অধ্যায় – ৩
ফেরার পথের মানুষ
দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
অফিসের করিডোরে তখনও মানুষের আনাগোনা থামেনি। কোথাও ফাইলের শব্দ, কোথাও প্রিন্টারের একটানা গুঞ্জন, কোথাও আবার শেষ মুহূর্তের স্বাক্ষরের অপেক্ষা।
অনির্বাণ নিজের টেবিলে বসে শেষ নোটশিটটায় সই করল। সামনে রাখা ফাইলগুলো একবার গুছিয়ে রাখল। সারাদিনের ব্যস্ততার পর টেবিলটা অগোছালো রেখে সে কোনোদিন বাড়ি ফেরে না।
তার বিশ্বাস—
কাজেরও একটা সম্মান আছে।
কাজ শেষ করে তাকে সুন্দরভাবে রেখে যাওয়াও দায়িত্বেরই অংশ।
দেওয়ালের ঘড়িটার দিকে চোখ পড়তেই সে একটু চমকে উঠল।
বিকেল পাঁচটা পনেরো।
সময়টা তার কাছে শুধুই ঘড়ির কাঁটা নয়।
এই পাঁচটা পনেরোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা টোটো, একটা বাস, একটা লোকাল ট্রেন, আর শেষ পর্যন্ত বাড়ি পৌঁছে বাবার হাতে ওষুধ তুলে দেওয়ার দায়িত্ব।
একটা গাড়ি মিস হলে পরের সব হিসেব এলোমেলো হয়ে যায়।
তাই প্রতিদিনের এই সময়ের সঙ্গে তার যেন এক নীরব চুক্তি।
ব্যাগের চেন টানতে টানতেই পাশের টেবিল থেকে সুশান্তদা হেসে বললেন—
— কী রে, আজও দৌড় শুরু?
আরেকজন সহকর্মী মজা করে বললেন—
— কতবার বলেছি, সরকারি কোয়ার্টার ফাঁকা পড়ে আছে। থেকে যা না! রোজ এত পথ ঠেলে কী লাভ?
অনির্বাণ হেসে ফেলল।
— ইচ্ছে করলে থাকতেই পারতাম দাদা।
সুশান্তদা আবার প্রশ্ন করলেন—
— তাহলে থাকিস না কেন?
অনির্বাণ উত্তর দেওয়ার আগে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল—
— বাবা একা।
মাত্র দুটি শব্দ।
কিন্তু সেই দুটি শব্দের ভেতরেই যেন লুকিয়ে ছিল বহু না-বলা গল্প।
ঘরটা মুহূর্তের জন্য নিঃশব্দ হয়ে গেল।
সহকর্মীরা সবাই জানেন, অনির্বাণের বাবার গলায় ক্যান্সার ধরা পড়েছে।
ডাক্তার আশ্বাস দিয়েছেন—সময়মতো অস্ত্রোপচার হলে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা যথেষ্ট।
তবুও "সময়মতো" কথাটা মানুষের মনে যে অদৃশ্য ভয় তৈরি করে, তার কোনো ওষুধ নেই।
অনির্বাণ তাই প্রতিদিন বাড়ি ফেরে।
ক্লান্ত শরীর নিয়ে।
লম্বা পথ পেরিয়ে।
রাত যতই হোক।
কারণ সে জানে—
বাড়িতে একজন মানুষ অপেক্ষা করছেন।
অপেক্ষা—
শব্দটা ছোট।
কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর অনুভূতিগুলোর একটি।
একজন বৃদ্ধ বাবা হয়তো ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে আছেন।
একজন মা হয়তো বারবার বারান্দায় এসে রাস্তার দিকে চোখ রাখছেন।
এই অপেক্ষার কোনো শব্দ নেই।
কোনো অভিযোগও নেই।
তবু এই নীরব অপেক্ষাই মানুষকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ির পথে ফিরিয়ে আনে।
অনির্বাণের কাছেও বাড়ি ফেরা কোনো অভ্যাস নয়।
এ এক নীরব দায়িত্ব।
বরং তারও বেশি—
এ এক ভালোবাসা।
ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে সে সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল—
— আচ্ছা দাদা, কাল দেখা হবে।
সবাইও হাসিমুখে বিদায় জানাল।
অফিসের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে অনির্বাণের মনে হলো—
দিনের কাজ শেষ হতে পারে।
কিন্তু একজন মানুষের দায়িত্বের
কোনো অফিস-টাইম হয় না।
অফিসের গেট পেরিয়ে অনির্বাণ দ্রুত পা বাড়াল।
এই সময়টা তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
একটা টোটো মিস মানেই পরের বাস ধরতে দেরি। বাস মিস মানেই লোকাল ট্রেন হাতছাড়া। আর লোকাল ছুটে গেলে রাত আরও গভীর।
ভাগ্য ভালো।
স্ট্যান্ডে একটা টোটো ছাড়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল।
অনির্বাণ উঠে বসতেই চালক মুচকি হেসে বলল—
— দাদা, স্টেশন?
