সপ্তম অধ্যায় :
সারারাতের বৃষ্টির পর সকালের আকাশে আজ একরাশ ধূসর মেঘ। সূর্য উঠেছে ঠিকই, কিন্তু পাতলা মেঘের আড়াল থেকে তার আলো যেন পৃথিবীর গায়ে নরম হাতে ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মের এক কোণে এখনও বৃষ্টির জল জমে আছে। রেললাইনের ধারে ভেজা ঘাসের ডগায় ছোট ছোট শিশিরবিন্দু ঝুলছে।
গোপাল কাকুর ছোট্ট চায়ের দোকানটা প্রতিদিনের মতোই দিনের শুরু ঘোষণা করে দিয়েছে।
চুলোর ওপর কেটলিতে চা ফুটছে। আদা আর এলাচের গন্ধ মিশে ভেজা সকালের বাতাসকে আরও আপন করে তুলেছে। দু-একজন নিয়মিত যাত্রী ইতিমধ্যেই চায়ের গ্লাস হাতে গল্পে মেতে উঠেছেন।
ঠিক সেই সময় প্রায় একই সঙ্গে দু'জন মানুষ এসে দাঁড়াল দোকানের সামনে।
একজন পূর্ব দিকের রাস্তা ধরে।
অন্যজন পশ্চিমের কাঁচা পথ পেরিয়ে।
অনির্বাণ।
নন্দিতা।
গোপাল কাকু দু'জনকে দেখে মুচকি হেসে বললেন—
— আজ তো দেখি দু'জনেই একটু আগে!
দু'জনেই ভদ্রতার হাসি ফিরিয়ে দিল।
অনির্বাণ বলল—
— এক কাপ চা, কাকু।
প্রায় একই সঙ্গে নন্দিতাও বলল—
— আমারও একটা।
পাশাপাশি রাখা দুটি কাঁচের গ্লাস থেকে ধোঁয়া ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল।
দু'জন পাশাপাশি বসেছিল।
মাঝখানে সামান্য দূরত্ব।
অথচ সেই দূরত্বেরও যেন নিজস্ব এক নীরব ভাষা ছিল।
অনির্বাণ একবার চোখ তুলে তাকাল।
নন্দিতাও তাকিয়েছিল।
আজ সে আড়চোখে নয়, সরাসরি তাকিয়েছিল।
দৃষ্টিটা খুব অল্প সময়ের।
তবু সেই কয়েক মুহূর্তে যেন অজস্র নীরব প্রশ্ন ভেসে গেল।
ঠিক তখনই গোপাল কাকু চায়ের কেটলিটা নামিয়ে বললেন—
— কী বাবা, কাল তো এলে না! ভাবলাম শরীর-টরীর খারাপ হলো নাকি?
অনির্বাণ মৃদু হেসে বলল—
— না কাকু। বাবাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ একজন ভালো ডাক্তারের খবর পেলাম। তাই আর আসা হয়নি।
— এখন কেমন আছেন?
— আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো। ডাক্তার বলেছেন, নিয়ম করে ওষুধ খেলেই সামলে উঠবেন।
গোপাল কাকু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
— সে তো ভালো খবর। বয়স হলে নিজের চেয়ে বাড়ির লোকের চিন্তাই বেশি হয়।
অনির্বাণ শুধু মাথা নাড়ল।
নন্দিতা চুপচাপ চায়ে চুমুক দিল।
কেন জানি তার বুকের ভেতরটাও একটু হালকা লাগল।
কাল থেকে যে অকারণ প্রশ্নটা তাকে বারবার তাড়া করছিল, তার উত্তর আজ সে পেয়ে গেছে।
ঠিক সেই সময় দূর থেকে ভেসে এল ট্রেনের দীর্ঘ হুইসেল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই প্ল্যাটফর্মের অলসতা কেটে গিয়ে চারদিকে ব্যস্ততার ছন্দ নেমে এল।
নন্দিতা ধীরে ধীরে মহিলাদের কামরার দিকে এগিয়ে গেল।
ট্রেনটা তখন সম্পূর্ণ থেমে গেছে। নামা-ওঠার ব্যস্ততায় মুহূর্তের মধ্যেই প্ল্যাটফর্ম ভরে উঠল। কেউ তাড়াহুড়ো করে দরজার দিকে এগোচ্ছে, কেউ আবার নামতে গিয়েই পথ আটকে ফেলেছে। প্রতিদিনের মতোই কয়েক মিনিটের ছোট্ট বিশৃঙ্খলা।
নন্দিতা এক হাত দিয়ে শাড়ির আঁচল সামলে কামরায় উঠতে যাবে, ঠিক সেই সময় কাঁধের ব্যাগের লম্বা ফিতেটা দরজার লোহার হাতলে গিয়ে আটকে গেল।
প্রথমে সে বুঝতেই পারল না।
একটু টান দিতেই ফিতেটা আরও শক্ত হয়ে জড়িয়ে গেল।
— দিদি, একটু তাড়াতাড়ি করুন...
