Skip to main content

আমারও পরানো যাহা চায়


ষষ্ঠ অধ্যায় : 

মাসের ক্যালেন্ডারে অতিরিক্ত একটি ছুটি দেখে নন্দিতা ভেবেছিল, আজ হয়তো একটু নিশ্চিন্তে থাকা যাবে।

আজ তাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস

সেই উপলক্ষে স্কুল বন্ধ।

প্রতিদিনের মতো ভোরবেলা বেরোতে হবে না ভেবে আগের রাতে বেশ নিশ্চিন্ত মনেই ঘুমিয়েছিল সে।

কিন্তু ছুটির দিনের সকালটা অন্যরকম হয়ে উঠল।

ঘুম ভাঙল চিৎকার আর তর্কের শব্দে।

দাদা আর বৌদির ঝগড়া।

ছোট্ট ঈশানের জন্য বাজার থেকে যে ফল আর খাবার আনা হয়েছিল, সেগুলোর কয়েকটা ঠিকমতো পাকা ছিল না।

সেই সামান্য বিষয় নিয়েই শুরু হয়েছে তুমুল অশান্তি।

বৌদির গলায় অভিমান।

— একটা ছোট্ট বাচ্চার জন্য জিনিস আনতে বললেও তোমার একটু খেয়াল থাকে না?

দাদাও চুপ করে থাকার মানুষ নয়।

— যা পেয়েছি, তাই এনেছি। সবকিছু কি আমার হাতে থাকে?

কথার পর কথা বাড়তেই লাগল।

নন্দিতা বিছানা থেকে উঠে দরজার ফাঁক দিয়ে একবার তাকাল।

তারপর আবার নিঃশব্দে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল।

এই দৃশ্য তার কাছে নতুন নয়।

ছোটবেলা থেকেই সংসারের নানা টানাপোড়েন, অভাব, অভিমান আর ঝগড়া দেখে বড় হয়েছে সে।

দাম্পত্য জীবনে মতের অমিল হয়তো খুব অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু যখন সেই অশান্তি প্রায় প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে যায়, তখন বাড়ির দেওয়ালও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

একসময় নন্দিতা এসব থামানোর চেষ্টা করত।

এখন আর করে না।

সে জানে, সব ঝগড়ার বিচারক হওয়া যায় না।

কিছু কিছু অশান্তি সময়ই মিটিয়ে দেয়।

ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে ছোট্ট ঈশানের কান্নার শব্দ ভেসে এল।

চিৎকারে ভয় পেয়ে ঘুম ভেঙে গেছে তার।

নন্দিতা আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।

দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে সে ঈশানের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

ঈশান দু'হাত বাড়িয়ে নন্দিতার কোলে উঠে এল।

চোখে এখনও ঘুমের ছাপ, মুখে ভয়ের রেখা।

পিমি...

নন্দিতা ওকে বুকে জড়িয়ে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

চল, আমরা ছাদে যাই। পাখিদের দেখি।

ঈশান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

সিঁড়ি বেয়ে দু'জনে ছাদে উঠে এল।

সকালের রোদ তখন ধীরে ধীরে উঠছে।

হালকা বাতাস বইছে।

দূরে কয়েকটা শালিক উড়ে বেড়াচ্ছে।

ঈশান আঙুল তুলে চিৎকার করে উঠল—

পিমি... পাখি!

নন্দিতা হেসে বলল—

হ্যাঁ সোনা, ও পাখি। আর ওদিকে দেখ, কাক উড়ছে।

মুহূর্তের মধ্যেই ঈশানের ভয় কেটে গেল।

সে কখনও আকাশ দেখছে, কখনও পাশের বাড়ির ছাদে বসে থাকা বিড়াল।

হঠাৎ একটা কেন্নোকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—

পিমি... এটা কী?