— হ্যাঁ।
টোটোটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
অনির্বাণের বরাবরের একটা অভ্যাস আছে।
সে শুধু রাস্তা দেখে না।
মানুষও দেখে।
তার বিশ্বাস—
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইয়ের নাম "মানুষ"।
আর সেই বইয়ের প্রতিটি পাতা আলাদা।
আজকের চালকটিকে আগে কখনও দেখেনি।
বয়স বড়জোর বাইশ-তেইশ।
মুখভরা হাসি।
চোখে অদ্ভুত একটা পরিশ্রমী মানুষের আত্মবিশ্বাস।
অনির্বাণ নিজেই জিজ্ঞেস করল—
— আগে তো আপনাকে দেখিনি।
ছেলেটা হাসল।
— আমি আসলে রোজ টোটো চালাই না দাদা।
— তাই নাকি?
— ডাম্পার চালাই। আজ দু'দিনের জন্য বাড়ি এসেছি। কাকার টোটোটা ফাঁকা ছিল, তাই বেরিয়ে পড়লাম। ঘরে বসে থাকলে তো আর পয়সা আসে না।
অনির্বাণ মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
কথা বলতে বলতে জানা গেল—
আঠারো বছর বয়সেই বিয়ে হয়েছে তার।
প্রথম সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই চলে গেছে।
কথাটা বলতে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্য ছেলেটার মুখটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
তারপর নিজেই আবার হেসে বলল—
— এখন একটা ছেলে আছে। এক বছর বয়স। সারাদিনের কষ্ট বাড়ি গিয়ে ওকে একবার কোলে নিলেই শেষ।
এই কথাটা বলার সময় তার চোখ দুটো যেন অন্যরকম হয়ে উঠল।
সেখানে ক্লান্তি ছিল।
আবার সীমাহীন ভালোবাসাও ছিল।
অনির্বাণ চুপচাপ শুনছিল।
ছেলেটা আবার বলতে লাগল—
— ওর জন্যই তো দাদা সব করি। ওভারটাইম করি। আজ সকাল থেকে আটশো টাকার মতো হয়ে গেছে।
কথাটা বলার সময় তার গলায় কোনো অহংকার ছিল না।
ছিল এক বাবার স্বাভাবিক আনন্দ।
টোটোটা তখন গ্রামের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে।
রাস্তার পাশে একটা পুরোনো দেওয়ালে রং উঠে যাওয়া সরকারি পোস্টার।
"বাল্যবিবাহ রুখুন"
অনির্বাণ পোস্টারটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
আইন তার নিজের জায়গায় আছে।
সমাজেরও প্রয়োজন আছে।
তবু জীবনকে কেবল পোস্টার দিয়ে বিচার করা যায় না।
তার পাশে বসে থাকা ছেলেটা হয়তো খুব অল্প বয়সেই সংসার শুরু করেছে।
কিন্তু আজ সে একজন দায়িত্বশীল বাবা।
একটা ছোট্ট শিশুর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে।
জীবন অনেক সময় মানুষকে তার বয়সের আগেই বড় করে দেয়।
বইয়ের পাতায় সেই শিক্ষা লেখা থাকে না।
লেখা থাকে মানুষের জীবনে।
টোটোটা স্টেশনের সামনে এসে থামল।
ভাড়া মিটিয়ে অনির্বাণ নামতে নামতে মৃদু হেসে বলল—
— ভালো থাকবেন। আর ছেলেটাকে অনেক আদর দেবেন।
ছেলেটা হেসে উত্তর দিল—
— ওই তো দাদা, ওর জন্যই বেঁচে আছি।
অনির্বাণ কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়া টোটোটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো—
পৃথিবীতে অনেক মানুষ ধনী হয়।
অনেক মানুষ সফলও হয়।
কিন্তু যে মানুষ অন্য একজন মানুষের জন্য
নিজেকে প্রতিদিন নতুন করে গড়ে তোলে,
সেই মানুষই সত্যিকারের বড় মানুষ।
স্টেশনের লাউডস্পিকারে তখন ঘোষণা ভেসে এল—
"আপ লোকাল ট্রেনটি কিছুক্ষণের মধ্যেই এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করবে..."
