একটি নম্বর, কিছু বার্তা
সেই দিনের পর থেকে অদিতির সঙ্গে আমার যোগাযোগটা খুব ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।
না, তাকে যোগাযোগ বলা ঠিক হবে না।
বরং বলা যায়, একজন সরকারি আধিকারিক আর এক অসহায় মেয়ের মধ্যে প্রয়োজনের সূত্র ধরে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত বিশ্বাস।
সেই বিশ্বাসের মধ্যে কোনো গোপনীয়তা ছিল না।
ছিল না কোনো প্রেমের ইঙ্গিতও।
ছিল শুধু একা হয়ে যাওয়া একটা মানুষের একটু ভরসা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা।
লিগ্যাল হেয়ার এনকোয়ারির কাজ চলছিল।
কখনও কোনো নথিতে ভুল।
কখনও নতুন কাগজের প্রয়োজন।
তাই মাঝেমধ্যে ফোন করতেই হতো।
কখনও আমি করতাম।
কখনও অদিতি।
একদিন দুপুরে অফিসে বসে ফাইল দেখছি।
হঠাৎ মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপের শব্দ।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
"স্যার, বিরক্ত করছি না তো?"
আমি উত্তর দিলাম—
"না, বলুন।"
কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল—
"আজ সারাদিন কারও সঙ্গে একটা কথাও হয়নি। তাই আপনাকে লিখলাম।"
মেসেজটা পড়ে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম।
একজন মানুষ কতটা একা হলে এমন কথা লিখতে পারে?
শেষে শুধু লিখলাম—
"নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। বই পড়ুন। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।"
কিছুক্ষণ পর আবার উত্তর এল—
"বই খুলে বসি স্যার। কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা পড়তেই মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। তারপর আর পড়া হয় না।"
আমি আর কোনো উত্তর দিতে পারিনি।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ অদিতির কথাই ভাবছিলাম।
মাঝে মাঝে মনে হতো, যদি মেয়েটার একটা ভাই থাকত!
যদি একজন আপন মানুষ থাকত!
তাহলে হয়তো সে আমাকে লিখত না।
এরপর থেকে মাঝেমধ্যেই বার্তা আসতে লাগল।
কোনোদিন লিখত—
"আজ মায়ের আলমারি গুছালাম। এখনও শাড়িগুলোতে মায়ের গন্ধ পাই।"
কোনোদিন লিখত—
"স্যার, আপনার অফিসে কোনো ছোটখাটো কাজ হয় না?"
আবার কোনোদিন—
"আজ খুব মন খারাপ। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।"
আমি যতটা সম্ভব সংযত উত্তর দিতাম।
"হাল ছাড়বেন না।"
"চেষ্টা চালিয়ে যান।"
"জীবন আবার নতুন করে শুরু হয়।"
আমি লক্ষ্য করতাম—
অদিতি কখনও সীমা ছাড়িয়ে কোনো কথা বলত না।
আমিও না।
তবু কোথাও একটা অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি হচ্ছিল।
যার নাম হয়তো ছিল না।
কিন্তু বিশ্বাস ছিল।
একদিন বিকেলে অদিতি অফিসে এল।
কোনো কাগজের জন্য নয়।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—
— কিছু হয়েছে?
সে একটু ইতস্তত করে বলল—
— স্যার... একটা চাকরি করে দিতে পারবেন?
তার গলায় কোনো দাবি ছিল না।
ছিল অসহায় মানুষের শেষ অনুরোধ।
আমি বললাম—
— চেষ্টা করছি। সরকারি চাকরি তো সঙ্গে সঙ্গে হয় না।
অদিতি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
তারপর এমন একটা কথা বলল...
যে কথাটা আজও আমার কানে বাজে।
"সরকারি না হলেও হবে স্যার... একটা ছোট্ট কাজ হলেই হবে। ঘরে একা থাকতে আর ভালো লাগে না।"
আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সেদিন প্রথম বুঝলাম—
সে শুধু একটা চাকরি চাইছে না।
সে বাঁচার একটা কারণ খুঁজছে।
(চলবে... )

Comments
Post a Comment