নন্দিতা হেসে ফেলল।

এই ছোট্ট ছেলেটার কৌতূহলের যেন শেষ নেই।

সবকিছুই তার কাছে নতুন।

সবকিছুর উত্তর জানতে হবে।

ঈশানের সঙ্গে গল্প করতে করতেই নন্দিতার চোখ চলে গেল বাড়িটার দিকে।

বাড়িটা অনেক পুরোনো।

তবু এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

এই বাড়িটা তৈরি করেছিলেন তার ঠাকুরদা।

স্বপ্ন ছিল, ছেলে-নাতি সবাই একসঙ্গে থাকবে।

এক উঠোনে হাসি-কান্না ভাগ করে নেবে।

দুর্গাপুজো, কালীপুজো, বিয়ে, অন্নপ্রাশন—সব হবে এই বাড়িকে কেন্দ্র করে।

একসময় সত্যিই তাই ছিল।

জেঠু, কাকারা, তাঁদের সন্তানরা—

সারা বাড়ি মানুষে মানুষে ভরে থাকত।

উঠোনে বিকেলবেলা ছেলেমেয়েদের দৌড়ঝাঁপে মুখর থাকত চারদিক।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছবিটা বদলে গেল।

কারও চাকরি হলো অন্য শহরে।

কেউ ব্যবসার কারণে অন্যত্র চলে গেল।

কেউ আবার নিজের আলাদা সংসার গড়ে নিল।

আজ সেই বড় বাড়িতে মানুষ কম।

অনেক ঘর দিনের বেশির ভাগ সময় বন্ধই পড়ে থাকে।

দেওয়ালের কোথাও কোথাও চুন খসে পড়েছে।

ফাটল ধরেছে পুরোনো ইটের গায়ে।

নন্দিতার মাঝে মাঝে মনে হয়—

বাড়ির দেওয়ালে যে ফাটলগুলো দেখা যায়,
সেগুলো শুধু ইট-সিমেন্টের নয়;
সময়েরও, সম্পর্কেরও।

ঈশান আবার তার আঁচল টেনে বলল—

পিমি... নিচে ?

নন্দিতা মুচকি হেসে তাকে কোলে তুলে নিল।

নিচে নামার আগে একবার আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে হলো—

কিছু বাড়ি শুধু মানুষকে আশ্রয় দেয় না, তাদের স্মৃতিকেও বাঁচিয়ে রাখে।

ঈশানকে নিয়ে নন্দিতা নিচে নেমে এল।

ঘরের ভেতরটা এখন অনেকটাই শান্ত।

ঝগড়া থেমে গেছে।

কিন্তু অশান্তির রেশটা যেন এখনও বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।

নন্দিতা এসব নিয়ে কোনো মন্তব্য করল না।

সে অনেক আগেই শিখে গেছে—

সব সত্যি কথা বললেই সংসার ভালো থাকে না,
অনেক সময় চুপ করে থাকাটাও দায়িত্বের অংশ।

এই সংসারের হিসাব-নিকাশ সে খুব ভালো করেই জানে।

তার বাবা মানুষ হিসেবে অত্যন্ত সৎ, কিন্তু সংসারের ব্যাপারে কখনও খুব দূরদর্শী ছিলেন না।

যা রোজগার হয়েছে, তা দিয়ে সংসার চলেছে।

আগামী দিনের কথা ভেবে সঞ্চয় করার অভ্যাসটা কোনোদিনই গড়ে ওঠেনি।

পৈতৃক সম্পত্তিতে যে অংশটুকু পেয়েছিলেন, প্রয়োজনের তাগিদে একে একে তারও অনেকটাই বিক্রি হয়ে গেছে।