অনির্বাণ ব্যাগটা কাঁধে তুলে প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
স্টেশনে তখন নিত্যদিনের সেই চেনা ব্যস্ততা।
কেউ দৌড়ে টিকিট কাউন্টারের দিকে যাচ্ছে, কেউ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপ হাতে গল্পে মশগুল। কোথাও স্কুলফেরত ছাত্রছাত্রী, কোথাও সারাদিনের ক্লান্তি কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় অফিসযাত্রী।
লাউডস্পিকারে ভেসে এল ঘোষণার গলা।
"আপ লোকাল ট্রেনটি অল্প সময়ের মধ্যেই এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করবে।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই দূর থেকে হেডলাইটের আলো দেখা গেল।
ট্রেনটা ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে ঢুকতেই একসঙ্গে যেন শত শত মানুষের চলাচল শুরু হয়ে গেল।
কেউ নামছে।
কেউ উঠছে।
কেউ আবার জানালার ধারে বসার জন্য ছোটাছুটি করছে।
অনির্বাণ এসবের মধ্যে কোনোদিন তাড়াহুড়ো করে না।
তার বিশ্বাস—
যে যাত্রা প্রতিদিনের, সেখানে দৌড়ে জেতার কিছু নেই।
একটা জানালার ধারের সিট খালি পেয়ে সে বসে পড়ল।
ট্রেনটা ছেড়ে দিতেই সন্ধ্যার বাতাস জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে এল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল হকারদের পরিচিত ডাক।
— বাদাম নিন... গরম গরম বাদাম...
— ঝালমুড়ি... চানাচুর...
— ঠান্ডা জল... ঠান্ডা জল...
— দশ টাকায় দুইটা কলম...
এই মানুষগুলোকেও বহু বছর ধরে দেখে আসছে অনির্বাণ।
কেউ বয়সে বৃদ্ধ।
কেউ সদ্য যৌবনে পা দিয়েছে।
কিন্তু সবার কণ্ঠে একই আকুতি—
আজকের দিনটা যেন ভালো কাটে।
জানালার বাইরে একের পর এক গাছ পিছিয়ে যাচ্ছে।
ধানখেতের ওপর বৃষ্টিভেজা হাওয়া দুলছে।
দূরে কোথাও একটা ছোট্ট মন্দিরের ঘণ্টা শোনা গেল।
কোথাও মাঠের মধ্যে কয়েকটা গরু এখনও ঘাস খাচ্ছে।
একটা ছোট্ট স্টেশন এল।
দু'মিনিট দাঁড়িয়ে আবার ট্রেন ছেড়ে দিল।
অনির্বাণের মনে হয়—
জীবনও যেন একটা লোকাল ট্রেন।
কেউ কিছু দূর পাশাপাশি থাকে,
তারপর নিজের স্টেশন এলে নেমে যায়।
কিন্তু যাত্রাপথের স্মৃতিগুলো
রয়ে যায় চিরদিন।
হঠাৎ জানালায় কয়েক ফোঁটা জল এসে পড়ল।
আকাশে কখন যে কালো মেঘ জমেছে, খেয়ালই করেনি।
দূরে বিদ্যুতের চিকচিকানি দেখা গেল।
একজন বয়স্ক ভদ্রলোক জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন—
— আজ মনে হচ্ছে ভালো বৃষ্টি হবে।
অনির্বাণও আকাশের দিকে তাকাল।
তার হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ল।
বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় প্রতিদিনের মতো আজও বলেছিলেন—
— ছাতাটা নিয়েছিস তো?
