পর্ব – ৩ : বুড়ি মা
বাজারের একেবারে কোণায় ছোট্ট ত্রিপল পেতে বসেন বুড়ি মা।
সামনে কয়েকটা ঝুড়ি।
ঝিঙে, পুঁইশাক, কচু, ডাঁটা, লাউ, কুমড়ো, বেগুন, সঙ্গে দু-এক আঁটি ধনেপাতা।
দোকানটা বড় নয়।
তবু বাজারে প্রায় সবাই তাঁকে চেনে।
অনির্বাণকে দেখেই মুখভরা হাসি ফুটে উঠল।
— আয় বাবা... আজ এত দেরি করলি?
অনির্বাণও হেসে সামনে বসে পড়ল।
— আজ একটু দেরি হয়ে গেল বুড়ি মা। কেমন আছো?
বৃদ্ধা হেসে বললেন—
— আমার আবার কী হবে রে! যতদিন এই বাজারে আসতে পারছি, ততদিন ভালোই আছি।
কথা বলতে বলতেই তিনি সবচেয়ে টাটকা ঝিঙেগুলো আলাদা করে রাখলেন।
তারপর কয়েকটা কচু, এক আঁটি পুঁইশাক আর ধনেপাতা ব্যাগে ভরে দিলেন।
দাম শুনেই অনির্বাণ বুঝে গেল—
আবার কম নিয়েছেন।
— বুড়ি মা, এটা কী করলে? কতবার বলেছি, আমার কাছ থেকে কম নেবে না।
বৃদ্ধা দাঁতহীন মুখে হেসে বললেন—
— তোকে না কম দিলে কাকে দেব বল?
অনির্বাণ একটু অভিমান করেই বলল—
— এভাবে ব্যবসা করলে লাভ করবে কী করে?
বুড়ি মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন—
— বাবা, লাভ-লোকসানের হিসাব অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন মানুষ চিনেই জিনিস দিই।
অনির্বাণ চুপ করে শুনছিল।
বুড়ি মা নিজেই বলতে শুরু করলেন—
— তোর কাকু যখন মারা গেল, তখন আমার বড় ছেলে ক্লাস সেভেনে পড়ে। ছোট মেয়েটা তো কোলে। সংসারে একমুঠো চাল ছিল না।
— সেই যে মাথায় ঝুড়ি তুলে এই বাজারে এলাম, আর ছাড়তে পারলাম না।
— এই বাজারই আমার ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছে। এই বাজারের টাকাতেই ওরা পড়াশোনা করেছে। আজ সবাই নিজের নিজের সংসারে সুখে আছে।
একটু থেমে আবার হেসে বললেন—
— এখন তো ওরা আমাকেই বকাবকি করে।
— বলে, "মা, আর বাজারে বসবে না। এই বয়সে তোমাকে বসে থাকতে দেখলে লোকে কী বলবে?"
অনির্বাণ হেসে জিজ্ঞেস করল—
— তুমি কী বলো তখন?
বৃদ্ধার চোখ দুটো যেন হঠাৎ জ্বলে উঠল।
— আমি বলি, মানুষ কী বলল তাতে আমার কী! আমি বাড়িতে বসে থাকলে আরও তাড়াতাড়ি মরে যাব। এই বাজারেই তো আমার প্রাণ।
— এখানে না এলে কার সঙ্গে ঝগড়া করব, কার সঙ্গে হাসব, কে আমাকে "বুড়ি মা" বলে ডাকবে?
কথাটা বলে নিজেই হেসে উঠলেন।
অনির্বাণও হাসল।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে বুকের ভেতরটা যেন কেমন ভারী হয়ে উঠল।
বুড়ি মা ধনেপাতার একটা আঁটি ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলেন।
— এইটা রাখ বাবা।
— না না, এর দাম নাও।
— চুপ কর। তোকে আমি ফ্রি দিচ্ছি না... আশীর্বাদ দিচ্ছি।
কথাটা শুনে অনির্বাণ আর কিছু বলতে পারল না।
ধনেপাতার ছোট্ট আঁটিটার দাম হয়তো খুব বেশি নয়।
কিন্তু সেই মুহূর্তে তার মনে হলো—
পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিসের কোনো বাজারদর হয় না।
ভালোবাসা...
মমতা...
আর আশীর্বাদ...
এসব শুধু পাওয়া যায়।
কেনা যায় না।
Comments
Post a Comment