Skip to main content

পর্ব – ১৭ : নীরব অর্জন

পর্ব – ৭ : নীরব অর্জন

ছুটি শেষ হওয়ায় অরিন্দম আবার অফিসে ফিরে এসেছে।

কিন্তু অফিসের সেই পুরনো টেবিল, ফাইলের স্তূপ, মিটিং আর রিপোর্ট—সবকিছু যেন আগের মতো আর লাগছে না। কাজ চলছে ঠিকই, ইমেল খুলছে, ফাইল সই করছে, রিপোর্ট পড়ছে—তবু মনটা কোথাও যেন পুরোপুরি বসে নেই।

মাঝে মাঝে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। শহরের ব্যস্ততা, গাড়ির ভিড়, মানুষের তাড়া—সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকে। শুধু তার ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যেটার নাম সে ঠিক করে বলতে পারে না।

ছুটির সেই কয়েকটা দিন যেন তার ভেতরে কিছু বদলে দিয়ে গেছে। না, বড় কোনো ঘটনা নয়—কিন্তু একটা অনুভূতি, একটা টান, একটা নীরব প্রশ্ন রেখে গেছে।

অফিসের কফি মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে হঠাৎই বুঝতে পারে—সে কফির স্বাদটা ঠিক অনুভব করছে না, শুধু অভ্যাসটা করছে।

মিটিংয়ে বসে সহকর্মীরা কথা বলছে, প্রেজেন্টেশন চলছে, স্লাইড বদলাচ্ছে—অরিন্দম শুনছে ঠিকই, কিন্তু কোথাও যেন একটা অংশ অনুপস্থিত। মনটা বারবার অন্যদিকে সরে যাচ্ছে, যেন নিজের অজান্তেই কিছু খুঁজছে।

মনে পড়ে যায় পলাশডাঙার কথা।

ফেরার সময় মামা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—

— “তুই কলকাতা থেকে ফিরে আয় পলাশডাঙায়। এই বৃদ্ধ বয়সে আমার আপন বলতে একমাত্র তুই।”

মামিমাও একই কথা বলেছিলেন—

— “আমাদের আর কিসের অভাব? অর্থের তো কোনো সমস্যা নেই। তুই শুধু কাছে থাক।”

সুব্রতও বিদায়ের সময় বলেছিল—

— “এবার নিজের জন্য একটু বাঁচ। সারাজীবন তো অন্য কিছুর জন্যই দৌড়ালি।”

কথাগুলো অরিন্দমের মনে বারবার ফিরে আসে।

জীবনে যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সে চেয়েছিল, বহু আগেই তা অর্জন করেছে। নিজের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য, পরিবারের জন্য যা দরকার তার চেয়েও অনেক বেশি সঞ্চয় রয়েছে। একসময় যে লক্ষ্যগুলোকে জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য বলে মনে হতো, সেগুলো এখন অর্জিত বাস্তবতা।

তবু আশ্চর্যভাবে, সেই অর্জনের মধ্যে আর কোনো উত্তেজনা খুঁজে পায় না সে।

একটা নতুন পদ, আরেকটা ইনক্রিমেন্ট, আরও কিছু টাকা—

এইসব ভাবনা আর আগের মতো তাকে আলোড়িত করে না।

বরং মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলো হয়তো কোনোদিন ব্যাংকের হিসাবের খাতায় লেখা ছিল না।

তবু সে এখনও কলকাতায়।

এখনও অফিসে আসছে।

যেন কোনো অদৃশ্য সেতুর উপর দাঁড়িয়ে আছে—একদিকে পুরোনো জীবন, অন্যদিকে নতুন কোনো সম্ভাবনা।

এরই মধ্যে মাঝেমধ্যে মেঘলার মেসেজ আসে।

কখনও শান্তিনিকেতনের কোনো ছবি।

কখনও কোনো অদ্ভুত ভাবনা।

কখনও শুধু—

“আজ আকাশটা খুব সুন্দর।”

অরিন্দম সব পড়ে।

কখনও উত্তর দেয়, কখনও দেয় না।

কিন্তু বুঝতে পারে, মেয়েটি তার জীবনের ভেতরে একটা নীরব উপস্থিতি তৈরি করে ফেলেছে।

সেদিন বিকেলে অফিসে বসে একটি ফাইল দেখছিল সে।

হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

অরিন্দম কল রিসিভ করল।

— “হ্যালো।”

ওপাশ থেকে ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠস্বর।

— “আমি ঈশিতা বলছি।”

অরিন্দম একটু অবাক হলেও সেটা প্রকাশ করল না।

— “বলুন।”

ঈশিতা বলল—

— “আপনি হয়তো অবাক হচ্ছেন আমি ফোন করায়।”

— “না, অবাক না। তবে ফোনটা অপ্রত্যাশিত।”

ওপাশে মৃদু হাসি শোনা গেল।

— “হয়তো তাই। আসলে একটা খবর দেওয়ার জন্য ফোন করলাম।”

— “কী খবর?”

