Skip to main content

পর্ব – ১২ : চাঁদের নিচে দুটি পথ


গাড়িটা তারাপীঠের দিকে যত এগোচ্ছিল, অরিন্দমের মনের ভেতর ততই এক অদ্ভুত টানাপোড়েন ঘনীভূত হচ্ছিল। জানালার বাইরে লাল মাটির রাস্তা, দুপাশে শাল-পিয়ালের সারি। সুব্রত পাশে বসে মাঝে মাঝে কিছু বলছিল, কিন্তু কথাগুলো যেন অরিন্দমের কানে পৌঁছেও পৌঁছাচ্ছিল না।

তারাপীঠে পৌঁছে হোটেলে চেক-ইন করেই অরিন্দম প্রথমে স্নান সেরে নিল।

সুব্রত বলল,

— "চল, মন্দিরে যাই। সন্ধ্যারতি দেখব।"

অরিন্দম মাথা নাড়ল। কিন্তু পা দুটো যেন অকারণেই একটু ভারী লাগছিল।

মন্দির চত্বরে ঢুকতেই শঙ্খ-কাঁসরের ধ্বনি, ভক্তদের ভিড়, "জয় তারা মা" উচ্চারণ—সব মিলিয়ে যেন এক অন্য জগৎ।

মায়ের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে অরিন্দম চোখ বুজল।

প্রার্থনা করতে গিয়ে সে বুঝল, আসলে সে কী চাইছে তা নিজেই জানে না।

পদোন্নতি?

না।

অর্থ?

না।

শুধু একটু শান্তি।

একটু... ঘর।

পূজা শেষ করে বাইরে বেরিয়ে এসে সে দেখল, সুব্রত ফোনে কথা বলছে।

ফোন রাখতেই বলল,

— "জানিস, মামা ফোন করেছিল। জিজ্ঞেস করছিল ঈশিতাকে কেমন লাগল।"

অরিন্দম হেসে বলল,

— "কী বলব বল?"

সুব্রত চোখ টিপে বলল,

— "মেয়েটি বুদ্ধিমতী। আর কিছু না?"

অরিন্দম উত্তর দিল না।

শুধু আকাশের দিকে তাকাল।

তারার ভিড়ে চাঁদটা আজও উঠেছে—গোল, শান্ত, নির্লিপ্ত।

ঠিক গতরাতের মতো।

রাতে খাওয়ার পর দুজনে ছাদে গিয়ে বসল।

চারদিকে নিস্তব্ধতা। শহরের কোলাহল নেই, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরের শ্মশানঘাটের ক্ষীণ আলোর রেখা।

হঠাৎ সুব্রত বলল,

— "আচ্ছা অরিন্দম, তোর কি মনে হয় না... চল্লিশের পর প্রেম-ভালোবাসা একটু অন্যরকম হয়ে যায়?"

— "কেমন?"

— "টগবগে থাকে না। বরং নদীর গভীর স্রোতের মতো হয়ে যায়। ওপর থেকে শান্ত, কিন্তু ভেতরে অনেক গভীর। যেন দুজন মানুষ এক কাপ চা নিয়ে পাশাপাশি বসে আছে। কোনো তাড়া নেই, কোনো দাবি নেই। শুধু পাশে থাকাটাই যথেষ্ট।"

অরিন্দম কিছু বলল না।

পকেট থেকে মোবাইল বের করল।

স্ক্রিনে তখনও মেঘলার শেষ মেসেজটা ভাসছে—

"কখনো কখনো একটু অস্থিরতাও দরকার।"

আর তার ঠিক নিচেই সেভ করা আছে ঈশিতার বাবার নম্বর।

দুটো নাম।

দুটো সম্ভাবনা।

দুটো ভিন্ন জীবনবোধ।

একদিকে অস্থিরতার ডাক—যেখানে প্রশ্ন আছে, অনিশ্চয়তা আছে, আকাশের মতো মুক্তির হাতছানি আছে।

