রাত তখন বেশ নেমে এসেছে।
শহরের আলো একে একে জ্বলে উঠেছে। উড়ালপুলের গায়ে গায়ে আলোর মালা, রাস্তার দু'ধারে সারি সারি দোকানের সাইনবোর্ড, কোথাও ফাস্টফুডের দোকানে ভিড়, কোথাও রাতের শেষ বাস ধরার তাড়া।
অরিন্দম গাড়ি চালাতে লাগল।
কিন্তু আজ তার বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছিল না।
কোনো অদৃশ্য শূন্যতা যেন তাকে তাড়া করে ফিরছিল।
মনে হচ্ছিল, এই রাস্তা যদি শেষ না হতো! এই গাড়ি যদি শুধু চলতেই থাকত! কোনো গন্তব্য ছাড়া, কোনো হিসাব ছাড়া।
শহর ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল। রাস্তার ভিড় কমে এল।
গাড়ির ভেতরে শুধু ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ আর এফএম রেডিওতে ভেসে আসা পুরোনো গানের সুর।
কতক্ষণ এভাবে চলেছে সে নিজেও জানে না।
হঠাৎ খেয়াল করল, পরিচিত এক রাস্তার মোড়ে এসে পড়েছে। অবচেতন মন যেন স্টিয়ারিং ধরে তাকে নিয়ে এসেছে।
গঙ্গার ধারে। সকালের সেই ঘাট।
গাড়ি পার্ক করে ধীরে ধীরে নেমে এল সে।
রাতের গঙ্গা দিনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। দিনের কোলাহল নেই। আছে শুধু এক গভীর, অনন্ত নীরবতা।
বাঁধানো ঘাটের সিঁড়িগুলো জ্যোৎস্নার ম্লান আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে। দূরে কোথাও মন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠল। মাঝনদীতে একটি নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে।
হাওয়ার সঙ্গে ভেসে এল কোনো মাঝির গলা। পুরোনো এক ভাটিয়ালি সুর। নদীর বুক চিরে সেই গান যেন দূর অন্ধকার থেকে উঠে এসে আবার অন্ধকারেই মিলিয়ে যাচ্ছে।
অরিন্দম সিঁড়ির ওপর বসে পড়ল। সামনের কালো জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কত কথা মনে পড়তে লাগল।
ফেলে আসা শৈশব। মামা-মামিমা। কর্পোরেট জীবনের দীর্ঘ পথচলা। অসংখ্য অর্জন। আর সেইসব অর্জনের মাঝখানে কোথাও হারিয়ে যাওয়া কিছু অনুভূতি।
অদ্ভুতভাবে আবার মনে পড়ল মেঘলার কথা। বিকেলের কফিশপ। কাজলে ঘেরা দুটি চোখ। শান্ত, স্থির কণ্ঠস্বর।
বিদায়ের আগে মেঘলা তার ফোন নম্বর দিয়েছিল। বলেছিল— “প্রয়োজনে ফোন করবেন।”
অরিন্দম হেসে বলেছিল— “অপ্রয়োজনে করলে রাগ করবেন না তো?”
মেঘলার হাসিটা এখনও স্পষ্ট মনে আছে।
অরিন্দম পকেট থেকে মোবাইল বের করল। নম্বরটা সেভ করা আছে। আঙুল একবার স্ক্রিনের ওপর থেমে গেল। তারপর আবার সরিয়ে নিল।
এই মুহূর্তে হয়তো মেঘলা ঘুমিয়ে পড়েছে। হয়তো বই পড়ছে। হয়তো কোনো কাজের পরিকল্পনা করছে। হয়তো একেবারেই তার কথা ভাবছে না।
ভাবনাটা আসতেই নিজের অজান্তে অরিন্দম হেসে ফেলল। তারপরই একটু অস্বস্তি বোধ হলো।
কি হচ্ছে তার? কিসের এত আকর্ষণ? কেন বারবার মেঘলার মুখ মনে পড়ছে?
এ কি শুধুই দীর্ঘ একাকীত্বের প্রতিক্রিয়া? নাকি এর চেয়েও বেশি কিছু?
নিজের মনকে সে নিজেই ধমক দিল।
মেঘলার সঙ্গে তার পরিচয়ই বা কতটুকু? দু-একবার দেখা হয়েছে, কয়েক ঘণ্টা কথা হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়।
আর মেঘলা নিজেই তো স্পষ্ট করে বলেছে, প্রচলিত প্রেম বা সংসার নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ নেই।
তাহলে কেন? কেন এই মুখটা বারবার ফিরে আসছে?
গঙ্গার কালো জলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল অরিন্দম। তারপর মাথা নাড়ল।
না। এমন চিন্তাকে আর প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। এ নিছক আবেগ। নিতান্তই ছেলেমানুষি।
জীবন তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এই বয়সে এসে অনুভূতির চেয়ে বাস্তবতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবু মনের গভীরে কোথাও একটা কণ্ঠস্বর যেন ফিসফিস করে বলছিল— সব বাস্তবতারও কি ব্যাখ্যা থাকে?
মোবাইলটা আবার পকেটে রেখে দিল অরিন্দম।
নদীর ওপার থেকে আসা হাওয়ায় হালকা শীতের ছোঁয়া। জোয়ারের জল ধীরে ধীরে ঘাটের সিঁড়িতে আছড়ে পড়ছে। দূরে কোথাও একটা লঞ্চের হর্ন রাতের নিস্তব্ধতাকে খানিকটা চিরে দিয়ে আবার মিলিয়ে গেল।
ঘাটে লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। দু-একজন সাধু কম্বল জড়িয়ে বসে আছে। কয়েকজন মাঝি নৌকা বেঁধে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অরিন্দমের হঠাৎ মনে হলো, মানুষের জীবনও বুঝি এই নদীর মতো। উপরে শান্ত। ভেতরে অনন্ত স্রোত।
সে উঠে দাঁড়াল।
রাত অনেক হয়েছে। কাল অফিসে আর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ছুটির আবেদন মঞ্জুর হয়ে গেছে। পরশু মামার বাড়ি যাবে।
গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে আবার মেঘলার কথা মনে পড়ল। অদ্ভুত মেয়ে। যে যুগে মানুষ নিজের জন্য বাঁচতেই সময় পায় না, সেই যুগে সে অন্য মানুষের কথা ভাবে।
হয়তো এই কারণেই তাকে আলাদা মনে হয়েছে। হয়তো এর বেশি কিছু নয়।
গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট করল।
কিন্তু গাড়ি চলতে শুরু করার আগেই মোবাইলের স্ক্রিনটা একবার জ্বলে উঠল শব্দ করে।
একটি মেসেজ। অপরিচিত নয়।
মেঘলা
মেসেজটা খুব ছোট— “বাড়ি পৌঁছেছেন তো?”
অরিন্দম কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক ঘণ্টা আগেও সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, এসব ভাবনা নিছক আবেগ। নিতান্তই ছেলেমানুষি।
কিন্তু মানুষ যতই যুক্তির দেয়াল তুলুক, জীবনের কিছু মুহূর্ত সেই দেয়ালে নিঃশব্দে একটি জানালা খুলে দেয়।
রাতের নিস্তব্ধ গঙ্গার ধারে বসে অরিন্দম প্রথমবার অনুভব করল—
হয়তো তার দীর্ঘ একাকী জীবনের গল্পে একটি নতুন অধ্যায় নিঃশব্দে দরজায় কড়া নাড়ছে।
Comments
Post a Comment