পেছন থেকে কারও তাড়া দেওয়ার গলা ভেসে এল।
অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল নন্দিতা। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা ছাড়ানোর চেষ্টা করেও কিছুতেই পারছিল না।
ঠিক তখনই পাশ থেকে শান্ত স্বরে একটি কথা শোনা গেল—
— একটু দাঁড়ান...
অনির্বাণ।
সে কোনো তাড়াহুড়ো করল না।
প্রথমে একবার ফিতেটা কীভাবে আটকে আছে সেটা দেখল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাতলের ফাঁক দিয়ে ফিতেটা আলতো করে ঘুরিয়ে দিল।
মুহূর্তের মধ্যেই ব্যাগটা খুলে এল।
নন্দিতা এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই দৃষ্টিতে লজ্জা ছিল না, ছিল একরাশ স্বস্তি আর নিঃশব্দ কৃতজ্ঞতা।
খুব আস্তে বলল—
— ধন্যবাদ।
অনির্বাণের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— সাবধানে উঠুন।
আর কোনো কথা হলো না।
নন্দিতা কামরায় উঠে দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
অনির্বাণও নিজের কামরার দিকে এগিয়ে গেল।
ট্রেনের দীর্ঘ হুইসেল বেজে উঠল।
ধীরে ধীরে চাকা ঘুরতে শুরু করল।
প্ল্যাটফর্ম পিছিয়ে যেতে লাগল।
কামরার দরজার পাশে দাঁড়িয়ে নন্দিতা অজান্তেই ব্যাগের ফিতেটার ওপর হাত রাখল।
কয়েক মুহূর্ত আগের ঘটনাটা যেন এখনও সেখানে নীরবে লেগে আছে।
অন্যদিকে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে অনির্বাণ একবার বাইরে তাকাল।
গোপাল কাকু তখন আবার কেটলিতে জল চাপিয়ে দিয়েছেন।
চায়ের ধোঁয়া ধীরে ধীরে ভেজা সকালের বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।
স্টেশনও আবার তার প্রতিদিনের ছন্দে ফিরে গেল।
সকালের ট্রেন থেকে নেমে অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে অনির্বাণের মনে হঠাৎ করেই ভেসে উঠল কয়েক মিনিট আগের ঘটনাটা।
ভিড়ের মধ্যে আটকে যাওয়া একটি ব্যাগের ফিতে।
একটি শান্ত কণ্ঠ—
“ধন্যবাদ।”
আর তার নিজেরই অজান্তে বলা দুটি শব্দ—
“সাবধানে উঠুন।”
মুখে অজান্তেই একটুখানি হাসি ফুটে উঠেছিল।
পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল।
জীবনের সব অনুভূতিরই আলাদা সময় আছে।
সরকারি অফিসের গেট পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবনাগুলো যেন দায়িত্বের কাছে নীরবে সরে দাঁড়াল।
টেবিলে বসতে না বসতেই অফিসের পিয়ন এসে বলল—
— অনির্বাণবাবু, বিডিও সাহেব আপনাকে একবার ডাকছেন।
ফাইলটা হাতে নিয়েই অনির্বাণ বিডিও সাহেবের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, আর্থিক বরাদ্দ, অগ্রগতির রিপোর্ট—একটির পর একটি নথি টেবিলে সাজানো।
বিডিও সাহেব সংক্ষেপে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলেন।
কোথাও তথ্য যাচাই করতে হবে, কোথাও রিপোর্ট সংশোধন, আবার কোথাও জরুরি নথি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাঠাতে হবে।
— আজই কাজগুলো শেষ করতে হবে, অনির্বাণ।
— স্যার।
নিজের টেবিলে ফিরে এসে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না সে।
ফাইলের পর ফাইল খুলে দেখা।
প্রয়োজনীয় নোট লেখা।
রিপোর্ট মিলিয়ে দেখা।
ফোনে তথ্য সংগ্রহ।
কম্পিউটারের পর্দায় একের পর এক সরকারি নথি খুলে যাচ্ছিল।
শেষ ফাইলটায় মন্তব্য লিখে স্বাক্ষর করতেই অনির্বাণ একবার ঘড়ির দিকে তাকাল।
বিকেল তিনটে পেরিয়ে গেছে।
একটানা কাজের চাপের পর সে চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে একটু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
সরকারি অফিসের দিনগুলোও যেন একেকটা ঋতুর মতো।
