ব করে বলতেন,

— আমার ছেলে অঙ্কে এম.এসসি. করছে।

সেই কথাগুলো আজও কানে বাজে। তবে সময় মানুষকে শুধু বয়স দেয় না, নতুন নতুন সংজ্ঞাও শেখায়।

একদিন সেই ছেলেকেই গ্রুপ-ডি চাকরির আবেদনপত্র পূরণ করতে হয়েছিল।

ফর্মটা হাতে দেখে বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন। কাগজটার দিকে তাকিয়ে যেন কী ভাবছিলেন।

তারপর খুব ধীরে বলেছিলেন—

— তুই এম.এসসি. করে গ্রুপ-ডি চাকরির পরীক্ষা দিবি?

প্রশ্নটার মধ্যে অবজ্ঞা ছিল না। ছিল অপূর্ণ স্বপ্নের ব্যথা। যে বাবা সারাজীবন ছাত্র পড়িয়ে কাটিয়েছেন, তিনি ছেলের জন্য অন্যরকম ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিলেন।

অনির্বাণ সেদিন শুধু একবার বাবার দিকে তাকিয়েছিল। তারপর শান্ত গলায় বলেছিল—

— ডিগ্রি দিয়ে তো সংসার চলে না, বাবা। একটা চাকরি লাগে।

বাবা আর কিছু বলেননি। শুধু খুব আস্তে ফর্মটার ওপর হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন।

কারণ তিনিও সময়টাকে চিনতেন।

সেই সময় চাকরির বাজার যেন শুকিয়ে যাওয়া নদীর মতো হয়ে গিয়েছিল।

একটা বিজ্ঞপ্তি বেরোলেই লক্ষ লক্ষ আবেদন। যে পদের জন্য একসময় মাধ্যমিক পাশই যথেষ্ট ছিল, সেখানে এম.এ., এম.এসসি., বি.টেক., এম.টেক.—সবাই একই লাইনে দাঁড়িয়ে। ডিগ্রির উচ্চতা আর পদের উচ্চতা—দুটো যেন একে অপরের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই রাখত না।

অনির্বাণ সংবাদপত্রে প্রায়ই পড়ত, উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা নিম্নপদের চাকরির জন্য আবেদন করছে। খবরগুলো পড়ে অবাক লাগত না। কারণ বাস্তবটা খবরের কাগজের চেয়েও কঠিন ছিল।

একদিন চায়ের দোকানে কয়েকজন বলছিল,

— শুনেছিস? পি-এইচ.ডি. করা ছেলেরাও শ্মশানের ডোমের চাকরির জন্য আবেদন করেছে!

কথাটা সত্যি কি না, অনির্বাণ জানত না। কিন্তু সেটাকে অবিশ্বাসও করতে পারেনি। কারণ সময়টা এমনই ছিল। চাকরির চেয়ে বড় পরিচয় আর কিছু ছিল না।

বি.এড. শেষ করার পর অনির্বাণ ভেবেছিল, একদিন স্কুলেই পড়াবে। অঙ্ক তার প্রিয় বিষয়। জটিল সমীকরণও সে এমনভাবে বুঝিয়ে বলতে পারত, যেন কঠিন অঙ্কও গল্প হয়ে যায়। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নটা তাই তার কাছে কোনো চাকরি ছিল না, ছিল নিজের ভালোবাসার একটা ঠিকানা।

কিন্তু বছর কেটে গেল। আরও একটা বছর। তারপর আরও কয়েকটা।

শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা অনিয়মিত হয়ে পড়ল। যেটুকু বা হলো, তা নিয়েও চারদিকে অভিযোগ, আন্দোলন, আদালত, বিতর্ক। কী সত্যি, কী মিথ্যে—সেটা বিচার করার ক্ষমতা অনির্বাণের ছিল না। সে শুধু দেখেছিল, প্রতিটি পরীক্ষার পর হাজার হাজার ছেলেমেয়ের চোখে নতুন করে অপেক্ষা জন্ম নিচ্ছে।

অপেক্ষা...

শব্দটা তার জীবনের খুব চেনা।

কত লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছে। তারপর ইন্টারভিউ। তারপর দীর্ঘ নীরবতা।

কখনও ফল প্রকাশ হতে মাসের পর মাস কেটে গেছে। কখনও কোনো মামলা। কখনও নিয়োগ স্থগিত। কখনও আবার নতুন বিজ্ঞপ্তির আশ্বাস।

প্রতিবারই বাড়ি ফিরে একই প্রশ্ন শুনতে হতো।

— কিছু খবর হলো?

