Skip to main content

অরুণোদয়ের রাত

দশম অধ্যায় :

পরদিন সকাল।

মেসের ছোট্ট ঘরটায় তখনও পুরোপুরি আলো ঢোকেনি।

অনির্বাণ ঘুম থেকে উঠে বিছানার পাশে রাখা ব্যাগটা খুলল।

একে একে বাবার সমস্ত রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন, এক্স-রে প্লেট, স্ক্যান রিপোর্ট আর আগের চিকিৎসকের দেওয়া কাগজপত্র বের করে বিছানার ওপর সাজিয়ে রাখল।

প্রতিটা কাগজ আবারও মন দিয়ে মিলিয়ে নিল।

কোথাও কিছু বাদ পড়েছে কি না, শেষবারের মতো দেখে সবকিছু নীল রঙের ফাইলটায় সুন্দর করে গুছিয়ে রাখল।

আজ কোনো ভুলের সুযোগ নেই।

অনেক দিনের অপেক্ষার পর অবশেষে একজন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করার সময় মিলেছে।

বাইরে তখন রান্নাঘর থেকে হাঁড়ির ঢাকনার শব্দ ভেসে আসছে।

হরিপদ কাকা ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

ঘুম ভেঙেছে? এই নে, আগে চা খেয়ে নে।

চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে অনির্বাণ মৃদু হেসে বলল—

আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে কাকা।

হরিপদ কাকা মাথা নেড়ে বললেন—

যা, সময় নিয়ে বেরো। বড় ডাক্তারদের কাছে সময়ের দাম রোগীর চেয়েও বেশি।

কথাটা শুনে অনির্বাণ শুধু মৃদু হেসে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।

মেসের গেট পেরিয়ে কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় পা রাখতেই সকালটা যেন ইতিমধ্যেই ছুটতে শুরু করেছে।

বাসস্ট্যান্ডে মানুষের ভিড়।

মেট্রো স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইন।

প্রত্যেকেরই যেন কোথাও পৌঁছানোর তাড়া।

অনির্বাণও সেই ভিড়েরই একজন।

তবে তার গন্তব্য অফিস নয়।

আজ তার হাতে শুধু একটি নীল ফাইল।

সেই ফাইলের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে বাবার সুস্থ হয়ে ওঠার সমস্ত আশা।

হাসপাতালে পৌঁছাতেই অনির্বাণ বুঝতে পারল, সে একা নয়।

দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এসেছেন।

কারও হাতে মোটা রিপোর্টের ফাইল, কেউ হুইলচেয়ারে বসে, কেউ আবার স্ট্রেচারে শুয়ে নিঃশব্দে ছাদের দিকে তাকিয়ে।

প্রত্যেকের চোখেই একটাই প্রশ্ন—

"ডাক্তারবাবু কী বলবেন?"

রিসেপশনে নাম নথিভুক্ত করে অনির্বাণ অপেক্ষাকক্ষের একটি চেয়ারে গিয়ে বসল।

ডাক্তারবাবু সকাল দশটার মধ্যে আসবেন।

রিসেপশনের কর্মী এইটুকুই জানালেন।

অনির্বাণ ঘড়ির দিকে তাকাল।

তখন সকাল সাড়ে ন'টা।

অপেক্ষা শুরু হলো।

এক এক করে রোগীদের নাম ডাকা হচ্ছে, আবার নতুন রোগী এসে বসছে।

সময় যেন আজ ইচ্ছে করেই একটু ধীরে হাঁটছে।

কিছুক্ষণ পর মায়ের ফোন এল।

বাবা, ডাক্তার দেখাতে পেরেছিস?

