Skip to main content

পর্ব–১০ :আলো-আঁধারি

সিগারেটের শেষ টানটা দিয়ে অরিন্দম যখন ছাইদানিতে চাপা দিতে যাবে, ঠিক তখনই মোবাইলের মেসেজ টোন বেজে উঠল।

এত রাতে কে?

স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে একটু অবাক হলো।

মেঘলা।

মেসেজে লেখা—

"আপনি তো বড় মিথ্যুক।"

অরিন্দম ভ্রু কুঁচকে মেসেজটা আবার পড়ল।

তারপর আরেকটা মেসেজ ভেসে উঠল।

"প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে ফোন করবেন বলেছিলেন। অথচ কোনো খবরই নেই!"

অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।

কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল—

"অভিযোগটা বেশ গুরুতর মনে হচ্ছে।"

মুহূর্তের মধ্যেই রিপ্লাই এল।

"হওয়াই উচিত। আমি কিন্তু কথা মনে রাখি।"

"আমি জানি আপনি খুব ব্যস্ত মানুষ।"

"ব্যস্ত মানুষরা মেসেজ করতে পারে না নাকি?"

অরিন্দম হেসে ফেলল।

কী আশ্চর্য!

যে মেয়েটি প্রথম দেখায় এত সংযত, এত গম্ভীর মনে হয়েছিল, তার ভেতরে এমন দুষ্টু রসবোধও লুকিয়ে আছে!

সে লিখল—

"আসলে কয়েকদিন একটু ব্যস্ত ছিলাম। আজ গ্রামে এসেছি।"

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল—

"জানি।"

অরিন্দম অবাক হয়ে গেল।

"জানেন?"

"হ্যাঁ। সৌমেনদা বলেছিল।"

তারপর আরেকটা মেসেজ।

"গ্রামের রাতগুলো কিন্তু শহরের রাতের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর।"

অরিন্দম কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

কী উত্তর দেবে বুঝতে পারছিল না।

শেষ পর্যন্ত লিখল—

"সুন্দর কি না জানি না, তবে অনেক শান্ত।"

মেঘলার উত্তর এল—

"সবসময় শান্তিই সুন্দর হয় না। কখনো কখনো একটু অস্থিরতাও দরকার।"

মেসেজটা পড়ে অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

কথাটা খুব সাধারণ।

তবু কেন যেন মনে হলো, এর ভেতরে শুধু কথার অর্থের চেয়েও বেশি কিছু লুকিয়ে আছে।

সে আর উত্তর দিল না।

কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিন নিভে যাওয়ার পরও মেঘলার শেষ কথাটা তার মনে রয়ে গেল—

"কখনো কখনো একটু অস্থিরতাও দরকার।"

পুরোনো জমিদারবাড়ির নিস্তব্ধতায় বসে মোবাইলটা হাতেই রইল অরিন্দমের। স্ক্রিনটা নিভে গেলেও চোখটা যেন সেখানেই আটকে আছে।

ঠিক তখনই আবার মেসেজ এল।

“রাগ করেছেন নাকি?”

অরিন্দম একটু হেসে ফেলল। আঙুল চলল—

“রাগ করার মতো কিছু বলেছ কি?”

মুহূর্তেই রিপ্লাই।

“না, কিন্তু চুপ করে গেলে মানুষটা অচেনা হয়ে যায়।”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বাইরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। আকাশে তারা জমে আছে। তবু মনে হলো, এই নিস্তব্ধতার ভেতরেই কোথাও যেন একটা আলাদা আলো জ্বলে উঠছে।

সে লিখল—

“আমি তো চুপ থাকতে শিখেছি অনেক আগেই।”

মেঘলা লিখল—

“খারাপ অভ্যাস।”

“কেন?”

“চুপ মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি একা থাকে।”

অরিন্দম একটু থেমে লিখল—

“একাকীত্ব সবসময় খারাপ না।”

মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে লিখল—

“না। কিন্তু চুপ থাকা মানুষগুলো কখনো কখনো নিজের ভেতরেই হারিয়ে যায়।”

অরিন্দম ধীরে ধীরে টাইপ করল—

“চুপ মানুষগুলো কি এতটাই জটিল?”

মেঘলা কিছুক্ষণ পর লিখল—

“জটিল না। বিপজ্জনক।”

অরিন্দম ভ্রু কুঁচকে তাকাল স্ক্রিনে।

সে লিখল—

“বিপজ্জনক কেন?”