নন্দিতা কখনও বাবাকে দোষ দেয় না।

শুধু মাঝে মাঝে ভাবে—

সংসার শুধু আজকে নিয়ে চলে না,
আগামীকালকেও সঙ্গে নিয়ে চলতে হয়।

তার দাদাও অনেক স্বপ্ন দেখে।

কখনও নতুন ব্যবসা, কখনও নতুন পরিকল্পনা।

উদ্যমের কোনো অভাব নেই।

কিন্তু সেই উদ্যমটাকে দীর্ঘদিন ধরে ধরে রাখার ধৈর্য যেন কোথাও গিয়ে হারিয়ে যায়।

এখন বাড়ির সামনেই ছোট্ট একটা মুদিখানার দোকান চালায়।

মোটামুটি চলে।

সংসারও কোনোমতে এগিয়ে যায়।

দোকানটা শুরু করার সময় কিছু টাকার দরকার হয়েছিল।

ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিল নন্দিতা।

দোকানটা যেন দাঁড়িয়ে যায়, সেই আশাতেই।

ঋণের কাগজে তারই নাম।

প্রতি মাসে কিস্তির টাকাটাও সে-ই দেয়।

এসব কথা বাড়িতে কেউ বলে না।

নন্দিতাও কাউকে মনে করিয়ে দেয় না।

সে জানে—

সংসারে কিছু হিসাব খাতায় লেখা থাকে।

আর কিছু হিসাব শুধু মানুষ নিজের মনেই রেখে দেয়।

দাদা হয়তো সবসময় প্রকাশ করতে পারে না, তবু নন্দিতা জানে—সংসারের জন্য তারও চিন্তা আছে।

তাই কাউকে ছোট না করে, কাউকে দোষ না দিয়েই সে নিজের দায়িত্বটুকু পালন করে যায়।

হয়তো এটাই তার স্বভাব।

সব বুঝেও, অনেক সময় না-বোঝার মতো করে থাকা।

ঠিক তখনই ভেতরের ঘর থেকে দিদির ডাক ভেসে এল—

নন্দু... একবার এদিকে আয় তো।

নন্দিতা ঈশানের হাতটা ধরে ধীরে ধীরে দিদির ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

ঈশানের ছোট্ট হাতটা ধরে নন্দিতা দিদির ঘরে ঢুকল।

জানালার পাশে খাটে আধশোয়া হয়ে বসে ছিল দিদি।

মুখে মাতৃত্বের কোমল আভা, কিন্তু চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপও স্পষ্ট।

প্রথম সন্তান হওয়ার সময় গ্রামে এখনও একটা রীতি অনেক বাড়িতেই মানা হয়।

মেয়েরা সন্তানসম্ভবা হলে কিছুদিনের জন্য বাপের বাড়িতে চলে আসে।

দিদিও সেই নিয়মেই কয়েক সপ্তাহ আগে এই বাড়িতে এসেছে।

নন্দিতাকে দেখেই মুচকি হেসে বলল—

কোথায় ছিলি এতক্ষণ?

নন্দিতা ঈশানকে পাশে বসিয়ে হেসে বলল—

এই বাবুসোনাকে নিয়ে ছাদে গিয়েছিলাম। নিচে তো যুদ্ধ লেগেছিল!

দিদি হালকা হেসে আবার চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পরে খুব আস্তে বলল—

জানিস, মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে। এই সময়ে এসে তোদের কতটা অসুবিধা হচ্ছে...

নন্দিতা সঙ্গে সঙ্গে কথাটা কেটে দিল।

এইসব আবার বলছিস কেন? নিজের বাড়িতে এসে কেউ অসুবিধা করে নাকি?

দিদি কিছু বলল না।

শুধু মৃদু হেসে নন্দিতার দিকে তাকিয়ে রইল।

নন্দিতা জানে, দিদি সব বোঝে।

এই সংসারের টানাপোড়েনও বোঝে।

কে কতটা চুপচাপ দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে চলছে, সেটাও বোঝে।

তাই দিদির সামনে নন্দিতা কখনও সংসারের কোনো হিসাবের কথা তোলে না।

সবসময় গল্প করে।

হাসায়।

যেন এই কয়েকটা দিন দিদির মনে কোনো দুশ্চিন্তা না থাকে।

পরিবেশটা হালকা করার জন্য নন্দিতা হঠাৎ দিদির পেটের দিকে তাকিয়ে বলল—

আচ্ছা বল তো, এবার বুনপো হবে, না বুনঝি?

