Skip to main content

পর্ব –১৯ : আমার হিয়ার মাঝে

পর্ব – ৯ :আমার হিয়ার মাঝে

ইন্টারভিউয়ের দিন অরিন্দম তখন করিডোরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। গত প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সে কখনো এদিক-ওদিক হাঁটছে, কখনো জানালার বাইরে তাকাচ্ছে, কখনো আবার ঘড়ির কাঁটার দিকে চোখ রাখছে।

দরজা খুলতেই তার দৃষ্টি সেদিকে চলে গেল।

ঈশিতা বেরিয়ে আসছে।

মুখে একটা চাপা হাসি।

চোখ দুটো উজ্জ্বল।

আর সবচেয়ে বড় কথা, ভেতরে ঢোকার সময় যে উদ্বেগ তার মুখে ছিল, তার বেশিরভাগটাই যেন কোথাও মিলিয়ে গেছে।

কাছে আসতেই অরিন্দম জিজ্ঞেস করল,

— "কেমন হলো?"

ঈশিতা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে হেসে ফেলল।

— "আমার মনে হয় ভালো হয়েছে।"

অরিন্দমের বুকের ভেতর জমে থাকা অদৃশ্য চাপটা যেন এক মুহূর্তে নেমে গেল।

— "আমি জানতাম।"

— "এত আত্মবিশ্বাস আপনার কোথা থেকে আসে?"

— "কারণ আমি জানি তুমি কতটা প্রস্তুতি নিয়েছো।"

ঈশিতা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

তারপর হঠাৎ বলল,

— "জানেন, শেষ প্রশ্নটা বেশ মজার ছিল।"

— "কী জিজ্ঞেস করলেন?"

— "জিজ্ঞেস করলেন, এই চাকরিটা পেলে আমি কেন করতে চাই।"

— "তারপর?"

ঈশিতার চোখে আবার সেই উজ্জ্বলতা ফিরে এল।

— "আমি বলেছি, স্যার, আমার কাছে প্রশাসন শুধু একটি পদ বা ক্ষমতার জায়গা নয়।"

অরিন্দম মন দিয়ে শুনছিল।

— "বললাম, উন্নয়ন বলতে আমরা সাধারণত রাস্তা, সেতু, ভবন বা প্রকল্প বুঝি। কিন্তু আসল উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু মানুষ। একজন দরিদ্র মানুষ যদি তার ন্যায্য অধিকার পায়, একজন বৃদ্ধ যদি সরকারি সাহায্য পায়, একজন মেধাবী ছাত্র যদি সুযোগ পায়, একজন অসহায় পরিবার যদি প্রশাসনের দরজায় গিয়ে সম্মান পায়—সেখানেই উন্নয়নের সার্থকতা।"

একটু থেমে ঈশিতা আবার বলল—

— "তাই এই চাকরিটাকে আমি শুধু একটি কর্মসংস্থান হিসেবে দেখি না। মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার একটি সুযোগ হিসেবে দেখি।"

— "তারপর বোর্ড কী বলল?"

ঈশিতা মৃদু হেসে বলল—

— "একজন সদস্য বললেন, আপনার উত্তরটা আদর্শবাদী।"

— "তুমি কী বললে?"

— "বললাম, স্যার, বাস্তববোধ ছাড়া প্রশাসন চলে না, কিন্তু আদর্শ ছাড়া উন্নয়নও দিক খুঁজে পায় না। দুটোর সমন্বয়ই প্রয়োজন।"

কথাটা বলেই ঈশিতা হেসে ফেলল।

— "তারপর উনারাও হাসলেন। তখনই মনে হলো, ইন্টারভিউটা বোধহয় মন্দ হয়নি।"

অরিন্দমও হেসে ফেলল।

— "তাহলে তো বেশ ভালোই হয়েছে।"

— "আশা করি।"

ইন্টারভিউ সেন্টার থেকে বেরিয়ে তারা কাছের একটি ছোট্ট কফি শপে ঢুকল।

দুজনেই যেন একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলতে চেয়েছিল।

জানালার ধারে একটি টেবিলে বসে তারা কফির অর্ডার দিল।

বাইরে কলকাতার ব্যস্ত রাস্তা।

মানুষজন নিজের নিজের কাজে ছুটে চলেছে।

ভেতরে কফির গন্ধ আর নরম সুরের গান।

কফি আসার পর ঈশিতা কাপটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

— "জানেন, ভেতরে ঢোকার আগে আমি কয়েকবার বাইরে তাকিয়েছিলাম।"

— "কেন?"

ঈশিতা একটু হেসে বলল—

— "দেখার জন্য, আপনি এসেছেন কি না।"

কথাটা বলেই সে চোখ নামিয়ে নিল।

অরিন্দম কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

ইন্টারভিউটা ভালো হয়েছে কি না, সেই ভাবনা যেন হঠাৎ দ্বিতীয় স্থানে সরে গেল।

তার মনে হলো, এই কয়েক মাসের পরিচয়ের মধ্যে অদৃশ্য কোনো সুতো বোধহয় সত্যিই তৈরি হয়েছে।

এমন এক বিশ্বাস, যা যুক্তি দিয়ে তৈরি হয় না; ধীরে ধীরে মানুষের উপস্থিতির ওপর ভরসা করতে শিখলে তৈরি হয়।

সে শুধু মৃদু হেসে বলল—

— "আর আমাকে দেখতে পেয়েছিলে?"

