Skip to main content

একটি অদৃশ্য ক্ষত - ৩

অদিতি

টিফিন রুমের ভেতরটা হঠাৎ যেন অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে গেল।

জানালার বাইরে কৃষ্ণচূড়ার ডালগুলো বাতাসে দুলছে। দূরে অফিসের করিডোরে মানুষের পায়ের শব্দ ভেসে আসছে, কিন্তু সেই শব্দ যেন এই ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারছে না।

উৎপলবাবু কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইলেন।

মনে হচ্ছিল, তিনি যেন অফিসে নন—বহু বছর আগের কোনো বিকেলে ফিরে গেছেন।

ধীরে ধীরে তিনি বলতে শুরু করলেন—

— বছরটা ছিল ২০২০। চারদিকে করোনার আতঙ্ক। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই শুধু মৃত্যু, হাসপাতাল, অক্সিজেন, কান্না। সেই সময় আমাদের অফিসেও একের পর এক লিগ্যাল হেয়ার এনকোয়ারির ফাইল আসছিল।

একদিন দুপুরে আমার টেবিলে একটি ফাইল এসে পৌঁছাল।

অন্য দিনের মতোই খুললাম।

প্রথম পাতায় লেখা ছিল—

মৃত কর্মচারী : শ্রীমতী সুচরিতা মুখোপাধ্যায়

পদ : প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা

একমাত্র উত্তরাধিকারী : অদিতি মুখোপাধ্যায়

বয়স : ২৫ বছর

সরকারি কাগজে মানুষের পরিচয় এতটুকুই।

সেখানে লেখা থাকে না—

শৈশবে বাবা মারা গেছেন।

তারপর একমাত্র দিদিও চলে গেছে।

আর শেষ আশ্রয়, মা—করোনায় হারিয়ে গেলেন।

সরকারি ফাইলে এসব লেখা থাকে না।

সেখানে মানুষের জীবনের কান্না নয়, শুধু তথ্য থাকে।

দু'দিন পর অদিতি প্রথম অফিসে এল।

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে খুব আস্তে বলল—

— স্যার... ভেতরে আসব?

আমি মাথা তুলে তাকালাম।

একটি সাধারণ হালকা নীল সুতির শাড়ি।

চুলগুলো তাড়াহুড়ো করে খোঁপা করা।

কাঁধে পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।

মুখে কোনো প্রসাধন নেই।

কিন্তু মুখটা অদ্ভুত শান্ত।

আর চোখ...

আমি আজও সেই চোখ ভুলতে পারিনি।

এমন চোখ আমি খুব কম দেখেছি।

সেখানে সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি ছিল ক্লান্তি।

কান্নার চেয়ে বেশি ছিল নিঃসঙ্গতা।

আর সবকিছুর গভীরে ছিল এক অদ্ভুত প্রশ্ন—

"এবার আমি কার জন্য বাঁচব?"

আমি তাকে বসতে বললাম।

সে ধীরে ধীরে চেয়ারে বসল।

ব্যাগ খুলে একটার পর একটা কাগজ টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখল।

কাগজগুলো ধরার সময়ও তার হাত কাঁপছিল।

আমি নরম গলায় বললাম—

— ভয় পাবেন না। ধীরে ধীরে সব হয়ে যাবে।

সে প্রথমবার আমার দিকে তাকিয়ে খুব মৃদু হেসেছিল।

আজও সেই হাসিটা মনে আছে।

ওটা আনন্দের হাসি ছিল না।

ওটা ছিল ভেঙে পড়া একজন মানুষের শেষ ভদ্রতা।

সে খুব আস্তে বলেছিল—

— সবাই এই কথাটাই বলেন স্যার... কিন্তু বাড়ি ফিরে দরজা খুললেই বুঝতে পারি, কিছুই ঠিক হয়নি।

আমি উত্তর দিতে পারিনি।

কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর সরকারি চাকরির কোনো নিয়মবইয়ে লেখা থাকে না।

কাগজপত্রে কয়েকটি ভুল ছিল।

আমি বুঝিয়ে দিলাম।

সে মন দিয়ে শুনল।

তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল—

— আবার আসতে হবে?

— হ্যাঁ, দু-একটা কাগজ ঠিক করে আনতে হবে।

সে মাথা নাড়ল।

দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

মনে হলো, কিছু একটা বলতে চায়।

কিন্তু বলল না।

শুধু একবার মৃদু হেসে চলে গেল।

অদ্ভুত ব্যাপার জানো অর্ণিবান—

সেদিন মেয়েটা চলে যাওয়ার পরও আমি অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে বসে ছিলাম।

কেন জানি না...

মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটা শুধু একটা সরকারি ফাইলের নাম নয়।

এর বুকের ভেতর এমন একটা নীরবতা জমে আছে, যেটা একদিন না একদিন ভেঙে পড়বেই।

কিন্তু তখনও জানতাম না...

সেই ভাঙনের শব্দ আমাকেও সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে।

(চলবে... )

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...
🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান, আর প্রতিদিনের নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফিস শু...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...