দিদি হেসে ফেলল।

যেটাই হোক, সুস্থ হলেই হলো।

নন্দিতা ভান করে মুখ গম্ভীর করল।

না না, এভাবে হবে না। আগে ঠিক কর। বুনপো হলে আমি ফুটবল শেখাব। আর বুনঝি হলে প্রথমেই গান শেখাব।

ঈশান কিছুই না বুঝে হাততালি দিয়ে বলে উঠল—

বুনপো!

দুই বোন একসঙ্গে হেসে উঠল।

কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন সকালের সব অশান্তি কোথায় মিলিয়ে গেল।

সংসারে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে—

যেখানে বড় সুখের দরকার হয় না,
আপন মানুষগুলোর একফোঁটা হাসিই যথেষ্ট।

দিদির ঘর থেকে বেরিয়ে নন্দিতা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

মা চুপচাপ বসে শাক কুটছিলেন।

মেয়ের দিকে একবার তাকিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিলেন।

কিছু বললেন না।

কিন্তু মায়েরা অনেক কথাই না বলেও বলে ফেলেন।

সকালের ঝগড়া, সংসারের টানাপোড়েন, দাদার ব্যবসা, ঋণের কিস্তি—সবকিছুর মাঝেও নন্দিতা যেন কোনো অভিযোগ ছাড়াই হাসিমুখে সবাইকে আগলে রাখে।

মা সবই দেখেন।

সবই বোঝেন।

শুধু মুখে কিছু বলেন না।

নন্দিতা যখন ঈশানকে নিয়ে আবার উঠোনে খেলতে বেরিয়ে গেল, মা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর খুব আস্তে, যেন নিজের মনেই বললেন—

"ভগবান, আমার মেয়েটার জীবনে যেন একটু সুখ লিখে রেখো।

যে মেয়েটা নিজের কথা না ভেবে সারাক্ষণ অন্যের কথা ভাবে, তার কপালটা যেন খালি না থাকে।

ওর জন্য এমন একজন মানুষ রেখো, যে ওর মনটাকে বুঝবে। শুধু স্বামী নয়, ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু হবে।

সংসারটা যেন ও একা টেনে না নিয়ে যেতে হয়।"

চোখের কোণে জল এসে গিয়েছিল।

মা চুপচাপ আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে আবার রান্নাঘরের কাজে ফিরে গেলেন।

সব প্রার্থনা উচ্চস্বরে করা হয় না।
কিছু প্রার্থনা শুধু একজন মায়ের নীরব চোখেই লেখা থাকে।

বিকেলের দিকে নন্দিতা বারান্দায় বসে ঈশানকে নিয়ে খেলছিল।

দুপুরের অশান্তিটা অনেকটাই থেমে গেছে।

উঠোনে যেন আবার আগের মতো নীরবতা নেমে এসেছে।

ঠিক তখনই তার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি পরিচিত নাম—

🌼 ফুলদিদি

নন্দিতা তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরল।

হ্যালো দিদি...

কিরে, আজ আসছিস তো? সবাই কিন্তু এসে গেছে। তোকে ছাড়া রিহার্সাল জমছে না।

হ্যাঁ দিদি, বেরোচ্ছি। আর দশ-পনেরো মিনিট লাগবে।

আয়, তাড়াতাড়ি আয়। আজ কিন্তু নতুন গানটা ধরব।

ফোনটা কেটে যেতেই নন্দিতার মুখে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল।

সামনেই পঁচিশে বৈশাখ।

কয়েকদিন ধরেই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে।

আজও সন্ধ্যার মহড়া।

ঘরে ঢুকে আলমারি খুলল সে।

খুব সাধারণ একটা সাদা-নীল সুতির শাড়ি বের করল।

চুলগুলো পরিপাটি করে বেঁধে ছোট্ট একটা টিপ পরল।

আয়নায় একবার নিজেকে দেখে মৃদু হেসে ফেলল।

বেরোনোর সময় ঈশান দৌড়ে এসে তার আঁচল ধরে ফেলল।

পিমি... কোথায় ?

নন্দিতা হাঁটু গেড়ে বসে তার গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।

গান শিখতে যাচ্ছি সোনা। ফিরে এসে তোকে গান শোনাব।

ঈশান খুশি হয়ে হাততালি দিল।

পিমি... গান!

মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বললেন—

সাবধানে যাস মা। ফিরতে রাত হবে।

নন্দিতা শুধু মাথা নাড়ল।

উঠোনের এক কোণে রাখা সাইকেলটার তালা খুলতে খুলতে তার মনে হলো—

জীবনের যত ব্যস্ততাই থাকুক,
গানই যেন তাকে বারবার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে।

ফুলদিদির আসল নাম ফুলমালা চক্রবর্তী

জেলার স্বনির্ভর গোষ্ঠী (Self Help Group)-এর একজন সরকারি আধিকারিক।

বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।

সারা জীবন নিজের কাজ আর গান নিয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন।

বিয়ে করার সুযোগ যে আসেনি, তা নয়।

কিন্তু জীবনের কোনো এক মোড়ে তিনি সংসারের পথ ছেড়ে অন্য এক পথ বেছে নিয়েছিলেন।

গানই হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে বড় সঙ্গী।

সরকারি দায়িত্বের ব্যস্ততার মধ্যেও ছুটির দিনগুলো তিনি নিজের জন্য রাখেন না।

নিজের বাড়িতেই ছোট্ট করে গানের আসর বসান।

কোনো পারিশ্রমিক নেন না।

তবে সবাইকে শেখানও না।

যাদের মধ্যে সত্যিই শেখার আগ্রহ, নিষ্ঠা আর সুরের প্রতি শ্রদ্ধা দেখেন, শুধু তাদেরই আপন করে নেন।

নন্দিতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় আজকের নয়।

তখন নন্দিতা অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী।

সরকারি একটি সাংস্কৃতিক সচেতনতা কর্মসূচির জন্য ফুলদিদি নন্দিতাদের স্কুলে গিয়েছিলেন।

অনুষ্ঠান প্রায় শেষ।

ঠিক তখনই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেছিলেন—

ম্যাডাম, আমাদের স্কুলের একটা মেয়ে খুব সুন্দর গান গায়। যদি একটু শুনতেন...

ফুলদিদি মৃদু হেসে সম্মতি দিয়েছিলেন।

লাজুক মুখে মঞ্চে উঠেছিল নন্দিতা।

হারমোনিয়াম ছাড়াই গাইতে শুরু করেছিল রবীন্দ্রনাথের গান।

"আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে,
দেখতে আমি পাইনি..."

গান শেষ হওয়ার পর কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলেনি।

ফুলদিদি শুধু চুপচাপ নন্দিতার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

তারপর কাছে ডেকে খুব শান্ত গলায় বলেছিলেন—

— তোর গলায় মাটির গন্ধ আছে। এই গলা শেখানো যায় না, এটা ঈশ্বরের আশীর্বাদ। যদি সত্যিই গানকে ভালোবাসিস, তাহলে আমার কাছে চলে আয়। আমি তোকে গান শেখাব।

নন্দিতা লাজুক মুখে শুধু মাথা নেড়েছিল।

সেদিনই ফুলদিদি তার বাড়ির ঠিকানা আর ফোন নম্বর লিখে দিয়েছিলেন।

সেই কথাগুলো আজও নন্দিতার কানে বাজে।

তারপর থেকেই সুযোগ পেলেই সে ফুলদিদির কাছে গান শিখতে যায়।

ফুলদিদিও তাকে শুধু ছাত্রী বলে দেখেন না।

নিজের ছোট বোনের মতোই স্নেহ করেন।

জীবনে যদি একজন সত্যিকারের শিক্ষক পাওয়া যায়,
তবে অনেক পথই একটু সহজ হয়ে যায়।

বাড়ির উঠোন থেকে সাইকেলটা বের করতে করতে নন্দিতা একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

অনেক দিনের একটা ছোট্ট স্বপ্ন—

একটা ইলেকট্রিক স্কুটি কিনবে।

খুব দামী কিছু নয়।

শুধু এমন একটা বাহন, যেটা প্রতিদিনের দীর্ঘ পথটাকে একটু সহজ করে দেবে।

কিন্তু স্বপ্ন থাকলেই তো সব স্বপ্ন পূরণ হয় না।

মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনটা অনেকটা হিসেবের খাতার মতো।

