Skip to main content

বোনের সঙ্গে সাক্ষাৎ

বাড়ির দরজা খুলতেই মায়ের চেনা গলাটা আবার ভেসে এল—

— অনি, হাত-মুখ ধুয়ে আয়। ভাত বেড়ে দিচ্ছি।

অনির্বাণ মৃদু হেসে ব্যাগটা নামিয়ে রাখল।

বাইরে তখনও টুপটাপ করে বৃষ্টি পড়ছে।

ভেজা জামাকাপড় বদলে প্রথমেই বাবার ঘরে উঁকি দিল।

বাবা ওষুধ খেয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।

চোখ তুলে ছেলেকে দেখে শুধু বললেন—

— এলি?

এই একটি শব্দের মধ্যেই কতটা অপেক্ষা লুকিয়ে থাকে, তা শুধু অপেক্ষা করা মানুষই জানে।

রাতের খাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় সাড়ে ন'টা বেজে গেল।

মা রান্নাঘর গুছিয়ে নিচ্ছেন।

বাবা নিজের ঘরে।

আর অনির্বাণ নিজের ছোট্ট ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

জানলার বাইরে অন্ধকার।

টিনের চালের ওপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে একটানা ছন্দ তুলছে।

আজ মনটা অদ্ভুত শান্ত।

কেন, সে নিজেও ঠিক জানে না।

হয়তো বাড়ি ফিরে বাবাকে ভালো দেখে।

হয়তো সারাদিনের ক্লান্তি শেষ হওয়ার স্বস্তিতে।

অথবা...

আজ বৃষ্টিভেজা পথে ঘটে যাওয়া ছোট্ট ঘটনাটার জন্য।

একটা অচেনা মেয়ে।

একটা ছোট্ট ছাতা।

কয়েক মিনিটের পথচলা।

মেয়েটার নাম—

সোহিনী।

অনির্বাণ মৃদু হেসে ফেলল।

মানুষের জীবনে এমন কত মানুষই তো আসে।

কেউ কয়েক বছরের জন্য।

কেউ কয়েক মাসের জন্য।

আবার কেউ মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য।

সব পরিচয়েরই আলাদা মানে থাকে।

তার বেশি কিছু ভাবার মানুষ অনির্বাণ নয়।

সে মনে মনে নিজেকেই বলল—

পথে দেখা হওয়া সব মানুষই
জীবনের গল্প হয়ে ওঠে না।

তবু কিছু ব্যবহার
মনে থেকে যায় অনেক দিন।

বিছানার পাশে রাখা মোবাইলটা হাতে নিল সে।

আগামীকাল মহরমের ছুটি।

রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে অনির্বাণ অনেকদিন পর এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করল।

সাধারণ মানুষের কাছে একটা ছুটি হয়তো ক্যালেন্ডারের একটি লাল তারিখ মাত্র।

কিন্তু প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত পথের সঙ্গে যুদ্ধ করা মানুষের কাছে ছুটি মানে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলার সুযোগ।

কাল অন্তত ভোরের অ্যালার্মে ঘুম ভাঙবে না।

টোটো, বাস আর ট্রেনের সময় মিলিয়ে দৌড়তে হবে না।

অনেকদিন ফেসবুকও খোলা হয়নি।

আজকাল মানুষ আর খবর খুঁজতে যায় না।

প্রযুক্তিই যেন মানুষের দরজায় কড়া নেড়ে বলে—

— এই নাও, পৃথিবীর খবর।

মোবাইলের পর্দায় আঙুল ছোঁয়াতেই প্রথমেই চোখে পড়ল স্কুলজীবনের এক সহপাঠীর ছবি।

দুবাইয়ের মরুভূমির বুকে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তুলেছে।

পাশে তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী।

একটার পর একটা ছবি দেখতে দেখতে অনির্বাণের মনে পড়ে গেল স্কুলের সেই দিনগুলোর কথা।

ছেলেটা পড়াশোনায় কোনোদিন প্রথম সারির ছিল না।

সংসারের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না।

তবু জীবন তাকে অন্য এক রাস্তা দেখিয়েছে।

আজ সে নতুন টোটো বিক্রি করে, ব্যাটারির ব্যবসা করে নিজের চেষ্টায় বেশ প্রতিষ্ঠিত।

কিছুদিন আগে হঠাৎ দেখা হয়েছিল।

হাসতে হাসতেই বলেছিল—

— ব্যাটারি কোম্পানির তরফ থেকেই দুবাই ঘুরতে পাঠিয়েছে। ভাবতে পারিস?