না মা... এখনও অপেক্ষা করছি।

মায়ের গলায় উদ্বেগ স্পষ্ট।

অনির্বাণ ইচ্ছে করেই স্বাভাবিক গলায় কথা বলল।

চিন্তা কোরো না। ডাক্তার দেখেই সব জানাব।

ফোন রাখার কিছুক্ষণ পর আবার বোনের ফোন।

দাদা, কিছু খবর পেলেই সঙ্গে সঙ্গে জানিও।

অনির্বাণ শুধু বলল—

অবশ্যই জানাব।

ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলল।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো।

দুপুর পেরিয়ে বিকেল।

অপেক্ষাকক্ষের মানুষগুলোও যেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছিল।

কারও চোখে উদ্বেগ, কারও মুখে ক্লান্তি, কেউ আবার চুপচাপ প্রার্থনা করছিল।

অনির্বাণ মাঝে মাঝে উঠে করিডোরে হাঁটছিল।

আবার এসে একই চেয়ারে বসে পড়ছিল।

হাসপাতালের ক্যান্টিন থেকে এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট খেয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিল।

সকাল থেকে অপেক্ষা করতে করতে তার মনে একটাই কথা ঘুরছিল—

ভালো ডাক্তার দেখার সুযোগ পাওয়া যেন অনেক সময় ভগবানের দর্শন পাওয়ার মতোই কঠিন।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ একটুখানি আশার খোঁজে ছুটে আসে।

চিকিৎসকেরাও নিরলস কাজ করেন। একজনের পর একজন রোগী দেখেন। তাঁদের সময়ের ওপর ভরসা করেই অসংখ্য পরিবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে।

তবে অপেক্ষার এই দীর্ঘ সময় সাধারণ মানুষের কাছে সহজ নয়।

রোগের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে অর্থ, সময় আর মানসিক শক্তি—সবকিছুরই কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়।

স্বাধীনতার এত বছর পরেও উন্নত সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা এখনও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি।

তাই প্রয়োজনে মানুষ দূরদূরান্ত থেকে বড় শহরে আসে, দিনের পর দিন অপেক্ষা করে, শুধু একজন দক্ষ চিকিৎসকের আশ্বাস পাওয়ার জন্য।

ঘড়ির কাঁটা তখন সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই।

অপেক্ষাকক্ষে বসে থাকা অনেকের চোখেমুখে ক্লান্তি স্পষ্ট।

ঠিক সন্ধ্যা সাতটার কিছু আগে সহকারী এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নাম ডাকতে শুরু করলেন।

অনির্বাণ চক্রবর্তী...

অনির্বাণ দ্রুত উঠে দাঁড়াল।

শক্ত করে ফাইলটা বুকে চেপে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে এগিয়ে গেল।

চেম্বারে ঢুকতেই ডাক্তার অনির্বাণের হাত থেকে রিপোর্টের ফাইলটি নিয়ে মন দিয়ে দেখতে শুরু করলেন।

কয়েক মিনিট নীরবে সব রিপোর্ট দেখে তিনি মাথা তুলে বললেন—

চিন্তার তেমন কিছু নেই। অপারেশন করলেই ঠিক হয়ে যাবে।

তারপর কয়েকটি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা লিখে দিয়ে বললেন—

সব রিপোর্ট করিয়ে আবার একদিন দেখান। সেদিনই অপারেশনের তারিখ দিয়ে দেব।

অনির্বাণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

চেম্বার থেকে বেরিয়েই সে মাকে ফোন করল।

মা, ডাক্তার বলেছেন অপারেশন করলেই বাবা ভালো হয়ে যাবে।

ওপাশ থেকে শুধু শোনা গেল—

ঠাকুরের কৃপা... এবার সব ঠিক হবে বাবা।

ফোনটা রেখে অনির্বাণ হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে এল।

সারাদিনের ক্লান্তি থাকলেও তার মনটা অনেকটাই হালকা লাগছিল।

হাসপাতাল থেকে বেরোতেই রাত নেমে এসেছে।

সারাদিনের দৌড়ঝাঁপে শরীরটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

তবু মনটা অনেকটাই হালকা।

অন্তত এখন নিশ্চিত—বাবা সুস্থ হয়ে উঠবেন।

বাসে চেপে অনির্বাণ আবার মেসের দিকে রওনা দিল।

গলির মুখে নেমে পরিচিত রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, বহু বছর পরও এই পথটা যেন তাকে চিনে রেখেছে।

মেসের দরজায় ঢুকতেই রান্নাঘর থেকে ভেসে এল গরম ভাতের গন্ধ।

আরে, এসে গেছিস! হাত-মুখ ধুয়ে আয়। ভাত বেড়ে দিচ্ছি।

হরিপদ কাকার গলায় সেই আগের মতোই স্নেহ।

অনির্বাণ ব্যাগটা ঘরে রেখে মুখে জল দিয়ে ডাইনিং রুমে এসে বসল।

ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, মুসুর ডাল, আলুভাজা আর কাতলার ঝোল।