মাসের শেষে নিজের ইচ্ছেগুলোর আগে জায়গা করে নেয় সংসারের প্রয়োজন।

কখনও ঋণের কিস্তি, কখনও বাড়ির খরচ, কখনও আবার প্রিয় মানুষের কোনো দরকার।

তাই অনেক স্বপ্ন বছরের পর বছর শুধু মনের এক কোণে অপেক্ষা করেই থাকে।

হয়তো কোনোদিন পূরণ হয়, হয়তো আর কোনোদিনই হয় না।

তবু মানুষ স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে না।

কারণ মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে
স্বপ্নই সবচেয়ে বড় পুঁজি।
সব স্বপ্ন পূরণ না হলেও,
সেই স্বপ্নগুলোই প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার সাহস দেয়,
কাজ করার উৎসাহ দেয়,
আর আগামীকালের দিকে হাঁটতে শেখায়।


সাইকেলের ঘণ্টিটা আলতো করে বাজিয়ে নন্দিতা রওনা দিল।

মফস্বলের বিকেল তখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে এগোচ্ছে।

রাস্তার ধারে কচিকাঁচারা খেলছে।

চায়ের দোকানে আড্ডা জমে উঠেছে।

কোথাও ভাজা বেগুনির গন্ধ, কোথাও আবার গরম চায়ের ধোঁয়া।

দূরে মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এল।

আর অন্য প্রান্তে মন্দিরের ঘণ্টা।

ছোট্ট শহরটা যেন প্রতিদিনের মতোই নিজের ছন্দে সন্ধ্যাকে বরণ করে নিচ্ছে।

নন্দিতা ধীরে ধীরে প্যাডেল ঘুরিয়ে এগিয়ে চলল।

জীবনের পথও বোধহয় এমনই।
গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া থাকে,
তবু মাঝের পথটুকুই অজান্তে গল্প হয়ে যায়।

ফুলদিদির বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

উঠোন জুড়ে নরম আলো।

দরজার সামনে রাখা শিউলি আর জবা গাছের টবগুলো হালকা বাতাসে দুলছে।

বাড়িটা খুব বড় নয়।

কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব হয়।

যেন এই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে সুর লেগে আছে।

বৈঠকখানায় ইতিমধ্যেই গানের আসর বসেছে।

মেঝেতে শতরঞ্চি পেতে সবাই গোল হয়ে বসে আছে।

মাঝখানে হারমোনিয়াম।

পাশে তবলা।

কেউ সুর মিলিয়ে নিচ্ছে, কেউ গানের খাতা উল্টে দেখছে।

নন্দিতা ঘরে ঢুকতেই ফুলদিদি মুখ তুলে তাকালেন।

এসেছিস? আয়, তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

নন্দিতা প্রণাম করতেই ফুলদিদি স্নেহভরে মাথায় হাত রাখলেন।

আজ কিন্তু ফাঁকি চলবে না। যে গানটা ধরেছি, সেটা তোকে গাইতেই হবে।

নন্দিতা হেসে চুপচাপ গিয়ে সবার পাশে বসে পড়ল।

তার ঢুকতেই যেন ঘরটার প্রাণ আরও একটু বেড়ে গেল।

কারও সঙ্গে চোখাচোখি হতেই হাসি।

কেউ জায়গা করে দিল।

কেউ আবার মজা করে বলল—

এবার শুরু হোক। নন্দিতা না এলে ফুলদিদিও গান ধরেন না।

সবাই হেসে উঠল।

ফুলদিদিও মৃদু হেসে হারমোনিয়ামের ঢাকনা খুললেন।

ধীরে ধীরে সুর ভেসে উঠল ঘরের ভেতর।

প্রথমে স্বরাভ্যাস।

তারপর একে একে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মহড়া।

সামনে পঁচিশে বৈশাখ।

তাই আজ সবাই একটু বেশি মন দিয়ে গাইছে।

ভুল হলে ফুলদিদি থামিয়ে দিচ্ছেন।

আবার ধৈর্য ধরে বুঝিয়েও দিচ্ছেন।

তাঁর কাছে গান মানে শুধু সুর নয়—

গান মানে অনুভব,
গান মানে শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা জীবনকে খুঁজে পাওয়া।

