পর্ব – ৫ : পথের দিকে ফিরে দেখা
পলাশডাঙায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমে এসেছিল।
বাড়ির উঠোনে তখন তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলেছে। দূরে বাঁশবাগানের ফাঁক দিয়ে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। ছোটবেলায় এই শব্দগুলোকে খুব স্বাভাবিক মনে হতো অরিন্দমের। আজ এত বছর পর আবার শুনে মনে হলো, কিছু কিছু জিনিস কখনও বদলায় না।
গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগটা ঘরে রেখে সে বারান্দায় এসে বসল।
মামা তখন চুপচাপ খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
অরিন্দমকে দেখে বললেন,
— “কী রে, শান্তিনিকেতন ঘুরে এলি?”
অরিন্দম মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ।”
— “মেয়েটা কেমন?”
প্রশ্নটা শুনে অরিন্দম একটু হেসে ফেলল।
মামা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
— “আমি ঈশিতার কথা জিজ্ঞেস করছি।”
বারান্দার বাতাসে হালকা হাসির ঢেউ উঠল।
অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
— “ভালো মানুষ।”
মামা কাগজটা ভাঁজ করে পাশে রেখে দিলেন।
— “ভালো মানুষ খুব কম পাওয়া যায়।”
আবার কিছুক্ষণ নীরবতা।
দূরে কারও বাড়ি থেকে শঙ্খধ্বনি ভেসে এলো।
অরিন্দম হঠাৎ বলল,
— “মামা, একটা কথা বলি?”
— “বল।”
— “কখনও কখনও মনে হয়, আর ভালো লাগছে না।”
মামা অবাক হলেন না।
শুধু জিজ্ঞেস করলেন,
— “কী ভালো লাগছে না?”
অরিন্দম উঠোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঝরে পড়া জবা ফুলগুলো এখনও মাটিতে ছড়িয়ে আছে।
— “এই দৌড়টা।”
— “সবাই তো দৌড়ায়।”
— “হ্যাঁ। কিন্তু সবাই কি জানে কেন দৌড়াচ্ছে?”
মামা চুপ করে রইলেন।
অরিন্দম ধীরে ধীরে বলল,
— “জীবনের এতগুলো বছর ভেবেছি, আর একটু এগোলেই শান্তি পাব। তারপর আরও একটু। তারপর আরও একটু। এখন মনে হচ্ছে, শান্তিটা সামনে ছিল না। হয়তো কোথাও পেছনেই পড়ে ছিল।”
বৃদ্ধ মানুষটি দীর্ঘক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর মৃদু হেসে বললেন,
— “শেষ পর্যন্ত মানুষ ঘুরে ফিরে নিজের কাছেই আসে রে।”
অরিন্দম উত্তর দিল না।
আকাশে তখন সন্ধ্যাতারা জ্বলতে শুরু করেছে।
মামা আবার বললেন,
— “তা এবার কী ভাবছিস?”
অরিন্দম কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— “জানি না। তবে একটা কথা বুঝেছি। জীবনের বাকি সময়টা শুধু ব্যাংকের হিসাব বাড়ানোর জন্য খরচ করতে চাই না।”
— “চাকরি ছেড়ে দিবি নাকি?”
— “এখনই নয়। তবে হয়তো আর খুব বেশি দিনও নয়।”
মামার চোখে বিস্ময়ের চেয়ে স্বস্তিই বেশি ফুটে উঠল।
— “অনেক দেরিতে হলেও ঠিক কথাটা ভাবতে শুরু করেছিস।”
অরিন্দম হেসে ফেলল।
— “হতে পারে।”
— “আর বিয়ে?”
প্রশ্নটা এবার হঠাৎ করেই এসে পড়ল।
অরিন্দমের হাসিটা একটু থেমে গেল।
ঈশিতার শান্ত মুখটা মনে পড়ল।
তারপর মেঘলার চোখদুটো।
দুটো মানুষ।
দুটো জীবনদর্শন।
দুটো আলাদা পথ।
মামা আবার বললেন,
— “কাউকে পছন্দ হয়েছে?”
অরিন্দম এবার সরাসরি উত্তর দিল না।
শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “মনে হয়, জীবনে প্রথমবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি সত্যিই ভাবছি।”
মামা মৃদু হেসে বললেন,
— “তাহলে ভালো লক্ষণ।”
বারান্দার সামনে রাত আরও গাঢ় হয়ে আসছিল।
দূরে কোথাও বাঁশির সুর ভেসে এল।
অরিন্দম হেলান দিয়ে বসে রইল।
অনেকদিন পর তার মনে হলো, সামনে যে পথটা আছে, সেটা হয়তো খুব সহজ হবে না।
কিন্তু এই প্রথম সে পথটাকে ভয়ও পাচ্ছে না।
কারণ বহু বছর পর সে শুধু গন্তব্য নয়—
পথটাকেও দেখতে শুরু করেছে।
```
Comments
Post a Comment