প্রথম লোকমাটা মুখে দিতেই অনির্বাণ মুচকি হেসে বলল—

কাকা, এতদিন পর আবার এই স্বাদটা পেলাম।

হরিপদ কাকা হেসে বললেন—

হোটেলের রান্নায় পেট ভরে, বাড়ির রান্নায় মন ভরে।

খাওয়া শেষ করে অনির্বাণ ধীরে ধীরে দোতলায় উঠল।তার জন্য বরাদ্দ ঘরে এসে বসল

বাকীরাও খাওয়া-দাওয়া শেষ করে একে একে সবাই অনির্বাণের ঘরে এসে জড়ো হলো।

মুহূর্তের মধ্যেই ঘরটা আবার আগের দিনের মতো আড্ডায় জমে উঠল।

অনির্বাণ চারদিকে তাকাতে তাকাতে দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো পোস্টারগুলোর সামনে এসে দাঁড়াল।

হঠাৎ একটা পোস্টার দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

— ঋত্বিকটার কথা মনে আছে?

কথাটা শুনতেই ঘরের সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

ঋত্বিকের আসল নামটা অনেকেই ভুলে গিয়েছিল।

মেসে সবাই তাকে ডাকত "লাফা" নামে।

কেন এই নাম, তার সঠিক উত্তর আজও কেউ জানে না।

হয়তো সারাক্ষণ লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটত বলে, আবার কেউ বলত—এক জায়গায় পাঁচ মিনিট বসে থাকতে পারত না বলেই।

এলোমেলো চুল, রঙচটা টি-শার্ট, পুরোনো জিন্স আর পায়ে হাওয়াই চটি—দেখে কেউ বিশ্বাসই করত না, ছেলেটা দেশের অন্যতম কঠিন চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কিন্তু পাঁচ মিনিট কথা বললেই সবাই বুঝে যেত, ওর মাথার ভেতরটা যতটা গোছানো, বাইরের চেহারাটা ঠিক ততটাই অগোছালো।

মেসে ঢুকেই চিৎকার করে বলত—

— এই বইগুলো একটু সরাও! বেচারাগুলোরও তো অক্সিজেন দরকার!

রান্নাঘর থেকে হরিপদ কাকা রেগে বেরিয়ে এসে বলতেন—

— এই লাফা! তোর মুখটা কোনোদিন বন্ধ হবে না?

ঋত্বিক সঙ্গে সঙ্গে জিভ বার করে বলত—

— কাকা, মুখ বন্ধ রাখলে তোমার হাতের ঝোলের প্রশংসা করব কী করে?

ঘরটা হেসে গড়িয়ে পড়ত।

কেউ মন খারাপ করে বসে থাকলে সে জোর করেই ছাদে নিয়ে যেত।

তারপর বলত—

— আরে চাকরি করে কী করবি? একটা লাল টুকটুকে বউ এনে সারাদিন ঝগড়া করবি? তার চেয়ে চল, আজই বাজার থেকে একটা বউ কিনে নিয়ে আসি!

তার মুখে এমনসব উদ্ভট কথা থাকত যে, রাগ করতেও হাসি পেয়ে যেত।

কিন্তু এই হাসিখুশি ছেলেটার আরেকটা দিকও ছিল।

রাত জেগে পড়াশোনা করত।

ভোরে উঠে দৌড়াতে যেত।

নিজের হাতে তৈরি নোটস নতুন ছেলেদের দিয়ে দিত।

কেউ কোনো বিষয় না বুঝলে ধৈর্য ধরে পড়িয়ে দিত।

একদিন অনির্বাণ জিজ্ঞেস করেছিল—

— তুই এত হাসিস কী করে রে? টেনশন হয় না?

ঋত্বিক জানালার বাইরে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেছিল—

— টেনশন তো রোজই আসে। আমি ওকে এক কাপ চা খাইয়ে বিদায় করে দিই। না হলে ও-ই আমাকে খেয়ে ফেলবে!

