Skip to main content

Posts

Showing posts from June, 2026

নন্দিতার পৃথিবী

ষষ্ঠ অধ্যায় : নন্দিতা সকালের আকাশটা আজ কেমন যেন মেঘলা। রেলস্টপের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানটায় বসে আছে নন্দিতা। হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা। ট্রেন আজ বেশ দেরি করছে। চায়ের দোকানের সামনে প্রতিদিনের মতোই ভিড়। কেউ খবরের কাগজ পড়ছে। কেউ মোবাইলের পর্দায় চোখ রেখে খবর দেখছে। কেউ আবার রাজনীতি নিয়ে তর্কে ব্যস্ত। কিন্তু এই সমস্ত কোলাহলের মাঝেও নন্দিতার চোখ বারবার গিয়ে থামছে দোকানের ডানদিকের সেই বেঞ্চটার দিকে। আজ বেঞ্চটা খালি। একেবারে খালি। অদ্ভুত! এমন তো হয় না। ছুটির দিন ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই ওই সময়টায় ছেলেটাকে দেখা যায়। ঘড়ির কাঁটার মতোই নিয়মিত। হাতে এক কাপ চা। চোখে ক্লান্তি। তবু মুখে এক ধরনের স্থির শান্তি। কোনোদিন কথা হয়নি। প্রয়োজনও পড়েনি। তবু প্রতিদিনের সেই নীরব উপস্থিতিটা কখন যে অচেনা অভ্যাস হয়ে উঠেছে, নন্দিতা নিজেও বুঝতে পারেনি। চায়ের কাপটা হাতে নিয়েও আজ চা আর শেষ হচ্ছে না। এক চুমুক দিয়ে আবার কাপটা নামিয়ে রাখল। অকারণেই মনটা কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে উঠছে। আজ কি তার ছুটি? শরীর খারাপ? নাকি বাড়িতে ক...

বোনের সঙ্গে সাক্ষাৎ

বাড়ির দরজা খুলতেই মায়ের চেনা গলাটা আবার ভেসে এল— — অনি, হাত-মুখ ধুয়ে আয়। ভাত বেড়ে দিচ্ছি। অনির্বাণ মৃদু হেসে ব্যাগটা নামিয়ে রাখল। বাইরে তখনও টুপটাপ করে বৃষ্টি পড়ছে। ভেজা জামাকাপড় বদলে প্রথমেই বাবার ঘরে উঁকি দিল। বাবা ওষুধ খেয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। চোখ তুলে ছেলেকে দেখে শুধু বললেন— — এলি? এই একটি শব্দের মধ্যেই কতটা অপেক্ষা লুকিয়ে থাকে, তা শুধু অপেক্ষা করা মানুষই জানে। রাতের খাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় সাড়ে ন'টা বেজে গেল। মা রান্নাঘর গুছিয়ে নিচ্ছেন। বাবা নিজের ঘরে। আর অনির্বাণ নিজের ছোট্ট ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। জানলার বাইরে অন্ধকার। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে একটানা ছন্দ তুলছে। আজ মনটা অদ্ভুত শান্ত। কেন, সে নিজেও ঠিক জানে না। হয়তো বাড়ি ফিরে বাবাকে ভালো দেখে। হয়তো সারাদিনের ক্লান্তি শেষ হওয়ার স্বস্তিতে। অথবা... আজ বৃষ্টিভেজা পথে ঘটে যাওয়া ছোট্ট ঘটনাটার জন্য। একটা অচেনা মেয়ে। একটা ছোট্ট ছাতা। কয়েক মিনিটের পথচলা। মেয়েটার নাম— সোহিনী। অনির্বাণ ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

তৃতীয় অধ্যায় : ফেরার পথের মানুষ

অধ্যায় – ৩ ফেরার পথের মানুষ   দুপুর গড়িয়ে বিকেল। অফিসের করিডোরে তখনও মানুষের আনাগোনা থামেনি। কোথাও ফাইলের শব্দ, কোথাও প্রিন্টারের একটানা গুঞ্জন, কোথাও আবার শেষ মুহূর্তের স্বাক্ষরের অপেক্ষা। অনির্বাণ নিজের টেবিলে বসে শেষ নোটশিটটায় সই করল। সামনে রাখা ফাইলগুলো একবার গুছিয়ে রাখল। সারাদিনের ব্যস্ততার পর টেবিলটা অগোছালো রেখে সে কোনোদিন বাড়ি ফেরে না। তার বিশ্বাস— কাজেরও একটা সম্মান আছে। কাজ শেষ করে তাকে সুন্দরভাবে রেখে যাওয়াও দায়িত্বেরই অংশ। দেওয়ালের ঘড়িটার দিকে চোখ পড়তেই সে একটু চমকে উঠল। বিকেল পাঁচটা পনেরো। সময়টা তার কাছে শুধুই ঘড়ির কাঁটা নয়। এই পাঁচটা পনেরোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা টোটো, একটা বাস, একটা লোকাল ট্রেন, আর শেষ পর্যন্ত বাড়ি পৌঁছে বাবার হাতে ওষুধ তুলে দেওয়ার দায়িত্ব। একটা গাড়ি মিস হলে পরের সব হিসেব এলোমেলো হয়ে যায়। তাই প্রতিদিনের এই সময়ের সঙ্গে তার যেন এক নীরব চুক্তি। ব্যাগের চেন টানতে টানতেই পাশের টেবিল থেকে সুশান্তদা হেসে বললেন— — কী রে, আজও দৌড় শুরু? আরেকজন সহকর্মী মজা করে বললেন— — কতবার ব...

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...

পর্ব –১৯ : আমার হিয়ার মাঝে

পর্ব – ৯ :আমার হিয়ার মাঝে ইন্টারভিউয়ের দিন অরিন্দম তখন করিডোরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। গত প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সে কখনো এদিক-ওদিক হাঁটছে, কখনো জানালার বাইরে তাকাচ্ছে, কখনো আবার ঘড়ির কাঁটার দিকে চোখ রাখছে। দরজা খুলতেই তার দৃষ্টি সেদিকে চলে গেল। ঈশিতা বেরিয়ে আসছে। মুখে একটা চাপা হাসি। চোখ দুটো উজ্জ্বল। আর সবচেয়ে বড় কথা, ভেতরে ঢোকার সময় যে উদ্বেগ তার মুখে ছিল, তার বেশিরভাগটাই যেন কোথাও মিলিয়ে গেছে। কাছে আসতেই অরিন্দম জিজ্ঞেস করল, — "কেমন হলো?" ঈশিতা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে হেসে ফেলল। — "আমার মনে হয় ভালো হয়েছে।" অরিন্দমের বুকের ভেতর জমে থাকা অদৃশ্য চাপটা যেন এক মুহূর্তে নেমে গেল। — "আমি জানতাম।" — "এত আত্মবিশ্বাস আপনার কোথা থেকে আসে?" — "কারণ আমি জানি তুমি কতটা প্রস্তুতি নিয়েছো।" ঈশিতা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। তারপর হঠাৎ বলল, — "জানেন, শেষ প্রশ্নটা বেশ মজার ছিল।" — "কী জিজ্ঞেস করলেন?" — "জিজ্ঞেস করলেন, এই চাকরিটা পেলে আমি কেন করতে চাই।" — "তারপর?" ঈশিতার চোখে আবার সেই উ...