পরদিন সকালেই বেরিয়ে পড়ল অরিন্দম। সঙ্গে সুব্রত। আগের রাতেই ঠিক হয়েছিল, রামপুরহাটে মেয়ের বাড়ি দেখে সেখান থেকে তারা তারাপীঠ যাবে। রাতে সেখানে থাকবে, পরদিন সকালে মায়ের দর্শন করে গ্রামে ফেরা।
সকালের রোদ তখন ধীরে ধীরে চড়ছে। রাস্তার দু'পাশে শীতের শেষে ফসল কাটা জমি, কোথাও সবুজের ছোঁয়া, কোথাও লাল মাটির বিস্তার। গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে পথ কেটে গেল, কেউ খেয়াল করল না।
প্রায় এগারোটা নাগাদ তারা ভদ্রলোকের বাড়িতে পৌঁছাল।
বাড়িটি খুব বড় নয়। একতলা পাকা বাড়ি। সামনের উঠোনে কয়েকটি ফুলগাছ, পাশে একটি আমগাছ। বাড়ির রং কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে। দেখলেই বোঝা যায়, পরিবারটি ভদ্র ও শিক্ষিত, তবে আর্থিক দিক থেকে খুব সচ্ছল নয়।
গাড়ি থামতেই বাড়ির কর্তা এগিয়ে এলেন।
মুখভরা আন্তরিকতা।
— "আসুন, আসুন। অনেক কষ্ট করে এসেছেন।"
সাদর সম্ভাষণ করে তাদের বৈঠকখানায় বসানো হলো।
কিছুক্ষণ পর জল, মিষ্টি, চা এলো। প্রথমে সাধারণ কথাবার্তা চলতে লাগল। গ্রামের খবর, চাকরি, পরিবার, বর্তমান সময়ের নানা প্রসঙ্গ।
অরিন্দম লক্ষ করছিল, ভদ্রলোকের কথাবার্তায় একটা স্বচ্ছতা আছে। কোথাও বাড়াবাড়ি নেই, আবার আত্মসম্মানেরও অভাব নেই।
কিছুক্ষণ পর ভদ্রমহিলা মৃদু হেসে বললেন,
— "ঈশিতা, এদিকে আয় মা।"
পাশের ঘর থেকে ধীর পায়ে এসে ঘরে প্রবেশ করল মেয়েটি।
বয়স বড়জোর সাতাশ-আটাশ হবে।
মেয়েটি ঘরে ঢুকতেই অরিন্দমের দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, নিটোল মুখাবয়ব, বড় বড় মায়াভরা চোখ, সুঠাম নাসিকা আর স্বাভাবিক হাসিতে তার মুখ যেন আলোকিত হয়ে উঠেছিল। পরনে ছিল হালকা আকাশি রঙের শাড়ি। কোনো জাঁকজমকপূর্ণ সাজ নয়, তবু তার উপস্থিতিতে ঘরের পরিবেশ যেন মুহূর্তে বদলে গেল।
সৌন্দর্যটা চোখে পড়ার মতো, কিন্তু তার থেকেও বেশি চোখে পড়ছিল তার আত্মবিশ্বাস ও সংযম।
এসে সকলকে নমস্কার করে বসল সে।
ভদ্রলোক পরিচয় করিয়ে দিলেন,
— "এ আমার মেয়ে, ঈশিতা।"
প্রথমের কিছু সাধারণ কথাবার্তার পর জানা গেল, ঈশিতা স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে। পাশাপাশি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছে।
সুব্রত আগ্রহ নিয়ে বলল,
— "দুটো একসাথে সামলানো তো সহজ নয়।"
ঈশিতা মৃদু হেসে বলল,
— "সহজ নয়। তবে চেষ্টা করতে তো ক্ষতি নেই। সফল হব কি না জানি না, কিন্তু চেষ্টা না করলে আফসোস থেকে যাবে।"
কথাটা অরিন্দমের ভালো লাগল।
তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস ছিল, কিন্তু অহংকার ছিল না।
অরিন্দম জিজ্ঞেস করল,
— "শিক্ষকতা ভালো লাগে?"
