Skip to main content

ভয়ের ওপারে

অধ্যায়–৭

পর্ব–১

ভয়ের ওপারে

ট্রেনটা নিজের গতিতেই ছুটে চলেছে।

জানালার বাইরে একের পর এক গাছ, মাঠ, ছোট্ট স্টেশন পিছিয়ে যাচ্ছে। অথচ অর্ণিবানের মনে হচ্ছিল, সময় যেন কোথাও থমকে আছে।

সকালের ঘটনাটা বারবার ফিরে আসছে।

সে জানে, তার কোনো দোষ ছিল না।

তবু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কত সহজে তাকে অভিযুক্ত করে ফেলেছিল চারপাশের মানুষ।

কেউ জানতে চায়নি, ঘটনাটা কীভাবে ঘটল।

কেউ শোনার চেষ্টা করেনি, সে কী বলতে চাইছে।

মানুষের বিচার বড় অদ্ভুত।

সেখানে সত্যের চেয়ে দৃশ্যটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অর্ণিবানের হঠাৎ লাফার কথা মনে পড়ে গেল।

মেসের বারান্দায় একদিন গভীর রাতে চা খেতে খেতে লাফা বলেছিল—

"সমাজ কোনোদিন তোমাকে বলবে না, একটা মহৎ কাজ করো। কিন্তু সমাজের অদৃশ্য নিয়মের বাইরে যদি কখনও এক পা ফেলো—সে তোমাকে সহজে ক্ষমা করবে না।"

তখন কথাটা শুনে সবাই নিরুত্তর ছিল।

আজ অর্ণিবান বুঝল, কথাটার ভেতরে কতটা তিক্ত সত্যি লুকিয়ে ছিল।

মানুষ সারাজীবন সৎ থাকতে পারে।

অসংখ্য ভালো কাজ করতে পারে।

সেগুলোর হিসেব সমাজ খুব কমই রাখে।

কিন্তু এক মুহূর্তের ভুল বোঝাবুঝি...

একটি অনিচ্ছাকৃত ঘটনা...

একটি অপবাদ...

সেইটুকুই যেন একজন মানুষকে বিচার করার জন্য যথেষ্ট।

অর্ণিবান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

হঠাৎ তার মনে হলো—

ভয় পেয়েও তো সে রক্ষা পেল না।

এতদিন সমাজের ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে।

কোনো সম্পর্কের সীমা অতিক্রম করেনি।

কারও অস্বস্তির কারণ হতে চায়নি।

তবু আজ অপমান তাকে খুঁজে নিয়েছে।

তাহলে সারাক্ষণ এই অদৃশ্য ভয়কে বুকে নিয়ে বেঁচে থাকার অর্থ কী?

সমাজের কাছে নয়...

মানুষের আগে নিজের বিবেকের কাছেই সৎ থাকা দরকার।

হয়তো সেই সাহসটাই সবচেয়ে বড় সাহস।

ঠিক তখনই পিছন থেকে একটি মৃদু কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

— অর্ণিবানবাবু...

অর্ণিবান চমকে পিছন ফিরে তাকাল...

(চলবে... )

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...