ছবিগুলো দেখতে দেখতে অনির্বাণের অদ্ভুত ভালো লাগল।

ঈর্ষা নয়।

বরং এক ধরনের শান্ত আনন্দ।

জীবনের সাফল্যের পথ যে সবার জন্য এক হয় না, সে কথা সে অনেক আগেই বুঝে গেছে।

কেউ বইয়ের পাতায় নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজে পায়।

কেউ ব্যবসায়।

কেউ শ্রমে।

আবার কেউ নিজের সাহস আর সিদ্ধান্তের ওপর ভর করেই জীবনের নতুন দরজা খুলে ফেলে।

মোবাইলটা পাশে রেখে কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল অনির্বাণ।

হঠাৎ নিজের কথাটাও মনে পড়ে গেল।

বছরের পর বছর চাকরির প্রস্তুতি।

পরীক্ষা।

অপেক্ষা।

অনিশ্চয়তা।

আজ এই চাকরিটা না পেলে?

হয়তো দু-চারটি টিউশন করেই দিন কাটত।

হয়তো এখনও কোনো নতুন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায় বসে থাকত।

ভাবতে ভাবতেই তার মনে একটি প্রশ্ন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি শুধু ডিগ্রি দেয়, নাকি মানুষকে জীবনের জন্যও প্রস্তুত করে?

চারপাশে সে এমন অনেক তরুণ-তরুণীকে দেখেছে—

ইতিহাস, বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সংস্কৃত কিংবা অন্য বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করেছে।

কারও বি.এড. হয়েছে।

কারও গবেষণার ডিগ্রিও রয়েছে।

তবু একটি স্থায়ী জীবিকার অপেক্ষা যেন শেষ হতে চায় না।

কয়েকদিন আগে ট্রেনে এক কলেজের অধ্যাপকের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলাপ হয়েছিল।

জানলার বাইরে ছুটে চলা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মানুষটি মৃদু হেসে বলেছিলেন—

— ক্লাসে নাম আছে অনেকেরই, কিন্তু নিয়মিত পড়তে আসে খুব কম। কেউ কেউ শুধু সরকারি সুযোগ-সুবিধা কিংবা স্কলারশিপের জন্য নামটা রেখে দেয়।  কেউ বা শুধু ডিগ্রীর আশায়।পড়ার আগ্রহটা যেন আগের মতো আর দেখি না।

অনির্বাণ চুপচাপ শুনেছিল।

মানুষটা আবার বলেছিলেন—

— জানেন, শিক্ষক হওয়ার সবচেয়ে বড় আনন্দটা কী?

— নিজের শেখা জিনিসগুলো এমন ছাত্রদের হাতে তুলে দেওয়া, যাদের চোখে শেখার আগ্রহ থাকে। এখন সেই সুযোগটাই যেন দিন দিন কমে যাচ্ছে।

কথাগুলো বলার সময় অধ্যাপকের কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না।

ছিল এক ধরনের নিঃশব্দ আক্ষেপ।

অনির্বাণ সেদিন কোনো উত্তর দিতে পারেনি।

তার মনে হচ্ছিল—

শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় পাশ করার জন্য নয়। শিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যা মানুষকে জ্ঞানের পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহসও দেয়।

ডিগ্রি যদি জীবনের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে, তবে সেই শিক্ষার পূর্ণতা কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো একদিন সমাজকেই খুঁজে নিতে হবে।

