Skip to main content

ভুল বোঝাবুঝি

অধ্যায়–৬

ভুল বোঝাবুঝি

ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে একবার চোখাচোখি হয়েছিল নন্দিতা আর অর্ণিবানের।

কেউ কিছু বলেনি।

শুধু দু'জনেই মৃদু হেসেছিল।

সেই হাসিতে সংকোচ ছিল, নতুন পরিচয়ের মৃদু উষ্ণতা ছিল, আর ছিল অজান্তেই জন্ম নিতে থাকা একটুখানি ভালো লাগা।

গত কয়েকদিনে চায়ের দোকানে দু-একবার কথাও হয়েছে।

প্রথম পরিচয় অবশ্য করিয়ে দিয়েছিলেন গোপাল কাকু।

মাঝে মাঝে অর্ণিবানের মনে হয়, বুড়ো মানুষটা যেন দু'জনের মনের কথাই আগেই বুঝে ফেলেছিলেন।

আজ ট্রেনে ভিড়টা একটু বেশি।

নন্দিতা উঠেছে পাশের কামরায়।

অর্ণিবান দাঁড়িয়ে আছে নিজের কামরার দরজার কাছে।

ট্রেন একটা স্টেশনে থামতেই হুড়োহুড়ি করে অনেক যাত্রী একসঙ্গে উঠে পড়ল।

মুহূর্তের মধ্যে শুরু হলো ধাক্কাধাক্কি।

কেউ ভেতরে ঢুকতে চাইছে, কেউ নামতে চাইছে।

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন জোরে ধাক্কা দিল।

অর্ণিবান নিজের ভারসাম্য রাখতে পারল না।

এক ঝটকায় সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।

ঠিক সামনে জানালার ধারে বসেছিলেন এক তরুণী।

এক মুহূর্তের জন্য অর্ণিবানের শরীর প্রায় তাঁর গায়ের ওপর গিয়ে পড়ল।

ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে কেউ প্রস্তুত হওয়ার সুযোগই পেল না।

তরুণী চমকে উঠে আতঙ্কিত গলায় বলে উঠলেন—

— এ কী অসভ্যতা!

অর্ণিবান যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো সরে দাঁড়াল।

মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

কাঁপা গলায় বলল—

— বিশ্বাস করুন... আমি ইচ্ছে করে করিনি...

কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই চারদিক থেকে নানা গলা ভেসে এল।

— এইসব ছেলেদের জন্যই মেয়েদের ট্রেনে ওঠা মুশকিল!

— পুলিশে দাও!

— দু-চার ঘা দিলেই ঠিক হয়ে যাবে!

মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠল।

অর্ণিবান নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার ভাষাটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে।

ঠিক তখনই এক বৃদ্ধ আসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

গম্ভীর গলায় বললেন—

— সবাই একটু থামুন!

চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

বৃদ্ধ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—

— আমি নিজের চোখে দেখেছি। ছেলেটার কোনো দোষ নেই। পেছন থেকে ধাক্কা মেরে ওকে ফেলে দিয়েছে।

বৃদ্ধের কথার সঙ্গে সঙ্গে আরও দু-একজন যাত্রীও এগিয়ে এলেন।

তাঁরাও বললেন—

— হ্যাঁ, আমরা দেখেছি। ছেলেটা ইচ্ছে করে কিছু করেনি।

ধীরে ধীরে উত্তেজনা কমে এল।

তরুণীও আর কিছু বললেন না।

অর্ণিবান মাথা নিচু করে ভিড় ঠেলে কামরার এক কোণে গিয়ে বসে পড়ল।

ট্রেন আবার ছুটতে শুরু করল।

বাইরে সবকিছু স্বাভাবিক।

কিন্তু অর্ণিবানের ভেতরে যেন একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎই তার মনে পড়ল—

নন্দিতা তো পাশের কামরায়।

গোলমালের শব্দ নিশ্চয়ই ওর কানে গেছে।

হয়তো ও কিছুই দেখেনি।

হয়তো আবার...

শুধু সেই এক মুহূর্তটাই দেখেছে।

ভাবনাটা মাথায় আসতেই অর্ণিবানের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

জানলার বাইরে তাকিয়ে সে শুধু মনে মনে বলল—

"যে মানুষটার সামনে নিজেকে ভালো রাখতে চাই, যদি সেও আজ আমাকে ভুল বোঝে?"

ট্রেন ছুটে চলল নিজের গতিতে।

কিন্তু অর্ণিবানের মনে হলো—

মানুষের জীবনে সবচেয়ে কঠিন পথটা কখনও রেললাইন নয়...

বরং একজন মানুষের বিশ্বাস পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার পথ।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...
🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান, আর প্রতিদিনের নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফিস শু...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...