Skip to main content

পর্ব – ২ : মধ্যবিত্তের বাজার

বাজারে ঢুকতেই যেন অন্য এক পৃথিবী।

চারদিক মানুষের কোলাহলে মুখর।

কেউ হাঁক দিচ্ছে—

আলু নিন... টাটকা আলু...

আরেকজন বলছে—

এই যে দাদা, আজকের পটল... একেবারে ক্ষেত থেকে তোলা।

কোথাও ঝিঙে, কোথাও উচ্ছে, কোথাও আবার বেগুনের স্তূপ।

সবুজ ধনেপাতার গন্ধে মিশে আছে কাঁচা লঙ্কার ঝাঁঝ।

আদা, রসুন, পেঁয়াজের ছোট ছোট দোকান।

কেউ বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে বসেছে।

কেউ আবার মাটিতে ত্রিপল পেতে।

বাজারের এই দৃশ্যটা অনির্বাণের খুব প্রিয়।

এখানে বড় ছোট বলে কিছু নেই।

সবার জীবনই যেন নিজের নিজের লড়াই নিয়ে পাশাপাশি বসে আছে।

অনির্বাণ কোনোদিন এক দোকান থেকেই সব কেনাকাটা করে না।

সে জানে, কোন দোকানে আলু ভালো।

কোথায় পেঁয়াজ একটু সস্তা।

কোথায় ধনেপাতা টাটকা থাকে।

এক দোকান থেকে আলু।

আরেক দোকান থেকে টমেটো।

লঙ্কা আর পেঁয়াজ অন্য জায়গা থেকে।

এভাবেই ধীরে ধীরে বাজারের ব্যাগটা ভরে ওঠে।

এক দোকানি হেসে বলল—

দাদা, আপনাকে তো দরদাম করতেই হয় না। দাম জিজ্ঞেস করে আবার অন্য দোকানে চলে যান!

অনির্বাণও হেসে উত্তর দিল—

আপনাদেরও তো সংসার আছে, আমারও আছে।

চারপাশে কয়েকজন হেসে উঠল।

অনির্বাণের মনে হয়—

মধ্যবিত্ত মানুষ দরদাম করে দোকানিকে হারানোর জন্য নয়।

নিজের সংসারের হিসাবটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

মাসের শেষে পাঁচ টাকা, দশ টাকা করেই তো একটা সংসারের সঞ্চয় তৈরি হয়।

একজন দিনমজুর যেমন ঘামের মূল্য বোঝে, তেমনি একজন মধ্যবিত্ত মানুষ বোঝে প্রতিটি টাকার মূল্য।

কেউ হয়তো বাইরে থেকে দেখে ভাবে—

"এতটুকু টাকা নিয়ে এত হিসাব!"

কিন্তু সেই হিসাবের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে—

বাবার ওষুধ,

মায়ের শাড়ি,

সন্তানের স্কুলের ফি,

মাসের বিদ্যুতের বিল,

আর ভবিষ্যতের জন্য একটু একটু করে জমিয়ে রাখা আশা।

বাজারে হাঁটতে হাঁটতে অনেকেই অনির্বাণকে দেখে হাসিমুখে সম্ভাষণ জানায়।

কেউ বলে—

অনির্বাণবাবু, আজ একাই বাজার?

কেউ আবার বলে—

বাবা কেমন আছেন এখন?

অনির্বাণও সবার সঙ্গে দু'চার কথা বলে।

এই বাজারে তার খুব বেশি আত্মীয় নেই।

তবু অদ্ভুতভাবে সবাই যেন আপন।

একসময় সে বাজারের এক কোণে এসে দাঁড়াল।

ছোট্ট একটা ত্রিপলের ওপর সাজানো রয়েছে লাউ, কুমড়ো, পুঁইশাক, ঝিঙে, কচু আর কয়েক আঁটি ধনেপাতা।

দূর থেকেই একটা চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

— আয় বাবা... আজ এত দেরি করলি?

অনির্বাণের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

বুড়ি মার দোকানে না এলে যেন তার বাজারটাই সম্পূর্ণ হয় না।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...