Skip to main content

পর্ব – ১ : চাঁদ দেখা হয়ে ওঠে না

পর্ব – ১ : চাঁদ দেখা হয়ে ওঠে না

অরিন্দম সেনের আর চাঁদ দেখা হয়ে ওঠে না।

একসময় চাঁদ ছিল তার নিত্যসঙ্গী। গ্রামের মেঠোপথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হতো, আকাশের ওই রুপোলি গোলকটাও বুঝি তার সঙ্গে সঙ্গে পথ চলছে। জ্যোৎস্না রাত মানেই ছিল ছাদের কার্নিশে বসে থাকা, কিংবা উঠোনের এক কোণে চুপচাপ শুয়ে আকাশ দেখা। তখন সময় ছিল, স্বপ্ন ছিল, অপেক্ষা ছিল।

তারপর জীবন এসে পড়ল।

জীবননদী বড় দ্রুত বয়ে যায়। কখনও কখনও এত দ্রুত যে মানুষ বুঝতেই পারে না, ঠিক কোন মোড়ে এসে সে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলো ফেলে এসেছে। এই তো সেদিন কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেখত যে ছেলেটা, দেখতে দেখতে জীবনের চল্লিশেরও বেশি বসন্ত পেরিয়ে এসেছে।

এখন সে শহরের এক বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বেতন, পদমর্যাদা, সম্মান—সবই আছে। দক্ষিণ কলকাতার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি, ব্যাংকের সঞ্চয়—সাফল্যের যে চেহারা সমাজ কল্পনা করে, তার প্রায় সবটুকুই অর্জন করেছে অরিন্দম।

চল্লিশের অধিক বসন্ত পেরিয়ে এলেও অরিন্দমের জীবনে সংসার নামের অধ্যায়টি এখনও শুরু হয়নি। জীবন যখন ভালোবাসার দরজায় কড়া নেড়েছিল, তখন সে ব্যস্ত ছিল ভবিষ্যৎ নির্মাণে। আর যখন একটু থেমে পেছন ফিরে তাকিয়েছে, তখন দরজার ওপারে শুধু নীরবতা দাঁড়িয়ে ছিল।

গতরাতে অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল।

ফ্ল্যাটের দরজা খুলতেই নিস্তব্ধতা তাকে স্বাগত জানায়। এই নীরবতার সঙ্গে তার বহু বছরের পরিচয়। তবু কিছু কিছু রাত থাকে, যখন পরিচিত নিঃসঙ্গতাও নতুন করে বুকের ভেতর শব্দ তোলে।

পোশাক না বদলিয়েই জানালার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সে।

বারো তলার কাঁচঘেরা জানালার ওপারে রাতের শহর তখন আলোর মালা পরে দাঁড়িয়ে।

আর তারও ওপরে—

চাঁদ।

মেঘের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা গোল, শান্ত, নির্লিপ্ত চাঁদ।

কত বছর পর যেন সত্যি সত্যিই তাকে দেখল অরিন্দম।

তার মনে হলো, পৃথিবীতে কিছু কিছু জিনিস বড্ড একগুঁয়ে। তারা বদলায় না। বদলে যায় শুধু মানুষ।

মানুষের মন বড় বিচিত্র। অষ্টাদশী চঞ্চলার মতো সে ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়। গতরাতের জ্যোৎস্নাভেজা আবেগ সকালের আলোয় অনেকটাই ফিকে হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তা হলো না।

বরং ঘুম ভাঙার পর থেকেই বুকের ভেতর এক ধরনের অস্থিরতা জমতে শুরু করল। আজ রবিবার। অন্যদিন ছুটির সকাল মানেই অফিসের ফাইল, মেইল আর মিটিংয়ের প্রস্তুতি। আজ ল্যাপটপটা বন্ধই পড়ে রইল। কোনো কাজ করতে ইচ্ছে করছে না।

শীতের শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কুয়াশার পাতলা চাদর সরিয়ে ধীরে ধীরে সকাল নামছে রাস্তায়। কোথাও দোকানের ঝাঁপ উঠছে, কোথাও চায়ের কাপে প্রথম ধোঁয়া উড়ছে।

অরিন্দম হাঁটছিল।

দীর্ঘদেহী, সুগঠিত শরীর, প্রশস্ত কাঁধ আর সংযত ব্যক্তিত্ব তাকে এখনও ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে চেনায়। মুখাবয়বে ছিল এক ধরনের স্থির আত্মবিশ্বাস, যা দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিচয় বহন করে। পথ চলতে গিয়ে আজও অনেক চোখ অজান্তে একবার তার দিকে ফিরে তাকায়। কিন্তু অরিন্দম সেসবের কিছুই খেয়াল করছিল না। কোনো এক অদৃশ্য টানে সে গঙ্গার দিকে যেতে চাইছিল। নদীর ধারে বসতে।

কোনো হিসাব ছাড়া, কোনো লক্ষ্য ছাড়া, কোনো প্রয়োজন ছাড়া। শুধু কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতে। গঙ্গার ধারে এসে অরিন্দম একটি পুরোনো সিমেন্টের বেঞ্চে বসে পড়ল।

এই দিকটায় সচরাচর খুব বেশি লোকজন আসে না। শহরের ব্যস্ততা যেন এখানে এসে অনেকটাই থেমে যায়। একটু দূরে দু-একটি চায়ের দোকান। প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফেরা কয়েকজন মানুষের জন্যই বোধহয় তাদের অস্তিত্ব। কেতলির মুখ থেকে ধোঁয়া উঠছে, সঙ্গে ভেসে আসছে চায়ের পাতার মিষ্টি গন্ধ। আরও খানিকটা দূরে একটি স্নানের ঘাট। সেখানে গুটিকয়েক পুণ্যার্থী সকালবেলার পূজা-অর্চনা আর স্নানে ব্যস্ত। কারও ঠোঁটে মন্ত্রোচ্চারণ, কারও হাতে ফুল আর প্রদীপ। নদীর বুক থেকে ভেসে আসা হালকা কুয়াশা আর ঘাটের ঘণ্টাধ্বনি মিলেমিশে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

অরিন্দম চুপচাপ বসে রইল। সামনের গঙ্গা নিজের ছন্দে বয়ে চলেছে। যেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রার্থনা, ব্যর্থতা আর ভালোবাসার গল্প শুনে এসেও তার কোনো তাড়া নেই। অরিন্দম নদীর দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। কতক্ষণ কেটে গেছে, তার হিসাব সে রাখেনি।

```

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...
🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান, আর প্রতিদিনের নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফিস শু...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...