— “আমি সিভিল সার্ভিসের লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছি। সামনে ইন্টারভিউ।”

অরিন্দমের মুখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাসি ফুটে উঠল।

— “অভিনন্দন। সত্যিই খুব ভালো খবর।”

— “ধন্যবাদ।”

কিছুক্ষণ নীরবতার পর ঈশিতা আবার বলল—

— “আসলে আরেকটা কারণে ফোন করেছি।”

— “বলুন।”

— “ইন্টারভিউটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাবা বলেছে ও যাবে আমার সঙ্গে। কিন্তু আমি ওনাকে না করেছি।”

অরিন্দম মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।

ঈশিতা ধীরে ধীরে বলল—

— “আমি সবসময় নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, এত বড় একটা ইন্টারভিউয়ের আগে একটু নার্ভাস লাগছে।”

একটু থেমে সে আবার বলল—

— “আপনি যদি ওইদিন একটু সময় দিতে পারেন...”

অরিন্দম চুপ করে রইল।

ঈশিতা দ্রুত যোগ করল—

— “না না, কোনো অসুবিধা হলে ভুলে যান। আমি শুধু ভেবেছিলাম... আপনি থাকলে ভালো লাগবে।”

— “আমি থাকলে?”

— “হ্যাঁ।”

ওপাশের গলাটা এবার খুব স্বাভাবিক, খুব আন্তরিক শোনাল।

— “আপনি হয়তো বিষয়টাকে খুব সাধারণভাবে নেবেন। কিন্তু কিছু মানুষকে দেখলে মনে হয়, তারা থাকলে অকারণেই একটা ভরসা পাওয়া যায়।”

অরিন্দম কিছু বলল না।

ঈশিতা বলেই চলল—

— “আমি জানি না কেন। হয়তো আমাদের খুব বেশি পরিচয়ও নেই। কিন্তু আপনার সঙ্গে কথা বলার পর মনে হয়েছে, আপনি পাশে থাকলে আমি আরও আত্মবিশ্বাসী বোধ করব।”

কথাটা শুনে অরিন্দমের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নিল।

বহু বছর ধরে মানুষ তাকে চিনেছে তার পদমর্যাদার জন্য। তার সাফল্যের জন্য। তার অবস্থানের জন্য।

কিন্তু আজ একজন মানুষ তাকে ডাকছে অন্য কারণে।

কোনো সমস্যা সমাধান করার জন্য নয়।

কোনো প্রভাব খাটানোর জন্য নয়।

শুধু তার উপস্থিতির জন্য।

শুধু এই বিশ্বাসে যে, সে পাশে থাকলে সাহস বাড়বে।

অদ্ভুতভাবে কথাটা তার ভালো লাগল।

হয়তো কারণ বহুদিন পর সে অনুভব করল—তার মূল্য শুধু তার পরিচয়ে নয়, তার মানুষ হিসেবেও।

ঈশিতা আবার বলল—

— “আপনি কি পারবেন?”

অরিন্দম ধীরে বলল—

— “হ্যাঁ, পারব।”

ওপাশে স্বস্তির নিঃশ্বাস শোনা গেল।

— “ধন্যবাদ।”

ফোনটা কেটে গেল।

অরিন্দম অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে জানালার বাইরে তাকাল।

কলকাতার আকাশে মেঘ জমছে।

নিচে মানুষের ভিড়, গাড়ির সারি, শহরের অবিরাম ছুটে চলা।

আর তার মনে হলো—

জীবনের সব অর্জন হয়তো সংখ্যায় মাপা যায় না।

কিছু অর্জন আসে খুব নীরবে।

যখন একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে বলে—

“আপনি থাকলে আমার সাহস বাড়ে।”

```

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...
🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান, আর প্রতিদিনের নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফিস শু...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...