Skip to main content

পর্ব – ১৫ :পথের দিকে ফিরে দেখা

পর্ব – ৫ : পথের দিকে ফিরে দেখা

পলাশডাঙায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমে এসেছিল।

বাড়ির উঠোনে তখন তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলেছে। দূরে বাঁশবাগানের ফাঁক দিয়ে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। ছোটবেলায় এই শব্দগুলোকে খুব স্বাভাবিক মনে হতো অরিন্দমের। আজ এত বছর পর আবার শুনে মনে হলো, কিছু কিছু জিনিস কখনও বদলায় না।

গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগটা ঘরে রেখে সে বারান্দায় এসে বসল।

মামা তখন চুপচাপ খবরের কাগজ পড়ছিলেন।

অরিন্দমকে দেখে বললেন,

— “কী রে, শান্তিনিকেতন ঘুরে এলি?”

অরিন্দম মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

— “হ্যাঁ।”

— “মেয়েটা কেমন?”

প্রশ্নটা শুনে অরিন্দম একটু হেসে ফেলল।

মামা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

— “আমি ঈশিতার কথা জিজ্ঞেস করছি।”

বারান্দার বাতাসে হালকা হাসির ঢেউ উঠল।

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

— “ভালো মানুষ।”

মামা কাগজটা ভাঁজ করে পাশে রেখে দিলেন।

— “ভালো মানুষ খুব কম পাওয়া যায়।”

আবার কিছুক্ষণ নীরবতা।

দূরে কারও বাড়ি থেকে শঙ্খধ্বনি ভেসে এলো।

অরিন্দম হঠাৎ বলল,

— “মামা, একটা কথা বলি?”

— “বল।”

— “কখনও কখনও মনে হয়, আর ভালো লাগছে না।”

মামা অবাক হলেন না।

শুধু জিজ্ঞেস করলেন,

— “কী ভালো লাগছে না?”

অরিন্দম উঠোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

ঝরে পড়া জবা ফুলগুলো এখনও মাটিতে ছড়িয়ে আছে।

— “এই দৌড়টা।”

— “সবাই তো দৌড়ায়।”

— “হ্যাঁ। কিন্তু সবাই কি জানে কেন দৌড়াচ্ছে?”

মামা চুপ করে রইলেন।

অরিন্দম ধীরে ধীরে বলল,

— “জীবনের এতগুলো বছর ভেবেছি, আর একটু এগোলেই শান্তি পাব। তারপর আরও একটু। তারপর আরও একটু। এখন মনে হচ্ছে, শান্তিটা সামনে ছিল না। হয়তো কোথাও পেছনেই পড়ে ছিল।”

বৃদ্ধ মানুষটি দীর্ঘক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর মৃদু হেসে বললেন,

— “শেষ পর্যন্ত মানুষ ঘুরে ফিরে নিজের কাছেই আসে রে।”

অরিন্দম উত্তর দিল না।

আকাশে তখন সন্ধ্যাতারা জ্বলতে শুরু করেছে।

মামা আবার বললেন,

— “তা এবার কী ভাবছিস?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

— “জানি না। তবে একটা কথা বুঝেছি। জীবনের বাকি সময়টা শুধু ব্যাংকের হিসাব বাড়ানোর জন্য খরচ করতে চাই না।”

— “চাকরি ছেড়ে দিবি নাকি?”

— “এখনই নয়। তবে হয়তো আর খুব বেশি দিনও নয়।”

মামার চোখে বিস্ময়ের চেয়ে স্বস্তিই বেশি ফুটে উঠল।

— “অনেক দেরিতে হলেও ঠিক কথাটা ভাবতে শুরু করেছিস।”

অরিন্দম হেসে ফেলল।

— “হতে পারে।”

— “আর বিয়ে?”

প্রশ্নটা এবার হঠাৎ করেই এসে পড়ল।

অরিন্দমের হাসিটা একটু থেমে গেল।

ঈশিতার শান্ত মুখটা মনে পড়ল।

তারপর মেঘলার চোখদুটো।

দুটো মানুষ।

দুটো জীবনদর্শন।

দুটো আলাদা পথ।

মামা আবার বললেন,

— “কাউকে পছন্দ হয়েছে?”

অরিন্দম এবার সরাসরি উত্তর দিল না।

শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

— “মনে হয়, জীবনে প্রথমবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি সত্যিই ভাবছি।”

মামা মৃদু হেসে বললেন,

— “তাহলে ভালো লক্ষণ।”

বারান্দার সামনে রাত আরও গাঢ় হয়ে আসছিল।

দূরে কোথাও বাঁশির সুর ভেসে এল।

অরিন্দম হেলান দিয়ে বসে রইল।

অনেকদিন পর তার মনে হলো, সামনে যে পথটা আছে, সেটা হয়তো খুব সহজ হবে না।

কিন্তু এই প্রথম সে পথটাকে ভয়ও পাচ্ছে না।

কারণ বহু বছর পর সে শুধু গন্তব্য নয়—

পথটাকেও দেখতে শুরু করেছে।

```

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

পর্ব – ১৮ : সাহসের সকাল

পর্ব – ৮ : সাহসের সকাল ইন্টারভিউয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ঈশিতার ফোন কলের সংখ্যা ততই একটু একটু করে বাড়ছিল। খুব দীর্ঘ কথা নয়। নিতান্তই প্রয়োজনের কথা। কখনো কোনো নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন, কখনো যাতায়াতের সময় নিয়ে আলোচনা, কখনো বা শুধু নিশ্চিত হওয়া— — "আপনি তো আসছেন, তাই না?" প্রতিবারই অরিন্দমের একই উত্তর— — "হ্যাঁ, আসছি।" ইন্টারভিউয়ের তিন দিন আগেই সে অফিসে ছুটির আবেদন করে রেখেছিল। কারণ হিসেবে লিখেছিল— 'Personal Work'। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় তার নিজেরই মনে হয়েছিল, বহু বছর পর কোনো ছুটি সে সত্যিই নিজের ইচ্ছায় নিচ্ছে। ইন্টারভিউয়ের আগের দিন দুপুরে অফিসে কাজ করছিল অরিন্দম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "ঈশিতা"। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। তবে আজ সেই কণ্ঠে যেন এক অচেনা অস্থিরতা মিশে আছে। — "ব্যস্ত আছেন?" — "না, বলুন।" কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ঈশিতা ধীরে বলল— — "জানেন, আজ বড় অদ্ভুত লাগছে। এতদিন এই দিনটার জন্যই তো প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন দিনটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আর মনে হচ্ছে সব যেন গু...