Skip to main content

একটি অদৃশ্য ক্ষত -২

দুপুর একটা বাজতেই অফিসের করিডোরে যেন অন্যরকম একটা প্রাণ ফিরে এল।

কেউ টিফিন ক্যারিয়ার হাতে বেরিয়ে এল নিজের ঘর থেকে, কেউ আবার ক্যান্টিনের দিকে হাঁটতে লাগল। সরকারি অফিসে দুপুরের এই এক ঘণ্টা যেন কাজের ফাঁকে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়। হাসি, গল্প, খুনসুটি—সব মিলিয়ে পরিবেশটা হালকা হয়ে ওঠে।

অর্ণিবানও ধীরে ধীরে টিফিন রুমে ঢুকল।

ঘরটা খুব বড় নয়।

এক পাশে বড় জানালা। জানালার ওপারে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। লাল ফুলে ভরে আছে ডালগুলো। বাতাস এলেই দু-একটা ফুল মাটিতে ঝরে পড়ছে।

মাঝখানে লম্বা টেবিল।

চারদিকে সহকর্মীদের ভিড়।

কেউ হাসতে হাসতে বলছে—

— আরে, কাল আবার ভারত হারল!

আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলেন—

— ক্রিকেট নিয়ে তোকে দিয়ে আর হবে না!

এক কোণে বাজারদর নিয়ে তর্ক চলছে।

অন্যদিকে একজন ছেলের স্কুলে ভর্তি নিয়ে পরামর্শ চাইছে।

জীবনের ছোট ছোট গল্পে ভরে উঠেছে ঘরটা।

শুধু অর্ণিবানের চারপাশে যেন অদৃশ্য একটা নীরবতা।

সে চুপচাপ একটা চেয়ার টেনে বসল।

টিফিনের বাক্স খুলল।

মা সকালে যত্ন করে আলু-পোস্ত আর ডাল দিয়ে ভাত বেঁধে দিয়েছিলেন।

অন্যদিন এই খাবার দেখলেই তার খিদে পেয়ে যেত।

আজ যেন খাবারের গন্ধও অনুভব করতে পারছে না।

চামচটা হাতে নিয়েও আবার নামিয়ে রাখল।

ঠিক তখনই দরজার দিক থেকে পরিচিত একটা গলা ভেসে এল—

— কী ভাইয়া, আজ টিফিনের সঙ্গে অভিমান নাকি?

অর্ণিবান মুখ তুলে তাকাল।

শিল্প আধিকারিক উৎপল চক্রবর্তী।

সবার প্রিয় উৎপলবাবু।

বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।

মুখে সবসময় একরাশ শান্ত হাসি।

অফিসে নতুন যারা যোগ দেয়, তাদের প্রথম সাহস জোগান এই মানুষটাই।

কোনো কাজ না বুঝলে ধমক নয়, ধৈর্য ধরে শেখান।

তাই পদমর্যাদার থেকেও মানুষ হিসেবে তাঁর সম্মান অনেক বেশি।

উৎপলবাবু নিজের টিফিন নিয়ে অর্ণিবানের পাশেই এসে বসলেন।

হেসে বললেন—

— কী ব্যাপার? সকাল থেকে দেখছি মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে। শরীর খারাপ?

অর্ণিবান জোর করে হাসল।

— না স্যার... কিছু না।

উৎপলবাবু একটু হেসে মাথা নাড়লেন।

তারপর টিফিনের ঢাকনা বন্ধ করে বললেন—

— চাকরি করতে করতে একটা জিনিস শিখেছি। মানুষ যখন বলে ‘কিছু না’, তখনই বুঝতে হবে অনেক কিছু হয়েছে।

অর্ণিবান মাথা নিচু করেই রইল।

উৎপলবাবু আর জোর করলেন না।

শুধু বললেন—

— বলো ভাইয়া। যদি বলতে ইচ্ছে করে। না বললেও অসুবিধা নেই। তবে কষ্টটা ভাগ করলে অনেক সময় হালকা হয়।

এই কথাটুকুর মধ্যে কোনো কৌতূহল ছিল না।

ছিল নিখাদ আন্তরিকতা।

অর্ণিবান ধীরে ধীরে সকালের পুরো ঘটনাটা বলতে শুরু করল।

ট্রেনের ভিড়...