ঘড়িতে তখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা।

মোবাইলটা বন্ধ করে পাশে রাখতেই  অনির্বাণের মনে পড়ল—

আগামীকাল অন্বেষার কাছে যাওয়ার কথা।

মাসের টাকা তো আগেই পাঠানো হয়েছে।

অনির্বাণ আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।

বাইরে রাত আরও গভীর হচ্ছে।

কিন্তু তার মনটা যেন আগামীকালের পথেই হাঁটতে শুরু করেছে।

অন্বেষার মুখটা মনে পড়তেই অদ্ভুত এক শান্তি নেমে এল।

কিছু পথের ক্লান্তি বিশ্রামে মুছে যায়।

আর কিছু পথের ক্লান্তি প্রিয় মানুষের মুখ দেখার অপেক্ষাতেই হারিয়ে যায়।

সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছিল অনির্বাণ।

দুই হাতে দুটি ভারী ব্যাগ।

একটায় মায়ের হাতে বানানো আমের আচার, গাওয়া ঘি, নারকেলের নাড়ু আর কিছু শুকনো খাবার।

অন্যটায় অন্বেষার দেওয়া ছোট্ট তালিকার জিনিসপত্র।

টাকা পাঠিয়ে অনেক প্রয়োজন মেটানো যায়।

কিন্তু বাড়ির গন্ধ, মায়ের হাতের আচারের স্বাদ কিংবা আপনজনের স্নেহ—এসব কোনো পার্সেলে পাঠানো যায় না।

তাই এতটা পথ আসতেও তার কোনো ক্লান্তি লাগছিল না।

প্রথমে এক্সপ্রেস ট্রেন।

তারপর লোকাল।

তারপর টোটো।

জানালার বাইরে ছুটে চলা সবুজ মাঠ, নদী, খাল, তালগাছ আর দূরের গ্রামগুলো দেখতে দেখতে কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে এসেছে, সে নিজেও খেয়াল করেনি।

অবশেষে কাকদ্বীপের নার্সিং কলেজের হোস্টেলের সামনে এসে দাঁড়াল অনির্বাণ।

ব্যাগ দুটো মাটিতে রেখে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল।

ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে চেনা কণ্ঠ ভেসে এল—

— দাদা! তুই এসে গেছিস? দাঁড়া... আমি আসছি।

দু'মিনিটও কাটেনি।

হোস্টেলের সিঁড়ি বেয়ে প্রায় দৌড়ে নেমে এল অন্বেষা।

পিছনে আরও তিনজন মেয়ে।

অন্বেষার মুখভরা হাসি দেখে অনির্বাণের মনে হলো, এতটা পথ আসাটাই যেন সার্থক।

হোস্টেলের দারোয়ানকে আগেই জানানো ছিল।

তাই ভেতরে ঢুকতে কোনো অসুবিধা হলো না।

দাদার হাতে ভারী ব্যাগ দুটো দেখে অন্বেষা এগিয়ে এসে প্রায় ছিনিয়ে নিল।

— তোকে যে আমি একটা ছোট্ট লিস্ট দিয়েছিলাম! তাহলে এত জিনিস নিয়ে এলি কেন?

অনির্বাণ হেসে বলল—

— এসব আমি আনিনি। সবই তোর মা পাঠিয়েছে।

একটু থেমে বোনের দিকে তাকিয়ে আবার বলল—

— হোস্টেলের খাবার খেয়ে তো দেখছি বেশ মোটাই হয়ে গেছিস।

অন্বেষা সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বলল—

— একদম মিথ্যে কথা বলছিস। এখানে এসে একদিন খেয়ে দেখ, তারপর বুঝবি।

দু'জনেই হেসে উঠল।

সেই হাসি দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন মেয়েও মুচকি হাসল।

হাসির রেশ মিলিয়ে যেতেই অন্বেষার মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গেল।

— বাবা কেমন আছে রে?

— ওষুধগুলো ঠিকমতো খাচ্ছে তো?

— এই মাসে ব্লাড প্রেসারটা মাপানো হয়েছে?

একটার পর একটা প্রশ্ন।

অনির্বাণ শুধু মৃদু হেসে উত্তর দিল—

— সব ঠিক আছে। তুই এসব নিয়ে একদম চিন্তা করবি না। মন দিয়ে পড়াশোনা কর।

কথাগুলো শুনে অনির্বাণের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভরে উঠল।

ছোট্ট সেই মেয়েটা যে আজ সংসারের চিন্তা করতে শিখেছে, সেটা বুঝতে তার আর বাকি রইল না।

অন্বেষা হঠাৎ পাশের মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বলল—

— আচ্ছা, তোদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।

একজনকে দেখিয়ে বলল—

— ও তৃষা। আমার রুমমেট। সারাদিন কথা বলে মাথা খেয়ে ফেলে।

কথাটা শেষ হতেই মেয়েটা চোখ বড় বড় করে বলল—

— এই! দাদার সামনে আমার নামে বদনাম করবি না কিন্তু!

