Skip to main content

একটি অদৃশ্য ক্ষত -৭

শেষ বার্তাটি

উৎপলবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

টিফিন রুমের ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো বাজতে চলেছে। সহকর্মীরা একজন একজন করে উঠে নিজের ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। কিন্তু অর্ণিবান আর উৎপলবাবুর যেন সময়ের কোনো হিসেব নেই।

উৎপলবাবু ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—

— তারপর আমার বিয়ে হয়ে গেল।

নতুন সংসার...

নতুন দায়িত্ব...

অফিসের কাজও তখন অনেক বেড়ে গেছে।

জীবন অদ্ভুত জিনিস, অর্ণিবান।

সে কাউকে ভুলিয়ে দেয় না, কিন্তু ব্যস্ত করে দেয়।

আমিও ভেবেছিলাম, অদিতি নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিচ্ছে।

হয়তো কোথাও একটা কাজ পেয়ে গেছে।

হয়তো নতুন করে বাঁচতে শিখছে।

এই ভেবেই আর তেমন খোঁজ নেওয়া হয়নি।

অদিতির বার্তাও ধীরে ধীরে কমে গেল।

আগে সপ্তাহে দু-তিনবার লিখত।

তারপর মাসে একবার।

শেষদিকে শুধু উৎসবের দিনে একটি ছোট্ট শুভেচ্ছা।

আর আমি...

আমিও শুধু লিখতাম—

"ভালো থাকবেন।"

আজ ভাবি, মানুষ কখন যে শুধু কথার উত্তর দেয়, মানুষের নয়—তা সে নিজেও বুঝতে পারে না।

প্রায় এক বছর কেটে গেল।

একদিন অন্য একটি সরকারি তদন্তের কাজে আবার সেই গ্রামে যেতে হলো।

সরকারি গাড়ি থেকে নেমে হঠাৎ চোখ পড়ল অদিতিদের বাড়ির দিকে।

আমার পা যেন থমকে গেল।

লোহার গেটে বড় একটা তালা ঝুলছে।

উঠোন জুড়ে আগাছা।

যে শিউলি গাছটার নিচে সাদা ফুল বিছিয়ে থাকত, তার ডালগুলোও যেন অবহেলায় নুয়ে পড়েছে।

বাড়িটা দেখে মনে হচ্ছিল—

অনেক দিন কেউ দরজা খোলেনি।

আমি পাশের বাড়িতে গিয়ে ডাকলাম।

একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম—

— অদিতি কোথায়? বাড়িতে নেই?

বৃদ্ধ মানুষটা আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

তারপর খুব ধীরে বললেন—

— আপনি অনেক দেরি করে ফেললেন স্যার...

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

আমি আবার বললাম—

— মানে?

লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—

— অদিতি আর নেই।

শব্দগুলো কানে এল।

কিন্তু মস্তিষ্ক যেন সেগুলো গ্রহণ করতে পারছিল না।

আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

লোকটা বললেন—

— কয়েক মাস আগে... নিজের ঘরেই আত্মহত্যা করেছে।

আমার চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পরে কোনোরকমে জিজ্ঞেস করলাম—

— কেন?

বৃদ্ধ মানুষটি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন—

— কারণ কি আর একটা হয় স্যার? মানুষ একদিনে মরে না। একটু একটু করে ভেতর থেকে ভেঙে যায়। শেষদিনটা শুধু সবাই দেখতে পায়।

তিনি আরও বললেন—

— যাওয়ার আগে নিজের বাড়ি আর সামান্য যা জমিজমা ছিল, সব রামকৃষ্ণ মিশনের নামে লিখে দিয়ে গেছে। বলেছিল, "আমার তো আর কোনো দরকার নেই। যদি অন্য কারও কাজে লাগে।"

আমার মাথাটা ঝিমঝিম করছিল।

গাড়িতে ফিরে এসে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম।

ড্রাইভার বারবার বলছিল—

— স্যার, শরীর খারাপ লাগছে?

আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি।

শুধু কাঁপা হাতে মোবাইলটা বের করলাম।

হোয়াটসঅ্যাপ খুললাম।

অনেক নিচে স্ক্রল করতে করতে খুঁজে পেলাম—

"অদিতি"

চ্যাটটা খুলতেই বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল...

কারণ সেখানে এখনও বেঁচে ছিল একজন মানুষ।

যে বাস্তবে আর পৃথিবীতে নেই।

(চলবে... )

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

পর্ব – ১৮ : সাহসের সকাল

পর্ব – ৮ : সাহসের সকাল ইন্টারভিউয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ঈশিতার ফোন কলের সংখ্যা ততই একটু একটু করে বাড়ছিল। খুব দীর্ঘ কথা নয়। নিতান্তই প্রয়োজনের কথা। কখনো কোনো নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন, কখনো যাতায়াতের সময় নিয়ে আলোচনা, কখনো বা শুধু নিশ্চিত হওয়া— — "আপনি তো আসছেন, তাই না?" প্রতিবারই অরিন্দমের একই উত্তর— — "হ্যাঁ, আসছি।" ইন্টারভিউয়ের তিন দিন আগেই সে অফিসে ছুটির আবেদন করে রেখেছিল। কারণ হিসেবে লিখেছিল— 'Personal Work'। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় তার নিজেরই মনে হয়েছিল, বহু বছর পর কোনো ছুটি সে সত্যিই নিজের ইচ্ছায় নিচ্ছে। ইন্টারভিউয়ের আগের দিন দুপুরে অফিসে কাজ করছিল অরিন্দম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "ঈশিতা"। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। তবে আজ সেই কণ্ঠে যেন এক অচেনা অস্থিরতা মিশে আছে। — "ব্যস্ত আছেন?" — "না, বলুন।" কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ঈশিতা ধীরে বলল— — "জানেন, আজ বড় অদ্ভুত লাগছে। এতদিন এই দিনটার জন্যই তো প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন দিনটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আর মনে হচ্ছে সব যেন গু...