Skip to main content

পর্ব – ৪ : মানুষ আসলে কী চায়?

অনির্বাণ বাজারের ব্যাগে সবজিগুলো গুছিয়ে রাখছিল।

ঠিক তখনই বুড়ি মা চুপিচুপি এক আঁটি ধনেপাতা আর দুটো কাঁচা লঙ্কা ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন।

অনির্বাণ সঙ্গে সঙ্গে দেখে ফেলল।

— আবার শুরু করলে বুড়ি মা?

বৃদ্ধা কিছু না বলে শুধু মিটিমিটি হেসে রইলেন।

— এগুলো বের করে নাও। কতবার বলেছি, আমার কাছ থেকে আলাদা ব্যবহার করবে না।

বুড়ি মা এবার অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন—

— বাবা, সব কিছুর দাম টাকায় হয় না। এটা বিক্রি করছি না, আশীর্বাদ দিচ্ছি। আশীর্বাদের দাম নিলে পাপ হবে।

অনির্বাণ আর কোনো কথা বলতে পারল না।

চুপচাপ বৃদ্ধার পায়ে হাত ছুঁয়ে প্রণাম করল।

বুড়ি মা কাঁপা হাতে মাথায় হাত রেখে বললেন—

— ভালো থাকিস বাবা। নিজের মানুষগুলোকে আগলে রাখিস। মানুষ পাশে থাকলে সংসার কখনও গরিব হয় না।

বাজারের ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে অনির্বাণের মনটা অদ্ভুত শান্ত হয়ে গেল।

তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল—

মানুষ আসলে কী চায়?

অর্থ?

সম্মান?

নাকি আরও বড় কিছু?

উত্তরটা যেন খুব দূরে ছিল না।

এই বুড়ি মার হাসির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল।

মানুষ শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাই চায়।

ভালোবাসা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

একজন বাবা দিনের পর দিন রোদে-জলে পরিশ্রম করেন— সেটাও ভালোবাসা।

একজন মা আগুনের তাপে ঘামতে ঘামতে রান্না করেন— সেটাও ভালোবাসা।

একজন শিক্ষক একই পাঠ বছরের পর বছর পড়িয়ে যান— সেখানেও ভালোবাসা আছে।

একজন কৃষক বীজ বুনে মাসের পর মাস অপেক্ষা করেন— সেই অপেক্ষার নামও ভালোবাসা।

কর্তব্য মানুষকে কাজ শুরু করতে শেখায়।

কিন্তু ভালোবাসা মানুষকে সেই কাজ বছরের পর বছর করে যাওয়ার শক্তি দেয়।

হয়তো সেই কারণেই বুড়ি মা এখনও বাজারে আসেন।

সংসারের অভাব আজ আর নেই।

তবু এই বাজার ছেড়ে তিনি থাকতে পারেন না।

কারণ এই বাজারে শুধু তাঁর রোজগার নেই।

আছে তাঁর জীবনের অগণিত স্মৃতি।

আছে মানুষের মুখ।

আছে খোঁজখবর নেওয়া।

আছে সম্পর্ক।

মানুষ শুধু ভাত খেয়ে বাঁচে না।
সে বাঁচে সম্পর্কের স্পর্শে।
সে বাঁচে ভালোবাসায়।

অনির্বাণের মনে হলো—

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভাব অর্থের নয়।
সবচেয়ে বড় অভাব ভালোবাসার।

যে মানুষ ভালোবাসা পায়,
সে অভাব নিয়েও হাসতে পারে।

আর যে মানুষ ভালোবাসাহীন,
তার কাছে প্রাচুর্যও একসময় শূন্য হয়ে যায়।

ভাবতে ভাবতেই সে মাছের বাজারের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

সামনে ভেসে আসছে মাছওয়ালাদের চেনা হাঁক—

"এই যে দাদা... টাটকা পাবদা... একবার দেখে যান!"

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...
🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান, আর প্রতিদিনের নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফিস শু...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...