— "খুব।"
একটু ভেবে আবার বলল,
— "আসলে পড়ানোটা শুধু একটা পেশা নয়। প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার সুযোগও। অনেক সময় ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকেও শেখার থাকে।"
— "যেমন?"
ঈশিতা হেসে বলল,
— "সরলভাবে বাঁচতে শেখা। বড় হতে হতে মানুষ অনেক কিছু শিখে, কিন্তু সহজ থাকা ভুলে যায়।"
ঘরের মধ্যে এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল।
মেয়েটির কথাগুলো মুখস্থ করা কোনো দার্শনিক উক্তি নয়, বরং নিজের উপলব্ধি থেকেই বলা—এটা বোঝা যাচ্ছিল।
অরিন্দম বলল,
— "আজকাল সবাই সাফল্যের পিছনে ছুটছে।"
ঈশিতা শান্ত গলায় উত্তর দিল,
— "সাফল্য অবশ্যই দরকার। কিন্তু সাফল্য আর সার্থকতা সবসময় এক জিনিস নয়।"
— "মানে?"
— "অনেক মানুষ অনেক কিছু অর্জন করেন। অর্থ, পদ, প্রতিষ্ঠা—সবই পান। তবু কোথাও একটা অপূর্ণতা থেকে যায়। আবার এমন মানুষও আছেন, যাদের হয়তো খুব বেশি কিছু নেই, কিন্তু রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মনে হয়—আজকের দিনটা বৃথা গেল না।"
অরিন্দম অজান্তেই মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
ঈশিতা আবার বলল,
— "আমার মনে হয়, মানুষ শেষ পর্যন্ত কত বড় হলো সেটা নয়, সে কেমন মানুষ হয়ে উঠল সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"
সুব্রত হেসে বলল,
— "বাহ, খুব সুন্দর কথা।"
ঈশিতা হালকা লজ্জা পেয়ে বলল,
— "সুন্দর কি না জানি না। বই পড়তে পড়তে আর মানুষকে দেখতে দেখতে নিজের মতো করে যা বুঝেছি, তাই বললাম।"
আলোচনা আরও কিছুক্ষণ চলল।
সাহিত্য, সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা, গ্রামের পরিবর্তন—নানা বিষয় নিয়ে।
অরিন্দম লক্ষ্য করল, ঈশিতা শুধু সুন্দরী নয়, যথেষ্ট মেধাবীও। তার কথায় পড়াশোনার ছাপ আছে, আবার বাস্তব জীবন সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা রয়েছে।
সব মিলিয়ে মেয়েটির প্রতি শ্রদ্ধা জন্মাল তার।
তবু মনের কোথাও যেন সেই পরিচিত প্রশ্নটা রয়ে গেল।
একজন মানুষকে কি কয়েক ঘণ্টার আলাপে সত্যিই চেনা যায়?
সামনের মানুষটিকে ভালো লাগছে, সম্মানও হচ্ছে।
কিন্তু ভালো লাগা আর জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যে যে দীর্ঘ পথ, সেই পথের শুরুটুকুও কি সত্যিই এই কয়েক ঘণ্টায় বোঝা সম্ভব?
প্রশ্নটার উত্তর তার জানা ছিল না।
কিন্তু এটুকু সে বুঝল, ঈশিতা এমন একজন মানুষ, যাকে সহজে ভোলা যায় না। শুধু রূপের জন্য নয়, তার ভাবনা ও ব্যক্তিত্বের জন্যও।
ঈশিতার বাবা মৃদু হেসে বললেন,
— "আজকালকার দিনে ছেলেমেয়েদের মতামতটাই আসল। তোমরা চাইলে একটু আলাদা করে কথা বলতে পারো।"
ঘরে উপস্থিত সকলেই সম্মতিসূচক হাসল।
ঈশিতা ধীর পায়ে উঠে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। অরিন্দমও তার পিছু নিল।
বাড়ির সামনের লম্বা বারান্দাটায় কয়েকটি কাঠের চেয়ার পাতা ছিল। উঠোনের একপাশে আমগাছ, অন্যপাশে কয়েকটি ফুলগাছ। দুপুরের রোদ বারান্দার মেঝেতে তির্যক হয়ে পড়েছে।
দুজনেই মুখোমুখি বসল।
প্রথম কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তবে নীরবতাটা অস্বস্তিকর ছিল না।
ঈশিতাই প্রথম কথা বলল।
— "আপনাদের আসতে খুব অসুবিধা হয়নি তো?"
