পর্ব – ৩ : বুড়ি মা
বাজারের একেবারে শেষ মাথায় বসেন বুড়ি মা।
বাঁশের পুরোনো একটা ডালার ওপর যত্ন করে সাজিয়ে রাখা থাকে পুঁইশাক, কচু, লাউ, ঝিঙে, ডাঁটা, ধনেপাতা আর দু-চার রকম মৌসুমি সবজি।
দোকান বলতে ত্রিপলের ওপর বিছানো এক চিলতে জায়গা।
সেখানেই প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বসেন তিনি।
বয়স সত্তর পেরিয়ে গেছে।
মুখজুড়ে সময়ের অসংখ্য রেখা।
কিন্তু সেই ভাঁজের মধ্যেও হাসিটা আজও শিশুর মতো নির্মল।
অনির্বাণকে দেখেই বুড়ি মা হেসে বললেন—
— আয় বাবা... আজ এত দেরি করলি?
অনির্বাণও হেসে সামনে বসে পড়ল।
— আজ ছুটি তো বুড়ি মা। একটু আরাম করে বেরোলাম। তুমি কেমন আছো?
বৃদ্ধা হেসে বললেন—
— আমার আবার কী হবে বাবা? বাজারে এলেই ভালো থাকি।
তিনি একটা ঝিঙে হাতে নিয়ে বললেন—
— এইটা নে। আজ ভোরে ক্ষেত থেকে তুলে এনেছি।
দাম শুনেই অনির্বাণ বুঝল—
আবারও কম নিয়েছেন।
সে একটু বিরক্তির সুরেই বলল—
— বুড়ি মা, তোমাকে কতবার বলেছি, আমার কাছ থেকে কম দাম নেবে না।
বুড়ি মা হেসে ফেললেন।
— তোকে না কম দিলে কাকে দেব বল?
অনির্বাণ মাথা নেড়ে বলল—
— এভাবে ব্যবসা করলে লাভ হবে কী করে?
বৃদ্ধা একটু দূরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন—
— লাভ-লোকসানের হিসাব অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে বাবা। এখন মানুষ চিনে জিনিস দিই।
কথাটা শুনে অনির্বাণ চুপ করে গেল।
এই বুড়ি মার জীবনটাও যেন একটা উপন্যাস।
স্বামীকে হারিয়েছিলেন অনেক বছর আগে।
তখন তিন ছেলে আর দুই মেয়ে—সবাই ছোট।
সংসার চালানোর মতো আর কেউ ছিল না।
সেই সময় মাথায় ঝুড়ি তুলে এই বাজারেই সবজি বিক্রি শুরু করেছিলেন।
রোদে পুড়েছেন।
বৃষ্টিতে ভিজেছেন।
অনেক দিন নিজের পেট খালি রেখে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন।
এই বাজারই তাঁর সন্তানদের মানুষ করেছে।
আজ তিন ছেলেই প্রতিষ্ঠিত।
দুই মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে।
নাতি-নাতনিরা স্কুল-কলেজে পড়ে।
ছেলেরা এখন প্রায়ই বলে—
— মা, আর বাজারে বসতে হবে না। এবার বিশ্রাম নাও।
আবার কখনও হাসতে হাসতেই বলে—
— এই বয়সে যদি তোমাকে বাজারে বসতে দেখি, মানুষ বলবে—ছেলেরা বুঝি মাকে খাওয়াতে পারে না!
বুড়ি মা তখন হেসেই উড়িয়ে দেন।
— ওসব মানুষ কী বলবে, তা নিয়ে আমি কোনোদিন ভাবিনি রে। বাড়িতে বসে থাকলে আরও তাড়াতাড়ি মরে যাব।
একটু থেমে চারপাশের বাজারটার দিকে তাকিয়ে আবার বললেন—
— এই বাজারেই আমার প্রাণ আছে বাবা। এখানে না এলে মনে হয় দিনটাই শুরু হলো না।
কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর চোখ দুটো কেমন যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
অনির্বাণের মনে হলো—
কিছু মানুষ সংসার চালানোর জন্য কাজ করেন।
আর কিছু মানুষ বেঁচে থাকার জন্য কাজ করেন।
বুড়ি মা দ্বিতীয় দলের মানুষ।
Comments
Post a Comment