Skip to main content

পর্ব – ৪ :মলের ভিড়ে হঠাৎ দেখা

তবু কাজের চাপ শেষ করতে করতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল।

ঘড়িতে তখন প্রায় সাতটা।

ল্যাপটপ বন্ধ করতে গিয়েই হঠাৎ মনে পড়ল—

আজ তো অফিসের ড্রাইভার রতনের মেয়ের বিয়ে।

কয়েক মাস ধরেই লোকটা বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আর্থিক সমস্যার কথা জানতে পেরে অরিন্দম যথাসাধ্য সাহায্যও করেছিল।

নিমন্ত্রণ করার সময় রতন বারবার বলেছিল,

— "স্যার, একবার আসবেন কিন্তু। আপনি না এলে আমার খুব খারাপ লাগবে।"

অফিসের নিমন্ত্রণবাড়িতে যাওয়ার অভ্যাস অরিন্দমের কোনোদিনই ছিল না।

তবু রতনের আন্তরিক অনুরোধ এড়িয়ে যেতে পারেনি।

ভাবল, যাওয়ার আগে একটা উপহার কিনে নেওয়া যাক।

গাড়ি ঘুরল কাছের একটি বড় শপিং মলের দিকে।

মলে ঢুকেই অরিন্দম থমকে দাঁড়াল।

সামনেই সৌমেন।

আর তার পাশে মেঘলা।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন পরিস্থিতিটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো তার।

এত বড় শহরে, এত তাড়াতাড়ি, এভাবে আবার দেখা হয়ে যাবে—ভাবেনি।

সৌমেন প্রথমেই চিৎকার করে উঠল,

— "আরে! এ যে অরিন্দম!"

তারপর হাসতে হাসতে এগিয়ে এল।

মেঘলাও ভদ্রভাবে নমস্কার করল।

অরিন্দম প্রতিনমস্কার জানাল।

— "আপনি এখানে?" মেঘলা প্রশ্ন করল।

— "একটা বিয়ের উপহার কিনতে এসেছি।"

— "আমরাও কিছু কেনাকাটা করতে এসেছি।"

খুব সাধারণ কথোপকথন।

তবু কথাগুলো অরিন্দমের কানে অদ্ভুতভাবে রয়ে গেল।

মেঘলার চোখ দুটো আজও ঠিক ততটাই শান্ত।

কাজলে ঘেরা গভীর চোখ।

ঠোঁটের কোণে মৃদু, সংযত এক হাসি।

সেই হাসিতে কোনো বাড়তি উচ্ছ্বাস নেই, কোনো কৃত্রিমতাও নেই।

তবু কেন যেন মনে হয়, মানুষটি হাসলে চারপাশের কোলাহল একটু কমে যায়।

কিছু কিছু মুখ খুব অল্প সময়ের জন্য জীবনে আসে।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে থেকে যায়।

— "জামাইবাবু আপনার খুব প্রশংসা করে।"

অরিন্দম হালকা হেসে বলল,

— "বন্ধুরা সাধারণত দু'ধরনের কাজ করে। হয় অযথা প্রশংসা করে, নয়তো অযথা বদনাম করে। আশা করি প্রথমটাই করেছে।"

মেঘলা মৃদু হেসে কফির কাপে চুমুক দিল।

কথা এগোতে লাগল।

একসময় কথার ফাঁকেই অরিন্দম বলে ফেলল,

— "তাহলে বিয়ের কথা ভাবেননি?"

প্রশ্নটা করার পরই সে নিজেকে একটু অস্বস্তিতে পড়তে দেখল। এত অল্প পরিচয়ে এমন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা বোধহয় ঠিক হলো না।

কিন্তু মেঘলা যেন তার অস্বস্তিটা বুঝতে পারল।

ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,

— "আপনি বিয়ে করেননি কেন?"

অরিন্দম হেসে ফেলল।

— "আমার জাহাজ যে নোঙর করবে এমন কোনো নিরাপদ বন্দর খুঁজে পাইনি।"

— "নাকি খুঁজতেই চাননি?"

