Skip to main content

নন্দিতার নীরবতা

প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা।

বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়।

একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।

চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই।

পাড়ার লোকজন বলত—

— "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।"

নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত।

মানুষ সাফল্য দেখে।

সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না।

চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না।

সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল।

বাড়িতে বাবা আছেন।

মা আছেন।

একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান...

আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে।

সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন।

তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য।

মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে—

— "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।"

পাত্রপক্ষ আসে।

চা-জলখাবার হয়।

কথাবার্তাও এগোয়।

কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।

তারপর হঠাৎ করেই সব থেমে যায়।

কেউ আর ফোন করে না।

কেউ আর ফিরে আসে না।

প্রথম প্রথম নন্দিতা খুব ভেঙে পড়ত।

নিজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবত—

তার কি কোথাও কোনো ত্রুটি আছে?

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝেছে—

সব ত্রুটি মানুষের নিজের মধ্যে থাকে না।

কিছু কিছু উত্তর পরিবারের চার দেওয়ালের ভেতরেই আটকে থাকে।

তার মনে বহুবার হয়েছে—

হয়তো বাবা কিংবা দাদা কোনো না কোনো কারণে সম্পর্কটা এগোতে দেননি।

হয়তো তাদেরও কোনো দুশ্চিন্তা ছিল।


কিন্তু কোনোদিন সে কাউকে প্রশ্ন করেনি।

কারণ সে জানে—

মানুষ বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করতে পারে।

কিন্তু নিজের মানুষগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ।

সেই যুদ্ধে জিতলেও মন হেরে যায়।

তাই নন্দিতা নীরব থাকতে শিখেছে।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে হঠাৎ তার মনে হয়েছিল—

মানুষ কাঁটায় ভরা পথ ধরে হাজার কিলোমিটার হেঁটে যেতে পারে।

কিন্তু সেই কাঁটাটা যদি নিজের জুতোর ভেতর ঢুকে যায়,

তখন এক পা-ও এগোনো যায় না।

কথাটা মনে আসার পর থেকেই যেন সে নিজের জীবনটাকেই নতুন করে বুঝতে শিখেছিল।

ছোটবেলায় পড়া গল্প, উপন্যাস, কবিতায় মানুষকে খুব মহান মনে হতো।

মনে হতো—

ভালোবাসা সব বাধা জয় করে।

ত্যাগের শেষ নেই।

আদর্শের কখনও পরাজয় হয় না।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝেছে—

জীবন বইয়ের পাতার মতো সাজানো নয়।

এখানেও ভালো মানুষ আছে।

ত্যাগী মানুষও আছে।

তবু অনেক সময় নিজের নিরাপত্তা, নিজের স্বার্থ, কিংবা সংসারের অদৃশ্য হিসেব—এসবের কাছে মানুষ অজান্তেই বদলে যায়।

নন্দিতা কাউকে দোষ দেয় না।

সে শুধু নিজের কর্তব্যটুকু পালন করে যায়।

মাসের প্রথম সপ্তাহে বেতন হাতে পেলেই নিজের জন্য সামান্য কিছু টাকা আলাদা করে রাখে।

বাকি টাকাটা নিঃশব্দে বাবার হাতে তুলে দেয়।

বাবা প্রতিবারই একই কথা বলেন—

— সব টাকা দিয়ে দিস না মা। তোরও তো খরচ আছে।

নন্দিতা মৃদু হেসে উত্তর দেয়—

— আমার আবার কী খরচ আছে বাবা?

বাবা আর কিছু বলেন না।

টাকাগুলো আলতো করে ভাঁজ করে আলমারির ভেতর রেখে দেন।

মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকান।

সেই দৃষ্টিতে গর্ব আছে।

আবার কোথাও যেন এক চিলতে অপরাধবোধও।

যে বয়সে মেয়ের বিয়ের কথা ভাবার কথা, সেই বয়সেই মেয়েটা সংসারের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নন্দিতা অবশ্য এসব নিয়ে কোনোদিন বড় বড় কথা বলে না।

ত্যাগ শব্দটাও তার ভালো লাগে না।

সে শুধু মনে করে—

সংসার যদি নিজের হয়,

তবে তার দায়িত্বও নিজের।

নিজের জন্য তার চাওয়া খুবই সামান্য।

মাঝে মাঝে একটা নতুন বই।

কখনও মায়ের জন্য একটা শাড়ি।

কখনও ছোট বোনের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস।

এইটুকুতেই সে সুখ খুঁজে নিতে শিখেছে।

জীবনের সব স্বপ্ন পূরণ হয় না।

কিছু স্বপ্ন সময়ের কাছে হার মেনে যায়।

আবার কিছু স্বপ্ন মানুষ নিজেই একদিন আলতো করে ভাঁজ করে মনের এক কোণে তুলে রাখে।

নন্দিতাও তার ব্যতিক্রম নয়।

তবে একটা জিনিস সে আজও হারায়নি—

মানুষের ওপর বিশ্বাস।

হয়তো সেই বিশ্বাসই তাকে প্রতিদিন নতুন করে পথ চলার সাহস দেয়।

ভোর হলে আবার স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি।

আবার সেই চেনা স্টেশন।

আবার লোকাল ট্রেন।

আবার একদল পরিচিত অথচ অচেনা মুখ।

জীবনও বোধহয় ঠিক লোকাল ট্রেনের মতো।

প্রতিদিন একই রেললাইন ধরে চলে।

তবু প্রতিটি দিনের গল্প আলাদা হয়।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...
🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান, আর প্রতিদিনের নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফিস শু...