পর্ব–২ : নীরব সন্ধিক্ষণ
কিছুক্ষণ পর একটি উপহার কিনে সে রতনের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
বিয়েবাড়িতে পৌঁছতেই রতন প্রায় দৌড়ে এসে তাকে অভ্যর্থনা জানাল।
মুখভরা হাসি, চোখেমুখে কৃতজ্ঞতার ছাপ।
— "স্যার, আপনি এসেছেন! আমি ভাবতেই পারিনি।"
অরিন্দম হাসল।
মানুষের জীবনে এমন কিছু আনন্দের মুহূর্ত থাকে, যেখানে উপস্থিত থাকাটাই সবচেয়ে বড় উপহার।
রতনের মেয়ের বয়স খুব বেশি নয়। আঠারো পেরিয়েছে সবে।
লাল বেনারসিতে তাকে বড্ড ছোটো লাগছিল।
বাড়ির উঠোনজুড়ে আত্মীয়স্বজনের ভিড়, রান্নার গন্ধ, মাইকের শব্দ, ছেলেমেয়েদের ছোটাছুটি—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম উৎসবের আবহ।
রতনের মুখের দিকে তাকিয়ে অরিন্দমের মনে হলো, গরিব মানুষের কাছে মেয়ের বিয়ে শুধু আনন্দের নয়, অনেক সময় এক বড় দায়িত্ব সম্পূর্ণ হওয়ার স্বস্তিও।
সমাজ বদলেছে।
সময় বদলেছে।
সম্পর্কের সংজ্ঞাও বদলেছে।
একসময় মানুষ খুব অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিত। আজকের প্রজন্ম অনেক বেশি সময় নিয়ে নিজেদের জীবন, পেশা, স্বপ্ন আর পরিচয় গড়ে তুলতে চায়।
কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ—তার সহজ উত্তর নেই।
তবে অরিন্দমের মনে হয়, সময় যতই বদলাক, মানুষের একটি চাওয়া কখনও বদলায় না।
সে চায় কাউকে নিজের কথা বলতে।
কাউকে নিজের আনন্দ আর দুঃখের অংশীদার করতে।
আর সেই কারণেই হয়তো ভালোবাসা, সংসার কিংবা সম্পর্ক—নানা রূপে, নানা নামে—মানুষের জীবনে বারবার ফিরে আসে।
উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে এসবই ভাবছিল অরিন্দম।
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, তার ভাবনার ফাঁকেফাঁকে বারবার ভেসে উঠছিল কাজলে ঘেরা দুটি শান্ত চোখ।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা তখন শুরু হবে হবে। উঠোনজুড়ে আত্মীয়স্বজনের ব্যস্ততা ক্রমশ বেড়ে উঠছে। কেউ অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত, কেউ বরযাত্রীদের দেখাশোনায়। মাইকে সানাইয়ের সুর ভেসে আসছে, আর রঙিন আলোর মালায় ছোট্ট বাড়িটা যেন উৎসবের আবরণে মুড়ে গেছে।
লগ্নের আর খুব বেশি দেরি নেই। পুরোহিত বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। বাড়ির মহিলারা কনেকে প্রস্তুত করার শেষ মুহূর্তের কাজে ব্যস্ত। ঠিক তখনই অরিন্দমের চোখে পড়ল, কনের ঘরের সামনে যেন অকারণ এক অস্থিরতা।
কিছুক্ষণ পর রতন প্রায় ছুটে এসে অরিন্দমের সামনে দাঁড়াল।
লোকটার মুখ ফ্যাকাশে।
— "স্যার... একটু আসবেন?"
অরিন্দম অবাক হয়ে তার সঙ্গে ভেতরে গেল।
ঘরের এক কোণে লাল বেনারসি পরে বসে আছে রতনের মেয়ে।
মুখে কান্নার ছাপ।
চোখ দুটো লাল।
অরিন্দমকে দেখে সে মাথা নিচু করে ফেলল।
রতন অসহায় গলায় বলল,
— "সকাল থেকে কিছু খাচ্ছে না স্যার। এখন বলছে বিয়ে করবে, কিন্তু একটা কথা না শুনলে মণ্ডপে যাবে না।"
অরিন্দম মেয়েটির দিকে তাকাল।
— "কী কথা?"
মেয়েটি ইতস্তত করছিল।
শেষ পর্যন্ত নিচু গলায় বলল,
— "আমি পড়তে চাই।"
ঘরের সবাই চুপ।
মেয়েটি আবার বলল,
— "বিয়েতে আমার আপত্তি নেই। বাবা যা ঠিক করেছে, আমি তাই করব। কিন্তু আমি পড়াশোনা বন্ধ করতে চাই না।"
তার গলাটা কেঁপে উঠল।
— "আমি কলেজে ভর্তি হতে চাই।"
এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
বাইরে তখন শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, সানাইয়ের সুর।
আর ভেতরে বসে এক আঠারো বছরের মেয়ে নিজের ভবিষ্যতের জন্য অনুমতি চাইছে।
অরিন্দমের হঠাৎ মেঘলার কথা মনে পড়ল।
"সব মানুষের জীবন এক ছাঁচে তৈরি হয় না..."
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— "ছেলের বাড়ির লোকজন কোথায়?"
কিছুক্ষণ পর ছেলের বাবা ও ছেলেকে ডাকা হলো।
অরিন্দম শান্ত গলায় পুরো বিষয়টা বলল।
সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে ছিল।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ছেলেটি নিজেই প্রথম কথা বলল।
— "এতটুকু ব্যাপার নিয়ে এত চিন্তা করছেন কেন?"
সবাই তার দিকে তাকাল।
ছেলেটি হেসে বলল,
— "ও পড়তে চাইলে অবশ্যই পড়বে। আমি নিজেও তো গ্র্যাজুয়েশন শেষ করছি। পড়াশোনা বন্ধ করার প্রশ্নই ওঠে না।"
মেয়েটির চোখে জল চলে এল।
রতন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
ছেলের বাবা মৃদু হেসে বললেন,
— "আজকাল মেয়েরা পড়াশোনা করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে—এটাই তো স্বাভাবিক।"
ঘরের ভারী পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল।
কনের মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।
বাইরে তখন বিয়ের মন্ত্রপাঠ শুরু হয়েছে।
অরিন্দম নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
তার মনে হচ্ছিল, সমাজ বদলাচ্ছে।
ধীরে।
খুব ধীরে।
তবু বদলাচ্ছে।
উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল সে।
অদ্ভুতভাবে আবার মেঘলার কথাগুলো মনে পড়ল।
রতনের সঙ্গে দেখা করে, নবদম্পতিকে আশীর্বাদ জানিয়ে এবং বিদায় নিয়ে অরিন্দম গাড়িতে উঠে বসল।
Comments
Post a Comment