তারপর দু'হাত জোড় করে অনির্বাণকে নমস্কার করল।

— নমস্কার দাদা। আমি কিন্তু আপনাকে আগে থেকেই চিনি।

অনির্বাণ অবাক হয়ে বলল—

— আমাকে? কীভাবে?

তৃষা হেসে উত্তর দিল—

— এই মেয়েটা সারাদিন "আমার দাদা... আমার দাদা..." করে এমনভাবে গল্প করে যে, আপনাকে না চিনে উপায় আছে? ছবিও দেখেছি। তবে সামনে থেকে দেখলে আরও শান্ত মনে হচ্ছে।

অন্বেষা লজ্জা পেয়ে বলল—

— ওর কোনো কথাই শুনবি না।

তৃষা দুষ্টু হেসে আবার বলল—

— আচ্ছা দাদা, একটা কথা বলি?

— বলুন।

— এত রোগা কেন? সরকারি চাকরিতে এত কাজ করায় নাকি?

অনির্বাণও হেসে ফেলল।

— হয়তো তাই।

চারদিকে আবার হাসির রোল উঠল।

প্রথম আলাপের সংকোচ যেন মুহূর্তের মধ্যেই কোথায় মিলিয়ে গেল।

অনির্বাণ মনে মনে ভাবল—

কিছু মানুষ আছে, যারা প্রথম দেখাতেই চারপাশের পরিবেশটাকে সহজ করে দিতে পারে। তৃষা বোধহয় সেই ধরনেরই একটি মেয়ে।

কথা বলতে বলতে সবাই হোস্টেলের ভিজিটরস রুমে এসে বসল।

অন্বেষা ব্যাগ দুটো খুলতেই ঘরের ভেতর হালকা করে আমের আচারের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।

একটার পর একটা জিনিস বেরোতে লাগল।

গাওয়া ঘি।

আমের আচার।

নারকেলের নাড়ু।

বিস্কুট, সাবান, শ্যাম্পু, খাতা, কলম...

অন্বেষা মৃদু হেসে বলল—

— দেখলি তো! আমি যতই কম জিনিস লিখি, মা ঠিক নিজের মতো করে ব্যাগ ভরে দেয়।

তৃষা আচারের শিশিটা হাতে নিয়ে বলল—

— মাসিমা যেন আমাদের মনের কথাও বুঝে ফেলেছেন। হোস্টেলের খাবারের সঙ্গে এই আচারটাই এখন উৎসব।

সবাই হেসে উঠল।

তারপর তৃষা হঠাৎ গলার স্বর একটু নামিয়ে বলল—

— জানেন দাদা, রাত জেগে পড়াশোনা করাটা এই মেয়ের কাছে কোনো ব্যাপারই না।

পরীক্ষার আগের রাতে আমরা সবাই যখন ঘুমে ঢুলে পড়ি, ও তখনও বই নিয়ে বসে থাকে।

অন্বেষা লজ্জা পেয়ে বলল—

— থাম না তুই।

— না থামব না। সেদিন ফিজিওলজির পরীক্ষার আগে সারারাত এক ফোঁটা ঘুমায়নি। ভোরবেলা চোখ লাল, তবু বই বন্ধ করেনি।

অনির্বাণ চুপ করে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

কথাটা শুনে বুকের ভেতর কোথাও একটা মোচড় দিয়ে উঠল।

সে জানত, এই মেয়েটা তার মতো এম.এসসি., বি.এড.-এর পথে হাঁটেনি।

ইচ্ছা করলেই হয়তো পারত।

পড়াশোনায় সে কোনোদিনই খারাপ ছিল না।

কিন্তু দাদার বছরের পর বছর ডিগ্রি হাতে নিয়ে চাকরির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা।

একটার পর একটা পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় বুড়িয়ে যাওয়া।

