Skip to main content

পর্ব – ৭ : আবার দেখা

অনির্বাণ থেমে পিছন ফিরে তাকাল।

বৃষ্টির জল ঝাপসা পর্দার মতো নেমে আসছে।

ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণীটি আবার মৃদু হেসে বলল—

— অনির্বাণবাবু... চিনতে পারছেন না?

অনির্বাণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

মুখটা বড় চেনা লাগছে।

কিন্তু কোথায় দেখেছে, কিছুতেই মনে করতে পারছে না।

মেয়েটি এবার হেসে ফেলল।

— সেদিন স্টেশনে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল... মনে আছে?

কথাটা শেষ হতেই অনির্বাণের মনে যেন হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি খেলল।

সেই রাত...

ঝড়-বৃষ্টি...

ফাঁকা স্টেশন...

আর এক অসহায় তরুণীকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা।

সে অবাক হয়ে বলল—

— ও... আপনি! সত্যিই চিনতে পারিনি।

মেয়েটি মিষ্টি করে হেসে বলল—

— চিনবেনই বা কী করে? সেদিন তো বৃষ্টির মধ্যে ঠিকমতো মুখই দেখতে পাননি।

আজ তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

হালকা নীল রঙের চুড়িদার।

কাঁধে ছোট্ট একটি ব্যাগ।

ভেজা বাতাসে কয়েক গোছা চুল মুখের ওপর এসে পড়েছে।

মুখে কোনো বাড়তি সাজ নেই।

তবুও এক অদ্ভুত স্বাভাবিক সৌন্দর্য যেন তাকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।

অনির্বাণ মনে মনে ভাবল—

সেদিন বৃষ্টির অন্ধকারে এই মুখটা দেখা হয়নি বলেই হয়তো চিনতে পারেনি।

মেয়েটি নিজেই বলল—

— আমি সোহিনী।

অনির্বাণ মাথা নাড়ল।

— আমি অনির্বাণ... যদিও নামটা আপনার জানা হয়ে গেছে।

দু'জনেই হেসে ফেলল।

বৃষ্টিটা তখনও থামেনি।

সোহিনী ছাতাটা একটু এগিয়ে দিয়ে বলল—

— এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন? চলুন, রাস্তার একটু দূর পর্যন্ত একসঙ্গেই যাই।

অনির্বাণ এক মুহূর্ত ইতস্তত করল।

তারপর মৃদু হেসে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরল।

বৃষ্টি ঝরছিল।

আর সেই বৃষ্টির মধ্যেই শুরু হলো দু'জন মানুষের দ্বিতীয় আলাপ।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...