পর্ব – ৬ : পুরোনো প্রেম, নতুন পথ
কলকাতায় ফেরার দিন হাওড়া স্টেশনে হঠাৎ অন্যন্যার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
প্রথম মুহূর্তে দুজনেই থমকে গিয়েছিল।
অন্যন্যা।
অরিন্দমের কলেজজীবনের প্রেম।
একটা সময় ছিল, যখন তাদের সম্পর্কের কথা পুরো কলেজ জানত। বন্ধুরা ধরে নিয়েছিল, একদিন ওদের বিয়েই হবে।
কিন্তু হয়নি।
সেই সময় অরিন্দমের কাছে জীবন মানে ছিল একটাই—নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। বড় চাকরি, বড় সাফল্য, বড় পরিচয়।
একদিন অন্যন্যা তাকে বলেছিল,
— "সবকিছুর আগে কি সত্যিই চাকরিটাই?"
আর অরিন্দম উত্তর দিয়েছিল,
— "এখন না লড়লে পরে আফসোস করতে হবে।"
সেদিনের সেই "পরে" আর কোনোদিন আসেনি।
জীবন দুজনকে দুই দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
আজ এত বছর পর আবার মুখোমুখি।
প্ল্যাটফর্মের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ গল্প হলো।
খোঁজখবর।
কুশল বিনিময়।
পুরনো দিনের দু-একটা স্মৃতি।
তার বেশি কিছু নয়।
অন্যন্যা জানাল, তার স্বামী কয়েক বছর আগে মারা গেছেন।
কথাগুলো বলছিল খুব স্বাভাবিক গলায়। যেন জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তি তাকে কান্নারও ওপারে নিয়ে গেছে।
অরিন্দম তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
একসময় এই মুখটাই তার সমস্ত পৃথিবী ছিল।
এই মানুষটিকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারত না।
কিন্তু আশ্চর্য!
আজ বুকের ভেতর কোনো ঝড় উঠল না।
না হারানোর কষ্ট।
না ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
না কোনো অপূর্ণতার আর্তি।
কিছুই না।
শুধু একধরনের মমতা।
একজন পুরনো পরিচিত মানুষের জন্য শুভকামনা।
ট্রেন ছাড়ার আগে অন্যন্যা হেসে বলল,
— "জানো, অনেক বছর তোমার ওপর রাগ ছিল।"
অরিন্দমও হেসে ফেলল।
— "এখন?"
— "এখন আর নেই। এখন মনে হয়, আমরা দুজনেই আমাদের সময়টাকে বাঁচছিলাম।"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
— "তবে একটা কথা বলি?"
— "বল।"
— "তোমাকে দেখে আজ বুঝলাম, আমরা দুজনেই আর সেই মানুষগুলো নেই।"
অরিন্দম উত্তর দিল না।
কারণ কথাটা সত্যি।
বিদায়ের সময় অন্যন্যা হাত বাড়িয়ে দিল।
অরিন্দম হাতটা ধরল।
এতটুকুই।
হাত ছুঁয়ে গেল, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর কোথাও কোনো কম্পন উঠল না।
তখনই অরিন্দমের মনে এক অদ্ভুত প্রশ্ন জাগল।
তাহলে কি প্রেম বলে কিছু নেই?
যে ভালোবাসার জন্য কবিরা কবিতা লিখেছেন, সাহিত্যিকরা উপন্যাস লিখেছেন, নাট্যকাররা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন—সবই কি কল্পনা?
কিছুক্ষণ ভেবেই নিজেকে উত্তর দিল সে।
না।
প্রেম আছে।
নিশ্চয়ই আছে।
কারণ একসময় অন্যন্যাকে সে সত্যিই ভালোবেসেছিল।
সেই অনুভূতি মিথ্যে ছিল না।
যে বিকেলগুলো একসঙ্গে কেটেছে, যে স্বপ্নগুলো একসঙ্গে দেখা হয়েছে, যে অভিমান আর অপেক্ষার ভেতর দিয়ে তারা হেঁটেছে—সেগুলোও সত্যি ছিল।
কিন্তু সত্যি বলে সবকিছু চিরকাল একই রকম থাকে না।
সময় মানুষের ভেতরেও ঋতু বদলে দেয়।
কিছু সম্পর্ক জীবনের সঙ্গে হাঁটে, কিছু সম্পর্ক জীবনকে হাঁটতে শেখায়।
অন্যন্যা হয়তো তার জীবনে দ্বিতীয় ধরনের মানুষ।
তখনই রবীন্দ্রনাথের সেই পংক্তিটি অকারণেই মনে পড়ল—
“পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়িয়া যাক নব প্রেমজালে।”
কিন্তু আজ এই কথার অর্থ তার কাছে অন্যরকম মনে হলো।
নতুন প্রেম এসে পুরোনো প্রেমকে মুছে দেয় না।
বরং তাকে তার যথাযোগ্য জায়গায় বসিয়ে দেয়।
পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো তখন আর বেদনা হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে জীবনেরই এক টুকরো ইতিহাস।
ট্রেন ছাড়ার বাঁশি বেজে উঠল।
অন্যন্যা অন্য বগির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
অরিন্দমও নিজের সিটে এসে বসল।
জানালার বাইরে প্ল্যাটফর্ম ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল।
তার মনে হলো, জীবনের কিছু মানুষকে ফিরে পাওয়ার জন্য নয়, মনে রাখার জন্যই পাওয়া যায়।
আর কিছু মানুষ আসে ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিতে।
ট্রেন তখন গতি পেতে শুরু করেছে।
অরিন্দম জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
মনের ভেতর কোথাও আর কোনো আক্ষেপ নেই।
শুধু এক ধরনের শান্তি।
কারণ সে বুঝতে পেরেছে—
ভালোবাসা কখনও হারিয়ে যায় না।
সে শুধু রূপ বদলায়।
Comments
Post a Comment