একের পর এক গান চলতে লাগল।

কখনও সমবেত কণ্ঠে, কখনও এককভাবে।

ফুলদিদি মাঝেমধ্যেই হারমোনিয়াম থামিয়ে দিতেন।

শুধু গলায় গান গাইলে হবে না। আগে কথাগুলো অনুভব করো। রবীন্দ্রনাথকে না বুঝে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া যায় না।

সবাই মন দিয়ে শুনছিল।

আবার কয়েক মিনিট পরেই হাসির রোল উঠছিল।

একজন ভুল সুর ধরতেই পাশ থেকে আর একজন মজা করে বলল—

ওই সুরটা রবীন্দ্রনাথও চিনতে পারতেন না!

ঘর ভরে উঠল হাসিতে।

ফুলদিদিও হেসে ফেললেন।

হাসাহাসি পরে হবে। আগে আবার শুরু করো।

মহড়া শেষ হতে হতে কখন যে রাত নেমে এসেছে, কেউ খেয়ালই করেনি।

ঠিক তখনই ফুলদিদি ভেতরের ঘর থেকে ডাক দিলেন—

এই, সবাই উঠে পড়ো। আগে কিছু খেয়ে নাও, তারপর যে যার বাড়ি যাবে।

ডাইনিং ঘরের বড় টেবিলটায় ইতিমধ্যেই খাবার সাজানো।

গরম লুচি।

আলুর দম।

সঙ্গে মিষ্টি আর চা।

সবাই মিলে বসে খেতে খেতে আবার শুরু হলো গল্প।

কেউ অফিসের কথা বলছে।

কেউ স্কুলের।

কেউ আবার আগামী অনুষ্ঠানের পোশাক নিয়ে ব্যস্ত।

ফুলদিদি সবার প্লেটে বারবার খাবার তুলে দিচ্ছেন।

এত কম খেলে গান গাইবি কী দিয়ে? আর একটা লুচি নে।

নন্দিতা হেসে বলল—

দিদি, আর পারব না।
সবাই এই কথাই বলে। তারপর আবার দ্বিতীয়বার নেয়!

আবারও হাসিতে ভরে উঠল ঘর।

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত আটটা ছুঁইছুঁই।

সবাই একে একে ফুলদিদির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।

নন্দিতাও প্রণাম করে সাইকেলটা বের করল।

সাবধানে যাস । বাড়ি পৌঁছে একটা ফোন করে দিবি।

নন্দিতা মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।

সাইকেলের ঘণ্টিটা একবার টুং করে বেজে উঠল।

তারপর ধীরে ধীরে সে রাতের আলোয় ভেসে থাকা মফস্বলের রাস্তায় এগিয়ে চলল।

রাত তখন প্রায় আটটা পেরিয়ে গেছে।

ফুলদিদির বাড়ি থেকে বেরিয়ে নন্দিতা ধীরে ধীরে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিল।

মফস্বল শহরটা যেন অন্য এক রূপ নিয়েছে।

দিনের ব্যস্ততা অনেকটাই থেমে গেছে।

রাস্তার দু'ধারে সারি সারি স্ট্রিট লাইট নরম হলুদ আলো ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কোথাও চায়ের দোকানে শেষ আড্ডা চলছে।

কোথাও দোকানের শাটার নামছে।

দূরে কোথাও কুকুরের ডাক।

বাতাসে হালকা শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে।

এমন সন্ধ্যা নন্দিতার খুব প্রিয়।

এই সময়টায় মনে হয়, পৃথিবী যেন একটু ধীরে হাঁটে।

সাইকেল চালাতে চালাতেই অজান্তে তার ঠোঁটে সুর ভেসে উঠল—

"আমারও পরানো যাহা চায়,
তুমি তাই... তুমি তাই গো..."