সে তখন হেসে বলেছিল—
— নিয়েছি মা।
মায়েরা যেন আবহাওয়া দপ্তরেরও আগে বুঝে যান, কখন বৃষ্টি নামবে।
ট্রেনটা নিজের ছন্দে এগিয়ে চলল।
আর অনির্বাণ জানালার বাইরে অন্ধকার নেমে আসা সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পরেই তার স্টেশন।
সে জানত না—
সেই বৃষ্টিভেজা রাতেই
একটি অচেনা মানুষের সঙ্গে
তার প্রথম পরিচয় হতে চলেছে।
রাত প্রায় ন'টা।
ট্রেনটা ধীরে ধীরে স্টেশনে ঢুকল।
প্রতিদিনের মতোই অনেকেই তাড়াহুড়ো করে নেমে পড়ল। কেউ সাইকেল স্ট্যান্ডের দিকে ছুটছে, কেউ টোটো ধরার জন্য, কেউ আবার বাড়ি পৌঁছানোর তাড়ায় দ্রুত পা চালিয়ে স্টেশন ছাড়ছে।
অনির্বাণের কোনো তাড়া নেই।
সে ধীরে ধীরে নেমে প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত এগিয়ে এল।
ঠিক তখনই—
ঝপঝপ করে বৃষ্টি নেমে এল।
প্রথমে কয়েক ফোঁটা।
তারপর মুহূর্তের মধ্যেই যেন আকাশ ভেঙে জল নামতে লাগল।
দু-এক সেকেন্ডের মধ্যেই প্ল্যাটফর্মে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল।
কেউ ব্যাগ মাথায় চাপা দিল।
কেউ দৌড়ে শেডের নিচে গিয়ে দাঁড়াল।
কেউ আবার খবরের কাগজ দিয়ে মাথা বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
অনির্বাণ ব্যাগের চেন খুলে ছাতাটা বের করতে গিয়েই মৃদু হেসে ফেলল।
মায়ের কথাটা যেন আবার কানে ভেসে এল—
— ছাতাটা নিয়েছিস তো?
প্রতিদিনই একই প্রশ্ন।
ছোটবেলা থেকে শুনে আসছে।
আজও বদলায়নি।
অনির্বাণ মনে মনে বলল—
— নিয়েছি মা।
ছাতাটা খুলে স্টেশন থেকে বেরিয়ে এল সে।
বৃষ্টির জলে রাস্তা চকচক করছে।
ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো সেই জলের ওপর পড়ে অদ্ভুত এক শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে।
স্টেশন চত্বর প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে।
শুধু দু-একটা টোটো এখনও যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে।
চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসছে গরম চায়ের গন্ধ।
কিছুটা এগোতেই অনির্বাণের চোখ আটকে গেল।
রাস্তার ধারে টিনের একটা ছোট্ট গুমটির নিচে একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি।
বৃষ্টির দিকে তাকাচ্ছে।
আবার রাস্তার দিকেও তাকাচ্ছে।
মনে হচ্ছে কোথাও যাওয়ার তাড়া আছে।
কিন্তু এই বৃষ্টিতে বেরোনোর সাহস পাচ্ছে না।
পরনে হালকা খয়েরি রঙের সালোয়ার-কামিজ।
কাঁধে বড় একটা কালো ব্যাগ।
ব্যাগের মুখটা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে কিছু প্রিন্ট করা নোট আর কয়েকটা মোটা খাতা।
মেয়েটাকে একবার দেখেই অনির্বাণ আবার নিজের পথে হাঁটতে শুরু করল।
অচেনা মানুষের জীবনে অযথা প্রবেশ করার অভ্যাস তার কোনোদিনই ছিল না।
বিশেষ করে কোনো মেয়ের সঙ্গে।
সে বিশ্বাস করে—
সম্মান অনেক সময় দূরত্বের মধ্যেও থাকে।
সৌন্দর্য তার চোখেও ধরা পড়ে।
কিন্তু সেই সৌন্দর্যকে উপলক্ষ করে পরিচয় তৈরি করার মানুষ সে নয়।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা মৃদু, দ্বিধাভরা কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
— শুনবেন...
