শেষ বার্তাটি
উৎপলবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
টিফিন রুমের ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো বাজতে চলেছে। সহকর্মীরা একজন একজন করে উঠে নিজের ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। কিন্তু অর্ণিবান আর উৎপলবাবুর যেন সময়ের কোনো হিসেব নেই।
উৎপলবাবু ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—
— তারপর আমার বিয়ে হয়ে গেল।
নতুন সংসার...
নতুন দায়িত্ব...
অফিসের কাজও তখন অনেক বেড়ে গেছে।
জীবন অদ্ভুত জিনিস, অর্ণিবান।
সে কাউকে ভুলিয়ে দেয় না, কিন্তু ব্যস্ত করে দেয়।
আমিও ভেবেছিলাম, অদিতি নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিচ্ছে।
হয়তো কোথাও একটা কাজ পেয়ে গেছে।
হয়তো নতুন করে বাঁচতে শিখছে।
এই ভেবেই আর তেমন খোঁজ নেওয়া হয়নি।
অদিতির বার্তাও ধীরে ধীরে কমে গেল।
আগে সপ্তাহে দু-তিনবার লিখত।
তারপর মাসে একবার।
শেষদিকে শুধু উৎসবের দিনে একটি ছোট্ট শুভেচ্ছা।
আর আমি...
আমিও শুধু লিখতাম—
"ভালো থাকবেন।"
আজ ভাবি, মানুষ কখন যে শুধু কথার উত্তর দেয়, মানুষের নয়—তা সে নিজেও বুঝতে পারে না।
প্রায় এক বছর কেটে গেল।
একদিন অন্য একটি সরকারি তদন্তের কাজে আবার সেই গ্রামে যেতে হলো।
সরকারি গাড়ি থেকে নেমে হঠাৎ চোখ পড়ল অদিতিদের বাড়ির দিকে।
আমার পা যেন থমকে গেল।
লোহার গেটে বড় একটা তালা ঝুলছে।
উঠোন জুড়ে আগাছা।
যে শিউলি গাছটার নিচে সাদা ফুল বিছিয়ে থাকত, তার ডালগুলোও যেন অবহেলায় নুয়ে পড়েছে।
বাড়িটা দেখে মনে হচ্ছিল—
অনেক দিন কেউ দরজা খোলেনি।
আমি পাশের বাড়িতে গিয়ে ডাকলাম।
একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম—
— অদিতি কোথায়? বাড়িতে নেই?
বৃদ্ধ মানুষটা আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব ধীরে বললেন—
— আপনি অনেক দেরি করে ফেললেন স্যার...
আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
আমি আবার বললাম—
— মানে?
লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
— অদিতি আর নেই।
শব্দগুলো কানে এল।
কিন্তু মস্তিষ্ক যেন সেগুলো গ্রহণ করতে পারছিল না।
আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
লোকটা বললেন—
— কয়েক মাস আগে... নিজের ঘরেই আত্মহত্যা করেছে।
আমার চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে কোনোরকমে জিজ্ঞেস করলাম—
— কেন?
বৃদ্ধ মানুষটি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন—
— কারণ কি আর একটা হয় স্যার? মানুষ একদিনে মরে না। একটু একটু করে ভেতর থেকে ভেঙে যায়। শেষদিনটা শুধু সবাই দেখতে পায়।
তিনি আরও বললেন—
— যাওয়ার আগে নিজের বাড়ি আর সামান্য যা জমিজমা ছিল, সব রামকৃষ্ণ মিশনের নামে লিখে দিয়ে গেছে। বলেছিল, "আমার তো আর কোনো দরকার নেই। যদি অন্য কারও কাজে লাগে।"
আমার মাথাটা ঝিমঝিম করছিল।
গাড়িতে ফিরে এসে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম।
ড্রাইভার বারবার বলছিল—
— স্যার, শরীর খারাপ লাগছে?
আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি।
শুধু কাঁপা হাতে মোবাইলটা বের করলাম।
হোয়াটসঅ্যাপ খুললাম।
অনেক নিচে স্ক্রল করতে করতে খুঁজে পেলাম—
"অদিতি"
চ্যাটটা খুলতেই বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল...
কারণ সেখানে এখনও বেঁচে ছিল একজন মানুষ।
যে বাস্তবে আর পৃথিবীতে নেই।
(চলবে... )

Comments
Post a Comment