Skip to main content

একটি অদৃশ্য ক্ষত -৫

একটি নম্বর, কিছু বার্তা

সেই দিনের পর থেকে অদিতির সঙ্গে আমার যোগাযোগটা খুব ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।

না, তাকে যোগাযোগ বলা ঠিক হবে না।

বরং বলা যায়, একজন সরকারি আধিকারিক আর এক অসহায় মেয়ের মধ্যে প্রয়োজনের সূত্র ধরে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত বিশ্বাস।

সেই বিশ্বাসের মধ্যে কোনো গোপনীয়তা ছিল না।

ছিল না কোনো প্রেমের ইঙ্গিতও।

ছিল শুধু একা হয়ে যাওয়া একটা মানুষের একটু ভরসা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা।

লিগ্যাল হেয়ার এনকোয়ারির কাজ চলছিল।

কখনও কোনো নথিতে ভুল।

কখনও নতুন কাগজের প্রয়োজন।

তাই মাঝেমধ্যে ফোন করতেই হতো।

কখনও আমি করতাম।

কখনও অদিতি।

একদিন দুপুরে অফিসে বসে ফাইল দেখছি।

হঠাৎ মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপের শব্দ।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল—

"স্যার, বিরক্ত করছি না তো?"

আমি উত্তর দিলাম—

"না, বলুন।"

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল—

"আজ সারাদিন কারও সঙ্গে একটা কথাও হয়নি। তাই আপনাকে লিখলাম।"

মেসেজটা পড়ে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম।

একজন মানুষ কতটা একা হলে এমন কথা লিখতে পারে?

শেষে শুধু লিখলাম—

"নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। বই পড়ুন। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।"

কিছুক্ষণ পর আবার উত্তর এল—

"বই খুলে বসি স্যার। কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা পড়তেই মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। তারপর আর পড়া হয় না।"

আমি আর কোনো উত্তর দিতে পারিনি।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ অদিতির কথাই ভাবছিলাম।

মাঝে মাঝে মনে হতো, যদি মেয়েটার একটা ভাই থাকত!

যদি একজন আপন মানুষ থাকত!

তাহলে হয়তো সে আমাকে লিখত না।

এরপর থেকে মাঝেমধ্যেই বার্তা আসতে লাগল।

কোনোদিন লিখত—

"আজ মায়ের আলমারি গুছালাম। এখনও শাড়িগুলোতে মায়ের গন্ধ পাই।"

কোনোদিন লিখত—

"স্যার, আপনার অফিসে কোনো ছোটখাটো কাজ হয় না?"

আবার কোনোদিন—

"আজ খুব মন খারাপ। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।"

আমি যতটা সম্ভব সংযত উত্তর দিতাম।

"হাল ছাড়বেন না।"

"চেষ্টা চালিয়ে যান।"

"জীবন আবার নতুন করে শুরু হয়।"

আমি লক্ষ্য করতাম—

অদিতি কখনও সীমা ছাড়িয়ে কোনো কথা বলত না।

আমিও না।

তবু কোথাও একটা অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি হচ্ছিল।

যার নাম হয়তো ছিল না।

কিন্তু বিশ্বাস ছিল।

একদিন বিকেলে অদিতি অফিসে এল।

কোনো কাগজের জন্য নয়।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—

— কিছু হয়েছে?

সে একটু ইতস্তত করে বলল—

— স্যার... একটা চাকরি করে দিতে পারবেন?

তার গলায় কোনো দাবি ছিল না।

ছিল অসহায় মানুষের শেষ অনুরোধ।

আমি বললাম—

— চেষ্টা করছি। সরকারি চাকরি তো সঙ্গে সঙ্গে হয় না।

অদিতি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

তারপর এমন একটা কথা বলল...

যে কথাটা আজও আমার কানে বাজে।

"সরকারি না হলেও হবে স্যার... একটা ছোট্ট কাজ হলেই হবে। ঘরে একা থাকতে আর ভালো লাগে না।"

আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

সেদিন প্রথম বুঝলাম—

সে শুধু একটা চাকরি চাইছে না।

সে বাঁচার একটা কারণ খুঁজছে।

(চলবে... )

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...