কখনও এমন সময় আসে, যখন মাথা তোলারও অবকাশ থাকে না। একটার পর একটা ফাইল, মিটিং, রিপোর্ট, ফোন—দিন কখন সন্ধ্যায় গড়িয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না।
আবার কোনো কোনো দিন কাজের সেই প্রবল স্রোত ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে।
আজ তেমনই এক বিকেল।
কেউ টিফিনের বাক্স গুছিয়ে রাখছে।
কেউ সহকর্মীর সঙ্গে দু'দণ্ড গল্পে মেতে উঠেছে।
করিডরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কোথাও মৃদু হাসির শব্দ ভেসে আসছে।
অনির্বাণও টিফিন সেরে টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্র গুছিয়ে রাখছিল।
ঠিক তখনই করিডরের দিক থেকে ভেসে এল এক পরিচিত প্রাণখোলা কণ্ঠ—
— কী গো, কাগজের পাহাড়টা আজ একটু ছোট হলো নাকি?
কথাটা শুনেই অফিসঘরের কয়েকজন মুখ তুলে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
অনির্বাণের মুখেও অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
এই কণ্ঠস্বর ভুল হওয়ার নয়।
কবিয়াল মধুসূদন মাস্টার এসেছেন।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সহজ-সরল হাসিমুখে।
কাঁধে বহুদিনের সঙ্গী পুরোনো কাপড়ের ঝোলা।
গলায় তুলসীর মালা।
দুই হাতের আঙুলে নানা রঙের পাথর বসানো কয়েকটি আংটি।
পরনে ধবধবে সাদা ধুতি আর হালকা ফিকে হয়ে আসা পাঞ্জাবি।
মুখভরা স্নিগ্ধ হাসি যেন মানুষটিকে আরও আপন করে তুলেছে।
অফিসে তিনি নতুন কেউ নন।
পাশের গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্যারা-শিক্ষক।
প্রয়োজন হলে মাঝেমধ্যেই ব্লক অফিসে আসেন।
কিন্তু শুধু শিক্ষক হিসেবেই নয়, একজন কবিয়াল হিসেবেও তাঁর পরিচিতি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।
তাঁকে দেখলেই অফিসের ব্যস্ত বিকেলগুলো যেন একটু প্রাণ ফিরে পায়।
অনির্বাণ উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল।
মুখে আন্তরিক হাসি।
— আরে মাস্টারমশাই! অনেকদিন পর এলেন যে!
মধুসূদন মাস্টার হেসে ঝোলাটা টেবিলের পাশে নামিয়ে রাখলেন।
— স্কুলের কাজ, আবার গান নিয়ে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি। তাই আর আসা হয় না ।
অফিসের এক কর্মচারী এগিয়ে এসে বললেন—
— মাস্টারমশাই, এক কাপ চা দেব?
— দাও না বাবা। আপনাদের অফিসের চায়ের স্বাদটাই আলাদা।
ঘরজুড়ে হালকা হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়ল।
অনির্বাণ মানুষটিকে গভীর শ্রদ্ধা করত।
প্রথম আলাপের দিন থেকেই সে বুঝেছিল, মধুসূদন মাস্টার শুধু গান লেখেন না—মানুষকে পড়েন।
অনির্বাণের বিশ্বাস, মানুষের হাতে যত শক্তি, তার চেয়েও বেশি শক্তি লুকিয়ে থাকে শব্দে।
একটি বাক্য মানুষকে ভেঙে দিতে পারে।
আবার একটি বাক্যই মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সাহস জোগাতে পারে।
ইতিহাসে এমন অগণিত উদাহরণ ছড়িয়ে আছে।
সেই কারণেই মধুসূদন মাস্টারের মতো মানুষদের সে আলাদা চোখে দেখত।
সামান্য সম্মানীর এক প্যারা-শিক্ষক।
সংসার চলে কষ্টে।
তবু মুখে অভিযোগ নেই।
ছোটবেলা থেকে কবিগান, পালাগান আর লোকসঙ্গীতের যে নেশা বুকের ভেতর বাসা বেঁধেছিল, সেটাই আজ তাঁর দ্বিতীয় জীবিকা।
জেলার নানা প্রান্তে কবিয়ালের আসর বসে।
তিনি গান লেখেন।
সুর বাঁধেন।
কবি-লড়াই করেন।
তাঁর লেখা কত গান যে অন্য শিল্পীর কণ্ঠে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে, তার হিসেব হয়তো তিনিও জানেন না।
কিন্তু সেই নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র অহংকার নেই।
বরং তিনি প্রায়ই হেসে বলেন—
— গান যদি মানুষের মুখে বেঁচে থাকে, লেখকের নামটা না থাকলেও ক্ষতি কী বলো?
