সন্ধ্যার জলযোগ সেরে অরিন্দমের হঠাৎই ইচ্ছে হলো পুরোনো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার।
কত বছর দেখা হয়নি!
ছোটবেলার সেই সঙ্গী, যার সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলেছে, পুকুরে সাঁতার কেটেছে, স্কুল পালিয়ে মেলায় গেছে।
গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অরিন্দমের মনে হচ্ছিল, কত কিছু বদলে গেছে।
একসময় যেখানে কাঁচা রাস্তা ছিল, সেখানে এখন পিচঢালা পথ। রাস্তার ধারে বৈদ্যুতিক আলোর সারি। ছোট ছোট দোকান, মোবাইল টাওয়ার, নতুন বাড়ি—গ্রাম যেন আধুনিকতার নতুন পোশাক পরে নিয়েছে।
গুটি গুটি পায়ে এগোতে এগোতে অনেক পরিচিত মুখের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কেউ চিনতে পেরে ডাকল, কেউ আবার প্রথমে চিনতে না পেরে পরে অবাক হয়ে উঠল।
অবশেষে বন্ধুর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল সে।
এই বাড়িতে কত বিকেল, কত সন্ধ্যা যে কেটেছে!
কত আড্ডা, কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা!
আজ সব যেন অন্য এক জীবনের গল্প।
ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই আচমকা ভেসে এলো চড়া গলার চিৎকার।
প্রথমে অরিন্দম থমকে দাঁড়াল।
তারপর বুঝতে পারল, ঘরের ভেতরে প্রবল ঝগড়া চলছে।
বন্ধুর স্ত্রীর গলা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। উত্তেজিত কণ্ঠে একের পর এক অভিযোগ ছুড়ে দিচ্ছেন।
অরিন্দমের ভীষণ অস্বস্তি লাগল।
মনে হলো, এই মুহূর্তে ফিরে যাওয়াই হয়তো ভালো।
মানুষের সংসারের ভেতরের মুহূর্তে অনাহূত সাক্ষী হয়ে থাকা সুখকর নয়।
ঠিক তখনই বন্ধু,সুব্রত তাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল।
— "আরে অরিন্দম! তুই?"
মুখে হাসি আনার চেষ্টা করলেও ক্লান্তি লুকোতে পারল না।
— "ভুল সময়ে চলে এলাম মনে হচ্ছে।"
— "না রে, আয়। এইসব এখন জীবনেরই অংশ।"
বন্ধু তাকে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল।
চা এলো।
কিছুক্ষণ এদিক-ওদিকের কথা চলল। তারপর অরিন্দম দ্বিধাভরে বলল,
— "সব ঠিক আছে তো?"
বন্ধু মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
সেই হাসির মধ্যে আনন্দের চেয়ে ক্লান্তিই বেশি ছিল।
— "সংসারটা আসলে দুটো চাকার গাড়ির মতো রে। একটা চাকা যতই শক্তিশালী হোক, অন্যটা যদি ঠিকমতো না ঘোরে, গাড়ি বেশিদূর যায় না।"
অরিন্দম চুপচাপ শুনছিল।
বন্ধু আবার বলল,
— "আমরা ছোটবেলায় যে সংসার দেখেছি, আজকের সংসার তার থেকে অনেক আলাদা।"
— "কীভাবে?"
— "আগে মানুষ হয়তো অনেক কিছু মুখ বুজে সহ্য করত। এখন আর করে না। আগে কর্তব্য বেশি ছিল, এখন অধিকারের কথাও সবাই বলে। পরিবর্তনটা খারাপ নয়। কিন্তু সমস্যা হয় যখন শ্রদ্ধা আর সহমর্মিতা হারিয়ে যায়।"
বারান্দার বাইরে রাত নেমে এসেছে।
দূরে কোনো বাড়ি থেকে টেলিভিশনের শব্দ ভেসে আসছে।
বন্ধু ধীরে ধীরে বলল,
— "জানিস অরিন্দম, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই অসম্পূর্ণতা থাকে। কেউ সম্পূর্ণ নয়। কেউ রাগী, কেউ জেদি, কেউ অতি সংবেদনশীল, কেউ আবার নিজের মনের কথাই ঠিকমতো বলতে পারে না।"
একটু থেমে সে চায়ের কাপে চুমুক দিল।
— "ভালোবাসার সবচেয়ে বড় কাজটাই বোধহয় সেই অসম্পূর্ণতাগুলোকে মেনে নেওয়া। যেখানে আমি অপূর্ণ, সেখানে সে পূরণ করবে; যেখানে সে দুর্বল, সেখানে আমি দাঁড়াব—এই বিশ্বাসটাই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে।"
অরিন্দম নীরবে শুনছিল।
বন্ধু মৃদু হেসে বলল,
— "একসঙ্গে থাকা খুব কঠিন কিছু নয়। একই ছাদের নিচে থাকা যায়, সংসার করা যায়, সন্তান মানুষ করা যায়। সমাজের চোখে সব দায়িত্ব পালনও করা যায়।"
তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "কিন্তু তার মধ্যেও ভালোবাসা বেঁচে থাকে কতজনের জীবনে?"
