দুপুর একটা বাজতেই অফিসের করিডোরে যেন অন্যরকম একটা প্রাণ ফিরে এল।
কেউ টিফিন ক্যারিয়ার হাতে বেরিয়ে এল নিজের ঘর থেকে, কেউ আবার ক্যান্টিনের দিকে হাঁটতে লাগল। সরকারি অফিসে দুপুরের এই এক ঘণ্টা যেন কাজের ফাঁকে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়। হাসি, গল্প, খুনসুটি—সব মিলিয়ে পরিবেশটা হালকা হয়ে ওঠে।
অর্ণিবানও ধীরে ধীরে টিফিন রুমে ঢুকল।
ঘরটা খুব বড় নয়।
এক পাশে বড় জানালা। জানালার ওপারে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। লাল ফুলে ভরে আছে ডালগুলো। বাতাস এলেই দু-একটা ফুল মাটিতে ঝরে পড়ছে।
মাঝখানে লম্বা টেবিল।
চারদিকে সহকর্মীদের ভিড়।
কেউ হাসতে হাসতে বলছে—
— আরে, কাল আবার ভারত হারল!
আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলেন—
— ক্রিকেট নিয়ে তোকে দিয়ে আর হবে না!
এক কোণে বাজারদর নিয়ে তর্ক চলছে।
অন্যদিকে একজন ছেলের স্কুলে ভর্তি নিয়ে পরামর্শ চাইছে।
জীবনের ছোট ছোট গল্পে ভরে উঠেছে ঘরটা।
শুধু অর্ণিবানের চারপাশে যেন অদৃশ্য একটা নীরবতা।
সে চুপচাপ একটা চেয়ার টেনে বসল।
টিফিনের বাক্স খুলল।
মা সকালে যত্ন করে আলু-পোস্ত আর ডাল দিয়ে ভাত বেঁধে দিয়েছিলেন।
অন্যদিন এই খাবার দেখলেই তার খিদে পেয়ে যেত।
আজ যেন খাবারের গন্ধও অনুভব করতে পারছে না।
চামচটা হাতে নিয়েও আবার নামিয়ে রাখল।
ঠিক তখনই দরজার দিক থেকে পরিচিত একটা গলা ভেসে এল—
— কী ভাইয়া, আজ টিফিনের সঙ্গে অভিমান নাকি?
অর্ণিবান মুখ তুলে তাকাল।
শিল্প আধিকারিক উৎপল চক্রবর্তী।
সবার প্রিয় উৎপলবাবু।
বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।
মুখে সবসময় একরাশ শান্ত হাসি।
অফিসে নতুন যারা যোগ দেয়, তাদের প্রথম সাহস জোগান এই মানুষটাই।
কোনো কাজ না বুঝলে ধমক নয়, ধৈর্য ধরে শেখান।
তাই পদমর্যাদার থেকেও মানুষ হিসেবে তাঁর সম্মান অনেক বেশি।
উৎপলবাবু নিজের টিফিন নিয়ে অর্ণিবানের পাশেই এসে বসলেন।
হেসে বললেন—
— কী ব্যাপার? সকাল থেকে দেখছি মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে। শরীর খারাপ?
অর্ণিবান জোর করে হাসল।
— না স্যার... কিছু না।
উৎপলবাবু একটু হেসে মাথা নাড়লেন।
তারপর টিফিনের ঢাকনা বন্ধ করে বললেন—
— চাকরি করতে করতে একটা জিনিস শিখেছি। মানুষ যখন বলে ‘কিছু না’, তখনই বুঝতে হবে অনেক কিছু হয়েছে।
অর্ণিবান মাথা নিচু করেই রইল।
উৎপলবাবু আর জোর করলেন না।
শুধু বললেন—
— বলো ভাইয়া। যদি বলতে ইচ্ছে করে। না বললেও অসুবিধা নেই। তবে কষ্টটা ভাগ করলে অনেক সময় হালকা হয়।
এই কথাটুকুর মধ্যে কোনো কৌতূহল ছিল না।
ছিল নিখাদ আন্তরিকতা।
অর্ণিবান ধীরে ধীরে সকালের পুরো ঘটনাটা বলতে শুরু করল।
ট্রেনের ভিড়...
হঠাৎ ধাক্কা...
সামনের সিটে বসা মেয়েটির গায়ের ওপর পড়ে যাওয়া...
তারপর চিৎকার...
চারপাশের মানুষের অভিযোগ...
আর শেষে সেই বৃদ্ধ মানুষের সাক্ষ্য।
সবটা শুনেও উৎপলবাবু একবারও বাধা দিলেন না।
শেষ পর্যন্ত শুনলেন।
তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
জানালার বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে তাকিয়ে যেন কী ভাবতে লাগলেন।
হঠাৎ খুব আস্তে বললেন—
— জানো অর্ণিবান... জীবন নদীতে নেমেছ। ঢেউ আসবে। ছোটও আসবে, বড়ও আসবে। সব ঢেউ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
একটু থামলেন।
তারপর আবার বললেন—
— নারী আর পুরুষ... দু'জনেই একে অপরের পরিপূরক। অথচ সমাজের সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি, সবচেয়ে বেশি অপবাদ, সবচেয়ে বেশি কষ্ট—এই দুই মানুষকে নিয়েই।
তিনি যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছিলেন।
হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তাঁর বুক থেকে।
অর্ণিবান প্রথমবার লক্ষ্য করল—
সবসময় হাসিখুশি মানুষটার চোখে আজ কেমন যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।
উৎপলবাবু খুব ধীরে বললেন—
— তোমার ঘটনাটা শুনে আজ ছয় বছর আগের একটা মুখ বারবার মনে পড়ছে।
অর্ণিবান চুপ করে রইল।
উৎপলবাবু নিজের জলের বোতল থেকে এক চুমুক জল খেলেন।
তারপর টেবিলের ওপর আঙুল দিয়ে আস্তে আস্তে টোকা দিতে দিতে বললেন—
— সরকারি চাকরিতে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। বেশিরভাগ মানুষকে কয়েকদিন পর ভুলেও যাই। কিন্তু কিছু মানুষ... তারা চলে গেলেও কোথাও যেন থেকে যায়।
তিনি মাথা নিচু করলেন।
তারপর অত্যন্ত নিচু স্বরে উচ্চারণ করলেন—
— অদিতি...
নামটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই যেন ঘরের বাতাসও ভারী হয়ে উঠল।
অর্ণিবান বুঝতে পারল, এটা কোনো সাধারণ গল্প নয়।
এটা এমন এক স্মৃতি...
যেটা একজন মানুষ ছয় বছর পরেও ভুলতে পারেনি।
(চলবে... )

Comments
Post a Comment