অনির্বাণ মৃদু হেসে বলল—
— নতুন কিছু লিখছেন নাকি?
মধুসূদন মাস্টারের চোখ দুটো হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
তিনি ধীরে ধীরে ঝোলার ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটি পুরোনো নীল মলাটের ডায়েরি বের করলেন।
ডায়েরির পাতাগুলো নানা রঙের কালিতে ভরা।
কোথাও কাটাকাটি।
কোথাও নতুন করে লেখা কয়েকটি পঙ্ক্তি।
মাস্টারমশাই পাতাটা খুলে মৃদু হেসে বললেন—
— একটা নতুন গান লিখছি .. শুনবে?
অনির্বাণ চেয়ারটা একটু এগিয়ে বসল।
অফিসঘরের আরও দু-একজন কর্মচারীও কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রইলেন।
মধুসূদন মাস্টার ডায়েরির পাতা উল্টে এক জায়গায় এসে থামলেন।
কয়েক মুহূর্ত চোখ বুজে রইলেন।
তারপর ধীর, শান্ত কণ্ঠে পড়তে শুরু করলেন—
জীবন মানে নদীর স্রোতে,
নৌকা ভাসার গান,
কখন জোয়ার, কখন ভাটা,
বুঝে না কোনো প্রাণ।মুঠো ভরে সুখ যে ধরিস,
ফাঁক দিয়ে যায় সরে,
দুঃখ এসে কাঁধে বসে,
হাসতে শেখায় পরে।রোদ না পেলে গাছ কি বল,
ছায়া দিতে শেখে?
ঝড় না এলে মাঝির হাতে,
হাল কি শক্ত থাকে?মানুষ বড় ঘর বানায়,
ঘর কি মানুষ হয়?
ভালোবাসার দুটি কথা,
সেই তো চিরময়।খালি হাতে এলি যখন,
খালি হাতেই যাবি,
মাঝখানে রে যতটুকু পথ,
মানুষ হয়ে থাকবি।নামটা মুছে যাবে একদিন,
থাকবে শুধু কাজ,
জীবন যদি মানুষ গড়ে,
সেই তো বড় সাজ।
ঘরটা কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কারও মুখে কোনো কথা নেই।
অনির্বাণের মনে হলো, গানটা যেন শুধু শোনা যায় না—ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে গিয়ে বসে।
ডায়েরিটা আলতো করে বন্ধ করলেন মধুসূদন মাস্টার।
জানালার বাইরে একবার তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন—
— জানো , জীবনটা বড় কঠিন।
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন—
— একটা সূচের ডগায় যদি সর্ষে রেখে হাঁটতে বলা হয়, মানুষ যেমন পা ফেলবে ভেবে ভেবে, জীবনও ঠিক তেমন করেই হাঁটতে হয়।
— একটুখানি অসাবধান হলেই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। তখন যা ছড়িয়ে পড়ে, তা আবার কুড়িয়ে নিতে অনেকটা জীবন লেগে যায়।
অনির্বাণ চুপচাপ শুনছিল।
মধুসূদন মাস্টার আবার হেসে বললেন—
— তাই আমি মানুষকে শেখানোর জন্য গান লিখি না। নিজের মনকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য লিখি। কারণ, সবচেয়ে কঠিন শিক্ষার্থী হচ্ছে নিজের মন।
অনির্বাণ কোনো উত্তর দিল না।
শুধু মনে হলো, কিছু মানুষ বই লিখে শিক্ষা দেন না, জীবন বাঁচিয়েই শিক্ষা দিয়ে যান।
বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে অফিসঘরের মেঝের ওপর লম্বা হয়ে পড়ছে।
আর সেই নীরব আলোর ভেতরেই কথাগুলো অনির্বাণের মনে অদৃশ্য অক্ষরে লিখে রইল।

Comments
Post a Comment