Skip to main content

মিটিংময় জীবন

মিটিংময় জীবন

একসময় মানুষ অফিসে যেত কাজ করতে। এখন অফিসে যায় মিটিং করতে। কাজ করার সময় পাওয়া গেলে সেটা বোনাস। আমার দিন শুরু হয় মিটিং দিয়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজতে মাজতে মোবাইলে দেখি— "Meeting starts in 10 minutes." আমার সন্দেহ, আর কয়েক বছর পরে ঘুম ভাঙার আগেই মিটিং শুরু হয়ে যাবে।

অফিসে পৌঁছানোর আগেই প্রথম মিটিং। বাসে উঠেছি। এক কানে ইয়ারফোন। অন্য হাতে বাসের রড আঁকড়ে ঝুলছি। এদিকে মোবাইলের স্ক্রিনে দশজন মানুষ গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছেন। আমি মাঝেমধ্যে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি যে আমি আলোচনায় গভীরভাবে মনোযোগী। মনে হবে যেন দেশের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি কিংবা অন্তত অফিসের ভবিষ্যৎ আমার সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে। বাস্তবে আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ ছিল সামনে একটা সিট খালি হবে কি না, তার উপর।

দুপুরে মিটিং। বিকেলে মিটিং। সন্ধ্যায় মিটিং। অফিস থেকে বের হওয়ার সময় মনে হয়, এবার নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরব। ঠিক তখনই মোবাইলে বার্তা আসে— "Urgent VC at 8 PM." এই "Urgent" শব্দটার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব পুরোনো। যে বিষয়টা তিন মাস ধরে অপেক্ষা করতে পেরেছে, সেটাই সাধারণত রাত আটটায় হঠাৎ জরুরি হয়ে যায়।

রাতে খেতে বসেছি। এক হাতে রুটি। অন্য হাতে মোবাইল। স্ক্রিনে বসের মুখ। বাড়ির লোক ভাবছে আমি অফিস করছি। অফিস ভাবছে আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছি। আর আমি ভাবছি মাছের কাঁটাটা গলায় আটকাল কি না। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, কোথায় আছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, মিটিংয়ে আছি কি না। বাসে মিটিং। ট্রেনে মিটিং। অফিসে মিটিং। বাড়িতে মিটিং। একদিন তো বাজারে আলু কিনতে কিনতেও মিটিং করেছি। সবজিওয়ালা জিজ্ঞেস করল—

— "কত কেজি আলু দেব?"
আমি অভ্যাসবশত বলে ফেললাম—
— "জি স্যার, ঠিক বলেছেন।"
সবজিওয়ালা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল—
— "আমি তো শুধু আলুর দাম বললাম!"

তবে সব দিনের গল্প একরকম নয়। একদিন অফিস থেকে ফিরেছি রাত সাড়ে ন'টায়। মনে মনে খুব খুশি। আজ আর কোনো মিটিং নেই। শান্তিতে খেয়ে-দেয়ে টিভিতে খেলা দেখব। ঠিক তখনই হোয়াটসঅ্যাপ খুলে দেখি ১২৭টি অপঠিত মেসেজ। গ্রুপের নাম দেখে বুক ধড়ফড় করে উঠল। "Emergency Review Meeting"। উপরের দিকে স্ক্রল করে দেখি, রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত এক দফা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়ে গেছে। সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়ে গেছে। কাজও বণ্টন হয়ে গেছে। শুধু আমি নেই। মুহূর্তের জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেল। মনে হলো, জীবনের অনেক কিছু মিস করেছি, কিন্তু এমন একটা মিটিং মিস করার কষ্ট আলাদা।

পরদিন অফিসে গিয়ে সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করলাম— "কাল মিটিংটা কেমন হলো?" সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল— "তুমি বেঁচে গেছ।" আমি বললাম— "তবু জানো, একটা আফসোস থেকেই গেল।" "কিসের?" "এতগুলো মেসেজ, এতগুলো ভয়েস নোট, এতগুলো 'জি স্যার' আর 'ঠিক বলেছেন স্যার'—সবকিছু থেকে বঞ্চিত হলাম!" সহকর্মী কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল— "তোমার রোগটা গুরুতর।" আমি মাথা নেড়ে বললাম— "হ্যাঁ। বহুদিন ধরে মিটিং করতে করতে এখন মিটিং না করলেও মিটিংয়ের অভাব বোধ হয়।"

এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, মিটিং না থাকলে অস্বস্তি লাগে। একদিন পুরো দিন কোনো মিটিং ছিল না। আমি নিজেই এক সহকর্মীকে ফোন করে বললাম— "হ্যালো, একটু মিটিং করবে?" সে অবাক হয়ে বলল— "কেন?" আমি বললাম— "কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।"

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ভবিষ্যতে মানুষের পরিচয় হবে না পেশা দিয়ে। পরিচয় হবে মিটিং দিয়ে।— "আপনি কী করেন?" — "আমি দিনে সাতটা মিটিং করি।" — "বাহ! আপনি তো সিনিয়র মানুষ!" আর যাঁরা দশটার বেশি মিটিং করেন, তাঁদের সরাসরি জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করা হবে। কারণ এত মিটিংয়ের মধ্যেও বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের কাজ নয়।

তাই সরকারের কাছে আমার বিনীত প্রস্তাব, কর্মীদের জন্য আলাদা ভাতা চালু করা হোক— "মিটিং ভাতা"। যাঁরা বাসে ঝুলতে ঝুলতে, ট্রেনে বসে, অফিস থেকে ফেরার পথে, এমনকি রাতে খেতে খেতেও ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেন, তাঁদের বিশেষ সম্মান দেওয়া উচিত। কারণ তাঁরা শুধু অফিস করেন না। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, মানুষের শরীর এক জায়গায় থাকলেও আত্মা অনলাইনে উপস্থিত থাকতে পারে। আর এই মহান ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবতত একটি পদক তাঁদের প্রাপ্য। পদকের নাম হতে পারে— "মিটিংশ্রী"। 😄

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...