উৎপলবাবু অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
টিফিন রুমে তখন প্রায় কেউ নেই। জানালার বাইরে বিকেলের আলো একটু একটু করে নরম হয়ে আসছে।
হঠাৎ তিনি খুব আস্তে বললেন—
— জানো অর্ণিবান, আজও মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়।
মনে হয়, আমি কি সত্যিই আমার কর্তব্য শেষ করেছিলাম?
সরকারি কর্মচারী হিসেবে হয়তো করেছিলাম।
কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে?
সেই প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজে পাই না।
সেদিন যদি সমাজের ভয়টাকে একটু দূরে সরিয়ে রাখতে পারতাম...
যদি একদিন অদিতিকে বলতাম—
"ভয় পেও না। মন খারাপ হলে ফোন করবে। আমি বড় ভাইয়ের মতো তোমার কথা শুনব।"
যদি মাসে একদিন শুধু খোঁজ নিতাম—
"কেমন আছ?"
যদি শুধু এইটুকু বিশ্বাস দিতে পারতাম যে পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ তার কথা মন দিয়ে শুনবে...
তাহলে হয়তো...
হয়তো অদিতির জীবনটা অন্যরকম হতে পারত।
আমি নিশ্চিত নই।
কিন্তু এই 'হয়তো' শব্দটাই আমার সারাজীবনের শাস্তি হয়ে গেছে।
আমরা সমাজকে খুব ভয় পাই, অর্ণিবান।
কিন্তু সমাজ কি কোনোদিন এসে একজন একা মানুষের চোখের জল মুছে দেয়?
সমাজ কি কোনোদিন গভীর রাতে কারও নিঃসঙ্গতার পাশে বসে থাকে?
না...
সেটা মানুষকেই করতে হয়।
তবু আমরা মানুষকে নয়, সমাজকেই বেশি ভয় পাই।
একটা কথা আজও আমাকে কষ্ট দেয়।
একজন ছেলে আর একজন মেয়ের মধ্যে কি শুধু একটাই সম্পর্ক থাকতে পারে?
শুধু প্রেম?
শুধু কামনা?
শুধু সন্দেহ?
রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও কি একজন মানুষ আর একজন মানুষের বড় ভাই হতে পারে না?
একজন বোন হতে পারে না?
একজন নিঃস্বার্থ বন্ধু হতে পারে না?
কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই শুধু মানবিকতার হাতটা বাড়িয়ে দেওয়া যায় না?
আমার বিশ্বাস—যায়।
কারণ পৃথিবীর সব সম্পর্কের নাম হয় না।
কিছু সম্পর্ক শুধু মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
তাদের একটাই পরিচয়—
মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।
সেদিন আমি নিজের মনকে নয়...
সমাজকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলাম।
আজ সমাজ আমাকে দোষ দেয় না।
কিন্তু আমার বিবেক...
সে আজও আমাকে ক্ষমা করেনি।

Comments
Post a Comment