ঈশিতা মাথা নেড়ে বলল—

— "হ্যাঁ। তখনই মনে হয়েছিল, সব ঠিক হবে।"

অরিন্দম স্পষ্ট লক্ষ্য করল - ঈশিতার চোখেমুখে আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট।

আজকের এই সাফল্য তার প্রাপ্য।

দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল।

অরিন্দমের বুকের ভেতর হঠাৎ এক ধরনের গর্বের অনুভূতি জন্ম নিল।

নিজের জন্য নয়।

ঈশিতার জন্য।

অনেকদিন পর অন্য কারও সাফল্যে এত আনন্দ হচ্ছে তার।

দুজনেই কাছের একটি কফি শপে ঢুকল।

জানালার ধারের একটি টেবিলে বসা গেল।

বাইরে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে।

কফির কাপ এসে গেল।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ বসে রইল।

এই নীরবতারও আলাদা একটা ভাষা আছে।

যেখানে সব কথা মুখে বলতে হয় না।

ঈশিতা কাপের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল—

— "জানেন, আজ সকালে খুব ভয় করছিল।"

— "জানি।"

— "কিন্তু ইন্টারভিউ রুমে ঢোকার আগে বারবার মনে হচ্ছিল, বাইরে আপনি আছেন।"

অরিন্দম কিছু বলল না।

শুধু তাকিয়ে রইল।

ঈশিতা আবার বলল—

— "অদ্ভুত না?"

— "কী?"

— "কিছু মানুষ খুব অল্প সময়েই ভরসার জায়গা হয়ে যায়।"

অরিন্দম হালকা হাসল।

— "ভরসা জোর করে তৈরি হয় না। নিজে থেকেই হয়।"

ঈশিতা ধীরে মাথা নাড়ল।

তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—

— "একটা কথা বলব?"

— "বল।"

ঈশিতা একটু ইতস্তত করল।

তারপর খুব আস্তে বলল—

— "আপনি কি আমার সঙ্গে চিরদিন এইভাবেই থাকবেন?"

কথাটা বলেই সে চোখ নামিয়ে ফেলল।

গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে।

মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল।

অরিন্দমও কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

প্রশ্নটা হঠাৎ এসেছে।

কিন্তু পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত নয়।

সম্ভবত ঈশিতার মনের গভীরে কথাটা অনেকদিন ধরেই ছিল।

আজ শুধু মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে।

হয়তো সে নিজেও বুঝে ওঠেনি কখন অরিন্দম তার কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অরিন্দম জানালার বাইরে তাকাল।

রাস্তার ওপরে বিকেলের আলো পড়েছে।

মানুষ চলাফেরা করছে।

জীবন তার নিজের গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু তার ভেতরে যেন অন্য এক প্রশ্ন জেগে উঠল।

সে কি সত্যিই নিশ্চিত?

ঈশিতাকে তার ভালো লাগে।

তার বুদ্ধিমত্তা ভালো লাগে।

তার মমতা ভালো লাগে।

তার স্বচ্ছতা ভালো লাগে।

তার সাফল্যে সে আনন্দ পায়।

তার কষ্টে মন খারাপ হয়।

কিন্তু এই অনুভূতির নাম কি ভালোবাসা?

নাকি গভীর শ্রদ্ধা?

নাকি দুটোর মাঝামাঝি কোনো অচেনা অনুভূতি?

মানুষের মনের সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত এটাই।

মানুষ ভাবে সে নিজের মনকে চেনে।

আসলে মনই তাকে চালায়।

কখন কাকে ভালো লাগবে, কেন ভালো লাগবে, কতটা ভালো লাগবে—তার কোনো যুক্তি নেই।

মনের গভীরে এমন অনেক দরজা থাকে, যার অস্তিত্ব মানুষ নিজেই জানে না।

হঠাৎ কোনো একদিন, কোনো এক মানুষ এসে সেই দরজায় আলতো করে টোকা দেয়।

আর তখনই ভেতর থেকে অচেনা আলো বেরিয়ে আসে।

অরিন্দম জানত না তার মনের সেই দরজাগুলো পুরোপুরি খুলেছে কি না।

কিন্তু এটুকু সে বুঝতে পারছিল—ঈশিতা তার জীবনে এমন এক জায়গা করে নিয়েছে, যা আর অস্বীকার করা সম্ভব নয়।

সে মৃদু হেসে বলল—

— "ভবিষ্যৎ কেউ জানে না, ঈশিতা।"

ঈশিতা মুখ তুলে তাকাল।

অরিন্দম ধীরে বলল—

— "তবে যতদিন পাশে থাকার মতো বিশ্বাস থাকবে, ততদিন আমি থাকব।"

ঈশিতার চোখে অদ্ভুত এক আলো ফুটে উঠল।

সেই আলোতে স্বস্তি আছে, আনন্দ আছে, আবার লুকোনো একটুকরো ভালোবাসাও আছে।

কফির কাপ থেকে তখনও ধোঁয়া উঠছে।

বাইরে সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে।

আর অরিন্দম অনুভব করল—

প্রকৃত ভালোবাসা সম্ভবত হঠাৎ করে আসে না।

সেটা জন্ম নেয় শ্রদ্ধা থেকে।

আর শ্রদ্ধা জন্ম নেয় একজন মানুষের কাজ, চরিত্র, সংগ্রাম আর ব্যক্তিত্বকে কাছ থেকে দেখার মধ্য দিয়ে।

ভালোবাসা তখন আর শুধু আবেগ থাকে না।

সে হয়ে ওঠে এক ধরনের নীরব আস্থা।

যার উপর ভর করে দীর্ঘ পথ হেঁটে যাওয়া যায়।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...