তৃতীয় অধ্যায় : ফেরার পথের মানুষ
অফিসের দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকাল অনির্বাণ।
বিকেল ৫টা ১৫।
আর এক মিনিটও দেরি করা যাবে না।
এখন বেরোতে দেরি হলে হিসেবটা এলোমেলো হয়ে যাবে।
প্রথমে টোটো।
তারপর বাস।
তারপর লোকাল ট্রেন।
সব ঠিকঠাক থাকলে বাড়ি পৌঁছাতে রাত ন'টা।
তারও পরে রাতের খাবার।
আর বাবার ওষুধ।
পাশের টেবিল থেকে সুশান্তদা হেসে বললেন,
— কী রে, আবার দৌড় শুরু?
অফিসে সবাই জানে, ঘড়িতে পাঁচটা পনেরো বাজলেই অনির্বাণের মনটা বাড়ির দিকে ছুটতে শুরু করে।
আরেকজন মজা করে বললেন,
— কতবার বলেছি, কোয়ার্টারে থেকে যা। রোজ এতটা পথ যাস কেন?
অনির্বাণ ব্যাগের চেইন টানতে টানতে হেসে বলল,
— ইচ্ছে করলে থাকতেই পারতাম দাদা... কিন্তু বাবা একা।
ঘরটা হঠাৎ একটু চুপচাপ হয়ে গেল।
সবাই জানে, অনির্বাণের বাবার গলার ক্যান্সার ধরা পড়েছে।
ডাক্তাররা বলেছেন, সময়মতো অস্ত্রোপচার করলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
তবু অসুস্থ মানুষকে একা রেখে নিশ্চিন্তে থাকা যায় না।
অনির্বাণ তাই প্রতিদিন বাড়ি ফেরে।
ক্লান্তি নিয়ে।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে।
কারণ বাড়িতে একজন মানুষ অপেক্ষা করেন।
আর সেই অপেক্ষার দাম কোনো সরকারি কোয়ার্টারের আরামে মাপা যায় না।
অফিস থেকে বেরিয়ে একটা টোটো থামাল সে।
চালকের পাশের সিটে বসতেই টোটোটা ধীরে ধীরে বাসস্ট্যান্ডের দিকে চলতে শুরু করল।
টোটোতে বসতে অনির্বাণের ভালো লাগে।
শুধু যাতায়াতের জন্য নয়।
প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষের গল্প শোনার জন্যও।
তার বিশ্বাস, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইয়ের নাম "মানুষ"।
আজকের চালক ছেলেটাকে আগে কখনও দেখেনি।
বয়স খুব বেশি হলে বাইশ-তেইশ।
হাসিমুখে বলল,
— দাদা, আমাকে নতুন লাগছে না?
অনির্বাণও হেসে বলল,
— হ্যাঁ, আগে তো দেখিনি।
— আমি আসলে ডাম্পার চালাই। আজ বাড়ি এসেছি। তাই কাকার টোটোটা নিয়ে বেরিয়েছি।
কথা বলতে বলতে জানা গেল—
আঠারো বছর বয়সেই তার বিয়ে হয়েছে।
স্ত্রীর বয়স তখন সতেরো।
প্রথম সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই হারিয়ে গেছে।
এখন এক বছরের একটা ছেলে।
ছেলেটার কথা বলতে বলতে চালকের মুখে একটা অন্যরকম আলো ফুটে উঠল।
— ওর জন্যই তো দাদা... যত কষ্ট করি।
ওভারটাইম করি।
বেশি টাকা রোজগার করতে হবে।
আজ সকাল থেকে আটশো টাকা হয়েছে।
অনির্বাণ চুপ করে শুনছিল।
এই বয়সে সংসারের দায়িত্ব ছেলেটাকে অনেক বড় করে দিয়েছে।
হঠাৎ তার চোখে ভেসে উঠল রাস্তার ধারে লাগানো সরকারি পোস্টারগুলো।
"বাল্যবিবাহ রুখুন"
গ্রামে গ্রামে সচেতনতা শিবির হয়।
মাইক বাজে।
সেমিনার হয়।
মিছিল হয়।
শপথ নেওয়া হয়।
সবাই জানে—আঠারো বছরের আগে মেয়ের বিয়ে দেওয়া আইনত অপরাধ।
তবু বাস্তবের অনেক গ্রাম যেন এখনও সেই পোস্টারগুলো পড়ে না।
আইন কাগজে লেখা থাকে।
ভাষণ মঞ্চে শোনা যায়।
কিন্তু সমাজ বদলায় তখনই, যখন মানুষের অভ্যাস বদলায়।
আর সেই বদলটাই সবচেয়ে কঠিন।
তবে অনির্বাণ বিচার করল না।
সে শুধু দেখল—
একটা কাঁচা বয়সের ছেলে নিজের সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করছে।
জীবন কখনও কখনও মানুষকে বয়সের আগেই বড় করে দেয়।
রাত প্রায় ন'টা।
ট্রেনটা স্টেশনে এসে থামল।
নামতেই টুপটাপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল।
মুহূর্তের মধ্যেই ফোঁটাগুলো বড় হয়ে এল।
প্ল্যাটফর্মে নেমে যে যার মতো ছুটতে লাগল। কেউ ব্যাগ মাথায় দিল, কেউ খবরের কাগজ দিয়ে মাথা ঢাকল, কেউ আবার গুমটির নিচে আশ্রয় নিল।
অনির্বাণ ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করল।
ছাতা খুলতেই মায়ের মুখটা মনে পড়ে গেল।
বেরোনোর আগে প্রতিদিনের মতো আজও বলেছিলেন—
— "ছাতাটা নিয়েছিস তো?"