প্রশ্নটা যেন সে অরিন্দমকে নয়, নিজেকেই করল।
— "বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, সংসার আর ভালোবাসা এক জিনিস নয়। সংসার একটা ব্যবস্থা, আর ভালোবাসা একটা সাধনা। সেই সাধনা প্রতিদিন করতে হয়। শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ক্ষমা আর একে অপরকে বোঝার চেষ্টার মধ্য দিয়ে।"
কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল।
দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল।
বন্ধু আবার বলল,
— "সমস্যা কোথায় জানিস? আমরা ভালোবাসা পেতে শিখি, কিন্তু ভালোবাসা দিতে শিখি না। সবাই চায় তাকে বুঝুক, কিন্তু অন্যকে বোঝার চেষ্টা খুব কম মানুষই করে।"
অরিন্দমের মনে হলো, কথাগুলো শুধুই একজন বিবাহিত মানুষের অভিমান নয়; দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা উপলব্ধি।
বন্ধু মৃদু হেসে বলল,
— "যেদিন মানুষ ভাবতে শুরু করে, আমার আর বদলানোর কিছু নেই, বদলাবে শুধু অন্যজন—সেদিন থেকেই দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে।"
বারান্দার ওপারে অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এসেছে।
অরিন্দম কিছু বলল না।
শুধু মনে হলো, মানুষের জীবনের সবচেয়ে জটিল সমীকরণ হয়তো এখনও সম্পর্কই। চাকরি, অর্থ, সাফল্য—এসবের হিসাব মেলানো যায়। কিন্তু দুটি মানুষের মনের হিসাব, সেটার কোনো নির্ভুল অঙ্ক আজও আবিষ্কার হয়নি।
সুব্রত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হেসে বলল,
— "দেখ দেখি, এতদিন পর দেখা হলো। আমি তো শুধু নিজের কথাই বলে যাচ্ছি। তোর খবর কী বল?"
অরিন্দমও হেসে উঠল।
তারপর ধীরে ধীরে গত কয়েকদিনের ঘটনাগুলো বলল। কলকাতার ব্যস্ত জীবন, হঠাৎ মামার ডাকে গ্রামে আসা, বিকেলের বৈঠকখানায় বসে হওয়া কথাবার্তা—সবই।
একসময় বিয়ের প্রসঙ্গও উঠে এল।
— "মামা একটা মেয়ের কথা বলেছে। পরিবারের লোকজনও ভালো। আমাকে একদিন গিয়ে দেখে আসতে বলছে।"
সুব্রত মন দিয়ে শুনছিল।
— "তারপর?"
— "তারপর আর কী! আমি তো বিশেষ আগ্রহী নই। কিন্তু মামা যেভাবে বলল, সরাসরি না বলতে পারলাম না। মানুষটা সারা জীবন আমার জন্য যা করেছে, তার একটা অনুরোধও যদি না রাখি, খারাপ লাগবে।"
সুব্রত মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— "এটাই স্বাভাবিক।"
— "জানি না রে। জীবনের এতগুলো বছর একা কাটানোর পর মনে হয়, শুধু পরিচয় হল আর দু-চারটে কথাবার্তা হলো—এতটুকুর ওপর ভর করে একটা মানুষের সঙ্গে সারাজীবনের পথচলার সিদ্ধান্ত নেওয়া কি সত্যিই সম্ভব?"
