অদিতি
টিফিন রুমের ভেতরটা হঠাৎ যেন অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে গেল।
জানালার বাইরে কৃষ্ণচূড়ার ডালগুলো বাতাসে দুলছে। দূরে অফিসের করিডোরে মানুষের পায়ের শব্দ ভেসে আসছে, কিন্তু সেই শব্দ যেন এই ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারছে না।
উৎপলবাবু কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
মনে হচ্ছিল, তিনি যেন অফিসে নন—বহু বছর আগের কোনো বিকেলে ফিরে গেছেন।
ধীরে ধীরে তিনি বলতে শুরু করলেন—
— বছরটা ছিল ২০২০। চারদিকে করোনার আতঙ্ক। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই শুধু মৃত্যু, হাসপাতাল, অক্সিজেন, কান্না। সেই সময় আমাদের অফিসেও একের পর এক লিগ্যাল হেয়ার এনকোয়ারির ফাইল আসছিল।
একদিন দুপুরে আমার টেবিলে একটি ফাইল এসে পৌঁছাল।
অন্য দিনের মতোই খুললাম।
প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
মৃত কর্মচারী : শ্রীমতী সুচরিতা মুখোপাধ্যায়
পদ : প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা
একমাত্র উত্তরাধিকারী : অদিতি মুখোপাধ্যায়
বয়স : ২৫ বছর
সরকারি কাগজে মানুষের পরিচয় এতটুকুই।
সেখানে লেখা থাকে না—
শৈশবে বাবা মারা গেছেন।
তারপর একমাত্র দিদিও চলে গেছে।
আর শেষ আশ্রয়, মা—করোনায় হারিয়ে গেলেন।
সরকারি ফাইলে এসব লেখা থাকে না।
সেখানে মানুষের জীবনের কান্না নয়, শুধু তথ্য থাকে।
দু'দিন পর অদিতি প্রথম অফিসে এল।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে খুব আস্তে বলল—
— স্যার... ভেতরে আসব?
আমি মাথা তুলে তাকালাম।
একটি সাধারণ হালকা নীল সুতির শাড়ি।
চুলগুলো তাড়াহুড়ো করে খোঁপা করা।
কাঁধে পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।
মুখে কোনো প্রসাধন নেই।
কিন্তু মুখটা অদ্ভুত শান্ত।
আর চোখ...
আমি আজও সেই চোখ ভুলতে পারিনি।
এমন চোখ আমি খুব কম দেখেছি।
সেখানে সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি ছিল ক্লান্তি।
কান্নার চেয়ে বেশি ছিল নিঃসঙ্গতা।
আর সবকিছুর গভীরে ছিল এক অদ্ভুত প্রশ্ন—
"এবার আমি কার জন্য বাঁচব?"
আমি তাকে বসতে বললাম।
সে ধীরে ধীরে চেয়ারে বসল।
ব্যাগ খুলে একটার পর একটা কাগজ টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখল।
কাগজগুলো ধরার সময়ও তার হাত কাঁপছিল।
আমি নরম গলায় বললাম—
— ভয় পাবেন না। ধীরে ধীরে সব হয়ে যাবে।
সে প্রথমবার আমার দিকে তাকিয়ে খুব মৃদু হেসেছিল।
আজও সেই হাসিটা মনে আছে।
ওটা আনন্দের হাসি ছিল না।
ওটা ছিল ভেঙে পড়া একজন মানুষের শেষ ভদ্রতা।
সে খুব আস্তে বলেছিল—
— সবাই এই কথাটাই বলেন স্যার... কিন্তু বাড়ি ফিরে দরজা খুললেই বুঝতে পারি, কিছুই ঠিক হয়নি।
আমি উত্তর দিতে পারিনি।
কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর সরকারি চাকরির কোনো নিয়মবইয়ে লেখা থাকে না।
কাগজপত্রে কয়েকটি ভুল ছিল।
আমি বুঝিয়ে দিলাম।
সে মন দিয়ে শুনল।
তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল—
— আবার আসতে হবে?
— হ্যাঁ, দু-একটা কাগজ ঠিক করে আনতে হবে।
সে মাথা নাড়ল।
দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
মনে হলো, কিছু একটা বলতে চায়।
কিন্তু বলল না।
শুধু একবার মৃদু হেসে চলে গেল।
অদ্ভুত ব্যাপার জানো অর্ণিবান—
সেদিন মেয়েটা চলে যাওয়ার পরও আমি অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে বসে ছিলাম।
কেন জানি না...
মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটা শুধু একটা সরকারি ফাইলের নাম নয়।
এর বুকের ভেতর এমন একটা নীরবতা জমে আছে, যেটা একদিন না একদিন ভেঙে পড়বেই।
কিন্তু তখনও জানতাম না...
সেই ভাঙনের শব্দ আমাকেও সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে।
(চলবে... )

Comments
Post a Comment