Skip to main content

নন্দিতার পৃথিবী

ষষ্ঠ অধ্যায় : নন্দিতা

সকালের আকাশটা আজ কেমন যেন মেঘলা।

রেলস্টপের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানটায় বসে আছে নন্দিতা।

হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা।

ট্রেন আজ বেশ দেরি করছে।

চায়ের দোকানের সামনে প্রতিদিনের মতোই ভিড়।

কেউ খবরের কাগজ পড়ছে।

কেউ মোবাইলের পর্দায় চোখ রেখে খবর দেখছে।

কেউ আবার রাজনীতি নিয়ে তর্কে ব্যস্ত।

কিন্তু এই সমস্ত কোলাহলের মাঝেও নন্দিতার চোখ বারবার গিয়ে থামছে দোকানের ডানদিকের সেই বেঞ্চটার দিকে।

আজ বেঞ্চটা খালি।

একেবারে খালি।

অদ্ভুত!

এমন তো হয় না।

ছুটির দিন ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই ওই সময়টায় ছেলেটাকে দেখা যায়।

ঘড়ির কাঁটার মতোই নিয়মিত।

হাতে এক কাপ চা।

চোখে ক্লান্তি।

তবু মুখে এক ধরনের স্থির শান্তি।

কোনোদিন কথা হয়নি।

প্রয়োজনও পড়েনি।

তবু প্রতিদিনের সেই নীরব উপস্থিতিটা কখন যে অচেনা অভ্যাস হয়ে উঠেছে, নন্দিতা নিজেও বুঝতে পারেনি।

চায়ের কাপটা হাতে নিয়েও আজ চা আর শেষ হচ্ছে না।

এক চুমুক দিয়ে আবার কাপটা নামিয়ে রাখল।

অকারণেই মনটা কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে উঠছে।

আজ কি তার ছুটি?

শরীর খারাপ?

নাকি বাড়িতে কোনো সমস্যা হয়েছে?

কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি তো?

প্রশ্নগুলো একটার পর একটা এসে ভিড় করতেই নন্দিতা নিজেই থমকে গেল।

সে কেন এসব ভাবছে?

ছেলেটা তার কে?

নামটুকুও তো জানে না।

এই পৃথিবীতে প্রতিদিন কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়।

বাসে...

ট্রেনে...

বাজারে...

বিয়েবাড়িতে...

আবার সময়ের স্রোতে সবাই হারিয়েও যায়।

তাহলে একজন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষের অনুপস্থিতি আজ এতটা অনুভব হচ্ছে কেন?

এ কি শুধু অভ্যাস?

নাকি নীরবতারও নিজস্ব এক ভাষা আছে, যা কোনো পরিচয় ছাড়াই মানুষের মনে জায়গা করে নেয়?

নিজের মনই যেন আজ নিজের কাছে প্রশ্ন করে চলেছে।

নন্দিতা উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না।

শুধু মনে হচ্ছে, গত কয়েক মাসে অজান্তেই তার প্রতিটি সকাল যেন সেই নীরব মানুষটার উপস্থিতির সঙ্গে কোথাও গিয়ে জড়িয়ে পড়েছিল।

হঠাৎ দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল।

লোহার চাকার শব্দ ধীরে ধীরে কাছে আসতে লাগল।

চমকে উঠে বাস্তবে ফিরে এল নন্দিতা।

চায়ের শেষ চুমুকটা খেয়ে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।

ট্রেন থেকে নেমে স্কুলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে নন্দিতার মনটা ধীরে ধীরে আবার নিজের চেনা জগতে ফিরে এল।

ট্রেন থেকে নেমে স্কুলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে নন্দিতার মনটা ধীরে ধীরে আবার নিজের চেনা পৃথিবীতে ফিরে এল।

স্টেশন থেকে স্কুল পর্যন্ত কাঁচা-পাকা মিশ্রিত রাস্তা।

দু'পাশে বিস্তীর্ণ ধানখেত।

মাঝে মাঝে শাল, সেগুন আর মহুয়ার গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

ভোরের শিশির তখনও পুরোপুরি শুকিয়ে যায়নি।

হালকা বাতাসে ভেসে আসছে ভেজা মাটির গন্ধ।

দূরে কোথাও গরুর গলায় বাঁধা ঘণ্টার শব্দ।

কোথাও উঠোন ঝাঁট দিচ্ছেন গ্রামের মহিলারা।

মাটির চুল্লি থেকে ধোঁয়া উড়ছে।

এই পথটুকু নন্দিতার খুব প্রিয়।

শহরের ব্যস্ততা যেন এখানে এসে আচমকাই থেমে যায়।

স্কুলটা একটা আদিবাসী গ্রামকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।

সরকারি প্রকল্পে এখন পাকা ভবন, মিড-ডে মিলের রান্নাঘর, খেলার মাঠ, লাইব্রেরি—সবই হয়েছে।