সুব্রত বলল,
— "সব বিয়ে প্রেম দিয়ে শুরু হয় না রে। আবার সব প্রেমও বিয়েতে গিয়ে শেষ হয় না।"
অরিন্দম চুপ করে রইল।
সুব্রত আবার বলল,
— "তুই দেখা করতে যা। বিয়ে করতেই হবে এমন তো কেউ বলছে না। মানুষটাকে চিনে আয়। অনেক সময় জীবনের বড় সিদ্ধান্তগুলো আমরা নিতে যাই না, সিদ্ধান্তগুলোই আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।"
কথাটা শুনে অরিন্দম মৃদু হেসে ফেলল।
— "দেখছি সংসার করে বেশ দার্শনিক হয়ে গেছিস।"
— "সংসার না করলে এই ডিগ্রি পাওয়া যায় না।"
দুজনেই হেসে উঠল।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে সুব্রতের স্ত্রী চায়ের কাপ নিয়ে বেরিয়ে এলেন। আগের উত্তেজনার ছাপ মুখে আর নেই।
স্বাভাবিক গলায় বললেন,
— "এতদিন পর এসেছেন, আরেকদিন কিন্তু দুপুরে খেয়ে যাবেন।"
অরিন্দম সৌজন্যবশত মাথা নাড়ল।
কিছুক্ষণ পর উঠতে গেল সে।
সুব্রত দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এল।
— "কাল বা পরশু সময় পেলে আবার আয়। অনেক গল্প বাকি আছে।"
— "আসব।"
বাড়ির উঠোন পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল অরিন্দম।
রাত নেমেছে পুরোপুরি।
গ্রামের আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছে। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। শীতের হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো মৃদু শব্দে দুলে উঠছে।
ধীরে ধীরে বাড়ির পথ ধরল সে।
হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, জীবনের অনেক প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখনো তার জানা নেই। তবে এতটুকু বুঝেছে—মানুষের পথচলায় কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে ফিকে হয় না। বহু বছর পর দেখা হলেও তারা আবার ঠিক আগের জায়গা থেকেই কথা শুরু করতে পারে।
সুব্রত সেই মানুষগুলোরই একজন।
রাতে খাওয়াদাওয়া সেরে অরিন্দম বাড়ির এক নিরিবিলি কোণে এসে বসল। পুরোনো জমিদারবাড়ির বিশাল চত্বরের এই অংশটায় রাতে লোকজনের আনাগোনা প্রায় থাকে না। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আকাশ ভরা তারা।
পকেট থেকে সিগারেট বের করে আগুন ধরাল সে।
ধোঁয়ার সরু রেখাটা অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে যেতে তার মনটাও যেন নানা ভাবনায় জড়িয়ে পড়ল।
আজকের সন্ধ্যায় সুব্রতের সঙ্গে কথাবার্তাগুলো বারবার মনে পড়ছে।
ছেলেবেলা থেকেই সুব্রতকে সে দেখেছে সংগ্রাম করতে।
তিন ভাইবোনের সংসার। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সেই অভাবকে কোনোদিন অজুহাত হতে দেয়নি সে। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছে। আজ তারা দুজনেই ভালো চাকরি করে, নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বোনের বিয়ে দেওয়া, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা, সংসারের হাল ধরা—সবকিছুর ভার দীর্ঘদিন একাই বহন করেছে সুব্রত।
শেষ পর্যন্ত বহু কষ্টে ঋণ নিয়ে নিজের মাথা গোঁজার মতো একটি বাড়িও তৈরি করেছে।
আজও সে স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক।
সমাজে সম্মান আছে, ছাত্রদের ভালোবাসা আছে, মানুষের শ্রদ্ধা আছে।
তবু আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য বলতে যা বোঝায়, তা এখনও তার জীবনে পুরোপুরি আসেনি।
অরিন্দমের মনে হলো, জীবনের হিসাব বড় অদ্ভুত।
কেউ অর্থের পেছনে ছুটতে ছুটতে সম্পর্ক হারায়, আবার কেউ সম্পর্ককে আগলে রাখতে গিয়ে অর্থের কাছে পিছিয়ে পড়ে।
অর্থ যে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক অবস্থান, এমনকি আত্মবিশ্বাসকেও প্রভাবিত করে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু অর্থই কি সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড?
সুব্রতের কথা ভাবলে প্রশ্নটা বারবার মাথায় আসে।
তার ছেলে এখন শহরের এক হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে। ছেলের ভবিষ্যতের জন্য এখনও মাসের শেষে হিসাব মেলাতে হয় তাকে। তবু আজ সন্ধ্যায় তার কথায় কোনো হাহাকার ছিল না, ছিল না কোনো অভিযোগও।
বরং ছিল এক ধরনের স্থিরতা।
এক ধরনের মানসিক পরিপক্বতা, যা হয়তো শুধু অভিজ্ঞতা দিয়েই অর্জন করা যায়।
সিগারেটের শেষ টানটা দিয়ে অরিন্দম দূরের অন্ধকারে তাকিয়ে রইল।
মানুষের জীবনের সাফল্য কি শুধুই অর্থ, পদ আর প্রভাবের অঙ্কে মাপা যায়?
নাকি অন্য কোনো অদৃশ্য মাপকাঠিও আছে, যা হিসাবের খাতায় ধরা পড়ে না?
প্রশ্নটার উত্তর সে জানত না।
তবে আজ বহুদিন পর মনে হচ্ছিল, উত্তর খোঁজার চেয়েও হয়তো প্রশ্নগুলোকে বোঝা বেশি জরুরি।
Comments
Post a Comment