Skip to main content

পর্ব – ৫ : মাছের বাজার

মাছের বাজারে ঢুকতেই যেন আরেকটা আলাদা জগৎ।

চারদিকে বরফের ওপর সারি সারি মাছ।

ইলিশ, কাতলা, রুই, পাবদা, ট্যাংরা, শোল, বোয়াল, গলদা চিংড়ি— যেদিকে চোখ যায় শুধু মাছ আর মাছ।

মাছওয়ালাদের হাঁকডাকে পুরো বাজার মুখর।

এই যে দাদা... আজকের ইলিশ দেখে যান!

পাবদা নিন... একেবারে নদীর মাছ!

গলদা চিংড়ি... একবার দাম শুনে যান!

অনির্বাণ অবশ্য জানে—

সব ডাকের উত্তর দিতে নেই।

একবার দাঁড়ালেই আর ছাড়া পাওয়া মুশকিল।

সে ধীরে ধীরে কয়েকটা দোকান ঘুরে দাম জিজ্ঞেস করতে লাগল।

ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছেই শিখেছে—

বাজারে কখনও প্রথম দোকান থেকেই কিছু কিনতে নেই।
দুই-চারটে দোকান ঘুরে তবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

আজ বাবার কথাই বেশি মনে পড়ছে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার শরীরটাও আগের মতো নেই।

ডাক্তার তেল-মশলা কম খেতে বলেছেন।

তাই আজ সে ঠিক করেই বেরিয়েছে—

বাবার জন্য পাবদা মাছ নেবে।

একটা দোকানে দাঁড়াতেই মাছওয়ালা হেসে বলল—

দাদা, আজ কী দেব?

অনির্বাণ মাছগুলো একটু উল্টেপাল্টে দেখে বলল—

তিন পিস পাবদা কেটে দিন। একটু ছোট সাইজের হলে ভালো হয়।

মাছওয়ালা ওজন করে দাম বলল।

অনির্বাণ মাথার ভেতরেই দ্রুত হিসাব কষে নিল।

মাসের বাজেটের বাইরে যাওয়া চলবে না।

মধ্যবিত্ত মানুষের সংসারে ইচ্ছের থেকেও হিসাবের দাম অনেক বেশি।

তবুও সংসারের মানুষের মুখে ভালো কিছু তুলে দেওয়ার আনন্দেরও আলাদা মূল্য আছে।

মাছ কেটে কাগজে মুড়ে ব্যাগে ভরে দিল মাছওয়ালা।

অনির্বাণ টাকা মিটিয়ে বাজার থেকে বেরিয়ে এল।

প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় কেটে গেছে।

ঠিক তখনই আকাশটা আরও কালো হয়ে উঠল।

মুহূর্তের মধ্যেই টুপ... টুপ... করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল।

প্রথমে হালকা।

তারপর ধীরে ধীরে ফোঁটাগুলো বড় হতে লাগল।

লোকজন যে যেদিকে পারছে ছুটছে।

কেউ দোকানের ছাউনির নিচে।

কেউ গাছতলায়।

কেউ আবার প্লাস্টিক মাথায় দিয়ে দৌড়ে বাড়ির পথে।

অনির্বাণও সাইকেল ঠেলে রাস্তার ধারে একটি বন্ধ দোকানের আটচালার নিচে গিয়ে দাঁড়াল।

ভাবল—

"একটু দাঁড়াই। হয়তো পাঁচ-দশ মিনিটেই থেমে যাবে।"

কিন্তু সে জানত না—

এই বৃষ্টিই আজ তার জন্য নিয়ে এসেছে
আর-একটি অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ...

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...