তবু স্কুলটার আসল সৌন্দর্য ইট-সিমেন্টে নয়।

তার সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে চারপাশের মানুষগুলোর সরলতায়।

গ্রামের মানুষগুলো বড় সহজ-সরল।

অভাব আছে।

কিন্তু আন্তরিকতার অভাব নেই।

গ্রামে কোনো বিয়ে হোক, পূজা হোক কিংবা নতুন ধান উঠুক—স্কুলের মাস্টারমশাই আর দিদিমণিদের নিমন্ত্রণ না করলে যেন অনুষ্ঠানটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তাদের কাছে শিক্ষক শুধু সরকারি কর্মচারী নন, পরিবারেরই একজন।

স্কুলের গেটে ঢুকতেই বছর সাতেকের একটি মেয়ে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—

— দিদিমণি, তুই এসেছিস?

চাকরির প্রথম দিকে এই সম্বোধন শুনে নন্দিতার খুব অস্বস্তি হতো।

মনে হতো, এ যেন অসম্মান।

পরে ধীরে ধীরে বুঝেছিল, বিষয়টা মোটেই তা নয়।

বাংলা এই শিশুদের মাতৃভাষা নয়।

তাদের ঘরের ভাষা অলচিকি।

বাংলা তারা শেখে স্কুলে এসে।

তাই অনেক সময় সম্বোধন, উচ্চারণ কিংবা বাক্যগঠনে নিজেদের ভাষার ছাপ থেকেই যায়।

এতে অসম্মান নেই।

আছে নিজের মাটির গন্ধ।

সেই কৌতূহল থেকেই নন্দিতা একদিন ইউটিউব দেখে, বই পড়ে অলচিকি ভাষার কিছু শব্দ শেখা শুরু করেছিল।

এখন খুব সাবলীল না হলেও ছোটখাটো কথাবার্তা বলতে পারে।

ক্লাসে ঢুকতেই বছর আটেকের এক ছেলেটা উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলল—

— দিদিমণি, চেদাক কানাম?

নন্দিতা বিন্দুমাত্র দেরি না করে হেসে উত্তর দিল—

— বানুগি... আর তুই?

মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ক্লাস হাততালিতে ফেটে পড়ল।

কারও মুখে বিস্ময়, কারও চোখে আনন্দ।

একটা ছোট্ট মেয়ে খুশিতে লাফিয়ে উঠল।

— দিদিমণি আমাদের ভাষায় কথা বলতে পারে!

হাততালির শব্দ শুনে পাশের শ্রেণিকক্ষ থেকে প্রবীণ শিক্ষিকা মহুয়া দিদি দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন।

মুখে মৃদু হাসি।

— কী রে? আজ এত আনন্দ কিসের?

একটা বাচ্চা ছেলেই উত্তর দিল—

— মহুয়া দিদিমণি, নন্দিতা দিদিমণি আমাদের ভাষায় কথা বলছে!

মহুয়া দিদি অবাক হয়ে নন্দিতার দিকে তাকালেন।

— তুই আবার অলচিকি শিখলি কবে?

নন্দিতা একটু লজ্জা পেয়ে হেসে বলল—

— এখনও শিখছি দিদি। ও আমাকে বলল, "চেদাক কানাম?"—মানে, "দিদিমণি, কেমন আছেন?" আর আমি বললাম, "বানুগি"—মানে, "ভালো আছি।" এরপর ওকে জিজ্ঞেস করলাম, "আর তুই?"

পুরো ক্লাস আবার হেসে উঠল।

মহুয়া দিদি কিছুক্ষণ নন্দিতার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন—

— ভাষা শেখা খুব বড় কথা নয় নন্দিতা। কিন্তু মানুষের ভাষাকে সম্মান করতে শেখাটা বড় কথা। তুই সেটা পেরেছিস বলেই বাচ্চাগুলো তোকে এত আপন করে নিয়েছে।

নন্দিতা মৃদু হেসে মাথা নিচু করল।

তার বিশ্বাস, একজন শিক্ষক যদি ছাত্রের ভাষা, সংস্কৃতি আর মাটিকে সম্মান না করেন, তবে বইয়ের অক্ষর শেখানোটা অপূর্ণই থেকে যায়।

সে ব্ল্যাকবোর্ডে প্রথম শব্দটা লিখতে লিখতে বলল—

— আজ আমি তোমাদের বাংলা শেখাব, আর তোমরা আমাকে নতুন নতুন অলচিকি শব্দ শেখাবে। কেমন?

একসঙ্গে গোটা ক্লাস গর্জে উঠল—

— হ্যাঁ দিদিমণি!

