সমাজের ভয়
উৎপলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
টিফিন রুমের কোলাহল যেন অনেক দূরে সরে গেছে। অর্ণিবান বুঝতে পারছিল, মানুষটা শুধু একটা গল্প বলছেন না—নিজের বুকের ভেতরে বহু বছর ধরে লুকিয়ে রাখা একটা ক্ষত ধীরে ধীরে খুলে দেখাচ্ছেন।
উৎপলবাবু আবার বলতে শুরু করলেন—
— সেদিন অদিতির কথা শুনে সত্যিই চেষ্টা করেছিলাম।
আমার পরিচিত দু-একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, একটি বেসরকারি স্কুল, এমনকি একজন বন্ধুর অফিসেও কথা বলেছিলাম।
প্রতিবারই একই উত্তর—
"অভিজ্ঞতা চাই।"
"এখন লোক নেওয়া হচ্ছে না।"
"পরে যোগাযোগ করুন।"
প্রতিবার অদিতিকে ফোন করে বা বার্তা দিয়ে বলতাম—
"আরও একটু অপেক্ষা করুন। আমি চেষ্টা করছি।"
ও প্রতিবারই একই উত্তর দিত—
"আপনি চেষ্টা করছেন, এটাই আমার কাছে অনেক স্যার।"
কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম, কথাগুলো বলার সময়ও ওর ভেতরের আলো একটু একটু করে নিভে যাচ্ছে।
একদিন রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপের শব্দ হলো।
অদিতির বার্তা।
"ঘুমিয়ে পড়েছেন?"
আমি লিখলাম—
"না। বলুন।"
প্রায় পাঁচ মিনিট কোনো উত্তর নেই।
তারপর শুধু একটি লাইন ভেসে উঠল—
"আজ খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে।"
আমি দীর্ঘক্ষণ মোবাইলের পর্দার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
আঙুল বারবার কীবোর্ডের ওপর গিয়ে থেমে যাচ্ছিল।
ইচ্ছে হচ্ছিল লিখি—
"কাল অফিসে চলে আসুন। এক কাপ চা খাব। গল্প করব। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
আবার মনে হচ্ছিল লিখি—
"আপনি একা নন। বড় ভাইয়ের মতো আমাকে ভাবতে পারেন।"
কিন্তু...
আমি কিছুই লিখলাম না।
মাথার ভেতর তখন অন্য একটা কণ্ঠস্বর ঘুরছিল।
"যদি কেউ দেখে ফেলে?"
"যদি ভুল বোঝে?"
"যদি অফিসে কথা ওঠে?"
"যদি কেউ অন্য অর্থ খুঁজে নেয়?"
শেষ পর্যন্ত আমি শুধু লিখেছিলাম—
"নিজেকে শক্ত রাখুন। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
অদিতি আর কোনো উত্তর দেয়নি।
আজ ভাবি...
সেদিন কি আমার আরও কিছু লেখা উচিত ছিল?
একটা মানুষ যখন কান্নার কথা জানায়, তখন সে আসলে পরামর্শ চায় না।
সে চায়—কেউ তার কান্নার শব্দটা শুনুক।
উৎপলবাবুর গলাটা ভারী হয়ে এল।
তিনি খুব ধীরে বললেন—
— অর্ণিবান, সমাজ আমাদের অনেক কিছু শেখায়। কিন্তু একটা জিনিস খুব বেশি শেখায়—ভয়।
— একজন অসহায় মেয়ের পাশে দাঁড়ানোর আগেও একজন পুরুষকে ভাবতে হয়, "লোকে কী বলবে?" আর একজন পুরুষের পাশে দাঁড়ানোর আগে একজন নারীও একই ভয় পায়।
তিনি মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
সেই হাসির মধ্যে আনন্দ ছিল না।
ছিল আত্মগ্লানি।
— আমি অদিতিকে কখনও ভুল পথে নিয়ে যাইনি, কোনো সীমাও অতিক্রম করিনি। তবু সমাজের অদৃশ্য চোখকে আমি এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে, একজন ভেঙে পড়া মানুষের পাশে আর এক পা এগোতে পারিনি।
তিনি জানালার বাইরে তাকালেন।
বাতাসে কৃষ্ণচূড়ার কয়েকটি পাপড়ি উড়ে এসে জানালার কার্নিশে পড়ল।
উৎপলবাবু ফিসফিস করে বললেন—
"কখনও কখনও মানুষের সবচেয়ে বড় অপরাধ সে যা করেছে তা নয়... সে যা করতে পারত, অথচ করেনি।"
অর্ণিবানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
সে তখনও জানত না...
উৎপলবাবুর গল্পের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায় এখনও বাকি।
(চলবে... )

Comments
Post a Comment