— "না, রাস্তা ভালোই ছিল।"
— "তারাপীঠও যাবেন শুনলাম।"
— "হ্যাঁ। আজ সেখানেই থাকার ইচ্ছে আছে। কাল সকালে পূজা দিয়ে ফিরব।"
ঈশিতা মাথা নাড়ল।
— "ভালো। ছোটোবেলায় গিয়েছিলাম একবার। তারপর আর যাওয়া হয়নি।"
কথার সূত্র খুলে গেল।
কিছুক্ষণ গ্রামের পরিবর্তন, পড়াশোনা, চাকরি নিয়ে আলোচনা চলল।
তারপর ঈশিতা বলল,
— "একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"
— "করুন।"
— "আপনি যদি কিছু মনে না করেন, একটা বিষয় জানতে ইচ্ছে করছে।"
— "বলুন।"
ঈশিতা স্বাভাবিক গলায় বলল,
— "এতদিন বিয়ে করলেন না কেন?"
প্রশ্নটা শুনে অরিন্দম মৃদু হেসে ফেলল।
আশ্চর্যের বিষয়, প্রশ্নটার মধ্যে কোনো কৌতূহলী উঁকিঝুঁকি ছিল না, কোনো বিচারও ছিল না। যেন একজন মানুষ আরেকজন মানুষের জীবনের গল্প জানতে চাইছে।
— "এই প্রশ্নটা আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়।"
— "হয়তো স্বাভাবিক কারণেই।"
— "হতে পারে। আসলে কখনো কাজের পিছনে ছুটেছি, কখনো ভেবেছি পরে করব। তারপর একসময় দেখলাম সময় নিজের মতো করে এগিয়ে গেছে।"
ঈশিতা শান্তভাবে শুনছিল।
তারপর বলল,
— "জীবনে সবকিছু নির্দিষ্ট সময়ে ঘটবে, এমন তো কোনো নিয়ম নেই।"
অরিন্দম তার দিকে তাকাল।
কথাটা খুব সাধারণ।
তবু তার ভালো লাগল।
কারণ মেয়েটির কথার মধ্যে কোথাও বিস্ময় নেই, আক্ষেপ নেই, কিংবা সমাজের প্রচলিত সেই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিটাও নেই।
যেন চল্লিশের গণ্ডি পেরিয়ে একজন মানুষের অবিবাহিত থাকা তার কাছে অস্বাভাবিক কিছু নয়।
ঈশিতা আবার বলল,
— "আমার মনে হয় প্রত্যেক মানুষের জীবন আলাদা ছাঁচে গড়া হয়। কারও জীবনে কিছু ঘটনা আগে আসে, কারও জীবনে পরে।"
— "আপনার এতে কোনো আপত্তি নেই?"
ঈশিতা হালকা হাসল।
— "আপত্তি কেন থাকবে? একজন মানুষকে তার বয়স বা বৈবাহিক অবস্থার দিয়ে বিচার করা ঠিক বলে মনে করি না। মানুষটা কেমন, সেটাই তো আসল।"
অরিন্দম চুপ করে রইল।
অদ্ভুতভাবে কথাগুলো তার ভালো লাগছিল।
আরও একটা বিষয় তার নজর এড়াল না।
ঈশিতা শুরু থেকেই তাকে "আপনি" বলছে, কিন্তু সেই সম্বোধনের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই। বরং একটা সহজ, স্বাভাবিক আপনভাব আছে।
অনেকদিন পর কোনো নতুন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অরিন্দমের মনে হলো, তাকে যেন নিজেকে প্রমাণ করতে হচ্ছে না।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর ঈশিতা আবার বলল,
— "আসলে বিয়ে নিয়ে আমার ধারণা একটু আলাদা।"
— "কেমন?"
— "বিয়ে আমার কাছে কোনো গন্তব্য নয়। জীবনের একটা অধ্যায় মাত্র।"
একটু থেমে আবার বলল,
— "অনেকেই মনে করেন বিয়েই জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য। আমি তা মনে করি না। আবার বিয়ের বিরোধীও নই।"
— "তাহলে?"
