টাকতত্ত্ব
(একটি ব্যঙ্গ-রম্য প্রবন্ধ)
মানুষের মাথায় চুল থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু চুল কমতে শুরু করলেই সমাজের আচরণ আর স্বাভাবিক থাকে না।
পৃথিবীতে এমন কোনো সমস্যা আছে কি না জানি না, যার এত বিশেষজ্ঞ আছে। কিন্তু টাক? আহা! এ বিষয়ে সবাই ডক্টরেট করে বসে আছেন।
বাড়ির কাকিমা বলবেন, "নারকেল তেল গরম করে লাগাও।"
পাশের বাড়ির কাকু বলবেন, "না না, পেঁয়াজের রসই আসল ওষুধ।"
অফিসের সহকর্মী বলবেন, "একটা নতুন তেল এসেছে, এক মাসে জঙ্গল হয়ে যাবে!"
শুধু সেই জঙ্গলটা আজ পর্যন্ত কেউ চোখে দেখেনি।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, বহুদিন পরে কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হলে তিনি জিজ্ঞেস করবেন না—
প্রথম প্রশ্ন
"আরে! চুলগুলো গেল কোথায়?"
মনে হয়, মাথার চুল হারিয়ে যাওয়া জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় উঠে গেছে।
টাক নিয়ে সমাজের কৌতূহল এমন পর্যায়ে যে, মানুষ আপনার চাকরি, বেতন, স্বাস্থ্য—এসব নিয়ে যতটা না ভাবে, তার চেয়ে বেশি ভাবে আপনার মাথা নিয়ে।
আর সমাজের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে—মানুষের আসল নাম যেন কেউ মনে রাখতেই চায় না। তার বদলে একটা বিশেষণ জুড়ে দিলেই পরিচয় সম্পূর্ণ।
"ওই যে টেকো সঞ্জীব।"
"টাক মাথা বড়বাবুর ঘরে যাও।"
"ওই যে অফিসে যে টাকওয়ালা স্যার বসে আছেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করুন।"
মনে হয়, মানুষটা আর মানুষ নন, তিনি যেন একটি হাঁটাচলা করা টাক!
ভাবুন তো, কেউ কি বলে—
"ওই যে ঘন চুলওয়ালা অরুণ?"
অথবা—
"ওই যে কোঁকড়া চুলের সমীর?"
না। কারণ সমাজের অভিধানে বিশেষণ লাগে শুধু তখনই, যখন একটু খোঁচা দেওয়ার সুযোগ থাকে।
তবে এখানেই শেষ নয়।
সমাজে আবার একদল স্বঘোষিত অর্থনীতিবিদ আছেন। তাঁদের যুগান্তকারী গবেষণার বিষয়—
যুগান্তকারী গবেষণা
"টাক থাকলেই টাকা থাকে!"
কেউ মাথার দিকে তাকিয়ে বলবেন—
"দেখেছিস? মাথায় চুল নেই মানেই লোকটার অনেক টাকা!"
আমি আজও বুঝলাম না, ব্যাংকের পাসবই আর মাথার চুলের মধ্যে সম্পর্কটা কোথায়!
তা হলে তো পৃথিবীর সব টাকওয়ালা মানুষই কোটিপতি হওয়ার কথা!
আর যাঁদের মাথায় ঘন চুল, তাঁরা সবাই দেউলিয়া!
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যাঁরা এই তত্ত্ব দেন, তাঁদের বেশিরভাগেরই মাথায় প্রচুর চুল। অর্থাৎ তাঁরা নিজেরাই নিজেদের গবেষণাকে ভুল প্রমাণ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
টাক নিয়ে আর-একটি জায়গায় বড় নাটক দেখা যায়—বিয়ের বাজারে।
পাত্রীপক্ষের প্রথম প্রশ্ন—
"ছেলের চাকরি কী?"
দ্বিতীয় প্রশ্ন—
"নিজের বাড়ি আছে?"