অনির্বাণ থেমে গেল।
ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকাল।
বৃষ্টির ফোঁটার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি এবার একটু ইতস্তত করে বলল—
— একটু... এগিয়ে দেবেন? অসুবিধা না থাকলে...
এক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর অনির্বাণ ছাতাটা একটু ডানদিকে সরিয়ে শান্ত গলায় বলল—
— আসুন।
একটি ছোট্ট ছাতা।
দুটি সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ।
আর বাইরে অবিরাম ঝরে পড়া বর্ষার রাত।
কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়গুলোর শুরু হয়
মাত্র একটি শব্দ দিয়ে—
‘আসুন।’
দু'জন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
ছাতাটা খুব বড় নয়।
তাই দু'জনেরই হাঁটার গতি যেন অজান্তেই এক হয়ে গেল।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ছাতার কাপড়ে পড়ে একটানা সুর তুলছে।
চারপাশে প্রায় কেউ নেই।
ভেজা রাস্তার ওপর ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো পড়ে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে।
প্রথম কয়েক মিনিট কেউই কথা বলল না।
অচেনা মানুষের সঙ্গে নীরবতা অনেক সময় কথার থেকেও বেশি স্বাভাবিক হয়।
অবশেষে মেয়েটিই নীরবতা ভাঙল।
— আপনি... অনির্বাণদা, তাই তো?
অনির্বাণ একটু অবাক হয়ে তাকাল।
— আমার নাম জানেন?
মেয়েটি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— জানি। আপনি আমাকে চিনবেন না। কিন্তু আমি আপনাকে অনেক আগে থেকেই চিনি।
অনির্বাণের বিস্ময় আরও বাড়ল।
— কোথা থেকে?
মেয়েটি একটু হেসে বলল—
— আমাদের স্কুল থেকে। আপনি যখন উচ্চমাধ্যমিকে পড়তেন, আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে। অঙ্কের স্যার এখনও নতুন ব্যাচ পেলেই আপনার কথা বলেন।
অনির্বাণ হালকা হেসে ফেলল।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কোথায় যেন একটুখানি নীরবতা লুকিয়ে রইল।
জীবন সবসময় মেধার হিসেব মেনে চলে না।
এই সত্যিটা সে অনেক আগেই মেনে নিয়েছে।
মেয়েটি হয়তো সেই নীরবতাটুকু অনুভব করেছিল।
তাই আর কথাটা বাড়াল না।
কিছুটা পথ এগিয়ে এবার অনির্বাণই জিজ্ঞেস করল—
— আপনার নামটা তো জানা হলো না।
মেয়েটি উত্তর দিল—
— সোহিনী।
অনির্বাণ মাথা নাড়ল।
— কী করেন?
