Skip to main content

পর্ব – ৬ : বৃষ্টির আটচালা

আকাশের দিকে তাকিয়ে অনির্বাণ বুঝল, এই বৃষ্টি এত সহজে থামার নয়।

মুহূর্তের মধ্যেই ঝমঝমিয়ে নেমে এল বর্ষা।

টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ যেন একটানা তবলার তালে বাজতে লাগল।

অনির্বাণ সাইকেলটা পাশে রেখে বন্ধ দোকানের আটচালার নিচে দাঁড়িয়ে রইল।

তার সঙ্গে আরও কয়েকজন আশ্রয় নিয়েছেন।

কেউ ভিজে গামছা নিংড়াচ্ছেন।

কেউ মোবাইল ফোনে রিল দেখে হেসে উঠছেন।

দু-একজন চুপচাপ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে।

আর এক কোণে চার-পাঁচজন ভদ্রলোক বেশ জমিয়ে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছেন।

দেশটার আর কিছু হবে না।

সব দোষ সরকারের।

আরে না না, আগের সরকার থাকলেও একই হতো।

ভোটের সময় সবাই বড় বড় কথা বলে। তারপর কেউ আর মানুষকে মনে রাখে না।

কথার সঙ্গে সঙ্গে হাতও নাড়ছে।

কখনও গলার স্বর উঁচু হচ্ছে।

কখনও সবাই একসঙ্গে কথা বলছে।

দেখলে মনে হবে, এই আটচালাতেই বুঝি দেশের ভবিষ্যৎ ঠিক হয়ে যাবে।

অনির্বাণ মৃদু হেসে মাথা নিচু করল।

রাজনীতি সম্পর্কে তার নিজস্ব মতামত অবশ্যই আছে।

কিন্তু সে অকারণ তর্কে বিশ্বাস করে না।

ছোটবেলা থেকেই সে শিখেছে—

কথা কম বললেও মানুষ হওয়া যায়,
কিন্তু শুধু কথা বলে কখনও মানুষ হওয়া যায় না।

সে বরং মানুষকে দেখতে ভালোবাসে।

শুনতে ভালোবাসে।

কারও জীবনের গল্প, কারও সংগ্রাম, কারও স্বপ্ন— এইসব গল্পই তার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।

সময় কেটে যাচ্ছে।

বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই।

ঘড়িতে প্রায় এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে।

অনির্বাণ বাজারের ব্যাগটার দিকে তাকাল।

মাছ আছে।

সবজি আছে।

বাড়িতে সবাই অপেক্ষা করছে।

সে মনে মনে ভাবল—

"আর দাঁড়িয়ে লাভ নেই। একটু ভিজেই না হয় বাড়ি ফিরব।"

সাইকেলটা হাতে নিয়ে আটচালা থেকে বেরিয়ে এল।

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মুহূর্তের মধ্যেই জামাকাপড় ভিজিয়ে দিল।

ঠিক তখনই পিছন থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল—

— অনির্বাণবাবু...!

হঠাৎ নিজের নাম শুনে অনির্বাণ থমকে দাঁড়াল।

ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকাল।

বৃষ্টির পর্দার ওপারে একটা ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী।

মুখটা চেনা চেনা লাগছে।

কিন্তু এই মুহূর্তে ঠিক মনে করতে পারছে না—

সে কে?

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...