— "দুটোই হতে পারে।"

মেঘলা মাথা নাড়ল।

— "তা হলে আমাদের অবস্থাও প্রায় একই।"

— "আপনার ক্ষেত্রে?"

— "আমার জাহাজও এখনও সমুদ্রে ভাসছে। কোথাও নোঙর ফেলার মতো তেমন প্রয়োজন বোধ করিনি।"

দু'জনেই হেসে উঠল।

কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর অরিন্দম বলল,

— "এখন আর এসব নিয়ে বিশেষ ভাবিও না। এই বয়সে এসে মানুষ অনেক কিছু মেনে নিতে শিখে যায়।"

মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল।

— এই বয়স? আপনি এমনভাবে বলছেন যেন নিজেকে বৃদ্ধ ঘোষণা করে ফেলেছেন। এটা কিন্তু বাড়াবাড়ি।

তার চোখে তখন এক ধরনের আন্তরিক দৃঢ়তা।

— "মানুষের বয়স ক্যালেন্ডার ঠিক করে না। কৌতূহল, স্বপ্ন আর নতুন করে শুরু করার সাহস ঠিক করে। সেই হিসাবে আপনি মোটেই বৃদ্ধ নন।"

কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল।

তবু কেন জানি না, অরিন্দমের মনে হলো বহুদিন পর কেউ তাকে তার পদবি, সাফল্য বা বয়স দিয়ে নয়—মানুষ হিসেবে বিচার করল।

আর সেই অনুভূতিটা আশ্চর্যরকম ভালো লাগল।

অরিন্দম মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

— "আপনার কথায় যুক্তি আছে। তবে সবাই তো আর আপনার মতো ভাবে না।"

মেঘলা জানালার ওপারে সন্ধ্যার আলো-আঁধারি দিকে তাকাল।

তারপর ধীর স্বরে বলল,

— "সব মানুষের জীবন এক ছাঁচে তৈরি হয় না।"

— "মানে?"

— "সংসার খুব সুন্দর একটা জিনিস। কিন্তু সেটাই জীবনের একমাত্র গন্তব্য—এটা আমি বিশ্বাস করি না।"

তার কণ্ঠে কোনো তিক্ততা ছিল না।

ছিল শুধু এক শান্ত দৃঢ়তা।

— "আমার কখনও মনে হয়নি, শুধু সমাজের নিয়ম মেনে বিয়ে করতেই হবে।"

কিছুক্ষণ থেমে সে আবার বলল,

— "আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো সংসার, সন্তান, বাজার-ঘরকন্না—এসবের মধ্যে কোনো অসম্মান নেই। বরং খুব বড় দায়িত্ব। অনেকেই সেটা খুব সুন্দরভাবে পালন করেন। কিন্তু আমি বুঝেছিলাম, আমার পথটা বোধহয় একটু আলাদা।"

অরিন্দম মন দিয়ে শুনছিল।

মেঘলার চোখদুটো তখন স্থির।

মনে হচ্ছিল, কথাগুলো সে শুধু বলছে না, বাঁচছে।

— "আমি বরাবরই চেয়েছি নিজের মতো করে কিছু করতে। এমন কিছু, যার মধ্যে শুধু নিজের নয়, অন্যের জীবনও একটু ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।"

অরিন্দম বলল,

— "তাই সমাজসেবার কাজ?"

— "সমাজসেবা শব্দটা খুব বড় হয়ে যায়। আমি শুধু মনে করি, আমরা সবাই যদি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দু-একজন মানুষের পাশে দাঁড়াই, পৃথিবীটা হয়তো একটু সুন্দর হবে।"

মুহূর্তখানেক থেমে সে আবার বলল,

— "জীবনে কিছু মানুষ থাকে, যাদের সুখ নিজের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। অন্য কারও মুখে হাসি ফুটলে তারাও আনন্দ পায়। আমি হয়তো তাদের দলে পড়ি।"

