Skip to main content

পর্ব – ২ : গঙ্গার ধারে পুরোনো দেখা

পর্ব – ২ : গঙ্গার ধারে পুরোনো দেখা

হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এল একটি কণ্ঠস্বর—

— "মাফ করবেন, আপনি কি অরিন্দম সেন?"

অরিন্দম প্রথমে খেয়াল করেনি। প্রশ্নটা দ্বিতীয়বার শোনার পর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে প্রথম মুহূর্তে চিনতে পারল না সে।

মাঝারি উচ্চতা, সামান্য ভুঁড়ি, মাথার সামনের চুল অনেকটাই পাতলা হয়ে এসেছে। কিন্তু মুখের হাসিটা যেন কোথাও দেখা।

লোকটিই হেসে বলল,

— "চিনতে পারছিস না তো? আমি সৌমেন... সৌমেন মিত্র।"

নামটা শুনতেই যেন বহুদিনের ধুলো জমা স্মৃতির দরজা খুলে গেল।

কলেজের সেই দিনগুলো। ক্যান্টিনের আড্ডা। পরীক্ষার আগের রাতের পড়া। অকারণ হাসাহাসি। ভবিষ্যৎ নিয়ে অসংখ্য পরিকল্পনা।

অরিন্দম অবাক হয়ে উঠে দাঁড়াল।

— "সৌমেন! তুই?"

দু'জনেই কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

সময় মানুষের চেহারা বদলে দেয়, কিন্তু কিছু কিছু হাসি বদলাতে পারে না।

সৌমেন বেঞ্চের একপাশে বসে পড়ল।

— "বিশ বছর পর দেখা হচ্ছে, তাই না?"

অরিন্দম নদীর দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।

— "হয়তো তারও বেশি।"

গঙ্গার জল তখনও নিজের ছন্দে বয়ে চলেছে। আর দুই পুরোনো বন্ধুর মাঝখানে ধীরে ধীরে ফিরে আসছিল বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক সময়।

সৌমেন বেঞ্চে বসে পড়েছিল অরিন্দমের পাশে।

প্রথম কয়েক মিনিট দু'জনেই যেন পুরোনো মুখের মধ্যে কলেজের সেই ছেলেটাকে খুঁজছিল। তারপর কথার বাঁধ ভাঙতে সময় লাগল না।

কে কোথায় আছে, কার কী অবস্থা, কোন অধ্যাপক এখনও বেঁচে আছেন, কার সঙ্গে কার যোগাযোগ আছে—একের পর এক গল্প চলতে লাগল।

— "তোর খবর তো মাঝেমধ্যে লিংকডইনে দেখি," সৌমেন বলল, "বড় সাহেব হয়ে গেছিস দেখছি।"

অরিন্দম হেসে মাথা নাড়ল।

— "বড় সাহেব না, বড় চাকর।"

সৌমেন হো হো করে হেসে উঠল।

— "বিয়ে করলি না কেন বল তো?"

প্রশ্নটা এমনভাবে করা হলো যেন উত্তরটা খুবই সহজ।

অরিন্দম কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

— "করে ওঠা হয়নি।"

— "করে ওঠা হয়নি, না করিসনি?"

— "দুটোই ধর।"

সৌমেন মাথা নাড়ল।

বয়স তাদের দু'জনেরই চল্লিশ পেরিয়েছে। এই বয়সে মানুষ সাধারণত জোর করে আর কারও ব্যক্তিগত জীবনে ঢুকতে চায় না।

তবু বন্ধুত্বের একটা পুরোনো অধিকার থাকে।

— "আমার কিন্তু বড় মেয়ে এবার কলেজে উঠল," গলায় গর্ব মিশিয়ে বলল সৌমেন।

অরিন্দম অবাক হয়ে তাকাল।

যে ছেলেটা একসময় কলেজ ক্যান্টিনে প্রেমপত্র লিখত, তার মেয়ে আজ কলেজে পড়ে।

সৌমেন মোবাইল বের করে ছবি দেখাতে লাগল। স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে—হাসিখুশি একটা পরিবার।

সৌমেন হঠাৎ বলল,

— "আজ আর কোনো কাজ আছে?"

— "না।"

— "তাহলে চল, দুপুরে আমার বাড়ি।"

— "না রে, থাক।"

— "চুপ কর। বিশ বছর পর দেখা হয়েছে। বউকে বলব কলেজের বন্ধু এসেছে। তোর না গেলে কিন্তু বাড়িতে ঢুকতে দেবে না।"

অরিন্দম হেসে ফেলল।

— "এখনও আগের মতো জোর করে কথা বলিস দেখছি।"

— "অবশ্যই। কিছু জিনিস বদলায় না।"

সৌমেন উঠে দাঁড়াল।

— "চল। আজ দুপুরের খাওয়া আমার বাড়িতে।"

অরিন্দম একবার নদীর দিকে তাকাল।

যে নির্জনতা খুঁজতে সে এখানে এসেছিল, সেটা হয়তো আর পাওয়া যাবে না।

তবু বহুদিন পর পুরোনো বন্ধুর আন্তরিক টানকে উপেক্ষা করার ইচ্ছে হলো না তার।

সে ধীরে ধীরে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল।

গঙ্গার ওপর দিয়ে তখন হালকা রোদ ঝিকমিক করছে।

আর অরিন্দম জানত না, এই সাধারণ নিমন্ত্রণটাই হয়তো তার বহুদিনের স্থির জীবনের ছন্দে একটুখানি পরিবর্তনের সূচনা হতে চলেছে।