সে একবার ব্যাগের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল।
মায়েরা বোধহয় সন্তানের প্রয়োজনগুলো সন্তানের আগেই বুঝে ফেলেন।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে কয়েক পা এগোতেই চোখে পড়ল—
গুমটির নিচে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে কয়েকটা খাতা।
কাঁধে পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।
মুখে অস্বস্তির ছাপ।
সম্ভবত কোচিং সেন্টার থেকে ফিরছে।
বৃষ্টির জন্য আর এগোতে পারছে না।
অনির্বাণ একবার তাকিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল।
মেয়েদের সঙ্গে অকারণে কথা বলার অভ্যাস তার কোনোদিনই ছিল না।
আর পাঁচটা তরুণের মতোই সুন্দর মুখ তারও চোখে পড়ে।
কিন্তু দূর থেকেই।
নিজের সীমারেখা অতিক্রম করার মানুষ সে নয়।
তাই চুপচাপ নিজের পথেই এগিয়ে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা মৃদু, দ্বিধাভরা কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
— শুনবেন...
অনির্বাণ থেমে পিছন ফিরে তাকাল।
মেয়েটা একটু সংকোচ নিয়ে বলল—
— একটু... এগিয়ে দেবেন? যদি অসুবিধা না থাকে।
অনির্বাণ এক মুহূর্ত দ্বিধায় পড়ল।
তারপর ছাতাটা একটু ডানদিকে সরিয়ে বলল—
— আসুন।
দু'জনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
একটা ছোট ছাতা।
তার নিচে দু'জন মানুষ।
মাঝখানে অদৃশ্য একরাশ সংকোচ।
কিছুদূর কেউ কোনো কথা বলল না।
শুধু ছাতার ওপর বৃষ্টির শব্দ।
টুপ... টুপ... টুপ...
হঠাৎ মেয়েটাই নীরবতা ভাঙল।
— আপনি অনির্বাণদা... তাই তো?
অনির্বাণ অবাক হয়ে তাকাল।
— আপনি আমার নাম জানেন?
মেয়েটা হালকা হেসে বলল—
— জানি। আপনি হয়তো আমাকে চেনেন না, কিন্তু আমি আপনাকে অনেক আগে থেকেই চিনি।
— কোথা থেকে?
— আমাদের স্কুল থেকে।
অনির্বাণ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— আমাদের স্কুল?
— হ্যাঁ। আপনি যখন ক্লাস টুয়েলভে পড়তেন, আমি তখন ক্লাস সিক্সে।
— এখনও আমাদের স্কুলের স্যাররা আপনার কথা বলেন। বিশেষ করে অঙ্কের স্যার। নতুন ব্যাচ এলেই বলেন, "মন দিয়ে পড়লে অনির্বাণের মতো ফল করা অসম্ভব নয়।"
অনির্বাণ মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— স্যাররা একটু বাড়িয়ে বলেন।
— না। ছোটবেলায় আপনাদের মতো সিনিয়রদের দেখেই তো বড় হয়েছি। তখন ভাবতাম, এত ভালো পড়াশোনা করা মানুষ নিশ্চয়ই একদিন অনেক বড় অফিসার হবে।
কথাটা শুনে অনির্বাণের মুখে হাসি থাকলেও চোখে এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল।
জীবন সব সময় মেধার হিসাব মেনে চলে না।
সোহিনী আর কথাটা বাড়াল না।
কিছুক্ষণ পরে অনির্বাণই বলল—
— আপনার নামটা তো জানা হলো না।
— সোহিনী।
— কী করেন?
— চাকরির পরীক্ষার জন্য কোচিং করি। আর কয়েকটা টিউশন পড়াই। নিজের খরচটা অন্তত নিজেই চালানোর চেষ্টা করি।
অনির্বাণ মাথা নাড়ল।
— ভালো। চেষ্টা চালিয়ে যান।
— চেষ্টা তো করছি... বাকিটা ভাগ্য।
কথাটা শুনে অনির্বাণের ভালো লাগল।
নিজের চেষ্টায় এগিয়ে যেতে চাওয়া মানুষদের সে আলাদা চোখে দেখে।
সংগ্রামের পথটা তার নিজেরও খুব চেনা।
এরই মধ্যে সোহিনীদের বাড়ির মোড় এসে গেল।
সে ছাতার বাইরে এক পা বাড়িয়ে দাঁড়াল।
— অনেক ধন্যবাদ। আজ না থাকলে হয়তো আরও অনেকক্ষণ স্টেশনেই দাঁড়িয়ে থাকতে হতো।
— এতে ধন্যবাদের কী আছে! ভালো থাকবেন।
সোহিনী মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— আচ্ছা, আমি যাই।
— হ্যাঁ, সাবধানে যাবেন।
সোহিনী নিজের গলির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
অনির্বাণও আবার নিজের পথ ধরল।
বৃষ্টি তখনও ঝিরঝির করে পড়ছে।
ভেজা রাস্তার ওপর ল্যাম্পপোস্টের আলো নরম হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
বাড়ি পৌঁছতে এখনও খানিকটা পথ বাকি।

Comments
Post a Comment