সবকিছু নিজের চোখে দেখেছিল অন্বেষা।

হয়তো সেখান থেকেই শিখেছিল।

ডিগ্রি বড় না ছোট, সেটা বড় কথা নয়।

কথাটা হলো—পড়াশোনা শেষ হলেই যেন হাতে একটা নিশ্চিত রাস্তা থাকে।

তাই নার্সিং।

আর সেই রাস্তাটুকু পাকা করতেই আজ তাকে রাত জাগতে হয়।

একটার পর একটা পরীক্ষায় নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।

অনির্বাণ জানত, দাদার পাঠানো টাকাটা শুধু হোস্টেলের ফি বা বইয়ের দাম নয়।

তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাবার ওষুধ বাঁচিয়ে রাখা কিছু টাকা, নিজের কতগুলো প্রয়োজন পিছিয়ে দেওয়া কিছু মাস।

কিন্তু আজ বোনের চোখের নিচের কালি দেখে, তার ক্লান্ত অথচ জেদি মুখটা দেখে অনির্বাণ বুঝল—

এই টাকাটা একতরফা কোনো দান নয়।

ওপাশে বসে একজন মানুষও ঠিক ততটাই লড়ছে, রাত জেগে, চোখ লাল করে, নিজের স্বপ্নটাকে সত্যি করার জন্য।

সে আস্তে করে বলল—

— এত রাত জেগে পড়িস কেন? শরীর খারাপ করবে তো।

অন্বেষা মৃদু হেসে বলল—

— তুই যে রোজ ভোর সাড়ে পাঁচটায় ট্রেন ধরিস, সেটা কি শরীরের জন্য ভালো?

কথাটার কোনো জবাব অনির্বাণের কাছে ছিল না।

দুই ভাইবোন একে অপরের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ।

কথা না বলেও যেন বোঝাপড়াটা সম্পূর্ণ হয়ে গেল।

একজন ট্রেনে, আরেকজন বইয়ের পাতায়।

একজন ফাইলের স্তূপে, আরেকজন রাত জাগা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে।

দুজনেরই লড়াইয়ের ধরন আলাদা, কিন্তু লক্ষ্যটা একটাই—

পরিবারটাকে একটু সুস্থির জায়গায় দাঁড় করানো।

তৃষা এই নীরবতার মধ্যে হালকা করে বলল—

— এই দেখো, দুজনেই একরকম। মুখ ফুটে কিছু বলে না, শুধু করে যায়।

কেউ কিছু বলল না।

শুধু অন্বেষা আচারের শিশিটা হাতে নিয়ে একটু হাসল, চোখের কোণটা একটু চিকচিক করে উঠল।

অনির্বাণ চারদিকে তাকিয়ে দেখছিল।

এই ছোট্ট ঘরটার ভেতরেই কত শত স্বপ্ন বাস করে।

কেউ নার্স হয়ে মানুষের সেবা করতে চায়।

কেউ পরিবারের অভাব দূর করতে চায়।

আবার কেউ নিজের একটা পরিচয় গড়ে তুলতে চায়।

ঠিক তখনই তৃষা আবার বলল—

— দাদা, আপনি এত চুপচাপ কেন? সরকারি চাকরি করলে কি কথা বলার ওপরও ট্যাক্স লাগে?

ঘর জুড়ে আবার হাসির রোল উঠল।

অনির্বাণও হেসে বলল—

— না, তবে কম কথা বললে ভুলও কম হয়।

তৃষা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—

— তা হলে আমি বুঝি সারাক্ষণ ভুলই করি!

অন্বেষা বলল—

— ওর কথা শুনে বুঝতে পারবি না। কিন্তু মনটা খুব ভালো।

তৃষা মুখ বাঁকিয়ে বলল—

— এই অন্বেষা, আজ তোর দাদার সামনে আমাকে সাধ্বী বানানোর দরকার নেই।

আবার সবাই হেসে উঠল।

হাসির আড়ালেই কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল, কেউ খেয়ালই করল না।

অনির্বাণ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

— চল রে, এবার উঠি। নইলে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে।

কথাটা শুনেই অন্বেষার মুখের হাসিটা একটু ম্লান হয়ে গেল।

হোস্টেলের গেট পর্যন্ত সবাই এগিয়ে এল।

গেটের বাইরে এসে অন্বেষা ধীর গলায় বলল—

— দাদা... তোর খুব কষ্ট হয় না? রোজ এতটা পথ... বাবা... সংসার... আবার আমার খরচ...