সৌমেনের বাড়িটি উত্তর কলকাতার এক পুরোনো পাড়ায়।

বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ। তিনতলা বাড়ি। বারান্দার গ্রিলে মানিপ্ল্যান্ট জড়িয়ে আছে। উঠোনের এক কোণে তুলসীমঞ্চ। বাড়ির গায়ে সময়ের ছাপ স্পষ্ট, তবু কোথাও যেন এক অদ্ভুত উষ্ণতা লেগে আছে।

গাড়ি থেকে নেমেই অরিন্দম বুঝতে পারল, বহুদিন এমন বাড়িতে তার আসা হয়নি।

এখানে মানুষের বসবাস আছে।

দরজা খুলতেই ভেসে এল রান্নার গন্ধ, কারও হাসির শব্দ, দূরে টেলিভিশনের আওয়াজ। বাড়িটা যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

— "এই যে, চলে এলাম!" সৌমেন চিৎকার করে উঠল।

মুহূর্তের মধ্যেই ঘরের ভেতর থেকে কয়েকজন বেরিয়ে এল।

সৌমেনের স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে—এক এক করে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগল সে।

অরিন্দম ভদ্রভাবে সবার সঙ্গে কথা বলছিল, এমন সময় সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার শব্দ হলো।

স্বাভাবিকভাবেই তার দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে গেল।

একজন মহিলা ধীরে ধীরে নিচে নামছিলেন।

বয়স সম্ভবত ত্রিশের কাছাকাছি।

শ্যামবর্ণ গায়ের রং, বড় বড় শান্ত চোখ, টানা ভুরু আর মুখজুড়ে এক ধরনের সংযত সৌন্দর্য। চোখে পড়ার মতো কিছু নয়, অথচ একবার তাকালে দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে থাকা কঠিন।

সাদামাটা হালকা রঙের শাড়ি পরেছিলেন। কোনো বাড়তি সাজগোজ নেই। কিন্তু তার মধ্যে এমন একটা স্বাভাবিক আভিজাত্য ছিল, যা প্রসাধনের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়।

সৌমেন হেসে বলল,

— "পরিচয় করিয়ে দিই। এ আমার শালী, মেঘলা।"

মহিলা মৃদু হেসে নমস্কার করলেন।

— "আপনার কথা অনেক শুনেছি।"

অরিন্দমও নমস্কার জানাল।

— "আশা করি সব ভালো কথাই শুনেছেন।"

মেঘলার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।

— "সেটা পরে বিচার করা যাবে।"

কথাটা খুব সাধারণ ছিল।

তবু অরিন্দমের মনে হলো, বহুদিন পর কেউ তার সঙ্গে এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলল, যেখানে তার পদমর্যাদা বা পরিচয়ের কোনো গুরুত্ব নেই।

শুধু মানুষ হিসেবে।

আলাপ-আলোচনা, হাসি-ঠাট্টা আর দুপুরের জলযোগ সেরে যখন অরিন্দম সৌমেনের বাড়ি থেকে বেরোল, তখন বিকেল প্রায় নেমে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছে।

অনেকদিন পর এমন একটি দিন কাটাল সে, যেখানে অফিসের কোনো আলোচনা ছিল না, কোনো লক্ষ্যপূরণের চাপ ছিল না, কোনো প্রেজেন্টেশনের হিসাব ছিল না। ছিল শুধু কিছু মানুষ, কিছু আন্তরিকতা আর কিছু ফেলে আসা দিনের গন্ধ।

গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে অদ্ভুতভাবে তার মনে পড়ছিল প্রথম যৌবনের কথা।

প্রেমের কথা।

ভালোবাসার কথা।

এমন নয় যে প্রেম তাকে কোনোদিন স্পর্শ করেনি। আর পাঁচজন মানুষের মতো তার জীবনেও ভালো লাগা এসেছে, আকর্ষণ এসেছে, কাউকে ঘিরে স্বপ্ন দেখার দিনও এসেছে।

কিন্তু ভালোবাসা সম্পর্কে তার ধারণা বরাবরই একটু আলাদা ছিল।

অরিন্দম বিশ্বাস করত, প্রকৃত প্রেম অধিকার থেকে জন্মায় না; জন্মায় শ্রদ্ধা থেকে।

যেখানে মানুষ মানুষকে নিজের সম্পত্তি বলে ভাবতে শুরু করে, সেখানে ভালোবাসার চেয়ে ভয়, প্রত্যাশা আর দাবি বেশি জায়গা দখল করে নেয়।

প্রেমের সবচেয়ে বড় শক্তি বন্ধন নয়, মুক্তি।

যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতাও দিতে হয়।

হয়তো সেই কারণেই জীবনের অনেক সম্পর্কের সামনে দাঁড়িয়েও অরিন্দম কখনও কাউকে ধরে রাখতে শেখেনি। জোর করে কাউকে নিজের পাশে রাখার চেষ্টাও করেনি।

তার বিশ্বাস ছিল, যে সত্যিই ভালোবাসে সে ফিরে আসবে।

আর যে ফিরে আসে না, তাকে আটকে রাখার অধিকার কারও নেই।

গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে সে একবার পেছন ফিরে তাকাল।

সৌমেনের বাড়ির বারান্দায় কেউ একজন দাঁড়িয়ে ছিল।

দূর থেকে মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না।

তবু অরিন্দমের মনে হলো, বিকেলের নরম আলোয় শ্যামবর্ণ একটি মুখ যেন মুহূর্তের জন্য তার দিকে তাকিয়ে আছে।

পরের মুহূর্তেই সে নিজের ভাবনায় হেসে ফেলল।

কিছু কিছু মানুষকে দেখার পর তাদের উপস্থিতি বাস্তবের চেয়ে স্মৃতিতে বেশি সময় ধরে রয়ে যায়।

```

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...