অন্যদিকে স্থিরতার আশ্বাস—যেখানে বোঝাপড়া আছে, সময় আছে, ঘর বেঁধে থাকার নিশ্চয়তা আছে।

অরিন্দম আকাশের দিকে তাকাল।

ছোটবেলায় সে চাঁদের সঙ্গে পথ চলত।

আজও চাঁদ ঠিক আগের জায়গাতেই আছে।

শুধু পথ হারিয়েছে সে নিজেই।

ঠিক তখনই মোবাইলটা আবার কেঁপে উঠল।

নতুন মেসেজ।

নামটা দেখেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন করে উঠল—

মেঘলা।

মেসেজে লেখা—

"তারাপীঠে চাঁদটা কি আজও আপনার সঙ্গে পথ চলছে?"

অরিন্দম কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

মেঘলা জানল কী করে সে তারাপীঠে?

তারপরই মনে পড়ল—সৌমেনকে সে নিজেই বলেছিল এখানে আসার কথা।

সে কিছু লিখল, আবার মুছে দিল।

"হ্যাঁ, চলছে"—

নাকি—

"না, আমি হারিয়ে গেছি"—

কোনটা সত্যি?

শেষ পর্যন্ত শুধু লিখল—

"চাঁদটা আছে। আমি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছি।"

সেন্ড বাটন টিপতেই উত্তর এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে—

"খুঁজবেন না। থেমে যান। চাঁদ হারায় না, মানুষই চাঁদের নিচে দাঁড়াতে ভুলে যায়।"

মেসেজটা পড়ে অরিন্দমের চোখ ভিজেছিল কি না, সে নিজেও বুঝতে পারল না।

শুধু মনে হলো, বহুদিন পর কেউ তাকে এগিয়ে যেতে নয়—থেমে যেতে বলল।

দৌড়াতে নয়—দেখতে বলল।

সুব্রত পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল,

— "কী রে? কার মেসেজ?"

অরিন্দম মোবাইলটা পকেটে রেখে বলল,

— "কেউ না। পুরোনো একটা বন্ধু।"

আকাশের চাঁদটা তখন মেঘ সরিয়ে বেরিয়ে এসেছে।

জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়েছে ছাদের মেঝেতে।

অরিন্দম ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে হোটেলের গেট পেরিয়ে রাস্তায় এল।

রাতের তারাপীঠ তখন শান্ত।

দোকানপাট প্রায় বন্ধ।

শুধু মন্দিরের দিক থেকে ভেসে আসছে মায়ের নামগান।

সে থেমে দাঁড়াল।

মাথা তুলে তাকাল আকাশের দিকে।

অনেক বছর পর সে চাঁদটাকে শুধু দেখল না—

দেখা হয়ে উঠল।

আর তখনই মনে হলো—

জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে সবসময় ছুটতে হয় না।

কখনো কখনো শুধু থেমে দাঁড়ালেই হয়।

আকাশের দিকে তাকালেই হয়।

ঠিক সেই মুহূর্তে মোবাইলের স্ক্রিন আবার জ্বলে উঠল।

এবার মেসেজটা ঈশিতার বাবার।

"মেয়ে বলেছে, আপনাদের কথা ওর ভালো লেগেছে। আপনিও যদি রাজি থাকেন, আমরা সামনের মাসে দিন দেখতে চাই।"

অরিন্দম মেসেজটা পড়ল।

তারপর ফোনটা নিঃশব্দে পকেটে রেখে দিল।

কোনো উত্তর দিল না।

কারণ তার সামনে যেন সত্যিই দুটি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে।

একটি দরজার ওপারে রয়েছে নিশ্চিন্ত আলো।

অন্যটির ওপারে অজানা আকাশ।

কোন পথে সে যাবে, তা এখনও সে নিজেও জানে না।

শুধু জানে—

আজ রাতে চাঁদটাকে আর নির্লিপ্ত মনে হচ্ছে না।

বরং মনে হচ্ছে, বহুদিন পর চাঁদও যেন তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উঠেছে।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...