Skip to main content

একটি অদৃশ্য ক্ষত -৬

সমাজের ভয়

উৎপলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

টিফিন রুমের কোলাহল যেন অনেক দূরে সরে গেছে। অর্ণিবান বুঝতে পারছিল, মানুষটা শুধু একটা গল্প বলছেন না—নিজের বুকের ভেতরে বহু বছর ধরে লুকিয়ে রাখা একটা ক্ষত ধীরে ধীরে খুলে দেখাচ্ছেন।

উৎপলবাবু আবার বলতে শুরু করলেন—

— সেদিন অদিতির কথা শুনে সত্যিই চেষ্টা করেছিলাম।

আমার পরিচিত দু-একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, একটি বেসরকারি স্কুল, এমনকি একজন বন্ধুর অফিসেও কথা বলেছিলাম।

প্রতিবারই একই উত্তর—

"অভিজ্ঞতা চাই।"
"এখন লোক নেওয়া হচ্ছে না।"
"পরে যোগাযোগ করুন।"

প্রতিবার অদিতিকে ফোন করে বা বার্তা দিয়ে বলতাম—

"আরও একটু অপেক্ষা করুন। আমি চেষ্টা করছি।"

ও প্রতিবারই একই উত্তর দিত—

"আপনি চেষ্টা করছেন, এটাই আমার কাছে অনেক স্যার।"

কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম, কথাগুলো বলার সময়ও ওর ভেতরের আলো একটু একটু করে নিভে যাচ্ছে।

একদিন রাত প্রায় সাড়ে দশটা।

মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপের শব্দ হলো।

অদিতির বার্তা।

"ঘুমিয়ে পড়েছেন?"

আমি লিখলাম—

"না। বলুন।"

প্রায় পাঁচ মিনিট কোনো উত্তর নেই।

তারপর শুধু একটি লাইন ভেসে উঠল—

"আজ খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে।"

আমি দীর্ঘক্ষণ মোবাইলের পর্দার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

আঙুল বারবার কীবোর্ডের ওপর গিয়ে থেমে যাচ্ছিল।

ইচ্ছে হচ্ছিল লিখি—

"কাল অফিসে চলে আসুন। এক কাপ চা খাব। গল্প করব। সব ঠিক হয়ে যাবে।"

আবার মনে হচ্ছিল লিখি—

"আপনি একা নন। বড় ভাইয়ের মতো আমাকে ভাবতে পারেন।"

কিন্তু...

আমি কিছুই লিখলাম না।

মাথার ভেতর তখন অন্য একটা কণ্ঠস্বর ঘুরছিল।

"যদি কেউ দেখে ফেলে?"
"যদি ভুল বোঝে?"
"যদি অফিসে কথা ওঠে?"
"যদি কেউ অন্য অর্থ খুঁজে নেয়?"

শেষ পর্যন্ত আমি শুধু লিখেছিলাম—

"নিজেকে শক্ত রাখুন। সব ঠিক হয়ে যাবে।"

অদিতি আর কোনো উত্তর দেয়নি।

আজ ভাবি...

সেদিন কি আমার আরও কিছু লেখা উচিত ছিল?

একটা মানুষ যখন কান্নার কথা জানায়, তখন সে আসলে পরামর্শ চায় না।

সে চায়—কেউ তার কান্নার শব্দটা শুনুক।

উৎপলবাবুর গলাটা ভারী হয়ে এল।

তিনি খুব ধীরে বললেন—

— অর্ণিবান, সমাজ আমাদের অনেক কিছু শেখায়। কিন্তু একটা জিনিস খুব বেশি শেখায়—ভয়।

— একজন অসহায় মেয়ের পাশে দাঁড়ানোর আগেও একজন পুরুষকে ভাবতে হয়, "লোকে কী বলবে?" আর একজন পুরুষের পাশে দাঁড়ানোর আগে একজন নারীও একই ভয় পায়।

তিনি মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।

সেই হাসির মধ্যে আনন্দ ছিল না।

ছিল আত্মগ্লানি।

— আমি অদিতিকে কখনও ভুল পথে নিয়ে যাইনি, কোনো সীমাও অতিক্রম করিনি। তবু সমাজের অদৃশ্য চোখকে আমি এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে, একজন ভেঙে পড়া মানুষের পাশে আর এক পা এগোতে পারিনি।

তিনি জানালার বাইরে তাকালেন।

বাতাসে কৃষ্ণচূড়ার কয়েকটি পাপড়ি উড়ে এসে জানালার কার্নিশে পড়ল।

উৎপলবাবু ফিসফিস করে বললেন—

"কখনও কখনও মানুষের সবচেয়ে বড় অপরাধ সে যা করেছে তা নয়... সে যা করতে পারত, অথচ করেনি।"

অর্ণিবানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

সে তখনও জানত না...

উৎপলবাবুর গল্পের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায় এখনও বাকি।

(চলবে... )

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...