সিগারেটের শেষ টানটা দিয়ে অরিন্দম যখন ছাইদানিতে চাপা দিতে যাবে, ঠিক তখনই মোবাইলের মেসেজ টোন বেজে উঠল।
এত রাতে কে?
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে একটু অবাক হলো।
মেঘলা।
মেসেজে লেখা—
"আপনি তো বড় মিথ্যুক।"
অরিন্দম ভ্রু কুঁচকে মেসেজটা আবার পড়ল।
তারপর আরেকটা মেসেজ ভেসে উঠল।
"প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে ফোন করবেন বলেছিলেন। অথচ কোনো খবরই নেই!"
অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল—
"অভিযোগটা বেশ গুরুতর মনে হচ্ছে।"
মুহূর্তের মধ্যেই রিপ্লাই এল।
"হওয়াই উচিত। আমি কিন্তু কথা মনে রাখি।"
"আমি জানি আপনি খুব ব্যস্ত মানুষ।"
"ব্যস্ত মানুষরা মেসেজ করতে পারে না নাকি?"
অরিন্দম হেসে ফেলল।
কী আশ্চর্য!
যে মেয়েটি প্রথম দেখায় এত সংযত, এত গম্ভীর মনে হয়েছিল, তার ভেতরে এমন দুষ্টু রসবোধও লুকিয়ে আছে!
সে লিখল—
"আসলে কয়েকদিন একটু ব্যস্ত ছিলাম। আজ গ্রামে এসেছি।"
কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল—
"জানি।"
অরিন্দম অবাক হয়ে গেল।
"জানেন?"
"হ্যাঁ। সৌমেনদা বলেছিল।"
তারপর আরেকটা মেসেজ।
"গ্রামের রাতগুলো কিন্তু শহরের রাতের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর।"
অরিন্দম কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কী উত্তর দেবে বুঝতে পারছিল না।
শেষ পর্যন্ত লিখল—
"সুন্দর কি না জানি না, তবে অনেক শান্ত।"
মেঘলার উত্তর এল—
"সবসময় শান্তিই সুন্দর হয় না। কখনো কখনো একটু অস্থিরতাও দরকার।"
মেসেজটা পড়ে অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
কথাটা খুব সাধারণ।
তবু কেন যেন মনে হলো, এর ভেতরে শুধু কথার অর্থের চেয়েও বেশি কিছু লুকিয়ে আছে।
সে আর উত্তর দিল না।
কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিন নিভে যাওয়ার পরও মেঘলার শেষ কথাটা তার মনে রয়ে গেল—
"কখনো কখনো একটু অস্থিরতাও দরকার।"
পুরোনো জমিদারবাড়ির নিস্তব্ধতায় বসে মোবাইলটা হাতেই রইল অরিন্দমের। স্ক্রিনটা নিভে গেলেও চোখটা যেন সেখানেই আটকে আছে।
ঠিক তখনই আবার মেসেজ এল।
“রাগ করেছেন নাকি?”
অরিন্দম একটু হেসে ফেলল। আঙুল চলল—
“রাগ করার মতো কিছু বলেছ কি?”
মুহূর্তেই রিপ্লাই।
“না, কিন্তু চুপ করে গেলে মানুষটা অচেনা হয়ে যায়।”
অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বাইরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। আকাশে তারা জমে আছে। তবু মনে হলো, এই নিস্তব্ধতার ভেতরেই কোথাও যেন একটা আলাদা আলো জ্বলে উঠছে।
সে লিখল—
“আমি তো চুপ থাকতে শিখেছি অনেক আগেই।”
মেঘলা লিখল—
“খারাপ অভ্যাস।”
“কেন?”
“চুপ মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি একা থাকে।”
অরিন্দম একটু থেমে লিখল—
“একাকীত্ব সবসময় খারাপ না।”
মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে লিখল—
“না। কিন্তু চুপ থাকা মানুষগুলো কখনো কখনো নিজের ভেতরেই হারিয়ে যায়।”
অরিন্দম ধীরে ধীরে টাইপ করল—
“চুপ মানুষগুলো কি এতটাই জটিল?”
মেঘলা কিছুক্ষণ পর লিখল—
“জটিল না। বিপজ্জনক।”
অরিন্দম ভ্রু কুঁচকে তাকাল স্ক্রিনে।
সে লিখল—
“বিপজ্জনক কেন?”
মেঘলা লিখল—
“কারণ তারা সব দেখে, সব বোঝে… কিন্তু সবটা বলে না।”
আরেকটা মেসেজ—
“আর যা বলা হয় না, সেটা অনেক সময় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।”
অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর লিখল—
“তুমি কি চুপ মানুষকে ভয় পাও?”
মেঘলা লিখল—
“ভয় না। সতর্ক থাকি।”
“কেন?”