সেদিন সবাই হেসেছিল।

আজ বুঝতে পারে, কথাটার ভেতরে কত বড় জীবনদর্শন লুকিয়ে ছিল।

কয়েক বছর পর সেই ঋত্বিকই SSC CGL পরীক্ষায় সফল হলো।

কেন্দ্রীয় সরকারের একটি দপ্তরে যোগ দিল।

চাকরি পাওয়ার পরও মানুষটা একটুও বদলায়নি।

মেসে ফিরে প্রথমেই বলেছিল—

— এই যে বেকার সমাজ! একজন সরকারি কর্মচারী এসেছি, সবাই দাঁড়িয়ে স্যালুট কর!

উত্তরে সবাই বালিশ ছুড়ে মেরেছিল।

হাসতে হাসতেই সে বলেছিল—

— আরে বাবা! চাকরি পেয়েছি, মানুষ বদলাইনি। শুধু মাসের শেষে ব্যাংকের এসএমএসটা একটু মোটা হয়েছে!

ঘরটা আবার হাসিতে ভরে উঠেছিল।

বিদায় নেওয়ার আগে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে একবার ঘুরে বলেছিল—

— মনে রাখিস, চাকরি পাওয়াটা জীবনের গন্তব্য নয়। মানুষ হয়ে বাঁচতে পারাটাই বড় কথা। আর এই মেস... এটা শুধু থাকার জায়গা নয়, স্বপ্ন দেখতে শেখার স্কুল। একদিন তোদের মধ্যেও কেউ আবার ফিরে আসবে—আজ আমি যেমন ফিরেছি।

আজও যখন মেসের কোনো ছেলে ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ে, তখন পুরোনো বোর্ডারদের কেউ না কেউ হেসে বলে—

— লাফা থাকলে এখন কী বলত জানিস?

আর অদ্ভুতভাবে, সেই একটাই বাক্য সবার মুখে একটু হলেও হাসি ফিরিয়ে আনে।

ঋত্বিকের গল্প শেষ হতেই অনির্বাণ হেসে বলল—

— আচ্ছা, সুশান্তের কী খবর? আমাদের "স্যার" এখনও আগের মতোই আছে তো?

কথাটা শুনেই আবার ঘরে হাসির রোল উঠল।

মেসে সুশান্তের আসল নামের চেয়ে "স্যার" নামটাই বেশি পরিচিত ছিল।

বয়সে সবার সমান, কিন্তু আচরণে যেন অনেকটাই পরিণত।

সব সময় ইস্ত্রি করা শার্ট।

বইয়ের ওপর সুন্দর করে কভার দেওয়া।

কলমগুলোও টেবিলে একেবারে সোজা করে সাজানো।

বিছানা এমনভাবে গুছিয়ে রাখত, যেন কোনো হোটেলের ঘর।

রাতে সবাই যখন আড্ডা দিত, তখন সুশান্ত বই থেকে মুখ না তুলেই বলত—

— রাত দশটার পরে একটু আস্তে কথা বল। কাল আবার পড়তে হবে।

ঋত্বিক সঙ্গে সঙ্গে খোঁচা দিত—

— স্যার, আজও কি টাইমটেবিল অনুযায়ী হাঁচি দিয়েছেন?

ঘর ফেটে পড়ত হাসিতে।

সুশান্ত গম্ভীর মুখে উত্তর দিত—

— হাসো। একদিন এই টাইমটেবিলই চাকরি দেবে।

ঋত্বিকও ছাড়ার পাত্র ছিল না।

— চাকরি যদি না দেয়, তাহলে টাইমটেবিলকেই বিয়ে করে নিও!

আবারও হাসির রোল পড়ে যেত।

তবে সবাই জানত না, এই গম্ভীর মানুষটার ভেতরে একটা অসাধারণ মন লুকিয়ে আছে।

একদিন নতুন এক ছেলের পরীক্ষার ফি জমা দেওয়ার টাকা ছিল না।

কাউকে কিছু না বলে সুশান্ত নিজের পকেট থেকেই টাকাটা দিয়ে দিয়েছিল।

ঘটনাটা অনেক পরে অনির্বাণ জানতে পেরে জিজ্ঞেস করেছিল—

— তুই কাউকে বললি না কেন?