সোহিনী ব্যাগের স্ট্র্যাপটা একটু ঠিক করে নিয়ে বলল—
— চাকরির পরীক্ষার জন্য পড়ছি। কোচিং করি। আর দু-একটা টিউশন পড়াই। নিজের খরচটা অন্তত নিজেই চালানোর চেষ্টা করি।
অনির্বাণের মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
— খুব ভালো। নিজের চেষ্টায় দাঁড়ানোর আনন্দটাই আলাদা। লেগে থাকুন।
সোহিনী মৃদু হেসে বলল—
— চেষ্টা তো করছি। বাকিটা... ভাগ্যের ওপর।
অনির্বাণ একটু থেমে বলল—
— ভাগ্য দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু সেই দরজার সামনে পৌঁছতে হলে হাঁটতে হয় নিজের চেষ্টাতেই।
সোহিনী উত্তর দিল না।
শুধু একবার তাকাল অনির্বাণের দিকে।
হয়তো কথাটা তার ভালো লেগেছিল।
হয়তো মনে মনে সাহসও পেল।
বৃষ্টি তখনও পড়ছে।
একই ছাতার নিচে পাশাপাশি হাঁটছে দু'জন।
তবু তাদের মাঝখানে ছিল ভদ্র দূরত্ব।
আর সেই দূরত্বের মধ্যেই জন্ম নিচ্ছিল এক অদ্ভুত স্বস্তি।
সব পরিচয়ের শুরু কথায় হয় না।
কিছু পরিচয় শুরু হয়
একজন মানুষের ব্যবহার দিয়ে।
কথা বলতে বলতে কখন যে সোহিনীদের গলির মোড় এসে গেছে, কেউই খেয়াল করেনি।
সোহিনী একটু থেমে দাঁড়াল।
ছাতার বাইরে এক পা বাড়াতেই বৃষ্টির কয়েক ফোঁটা তার কাঁধে এসে পড়ল।
— এই পর্যন্তই... আমার বাড়ি ওই দিকেই।
অনির্বাণও থেমে গেল।
— আচ্ছা। সাবধানে যাবেন।
সোহিনী মৃদু হেসে বলল—
— আজ আপনি না থাকলে হয়তো স্টেশনেই আরও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। ধন্যবাদ।
অনির্বাণ মাথা নাড়ল।
— এতে ধন্যবাদের কিছু নেই। ভালো থাকবেন। আর পড়াশোনা ছাড়বেন না।
সোহিনী আর কিছু বলল না।
শুধু একবার মৃদু হাসল।
তারপর ভিজতে ভিজতেই নিজের গলির ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল।
অনির্বাণ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আবার নিজের পথ ধরল।
বৃষ্টিটা তখন অনেকটাই কমেছে।
রাস্তার দু'পাশে ল্যাম্পপোস্টের আলো ভেজা কালো রাস্তায় লম্বা হয়ে পড়েছে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল কয়েক মাস আগের একটা ঘটনা।
একটি সরকারি প্রশিক্ষণে একজন আই.এ.এস. অফিসার বলেছিলেন—
"মানুষ সমাজকে যতটা ভয় পায়, তার চেয়ে অনেক বেশি ভয় পাওয়া উচিত নিজের বিবেককে।"
সেই কথাটা আজও অনির্বাণের মনে গেঁথে আছে।
সে বিশ্বাস করে—
পৃথিবীর চোখকে ফাঁকি দেওয়া হয়তো সম্ভব।
সমাজের বিচারও একদিন থেমে যায়।
কিন্তু দিনের শেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকাতে না পারলে, সেই জীবন কোনোদিন শান্তির হয় না।
আজও সে সেই বিশ্বাস নিয়েই পথ চলে।
সোহিনীকে সাহায্য করেছে।
কারণ সে একজন বিপদে পড়া মানুষ ছিল।
তার বেশি কিছু নয়।
তার কমও নয়।
বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে এক ধরনের শান্তি নেমে এল।
বাইরে তখনও টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে।
দূরে কোথাও ব্যাঙ ডেকে উঠল।
রাত ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠছে।
রাতটা যেন তাকে নিঃশব্দে একটা কথাই মনে করিয়ে দিল—
সমাজের বিচার একদিন থেমে যায়।
কিন্তু নিজের বিবেকের আদালত
প্রতিদিন বসে।
সেখানে মিথ্যে বলে
কেউ কোনোদিন জিততে পারে না।
অনির্বাণ বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল।
ভেতর থেকে মায়ের চেনা গলা ভেসে এল—
— অনি, এসেছিস?
অনির্বাণের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
বাইরের পৃথিবী যত বড়ই হোক,
দিনের শেষে "বাড়ি" শব্দটার মতো আশ্রয়
আর কোথাও নেই।

Comments
Post a Comment