Skip to main content

বিশ্বাস

অধ্যায়–৭

পর্ব–২

বিশ্বাস

ঠিক তখনই পিছন থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

— অর্ণিবানবাবু...

অর্ণিবান ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকাল।

নন্দিতা।

জানালার ধারের আসনে বসে আছে।

মুখে সেই চিরচেনা শান্ত হাসি।

হাতের ইশারায় পাশের খালি আসনটা দেখিয়ে বলল—

— এখানে বসুন... জায়গা আছে।

অন্য সময় হলে অর্ণিবান হয়তো ইতস্তত করত।

চারপাশে একবার তাকাত।

কে কী ভাববে, সেই অদৃশ্য হিসাবটা কষে নিত।

কিন্তু আজ তার ভেতরের মানুষটা যেন বদলে যেতে শুরু করেছে।

সমাজকে ভয় পেয়েও যে সব অপবাদ এড়ানো যায় না, সেই শিক্ষা আজ সকালেই পেয়ে গেছে।

সে আর কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে গিয়ে নন্দিতার পাশের আসনে বসল।

কিছুক্ষণ দু'জনেই চুপ।

ট্রেনের চাকার ছন্দ যেন সেই নীরবতারই ভাষা হয়ে উঠেছিল।

হঠাৎ নন্দিতা খুব শান্ত গলায় বলল—

— সকালের ঘটনাটা আমি দেখেছি।

অর্ণিবানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে মাথা নিচু করে বলল—

— খুব খারাপ একটা পরিস্থিতি হয়ে গিয়েছিল...

নন্দিতা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল—

— পরিস্থিতি খারাপ ছিল।

আপনি খারাপ ছিলেন না।

অর্ণিবান অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

নন্দিতা জানালার বাইরের দিকে চোখ রেখেই বলতে লাগল—

— আমি অনেকক্ষণ ধরেই আপনাকে দেখছি।

আপনি বারবার মাথা নিচু করে বসে আছেন।

মনে হচ্ছিল, যেন নিজেকেই দোষ দিচ্ছেন।

একটু থেমে সে আবার বলল—

— কিন্তু আমি আপনাকে যতটুকু চিনেছি, তাতে এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস হয়নি যে আপনি ইচ্ছে করে এমন কাজ করতে পারেন।

মানুষকে চেনা সব সময় অনেক বছরের ব্যাপার নয়।

কখনও কখনও কয়েকটা ছোট ছোট আচরণই যথেষ্ট।

গোপাল কাকুর সঙ্গে আপনার ব্যবহার...

চায়ের দোকানে সবার সঙ্গে কথা বলার ভঙ্গি...

বয়স্ক মানুষদের প্রতি আপনার শ্রদ্ধা...

এসব দেখে আমি একটা মানুষকে চিনেছি।

তাই সকালের ঘটনাটা দেখে আমার মনে একবারও সন্দেহ আসেনি।

অর্ণিবান যেন কথাই হারিয়ে ফেলল।

তার বুকের ভেতরে সারাদিন ধরে জমে থাকা অপমান, অস্বস্তি আর আত্মগ্লানির ভারটা ধীরে ধীরে হালকা হতে লাগল।

সে মনে মনে ভাবল—

আপন মানুষ কি সেই নয়,

যে মানুষের ক্ষতের ওপর নুনের ছিটে দেয় না,

বরং কোনো শব্দ না করেই তার ব্যথাটুকু নিজের মমতায় ঢেকে দেয়?

আজ এই মুহূর্তে নন্দিতাকে কেন যেন খুব কাছের মানুষ বলে মনে হলো।

এই 'কাছের' অনুভূতির মধ্যে প্রেমের কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না।

ছিল না কোনো দাবি।

ছিল শুধু এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা।

জীবনের পথে এমন একজন মানুষকে পাওয়া,

যার সামনে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে হয় না।

যে তোমার কথা শোনার আগেই তোমার চরিত্রের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে।

মানুষের জীবনে এমন বিশ্বাস খুব কমই আসে।

অর্ণিবান অনুভব করল—

ভালোবাসা হয়তো অনেক পরে আসে।

কিন্তু তারও আগে আসে বিশ্বাস।

আর যে বিশ্বাস ক্ষতকে নিরাময় করে,

সেই বিশ্বাসের কাছেই মানুষ একদিন নিজের হৃদয়টাও নিঃশব্দে সমর্পণ করে ফেলে।

জানালার বাইরে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে উঠছিল।

অর্ণিবানের মনে হলো—

আজকের সকালটা তার কাছ থেকে সম্মান কেড়ে নিতে চেয়েছিল।

আর এই বিকেল...

একজন মানুষের বিশ্বাস দিয়ে সেই ভাঙা সম্মানটাকেই আবার নীরবে জোড়া লাগিয়ে দিল।

(চলবে... অধ্যায়–৭ | পর্ব–৩)

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

পর্ব – ১৮ : সাহসের সকাল

পর্ব – ৮ : সাহসের সকাল ইন্টারভিউয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ঈশিতার ফোন কলের সংখ্যা ততই একটু একটু করে বাড়ছিল। খুব দীর্ঘ কথা নয়। নিতান্তই প্রয়োজনের কথা। কখনো কোনো নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন, কখনো যাতায়াতের সময় নিয়ে আলোচনা, কখনো বা শুধু নিশ্চিত হওয়া— — "আপনি তো আসছেন, তাই না?" প্রতিবারই অরিন্দমের একই উত্তর— — "হ্যাঁ, আসছি।" ইন্টারভিউয়ের তিন দিন আগেই সে অফিসে ছুটির আবেদন করে রেখেছিল। কারণ হিসেবে লিখেছিল— 'Personal Work'। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় তার নিজেরই মনে হয়েছিল, বহু বছর পর কোনো ছুটি সে সত্যিই নিজের ইচ্ছায় নিচ্ছে। ইন্টারভিউয়ের আগের দিন দুপুরে অফিসে কাজ করছিল অরিন্দম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "ঈশিতা"। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। তবে আজ সেই কণ্ঠে যেন এক অচেনা অস্থিরতা মিশে আছে। — "ব্যস্ত আছেন?" — "না, বলুন।" কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ঈশিতা ধীরে বলল— — "জানেন, আজ বড় অদ্ভুত লাগছে। এতদিন এই দিনটার জন্যই তো প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন দিনটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আর মনে হচ্ছে সব যেন গু...