অনির্বাণ মৃদু হেসে বোনের মাথায় হাত রাখল।

— লক্ষ্য যদি বড় হয়, একটু কষ্ট করতেই হয় রে।

— দেখিস, যেদিন তোকে সাদা ইউনিফর্ম পরে রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখব, সেদিন মনে হবে—এই পথটা বৃথা ছিল না।

অন্বেষার চোখ ভিজে উঠল।

সে আচমকাই দাদাকে জড়িয়ে ধরল।

— আবার তাড়াতাড়ি আসিস।

অনির্বাণ হেসে বলল—

— এই পাগলি, এত তাড়াতাড়ি কাঁদলে চলবে? আবার আসব। খুব শিগগিরই আসব।

একটু দূরে দাঁড়িয়ে তৃষা আর অন্য মেয়েরা চুপচাপ সব দেখছিল।

তৃষার মুখে আজ আর আগের সেই দুষ্টুমি নেই।

সে শুধু মৃদু স্বরে বলল—

— অন্বেষা... তোর দাদাকে দেখে একটা জিনিস শিখলাম।

— কী?

— দায়িত্ব মানুষকে সত্যিই খুব সুন্দর করে দেয়।

অন্বেষা কিছু বলল না।

শুধু মৃদু হেসে চোখের জল মুছে নিল।

বাস ছাড়ার সময় জানালার ধারে বসে অনির্বাণ হাত নাড়ল।

অন্বেষাও হাত নাড়ল।

বাসটা ধীরে ধীরে মোড় ঘুরে চোখের আড়ালে মিলিয়ে গেল।

অন্বেষা অনেকক্ষণ পর্যন্ত সেই দিকেই তাকিয়ে রইল।

অনির্বাণ জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল।

আজ বুকের ভেতরটা কেমন হালকা লাগছে।

প্রিয় মানুষগুলোর মুখে একটুখানি হাসি ফোটাতে পারার আনন্দ, সব ক্লান্তির চেয়েও বড়।

যারা নিজের স্বপ্নের সঙ্গে অন্যের স্বপ্নকেও বয়ে নিয়ে চলে, তাদের পথ কখনও সহজ হয় না।

তবু সেই পথেই একদিন সবচেয়ে সুন্দর সূর্যোদয় অপেক্ষা করে।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

পর্ব – ১৮ : সাহসের সকাল

পর্ব – ৮ : সাহসের সকাল ইন্টারভিউয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ঈশিতার ফোন কলের সংখ্যা ততই একটু একটু করে বাড়ছিল। খুব দীর্ঘ কথা নয়। নিতান্তই প্রয়োজনের কথা। কখনো কোনো নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন, কখনো যাতায়াতের সময় নিয়ে আলোচনা, কখনো বা শুধু নিশ্চিত হওয়া— — "আপনি তো আসছেন, তাই না?" প্রতিবারই অরিন্দমের একই উত্তর— — "হ্যাঁ, আসছি।" ইন্টারভিউয়ের তিন দিন আগেই সে অফিসে ছুটির আবেদন করে রেখেছিল। কারণ হিসেবে লিখেছিল— 'Personal Work'। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় তার নিজেরই মনে হয়েছিল, বহু বছর পর কোনো ছুটি সে সত্যিই নিজের ইচ্ছায় নিচ্ছে। ইন্টারভিউয়ের আগের দিন দুপুরে অফিসে কাজ করছিল অরিন্দম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "ঈশিতা"। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। তবে আজ সেই কণ্ঠে যেন এক অচেনা অস্থিরতা মিশে আছে। — "ব্যস্ত আছেন?" — "না, বলুন।" কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ঈশিতা ধীরে বলল— — "জানেন, আজ বড় অদ্ভুত লাগছে। এতদিন এই দিনটার জন্যই তো প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন দিনটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আর মনে হচ্ছে সব যেন গু...