Skip to main content

নিরিবিলির প্রেমে

নিরিবিলির প্রেমে

আমি আর খোঁজ রাখি না—
সেই বন্ধুদের, যাদের সাথে দিনরাত জমত আড্ডা,
চায়ের দোকানের ধোঁয়ায় হারিয়ে যেত বিকেল,
তাসের টেবিলে মিলত হাসি আর হারের হিসেব।
আজ সেসব নামও বুকের ভেতর ধুলো হয়ে আছে।
পুরনো পাতার মতো, যা ঝরে গেছে নিঃশব্দে,
কোনো শোক না রেখেই।

আমি আর খোঁজ রাখি না—
পাড়ার কার বউ কার সাথে,
কে কার বিরুদ্ধে, কার ছেলে প্রথম হলো,
কার মেয়ে গেল বিদেশে, কে বানাল কত বড়ো বাড়ি—
এসব খবর আর ডাকে না আমাকে।
এসব কোলাহল আজ আমার কাছে
দূরের কোনো জনপদের গুঞ্জন মাত্র।

জীবনকে সাজিয়ে নিয়েছি আমি
অরণ্যের বুক চিরে বয়ে চলা এক নদীর মতো—
নিঃশব্দ, নিজের ছন্দে, নিজের স্রোতে।
যার কোনো তাড়া নেই, কোনো দর্শক নেই,
যে জানে না তার জল কতদূর যাবে,
শুধু জানে বয়ে যেতে হবে,
নিজের ছন্দে, নিজের স্রোতে,
পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে
নিজের ভেতরই নিজের গান বাজিয়ে।
কোনো ঢেউ নেই তার আস্ফালনের,
শুধু এক নিরন্তর, নিভৃত বয়ে চলা—
যেমন করে বয়ে চলে সময়,
কারো অপেক্ষায় না থেকে।

ওই যে, যার সাথে রাত পেরিয়ে যেত ফোনের ওপারে—
হাসি, কান্না, রাগ, অভিমান, তারপর একদিন বিচ্ছেদ—
অনেক বছর হলো।
সে কেমন আছে, আমি আর জানি না,
জানার ইচ্ছেও নেই।
কারণ আমি এখন নিরিবিলির সঙ্গে সম্পর্কে আছি।

এখন যুদ্ধের খবর আর জাগিয়ে রাখে না আমাকে,
ক্রিকেটের জয়ে ভাসি না উল্লাসে,
পরাজয়ে মনেও নামে না অন্ধকার।
কে মন্ত্রী হলো, কে নায়ক, কে বিখ্যাত, কে হারিয়ে গেল—
সব খবর বাতাসের মতো চলে যায় পাশ দিয়ে।

পৃথিবী প্রতিদিন লেখে নতুন গল্প,
আর আমি প্রতিদিন একটু একটু সরে আসি
সেই গল্পের বাইরে।

এখন আমার পৃথিবী অনেক ছোট—
এক কাপ চা, দু-একটা বই,
কয়েকটি গাছ, একফালি আকাশ, একফালি চাঁদ
আর নিজের সঙ্গে নীরব কিছু কথোপকথন।

আজ বুঝেছি—
সব খবর জানা জীবন নয়,
সব মানুষের ভিড়ে থাকা বেঁচে থাকা নয়।
কখনও কখনও সবচেয়ে গভীর প্রেম
কোনো মানুষের সঙ্গে নয়—
এক টুকরো নিরিবিলির সঙ্গে।

সেখানেই আমার শান্তি।
সেখানেই আমি, অবশেষে,
নিজেকে খুঁজে পেয়েছি।

আমি আর খোজ রাখি না
নিরিবিলি আমায় দুহাত ভরে আপন করেছে

— অভিমানী

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...
🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান, আর প্রতিদিনের নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফিস শু...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...