Skip to main content

রম্য রচনা:লিপস্টিক

লিপস্টিক

(একটি রম্য রচনা)


লিপস্টিক কবে আবিষ্কার হয়েছিল, কে প্রথম ঠোঁটে রং মেখে পৃথিবীকে তাক লাগিয়েছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে আজও কোনো আন্তর্জাতিক গবেষণা হয়নি—মহিলারা এত লিপস্টিক কেন পরেন, আর সত্যিই কি পুরুষরা তাতে আকৃষ্ট হন?

পুরুষদের জিজ্ঞেস করলে বেশিরভাগই বুক ফুলিয়ে বলেন, "আমরা এসব দেখি না। আমরা মানুষের মন দেখি।" কিন্তু সেই ভদ্রলোকই স্ত্রী বা প্রেমিকার প্রশ্ন—"আজ আমার নতুন লিপস্টিকটা কেমন?"—শুনে এমনভাবে উত্তর খুঁজতে থাকেন, যেন UPSC-র ইন্টারভিউ চলছে। কারণ এখানে ভুল উত্তর দিলে নম্বর কাটা নয়, রাতের খাবার কাটার সম্ভাবনাই বেশি!

লিপস্টিকেরও আবার কী সব নাম! আগে ছিল লাল, গোলাপি, মেরুন। এখন নাম শুনলে মনে হয় কোনো কবি নতুন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন—"রোজ ড্রিম", "বারগান্ডি সিক্রেট", "চেরি ব্লিস", "মিস্টিক নিউড", "সানসেট কিস"। ঠোঁটে রং লাগাবেন, না প্রেমপত্র লিখবেন—বোঝাই দায়!

একসময় মানুষ আয়নায় নিজের মুখ দেখত। এখন অনেকের কাছে মনে হয়, আয়নাটা যেন লিপস্টিকের কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার। একবার লাগানো, তারপর ঠোঁট গোল করা, আবার লাগানো, আবার ঠোঁট চেপে ধরা, তারপর আবার পরীক্ষা। এমন মনোযোগে বিজ্ঞানীরা যদি গবেষণা করতেন, হয়তো মঙ্গল গ্রহেও এখন বাঙালির চায়ের দোকান খুলে যেত!

লিপস্টিকের আর-এক আশ্চর্য ক্ষমতা হলো—এটি কখনো শুধু ঠোঁটে থাকে না। চায়ের কাপে, কফির মগে, জলের বোতলে, টিস্যুতে, মোবাইলের স্ক্রিনে—সব জায়গায় নিজের উপস্থিতির সাক্ষর রেখে যায়। মনে হয়, ঠোঁট নয়, যেন সরকারি অফিসে হাজিরা খাতা সই করা হচ্ছে।

সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন

"বলো তো, আজ আমার মধ্যে কী আলাদা লাগছে?"

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে পৃথিবীর অসংখ্য পুরুষের আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়েছে।

বললেন, "নতুন লিপস্টিক?"

— "শুধু লিপস্টিক? আমি চুলও কেটেছি!"

বললেন, "চুল কেটেছ?"

— "তা হলে লিপস্টিকটা দেখলে না?"

বললেন, "দুটোই খুব সুন্দর।"

— "মিথ্যে প্রশংসা করছ!"

এই পরীক্ষার সিলেবাস আজও কেউ খুঁজে পায়নি।

আরেকটি বিষয় আমার মাথায় ঢোকে না। বাড়িতে আলমারির এক ড্রয়ারে সারি সারি লিপস্টিক। লাল আছে, হালকা লাল আছে, গাঢ় লাল আছে, একটু কম গাঢ় লাল আছে, 'প্রায় লাল' আছে, 'লাল নয় কিন্তু লালের মতো' আছে। পুরুষের চোখে সবই লাল। কিন্তু এই কথা মুখ ফসকে বলে ফেললে সংসারে লালবাতি জ্বলে যেতে পারে।

একদিন পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্না উপভোগ করতে বেরিয়েছি। চারদিকে নিস্তব্ধতা, সাদা চাঁদের আলোয় গাছপালাও যেন কবিতা লিখছে। হঠাৎ দূরে দেখি—অন্ধকারের মধ্যে দুটি টকটকে লাল দাগ নড়ছে! ছোটবেলা থেকেই ভূতের ভয় আছে। মনে হলো, এ নিশ্চয়ই কোনো নতুন প্রজাতির ভূত, যার চোখ নয়, মুখটাই জ্বলজ্বল করছে!

সাহস সঞ্চয় করে একটু একটু করে এগিয়ে গেলাম। কাছে গিয়ে দেখি, ভূত নয়—দুই তরুণী দিব্যি গল্প করতে করতে হাঁটছেন। চাঁদের আলোয় মুখ তেমন বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু ঠোঁটের লিপস্টিক এমন উজ্জ্বল যে মনে হচ্ছে, পূর্ণিমার চাঁদের সঙ্গে কে বেশি আলো ছড়াবে, সেই প্রতিযোগিতা চলছে!

সেদিনই বুঝলাম, লিপস্টিকের কোনো বয়স নেই। আট বছরের খুকি থেকে আশি বছরের ঠাকুমা—সবার কাছেই এর সমান কদর।

কিছুদিন পর এক অনুষ্ঠানে দেখি, এক প্রবীণ ঠাকুমাও দিব্যি গাঢ় লিপস্টিক পরে বসে আছেন। আমি মুচকি হেসে বললাম—

— "ঠাকুমা, আজ তো আপনাকে একেবারে নায়িকা লাগছে!"

ঠাকুমা একটুও না হেসে গম্ভীর মুখে উত্তর দিলেন—

— "কী করব বাবা! দাঁত তো অনেক আগেই চলে গেছে, এখন অন্তত ঠোঁট দুটোকে একটু সম্মান দিয়ে রাখি!"

সেদিন বুঝলাম, বয়স মানুষকে বুড়ো করে, কিন্তু সাজগোজ করার ইচ্ছেটাকে নয়।

তবে একটি কথা স্বীকার করতেই হবে। লিপস্টিকের আসল শক্তি তার রঙে নয়, আত্মবিশ্বাসে। কেউ এটি ব্যবহার করে নিজেকে সুন্দর অনুভব করেন, সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। তাই এই লেখার উদ্দেশ্য লিপস্টিককে নয়, আমাদের সেই চিরচেনা সামাজিক নাটকগুলোকে নিয়ে একটু হেসে নেওয়া।

শেষ কথা

যদি সত্যিই পুরুষরা লিপস্টিকে এতটা আকৃষ্ট না-ই হন, তাহলে প্রতি বছর বাজারে এত নতুন নতুন শেড আসে কী করে? রহস্যটা হয়তো ঠোঁটে নয়, বিজ্ঞাপনে লুকিয়ে আছে। সেই রহস্যের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত গবেষণা চলুক!

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...
🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান, আর প্রতিদিনের নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফিস শু...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...