সুশান্ত শুধু মৃদু হেসে বলেছিল—

— ভালো কাজের বিজ্ঞাপন দিলে তার দাম কমে যায়।

ঘরটা কয়েক মুহূর্তের জন্য নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল।

রাহুল ধীরে বলল—

— সুশান্ত এখনও চাকরি পায়নি।

— কিন্তু নতুন ছেলেরা আজও ওর কাছেই পড়তে বসে।

— আমরা সবাই বলি, এই মেসের যদি একটা মেরুদণ্ড থাকে, সেটা ছিল সুশান্ত।

অনির্বাণ চুপচাপ মাথা নাড়ল।

তার মনে হলো, সব সাফল্যের গল্প নিয়োগপত্রে লেখা থাকে না।

কিছু মানুষের সাফল্য লুকিয়ে থাকে অন্য মানুষের স্বপ্নকে এগিয়ে দেওয়ার মধ্যে।

"সব মানুষ চাকরি পেয়ে বড় হয় না;
কেউ কেউ অন্য মানুষের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেই বড় হয়ে ওঠে।"

অনির্বাণ হঠাৎ হেসে বলল—

— আরে, আমাদের "কবি"র কোনো খবর আছে?

কথাটা শুনেই সবাই হেসে উঠল।

আসল নামটা আজও অনেকের মনে নেই।

মেসে সবাই তাকে শুধু "কবি" বলেই চিনত।

রাতে সবাই যখন পড়তে বসত, কবি হঠাৎ বই বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলত—

— পাঁচ মিনিট বই বন্ধ কর। জানালার বাইরে চাঁদটা দেখ। পৃথিবী শুধু সিলেবাস দিয়ে তৈরি হয়নি।

সুশান্ত বিরক্ত হয়ে বলত—

— আবার শুরু হলো!

ঋত্বিক সঙ্গে সঙ্গে যোগ করত—

— ওকে বলতে দাও। কাল যদি প্রশ্ন আসে 'চাঁদ নিয়ে রচনা', তখন কিন্তু কবিই পাশ করাবে!

ঘরটা আবার হাসিতে ভরে উঠত।

আজও সেই কথা মনে পড়লেই অনির্বাণের মনে হয়—

সংগ্রামের দিনগুলো শুধু বইয়ের পাতায় ছিল না,
জানালার ওপারের চাঁদেও একটু করে লুকিয়ে ছিল।

রাত তখন অনেক হয়েছে।

আড্ডাও ধীরে ধীরে শেষের দিকে।

একজন একজন করে আবার নিজের বইয়ের সামনে ফিরে গেল।

কারও সামনে গণিতের খাতা।

কারও সামনে সংবিধানের বই।

কেউ নোটে দাগ টানছে, কেউ প্রশ্নপত্র সমাধান করছে।

অনির্বাণ দরজার কাছে এসে একবার ঘুরে তাকাল।

মনে হলো, সময় বদলেছে।

মুখগুলো বদলেছে।

কিন্তু এই ঘরের স্বপ্নগুলো বদলায়নি।

এখানে এখনও কেউ প্রথম চাকরির অপেক্ষায়।

কেউ প্রথম বেতনের স্বপ্নে।

কেউ আবার শুধু বাড়ির মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য লড়ে যাচ্ছে।

অনির্বাণ মৃদু হেসে আলোটা নিভিয়ে দরজার বাইরে বেরিয়ে এল।

করিডোরের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে সে একবার ফিরে তাকাল।

দরজার ফাঁক দিয়ে এখনও দেখা যাচ্ছে—

কয়েকটা মাথা নুয়ে আছে বইয়ের ওপর।

কয়েকটা স্বপ্ন এখনও ঘুমোতে শেখেনি।

কিছু ঠিকানা শুধু থাকার জন্য নয়,
মানুষ গড়ার জন্য তৈরি হয়।

অরুণোদয় ছাত্রাবাস ছিল ঠিক তেমনই একটি ঠিকানা।

আগামীকাল ভোরেই অনির্বাণ ফিরে যাবে তার কর্মস্থলে।

কিন্তু এই রাত...

এই আড্ডা...

এই মানুষগুলো...

আর এই ছোট্ট ছাত্রাবাস—

তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে চিরকাল থেকে যাবে।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...