Skip to main content

অধ্যায় – ৮

পর্ব – ১ : মেঘলা সকালের বাজার

আজ ছুটির দিন।

অনির্বাণের সকালটা অন্য দিনের তুলনায় একটু ধীর।

অফিস নেই।

তবু ভোরবেলা ঘুম ভাঙার অভ্যাসটা আর বদলায়নি।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক কাপ চা শেষ করে বাজারের ব্যাগটা হাতে তুলে নিল।

বাজার করতে তার ভীষণ ভালো লাগে।

অনেকের কাছে বাজার মানে সংসারের প্রয়োজন মেটানো।

অনির্বাণের কাছে বাজার মানে মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখা।

কে কী বিক্রি করছে, কার মুখে আজ হাসি, কার চোখে দুশ্চিন্তা, কোন সবজির দাম বেড়েছে, কোন মাছ আজ সস্তা—সবকিছুই যেন একটা জীবন্ত গল্পের মতো।

আকাশটা সকাল থেকেই মেঘে ঢাকা।

এবার বর্ষা যেন একটু বেশিই উদার হয়েছে।

প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি।

ঋতুরও যেন আজকাল নিজের কোনো নিয়ম নেই।

যে সময় বিকেলের শেষে কালবৈশাখী নামার কথা, সেই সময়ই সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে।

প্রকৃতিও যেন মানুষের মতোই বদলে যাচ্ছে।

সাইকেলটা বের করে রাস্তায় নামল অনির্বাণ।

ভেজা মাটির গন্ধে চারপাশ ভরে আছে।

রাস্তায় মানুষজনও আজ একটু বেশি।

ছুটির দিনের আলাদা একটা ছন্দ থাকে।

মোড়ের টোটো স্ট্যান্ডে কয়েকজন চালক বসে গল্প করছেন।

কারও হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাঁড়।

কেউ আবার চুপচাপ রাস্তার দিকে তাকিয়ে যাত্রীর অপেক্ষা করছেন।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাজের খোঁজ, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, ভালো চিকিৎসার আশা— এইসব কারণেই গ্রামের বহু পরিবার ধীরে ধীরে মফস্বল শহরের দিকে চলে এসেছে।

যে মফস্বল একসময় সন্ধ্যা নামলেই নিস্তব্ধ হয়ে যেত, সেখানে এখন সকাল থেকেই ব্যস্ততার শব্দ।

সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিতে দিতে অনির্বাণ মৃদু হেসে ফেলল।

জীবনও যেন এই সাইকেলের মতোই।

থেমে গেলে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।

চলতে থাকলেই পথ নিজে থেকেই খুলে যায়।

কিছুক্ষণ পর দূর থেকে বাজারের কোলাহল কানে ভেসে এল।

মানুষের ডাকাডাকি, দোকানিদের হাঁক, সাইকেলের ঘণ্টি, টোটোর হর্ন—সব মিলিয়ে যেন ছোট্ট এক জীবন্ত পৃথিবী।

অনির্বাণ সাইকেলটা স্ট্যান্ডে রেখে বাজারের ব্যাগটা হাতে নিল।

আজও শুরু হবে সেই পরিচিত পথচলা।

মানুষের ভিড়ের মধ্যে মানুষকে খুঁজে পাওয়ার পথচলা।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...
🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান, আর প্রতিদিনের নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফিস শু...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...