সেই ছোট্ট উত্তরটুকুর মধ্যেই যেন সকালটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

নন্দিতার মনে হলো, শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়।

মানুষের ভাষা, মানুষের সংস্কৃতি আর মানুষের মন—এই তিনটিকেও পড়তে পারলে তবেই একজন শিক্ষক সত্যিকার অর্থে পূর্ণ হয়ে ওঠেন।

মহুয়া দিদি কিছুক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলেন।

টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই বাচ্চারা হইহই করে মাঠের দিকে ছুটে গেল।

কেউ ফুটবল নিয়ে দৌড়চ্ছে।

কেউ লুকোচুরি খেলছে।

কেউ আবার নন্দিতার হাত ধরে টানতে লাগল—

— দিদিমণি, আজ তুমি আমাদের দলে থাকবে।

নন্দিতা হেসে বলল—

— আচ্ছা, আগে টিফিনটা খেয়ে নিই। তারপর কিন্তু আমি হার মানব না।

বাচ্চারা হেসে উঠল।

এই সরল হাসিগুলোই যেন তার প্রতিদিনের ক্লান্তি মুছে দেয়।

স্টাফরুমে ফেরার পথে মহুয়া দিদি পাশে এসে হাঁটতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন—

— জানিস নন্দিতা, শিক্ষকতা শুধু একটা চাকরি নয়। এটা একটা সাধনা।

নন্দিতা মৃদু হেসে উত্তর দিল—

— সাধনা করতে গেলে সাধকেরও তো যোগ্যতা লাগে দিদি। আমি এখনও শিখছি।

মহুয়া দিদি তার দিকে তাকিয়ে স্নেহভরা গলায় বললেন—

— এই শেখার ইচ্ছেটাই তোকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। একটা কথা মনে রাখিস, শিক্ষক হয়ে জন্মেছিস যখন, চেষ্টা করিস পৃথিবীতে একটা দাগ রেখে যেতে।

নন্দিতা একটু হেসে বলল—

— দাগ রেখে যাওয়া কি এত সহজ দিদি?

মহুয়া দিদি উত্তর দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ মাঠের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

একদল বাচ্চা খালি পায়ে দৌড়চ্ছে।

কেউ হেরে গিয়ে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে।

আবার মুহূর্তের মধ্যেই হাসতে হাসতে খেলায় ফিরে যাচ্ছে।

সেদিকে তাকিয়েই মহুয়া দিদি ধীরে ধীরে বললেন—

— না, সহজ নয়। দাগ রেখে যেতে কেউ পারে না শুধু বড় বড় কথা বলে। মানুষের মনে জায়গা করে নিতে হয়। বইয়ের অঙ্ক, ইতিহাস, ব্যাকরণ—সব একদিন ঝাপসা হয়ে যায়। কিন্তু যে শিক্ষক প্রথম পড়তে শিখিয়েছিল, হাত ধরে প্রথম অক্ষর লিখিয়েছিল, তাকে মানুষ খুব সহজে ভুলে না।

একটু থেমে তিনি আবার বললেন—

— একটা পুরোনো চীনা প্রবাদ আছে— "যদি এক বছরের কথা ভাবো, শস্য বুনো। যদি দশ বছরের কথা ভাবো, গাছ লাগাও। আর যদি একশো বছরের কথা ভাবো, মানুষকে শিক্ষিত করে যাও।"

নন্দিতা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।

তার চোখ চলে গেল মাঠে খেলতে থাকা বাচ্চাগুলোর দিকে।

মৃদু হেসে সে বলল—

— আমি বড় কোনো কীর্তি রেখে যেতে চাই না দিদি। শুধু চাই, অনেক বছর পরে এদের মধ্যে কেউ যদি আমাকে দেখে বলে— "ওই যে, আমার দিদিমণি..." তাহলেই মনে হবে আমার শিক্ষকতা সার্থক হয়েছে।

মহুয়া দিদি স্নেহভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

— পারবি নন্দিতা। কারণ তুই শুধু পড়াতে আসিস না, মানুষ গড়তে আসিস। আর মানুষ গড়ার কাজের ফল সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না। অনেক বছর পরে, কোনো ছাত্র যখন সৎ মানুষ হয়ে সমাজের পাশে দাঁড়ায়, তখনই একজন শিক্ষকের আসল প্রাপ্তি হয়।

টিফিন শেষের ঘণ্টা বেজে উঠল।

বাচ্চারা দৌড়ে আবার শ্রেণিকক্ষের দিকে ফিরতে লাগল।

 মহুয়া দিদির দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল—

— জানেন দিদি, পৃথিবী আমাকে কী মনে রাখল, সেটা বড় কথা নয়। এই ছোট ছোট মনগুলো যদি একটু ভালো মানুষ হয়ে বড় হয়, তাহলেই মনে করব আমার নাম না থাকলেও আমার কাজ বেঁচে থাকবে।

মহুয়া দিদি নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন।

দু'জনে পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের দিকে হাঁটতে লাগলেন।

কিছু পেশা জীবিকা দেয়।
কিছু পেশা পরিচয় দেয়।

আর শিক্ষকতা—
নীরবে মানুষের ভেতর আরেকজন মানুষ গড়ে তোলে।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...