দু'লাইন গেয়েই থেমে গেল সে।

গানটা যেন আজ অন্য রকম লাগছিল।

হঠাৎ করেই মনের ভেতর একটা প্রশ্ন এসে দাঁড়াল।

সত্যিই কি তার মনের আকাশে কারও পদচারণা শুরু হয়েছে?
নাকি এ শুধু অজানা কোনো রাজকুমারের জন্য মনের অচেনা অপেক্ষা?

নাকি...

স্টেশনে দেখা সেই অচেনা ছেলেটার কথা?

যার নামটাও সে আজ পর্যন্ত জানে না।

অদ্ভুত!

মানুষের সঙ্গে কতবার দেখা হয়, কত কথা হয়— তারপরও কেউ কেউ মনে থাকে না।

আবার কোনো কোনো মানুষকে মাত্র কয়েক মুহূর্ত দেখেও অকারণেই বারবার মনে পড়ে।

নন্দিতা নিজেই নিজের মনে হেসে ফেলল।

উফ্... কী সব যে ভাবছি!

মাথা নেড়ে আবার সামনে তাকাল সে।

কিন্তু মন কি আর এত সহজে কথা শোনে?

মনের কোথা থেকে যেন আবার ভেসে এল সুর—

"একটুকু ছোঁয়া লাগে,
একটুকু কথা শুনি..."

নন্দিতা বুঝতে পারল না—

সে কি গানটা গাইছে,

নাকি গানটাই আজ তার মনের ভেতরের অচেনা অনুভূতিগুলোকে আস্তে আস্তে জাগিয়ে তুলছে।

রাতের নরম বাতাস মুখে এসে লাগছিল।

সাইকেলটা নিজের ছন্দে এগিয়ে চলেছিল।

জীবনের কিছু প্রশ্নের উত্তর
হয়তো সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না।

সময়ই একদিন নিঃশব্দে তার উত্তর লিখে দেয়।


বাড়ির সামনে এসে নন্দিতা সাইকেলটা থামাল।

উঠোনের আলো তখনও জ্বলছে।

দরজায় হালকা টোকা দিতেই মা দরজা খুলে দিলেন।

এসেছিস? অনেক রাত করলি আজ।
রিহার্সাল একটু বেশি সময় চলল মা। তারপর সবাই মিলে খাওয়াদাওয়া করলাম।

মা মৃদু হেসে বললেন—

যা, হাত-মুখ ধুয়ে নে। ভাত গরম করে দিচ্ছি।

নন্দিতা রান্নাঘরে ঢুঁ মেরে দেখল, দিদি ঘুমিয়ে পড়েছে।

ঈশানও নিশ্চিন্তে মায়ের পাশে ঘুমোচ্ছে।

বিকেলের ঝগড়ার কোনো চিহ্ন যেন আর বাড়িতে নেই।

সংসার বোধহয় এমনই।

দিনের শেষে আবার সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে নিজের ছোট্ট ঘরে এসে জানালাটা খুলে দিল নন্দিতা।

বাইরে নিস্তব্ধ রাত।

দূরে কোথাও ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল।

অকারণেই তার মনে পড়ে গেল সেই স্টেশন।

আর... সেই অচেনা ছেলেটাকে।

সঙ্গে সঙ্গেই আর-একটা মুখ ভেসে উঠল।

নন্দিতা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।

নিজের মনকেই যেন প্রশ্ন করল—

"কাকে ভাবছি আমি?
অচীন দেশের রাজকুমার ?
নাকি সেই অচেনা মানুষটাকে?"

কোনো উত্তর এল না।

শুধু জানালার বাইরে রাতটা আরও গভীর হয়ে উঠল।

অজান্তেই আবার তার ঠোঁটে ভেসে এল সেই সুর—

"একটুকু ছোঁয়া লাগে,
একটুকু কথা শুনি,
তাই দিয়ে মনে মনে
রচি মম ফাল্গুনী..."

গানটা শেষ করল না সে।

শুধু মৃদু হেসে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...