Skip to main content

একটি অদৃশ্য ক্ষত -৮

উৎপলবাবু অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইলেন।

টিফিন রুমে তখন প্রায় কেউ নেই। জানালার বাইরে বিকেলের আলো একটু একটু করে নরম হয়ে আসছে।

হঠাৎ তিনি খুব আস্তে বললেন—

— জানো অর্ণিবান, আজও মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়।

মনে হয়, আমি কি সত্যিই আমার কর্তব্য শেষ করেছিলাম?

সরকারি কর্মচারী হিসেবে হয়তো করেছিলাম।

কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে?

সেই প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজে পাই না।

সেদিন যদি সমাজের ভয়টাকে একটু দূরে সরিয়ে রাখতে পারতাম...

যদি একদিন অদিতিকে বলতাম—

"ভয় পেও না। মন খারাপ হলে ফোন করবে। আমি বড় ভাইয়ের মতো তোমার কথা শুনব।"

যদি মাসে একদিন শুধু খোঁজ নিতাম—

"কেমন আছ?"

যদি শুধু এইটুকু বিশ্বাস দিতে পারতাম যে পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ তার কথা মন দিয়ে শুনবে...

তাহলে হয়তো...

হয়তো অদিতির জীবনটা অন্যরকম হতে পারত।

আমি নিশ্চিত নই।

কিন্তু এই 'হয়তো' শব্দটাই আমার সারাজীবনের শাস্তি হয়ে গেছে।

আমরা সমাজকে খুব ভয় পাই, অর্ণিবান।

কিন্তু সমাজ কি কোনোদিন এসে একজন একা মানুষের চোখের জল মুছে দেয়?

সমাজ কি কোনোদিন গভীর রাতে কারও নিঃসঙ্গতার পাশে বসে থাকে?

না...

সেটা মানুষকেই করতে হয়।

তবু আমরা মানুষকে নয়, সমাজকেই বেশি ভয় পাই।

একটা কথা আজও আমাকে কষ্ট দেয়।

একজন ছেলে আর একজন মেয়ের মধ্যে কি শুধু একটাই সম্পর্ক থাকতে পারে?

শুধু প্রেম?

শুধু কামনা?

শুধু সন্দেহ?

রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও কি একজন মানুষ আর একজন মানুষের বড় ভাই হতে পারে না?

একজন বোন হতে পারে না?

একজন নিঃস্বার্থ বন্ধু হতে পারে না?

কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই শুধু মানবিকতার হাতটা বাড়িয়ে দেওয়া যায় না?

আমার বিশ্বাস—যায়।

কারণ পৃথিবীর সব সম্পর্কের নাম হয় না।

কিছু সম্পর্ক শুধু মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

তাদের একটাই পরিচয়—

মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।

সেদিন আমি নিজের মনকে নয়...

সমাজকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলাম।

আজ সমাজ আমাকে দোষ দেয় না।

কিন্তু আমার বিবেক...

সে আজও আমাকে ক্ষমা করেনি।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...
🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান, আর প্রতিদিনের নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফিস শু...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...