“কারণ নীরব মানুষকে পড়া যায় না।”
অরিন্দম হালকা হেসে ফেলল।
“তুমি তো বেশ গভীরভাবে ভাবো।”
মেঘলা লিখল—
“কারণ আমি সহজ মানুষকে বিশ্বাস করতে শিখিনি।”
এই কথাটা পড়ে অরিন্দম আর উত্তর দিল না কিছুক্ষণ।
বাইরে রাত আরও ঘন হয়ে এসেছে। গাছের পাতায় হালকা বাতাস দুলছে। দূরে কুকুরের ডাক।
তারপর ধীরে ধীরে লিখল—
“আর আমি তো সাধারণত চুপই থাকি।”
মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে লিখল—
“তাই তো আপনাকে নিয়ে একটু ভয় হয়।”
অরিন্দম থেমে গেল।
“ভয়?”
“হ্যাঁ।”
একটা ছোট বিরতি।
তারপর মেঘলা লিখল—
“আপনি এমন মানুষ, যিনি কিছু না বলেও অনেক কিছু ভাবিয়ে দেন।”
অরিন্দম স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
বাইরের নীরবতা এবার যেন আর আগের মতো সাধারণ লাগছিল না।
সে শুধু লিখল—
“তাহলে তুমি কি আমাকে এড়িয়ে চলবে?”
মেঘলা লিখল—
“না।”
আরেকটা মেসেজ—
“আমি সাধারণত সেই জিনিসগুলোর কাছেই থাকি, যেগুলো আমি পুরোটা বুঝতে পারি না।”
```htmlমেঘলার শেষ মেসেজটা স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছিল।
"আমি সাধারণত সেই জিনিসগুলোর কাছেই থাকি, যেগুলো আমি পুরোটা বুঝতে পারি না।"
অরিন্দম দীর্ঘক্ষণ উত্তর দিল না।
আঙুলটা কীবোর্ডের উপর কয়েকবার থেমে গেল, আবার সরে এল।
কী উত্তর দেওয়া যায়?
কিছু কিছু কথার উত্তর শব্দে হয় না।
শুধু অনুভবে হয়।
রাত আরও গভীর হয়ে এসেছে।
দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, পুরোনো আমগাছের পাতায় বাতাসের মৃদু শব্দ, আর আকাশভরা অসংখ্য তারা।
মোবাইলের আলো নিভে গেলেও মেঘলার কথাগুলো যেন অরিন্দমের ভেতরে রয়ে গেল।
অদ্ভুত মেয়ে।
প্রথম পরিচয়ের দিন থেকেই যেন কথার আড়ালে আরেকটা কথা বলে।
কোনো দাবিও নেই।
কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিতও নেই।
তবু কথাগুলো মনের ভেতরে এসে থেকে যায়।
অরিন্দমের হঠাৎ মনে হলো, মেসেজগুলোর মধ্যে যেন একফোঁটা অভিমান লুকিয়ে ছিল।
খুব বড় নয়।
আবার একেবারে তুচ্ছও নয়।
সেই অভিমান কি তার খবর না নেওয়ার জন্য?
নাকি আরও অন্য কিছু?
সে বুঝতে পারল না।
বরং যত ভাবছে, ততই যেন বিষয়টা আরও জটিল হয়ে উঠছে।
মেঘলা কি ধরা দিতে চাইছে?
নাকি শুধু একজন পরিচিত মানুষের সঙ্গে সহজ আলাপ করছে?
নাকি দুজন নিঃসঙ্গ মানুষের মধ্যে অদৃশ্য কোনো সেতু তৈরি হচ্ছে, যার নাম এখনই দেওয়া যায় না?
অরিন্দম জানত না।
শুধু এটুকু বুঝতে পারছিল, মেঘলার প্রতিটি কথার পর তার নিজের ভেতরেও নতুন কিছু প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে।
যে মানুষটা এতদিন নিজের চারপাশে বাস্তবতার শক্ত দেয়াল তুলে রেখেছিল, সেই মানুষটিই আজ কয়েকটি সাধারণ মেসেজের অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছে।
মেঘলার উপস্থিতি ঠিক পূর্ণ আলোর মতো নয়।
বরং সন্ধ্যার আলো-আঁধারির মতো।
সবকিছু স্পষ্ট করে দেয় না।
আবার সম্পূর্ণ অন্ধকারেও ডুবিয়ে রাখে না।
শুধু কোথাও এক টুকরো মৃদু আলো রেখে যায়।
যার দিকে তাকালে মনে হয়, পথটা হয়তো এখানেই শেষ নয়।
আর সেই ভাবনাটুকুই অরিন্দমের বহুদিনের নিস্তব্ধ জীবনে অদ্ভুত এক আলোড়ন তুলে দিল।
মোবাইলটা পাশে রেখে সে আকাশের দিকে তাকাল।
তারারাও কি সবসময় এত উজ্জ্বল ছিল?
নাকি আজ তার চোখেই বদল এসেছে?
উত্তর সে পেল না।
তবে এতটুকু অনুভব করল—
কখনও কখনও মানুষের জীবনে কিছু মানুষ আসে, যারা কোনো ঘোষণা ছাড়াই, কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই, নিঃশব্দে তার একাকীত্বের ভেতরে আলো-আঁধারির একটি দীর্ঘ ছায়াপথ এঁকে দিয়ে যায়।
আর সেই পথের শেষ কোথায়, তা তখনও কেউ জানে না।
```
Comments
Post a Comment