হঠাৎ ধাক্কা...

সামনের সিটে বসা মেয়েটির গায়ের ওপর পড়ে যাওয়া...

তারপর চিৎকার...

চারপাশের মানুষের অভিযোগ...

আর শেষে সেই বৃদ্ধ মানুষের সাক্ষ্য।

সবটা শুনেও উৎপলবাবু একবারও বাধা দিলেন না।

শেষ পর্যন্ত শুনলেন।

তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

জানালার বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে তাকিয়ে যেন কী ভাবতে লাগলেন।

হঠাৎ খুব আস্তে বললেন—

— জানো অর্ণিবান... জীবন নদীতে নেমেছ। ঢেউ আসবে। ছোটও আসবে, বড়ও আসবে। সব ঢেউ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

একটু থামলেন।

তারপর আবার বললেন—

— নারী আর পুরুষ... দু'জনেই একে অপরের পরিপূরক। অথচ সমাজের সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি, সবচেয়ে বেশি অপবাদ, সবচেয়ে বেশি কষ্ট—এই দুই মানুষকে নিয়েই।

তিনি যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছিলেন।

হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তাঁর বুক থেকে।

অর্ণিবান প্রথমবার লক্ষ্য করল—

সবসময় হাসিখুশি মানুষটার চোখে আজ কেমন যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।

উৎপলবাবু খুব ধীরে বললেন—

— তোমার ঘটনাটা শুনে আজ ছয় বছর আগের একটা মুখ বারবার মনে পড়ছে।

অর্ণিবান চুপ করে রইল।

উৎপলবাবু নিজের জলের বোতল থেকে এক চুমুক জল খেলেন।

তারপর টেবিলের ওপর আঙুল দিয়ে আস্তে আস্তে টোকা দিতে দিতে বললেন—

— সরকারি চাকরিতে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। বেশিরভাগ মানুষকে কয়েকদিন পর ভুলেও যাই। কিন্তু কিছু মানুষ... তারা চলে গেলেও কোথাও যেন থেকে যায়।

তিনি মাথা নিচু করলেন।

তারপর অত্যন্ত নিচু স্বরে উচ্চারণ করলেন—

— অদিতি...

নামটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই যেন ঘরের বাতাসও ভারী হয়ে উঠল।

অর্ণিবান বুঝতে পারল, এটা কোনো সাধারণ গল্প নয়।

এটা এমন এক স্মৃতি...

যেটা একজন মানুষ ছয় বছর পরেও ভুলতে পারেনি।

(চলবে... )

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

পর্ব – ১৮ : সাহসের সকাল

পর্ব – ৮ : সাহসের সকাল ইন্টারভিউয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ঈশিতার ফোন কলের সংখ্যা ততই একটু একটু করে বাড়ছিল। খুব দীর্ঘ কথা নয়। নিতান্তই প্রয়োজনের কথা। কখনো কোনো নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন, কখনো যাতায়াতের সময় নিয়ে আলোচনা, কখনো বা শুধু নিশ্চিত হওয়া— — "আপনি তো আসছেন, তাই না?" প্রতিবারই অরিন্দমের একই উত্তর— — "হ্যাঁ, আসছি।" ইন্টারভিউয়ের তিন দিন আগেই সে অফিসে ছুটির আবেদন করে রেখেছিল। কারণ হিসেবে লিখেছিল— 'Personal Work'। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় তার নিজেরই মনে হয়েছিল, বহু বছর পর কোনো ছুটি সে সত্যিই নিজের ইচ্ছায় নিচ্ছে। ইন্টারভিউয়ের আগের দিন দুপুরে অফিসে কাজ করছিল অরিন্দম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "ঈশিতা"। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। তবে আজ সেই কণ্ঠে যেন এক অচেনা অস্থিরতা মিশে আছে। — "ব্যস্ত আছেন?" — "না, বলুন।" কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ঈশিতা ধীরে বলল— — "জানেন, আজ বড় অদ্ভুত লাগছে। এতদিন এই দিনটার জন্যই তো প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন দিনটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আর মনে হচ্ছে সব যেন গু...