তারপরই ফিসফিসিয়ে—
"চুল কেমন?"
যদি শোনা যায়, ছেলের মাথার সামনে একটু ফাঁকা, তাহলে মেয়ের মুখ ভার।
মনে হয়, বিয়েটা ছেলের সঙ্গে নয়, ছেলের চুলের সঙ্গে হবে।
আমি আজও বুঝলাম না, সংসারটা কে করবে?
ছেলেটা, না তার চুল?
চুল যদি এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তা হলে বরের পাশে একটা শ্যাম্পুর বোতলকেই বসিয়ে দিলেই তো হয়!
আবার বিয়ের কয়েক বছর পর দেখা যায়, সেই ঘন চুলওয়ালা স্বামীর মাথাতেও টাকের রাজত্ব শুরু হয়েছে। তখন আর বিয়ে ফেরত দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই!
টাকওয়ালা মানুষদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তাঁদের অনুমতি ছাড়াই সবাই তাঁদের মাথা নিয়ে আলোচনা শুরু করে দেন।
যেন মাথাটা তাঁর নিজের নয়, পৌরসভার সম্পত্তি।
এরই মধ্যে একদিন পাশের বাড়ির এক কমবয়সি ছেলেকে দেখি মাথায় কাঁচা ডিম মেখে দিব্যি বারান্দায় বসে আছে। দূর থেকে দেখে প্রথমে ভাবলাম, বুঝি নতুন কোনো সৌন্দর্যচর্চা শুরু হয়েছে।
কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম,
"কী ব্যাপার, মাথায় ডিম কেন?"
"শুনেছি টাকের নাকি দারুণ ওষুধ!"
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর মনে মনে ভাবলাম—ডিম আর চুলের সম্পর্কটা ঠিক কোথায়?
ডিম থেকে মুরগি বেরোয়, সেটা জানতাম। কিন্তু ডিম থেকে চুলও বেরোয়—এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আমার জানা ছিল না!
তবে আমাদের সমাজে টাকের ওষুধ নিয়ে এমন সব গবেষণা হয় যে, আর দু'দিন পর হয়তো কেউ বলবে—মাথায় অমলেট বেঁধে ঘুমোলে সকালে ঘন চুল নিয়ে ঘুম ভাঙবে!
শেষ উপলব্ধি
একদিন এক টাকওয়ালা ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম—
"আপনার টাক নিয়ে খারাপ লাগে না?"
তিনি হেসে বললেন—
"আগে লাগত। এখন বুঝেছি, মাথাটা তাঁর, অথচ চিন্তাটা পুরো পাড়ার!"
কথাটা শুনে মনে হলো, লোকটা শুধু টাক নয়, জীবনও বুঝেছেন।
আসলে টাক মাথায় হয়, মনে নয়।
চুল থাকলেই মানুষ ভালো হয় না, আর চুল না থাকলেই মানুষ খারাপ হয়ে যায় না।
তবু সমাজের গবেষণা থামে না।
আজও কেউ না কেউ এসে বলবেন—
"একটা দারুণ তেলের নাম বলি?"
আমি এখন আর না করি না।
শুধু হেসে বলি—
শেষ পর্যন্ত বুঝলাম, পৃথিবীতে টাকের সমস্যা যতটা না বড়, তার চেয়ে বড় সমস্যা হলো—টাক দেখলেই বিনা আমন্ত্রণে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠা মানুষগুলো।
চুল পড়ে যাওয়া কোনো মানুষের পরিচয় নয়; অথচ সমাজ সেটাকেই পরিচয় বানিয়ে ফেলেছে।
উপসংহার
তাই আমার বিনীত প্রস্তাব—মানুষকে তার মাথার চুল দিয়ে নয়, মাথার ভেতরের মানুষটাকে দেখে বিচার করুন। কারণ চুল একদিন না একদিন পড়বেই, কিন্তু সুন্দর চরিত্র পড়ে গেলে তার আর কোনো তেল নেই।

Comments
Post a Comment