— "আমার মনে হয়, দুটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকাটা সবচেয়ে জরুরি। ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে বাড়তেও পারে, কমতেও পারে। কিন্তু শ্রদ্ধা হারিয়ে গেলে সম্পর্কটাকে আর বাঁচিয়ে রাখা কঠিন।"
অরিন্দম নীরবে শুনছিল।
ঈশিতার কথাগুলো মুখস্থ কোনো দর্শন নয়।
তার নিজের উপলব্ধি।
এই বয়সে এমন পরিণত ভাবনা সচরাচর দেখা যায় না।
ঈশিতা একটু হেসে বলল,
— "আর একটা কথা বলি?"
— "বলুন।"
— "আজ আমরা দুজন এখানে বসে একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করছি। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এক কাপ চা আর এক ঘণ্টার কথাবার্তায় একজন মানুষকে চেনা যায় বলে আমার বিশ্বাস হয় না।"
অরিন্দমও হেসে ফেলল।
— "আমারও তাই মনে হয়।"
— "মানুষকে বুঝতে সময় লাগে। কখনো কখনো অনেক সময়।"
প্রথমবারের মতো দুজনের মতামত পুরোপুরি মিলল।
দূর থেকে ঘরের ভেতর কারও ডাক শোনা গেল।
বোধহয় তাদের খোঁজা হচ্ছে।
দুজনেই উঠে দাঁড়াল।
ঘরে ফেরার আগে একবার অরিন্দমের মনে হলো, মেয়েটি শুধু সুন্দরী নয়, চিন্তাশীলও।
আর সবচেয়ে বড় কথা, সে নিজের মতো করে ভাবতে জানে।
এই গুণটা আজকাল খুব বেশি দেখা যায় না।
ঘরে ফিরে আবার কিছু সাধারণ কথাবার্তা হলো।
ভদ্রমহিলা দুপুরের খাবার খেয়ে যাওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করলেন।
কিন্তু তারাপীঠে পৌঁছানোর পরিকল্পনা থাকায় অরিন্দম ও সুব্রত বিনয়ের সঙ্গে তা এড়িয়ে গেল।
শেষবারের মতো সকলের সঙ্গে সৌজন্যমূলক কথাবার্তা হলো।
ঈশিতা নমস্কার করল।
অরিন্দমও নমস্কার জানাল।
সেই মুহূর্তে দুজনের চোখ একবারের জন্য মিলল।
খুব স্বাভাবিক একটি মুহূর্ত।
তবু কেন যেন অরিন্দমের মনে হলো, কথার বাইরে আরও কিছু যেন থেকে গেল।
হয়তো ভুল ধারণা।
হয়তো শুধু মুহূর্তের অনুভূতি।
সে আর ভাবল না।
গাড়িতে উঠে বসার পর কিছুক্ষণ নীরবতা রইল।
বাড়ির ফটক ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল।
রাস্তার মোড় ঘুরতেই বাড়িটা আর চোখে পড়ল না।
সুব্রত এতক্ষণ চুপচাপ ছিল।
অবশেষে আর থাকতে না পেরে বলল,
— "কী রে, কেমন লাগল?"
অরিন্দম জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
রাস্তার দু'ধারে শীতশেষের মাঠ, দূরে তালগাছের সারি, কোথাও কোথাও শুকনো পুকুরের ধারে ছেলেদের খেলাধুলা।
কিছুক্ষণ পরে মৃদু স্বরে বলল,
— "মেয়েটি বুদ্ধিমতী।"
সুব্রত হেসে ফেলল।
— "শুধু বুদ্ধিমতী?"
অরিন্দমও হালকা হাসল।
কিন্তু আর কোনো উত্তর দিল না।
সব অনুভূতির ভাষা হয় না।
কিছু কিছু বিষয়কে সময়ের ওপরই ছেড়ে দিতে হয়।
গাড়ি তখন ধীরে ধীরে তারাপীঠের রাস্তার দিকে এগিয়ে চলেছে।
সামনে অপেক্ষা করছে আরেকটি পথ, আর হয়তো জীবনের নতুন কোনো অধ্যায়।
Comments
Post a Comment