অরিন্দম চুপ করে রইল।

বহু বছর কর্পোরেট জগতে কাটিয়ে সে অসংখ্য সফল মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। বড় পদ, বড় বেতন, বড় স্বপ্ন—এসবের অভাব ছিল না।

কিন্তু নিজের বিশ্বাসকে এত শান্তভাবে বাঁচতে দেখা মানুষ খুব বেশি পায়নি।

কেন জানি না, মেঘলার কথাগুলো তার মনে গভীরভাবে দাগ কাটছিল।

একজন সাফল্যের পেছনে ছুটেছে।

অন্যজন অর্থের চেয়ে অর্থপূর্ণতার পেছনে।

কফির কাপ প্রায় খালি হয়ে এসেছে।

কাঁচের ওপারে সন্ধ্যা ধীরে ধীরে শহরের ওপর নেমে আসছে।

মলের ব্যস্ত কোলাহলের মাঝেও যেন তাদের টেবিলের চারপাশে এক অদ্ভুত শান্তি তৈরি হয়েছে।

আর অরিন্দমের মনে হচ্ছিল, বহুদিন পর সে এমন একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছে, যার কথাগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার পরও মনের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রতিধ্বনিত হয়।

গল্পটা বেশ জমে উঠেছিল।

হয়তো আরও অনেকক্ষণ চলত। হয়তো রাত পর্যন্ত।

কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হতে সময় লাগে না। কথার পর কথা জন্ম নিতে থাকে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যায়, অথচ সময়ের হিসেব আর মনে থাকে না।

একেই কি মনের মানুষের উপস্থিতি বলে?

অরিন্দম জানে না।

তবে এতটুকু বুঝতে পারছিল, বহুদিন পর কোনো আলাপ তার ভেতরে এমন দীর্ঘ অনুরণন সৃষ্টি করেছে।

ঠিক সেই সময় সৌমেনের ফোন বেজে উঠল।

ফোনের ওপার থেকে আসা খবর শুনে তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।

— "আমাদের এখনই বেরোতে হবে।"

অরিন্দমও ঘড়ির দিকে তাকাল।

রতনের মেয়ের বিয়েতে যাওয়ার কথা।

বিদায়ের আগে মেঘলার দিকে একবার তাকিয়েছিল সে।

মেঘলা মৃদু হেসে বলেছিল,

— "আশা করি আবার দেখা হবে।" কথাটা নিছক সৌজন্যও হতে পারে। তবু অরিন্দমের মনে হলো, বহুদিন পর কোনো শব্দ তার মনে এতটা কোমলভাবে এসে ছুঁয়ে গেল।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...
🚉 মাধবপুর স্টেশন লোকাল ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এক মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব প্রেম, সংগ্রাম, দায়িত্ব, আত্মসম্মান এবং মানুষের গল্প। 📖 শুরু থেকে পড়ুন ১১ প্রকাশিত অধ্যায় ২ প্রধান চরিত্র ∞ অনুভূতির যাত্রা 📖 উপন্যাস সম্পর্কে 'মাধবপুর স্টেশন' কোনো রূপকথার প্রেমের গল্প নয়। এটি মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তব জীবনের কাহিনি। প্রতিদিনের লোকাল ট্রেন, সরকারি অফিস, সংসারের দায়িত্ব, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, চাকরির সংগ্রাম এবং নীরবে জন্ম নেওয়া ভালোবাসার এক মানবিক উপাখ্যান। অর্ণিবান ও নন্দিতার গল্পের পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের বিচার, আত্মসম্মান, বন্ধুত্ব এবং সেই সব সম্পর্ক, যাদের কোনো নাম নেই—তবু তারা জীবনের সবচেয়ে সত্যি সম্পর্ক। 📚 প্রকাশিত অধ্যায় অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা ভোরের স্টেশন, গোপাল কাকুর চায়ের দোকান, আর প্রতিদিনের নীরব চোখাচোখি—এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে এক অসাধারণ সম্পর্কের সূচনা করে। 📖 সম্পূর্ণ পড়ুন অফিস নামের আরেক সংসার সরকারি অফিস শু...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...