আর প্রতিবারই একই উত্তর।

— এখনও না...

"এখনও না"—এই দুটো শব্দই যেন কয়েক বছর ধরে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অবশেষে একদিন ডাকপিয়ন একটা খাম এনে দিল। সরকারি দপ্তরের সিল মারা খাম।

হাত কাঁপছিল। খাম খুলে যখন নিয়োগপত্রটা বের করল, তখন সে চিৎকার করে ওঠেনি। আনন্দে লাফায়ওনি।

বরং অনেকদিন ধরে বুকের ভেতরে জমে থাকা একটা ভার যেন আস্তে আস্তে নেমে গিয়েছিল।

"স্বপ্নের চাকরি না হোক...
অন্তত মাসের শেষে নির্দিষ্ট একটা বেতন তো থাকবে।"

হঠাৎ ট্রেনটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে পরের স্টেশনে ঢুকল। অনির্বাণ বর্তমান সময়ে ফিরে এল।

ভিড় আরও বেড়ে গেছে। কেউ খবরের কাগজ পড়ছে। কেউ আধঘুমে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে। কেউ মোবাইলে নতুন চাকরির বিজ্ঞপ্তি খুঁজছে।

অনির্বাণ একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল। নিজেকেই যেন দেখতে পেল তাদের মধ্যে।

একটা পরীক্ষার পর আরেকটা পরীক্ষা। একটা অ্যাডমিট কার্ডের পর আরেকটা অ্যাডমিট কার্ড। একটা আশার পর আরেকটা অপেক্ষা।

ট্রেনটা শেষমেশ তার গন্তব্যে এসে থামল।

এবার বাস।

তারপর আবার টোটো।

শেষে ব্লকের সরকারি অফিস।

প্রতিদিন একই রাস্তা। একই ভিড়। একই দৌড়।

তবু অনির্বাণ জানে—

বেকার জীবনের পথের কোনো ঠিকানা ছিল না।

এই পথটা অন্তত প্রতিদিন তাকে একটা কর্মস্থলে পৌঁছে দেয়।

ব্যাগটা কাঁধে তুলে অফিসের গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল অনির্বাণ। সামনে আরেকটা কর্মদিবস। পেছনে ফেলে আসা বহু বছরের অপেক্ষা। আর কোথাও যেন অজান্তেই শুরু হয়ে গেছে আরেকটি অপেক্ষা... যার নাম সে এখনও জানে না।

ট্রেনটা ধীরে ধীরে স্টেশনে এসে থামল।

ভিড়ের সঙ্গে নেমে প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে যখন গোপাল কাকুর চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে হাঁটছিল অনির্বাণ, তখন অজান্তেই একবার তার চোখটা দোকানের বেঞ্চটার দিকে চলে গেল।

খালি।

কেটলিতে তখনও ধোঁয়া উঠছে।

গোপাল কাকু ব্যস্ত হাতে ভাঁড়ে চা ঢালছেন।

অনির্বাণের মনে হঠাৎ ভেসে উঠল সকালের সেই আড়চোখে তাকানো কাজল-কালো চোখ দুটো।

একটা মুহূর্তের চোখাচোখি...

তারপর দুজনেরই অপ্রস্তুত হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে নেওয়া।

অদ্ভুত!

মানুষের জীবনে কিছু কিছু অনুভূতি খুব নিঃশব্দে এসে বাসা বাঁধে।

কোনো পরিচয় ছাড়াই।

কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই।

শুধু প্রতিদিনের কয়েকটি নীরব মুহূর্তের ভেতর দিয়ে।

অনির্বাণ নিজের অজান্তেই মৃদু হেসে ফেলল।

হয়তো এ শুধু প্রতিদিনের দেখা।

হয়তো এর কোনো নামই নেই।

তবু মনে কোথাও যেন একটা ভালো লাগা রয়ে যায়।

মনে হয়—

আগামীকাল আবার দেখা হবে।

এই ছোট্ট প্রত্যাশাটুকু নিয়েই সে বাড়ীর দিকে হাঁটতে শুরু করল।


❖ ❖ ❖
প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত

Comments

Popular posts from this blog

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...