মেঘলা লিখল—

“কারণ তারা সব দেখে, সব বোঝে… কিন্তু সবটা বলে না।”

আরেকটা মেসেজ—

“আর যা বলা হয় না, সেটা অনেক সময় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর লিখল—

“তুমি কি চুপ মানুষকে ভয় পাও?”

মেঘলা লিখল—

“ভয় না। সতর্ক থাকি।”

“কেন?”

“কারণ নীরব মানুষকে পড়া যায় না।”

অরিন্দম হালকা হেসে ফেলল।

“তুমি তো বেশ গভীরভাবে ভাবো।”

মেঘলা লিখল—

“কারণ আমি সহজ মানুষকে বিশ্বাস করতে শিখিনি।”

এই কথাটা পড়ে অরিন্দম আর উত্তর দিল না কিছুক্ষণ।

বাইরে রাত আরও ঘন হয়ে এসেছে। গাছের পাতায় হালকা বাতাস দুলছে। দূরে কুকুরের ডাক।

তারপর ধীরে ধীরে লিখল—

“আর আমি তো সাধারণত চুপই থাকি।”

মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে লিখল—

“তাই তো আপনাকে নিয়ে একটু ভয় হয়।”

অরিন্দম থেমে গেল।

“ভয়?”

“হ্যাঁ।”

একটা ছোট বিরতি।

তারপর মেঘলা লিখল—

“আপনি এমন মানুষ, যিনি কিছু না বলেও অনেক কিছু ভাবিয়ে দেন।”

অরিন্দম স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

বাইরের নীরবতা এবার যেন আর আগের মতো সাধারণ লাগছিল না।

সে শুধু লিখল—

“তাহলে তুমি কি আমাকে এড়িয়ে চলবে?”

মেঘলা লিখল—

“না।”

আরেকটা মেসেজ—

“আমি সাধারণত সেই জিনিসগুলোর কাছেই থাকি, যেগুলো আমি পুরোটা বুঝতে পারি না।”

```html

মেঘলার শেষ মেসেজটা স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছিল।

"আমি সাধারণত সেই জিনিসগুলোর কাছেই থাকি, যেগুলো আমি পুরোটা বুঝতে পারি না।"

অরিন্দম দীর্ঘক্ষণ উত্তর দিল না।

আঙুলটা কীবোর্ডের উপর কয়েকবার থেমে গেল, আবার সরে এল।

কী উত্তর দেওয়া যায়?

কিছু কিছু কথার উত্তর শব্দে হয় না।

শুধু অনুভবে হয়।

রাত আরও গভীর হয়ে এসেছে।

দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, পুরোনো আমগাছের পাতায় বাতাসের মৃদু শব্দ, আর আকাশভরা অসংখ্য তারা।

মোবাইলের আলো নিভে গেলেও মেঘলার কথাগুলো যেন অরিন্দমের ভেতরে রয়ে গেল।

অদ্ভুত মেয়ে।

প্রথম পরিচয়ের দিন থেকেই যেন কথার আড়ালে আরেকটা কথা বলে।

কোনো দাবিও নেই।

কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিতও নেই।

তবু কথাগুলো মনের ভেতরে এসে থেকে যায়।

অরিন্দমের হঠাৎ মনে হলো, মেসেজগুলোর মধ্যে যেন একফোঁটা অভিমান লুকিয়ে ছিল।

খুব বড় নয়।

আবার একেবারে তুচ্ছও নয়।

সেই অভিমান কি তার খবর না নেওয়ার জন্য?

নাকি আরও অন্য কিছু?

সে বুঝতে পারল না।

বরং যত ভাবছে, ততই যেন বিষয়টা আরও জটিল হয়ে উঠছে।

মেঘলা কি ধরা দিতে চাইছে?

নাকি শুধু একজন পরিচিত মানুষের সঙ্গে সহজ আলাপ করছে?

নাকি দুজন নিঃসঙ্গ মানুষের মধ্যে অদৃশ্য কোনো সেতু তৈরি হচ্ছে, যার নাম এখনই দেওয়া যায় না?

অরিন্দম জানত না।

শুধু এটুকু বুঝতে পারছিল, মেঘলার প্রতিটি কথার পর তার নিজের ভেতরেও নতুন কিছু প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে।

যে মানুষটা এতদিন নিজের চারপাশে বাস্তবতার শক্ত দেয়াল তুলে রেখেছিল, সেই মানুষটিই আজ কয়েকটি সাধারণ মেসেজের অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

মেঘলার উপস্থিতি ঠিক পূর্ণ আলোর মতো নয়।

বরং সন্ধ্যার আলো-আঁধারির মতো।

সবকিছু স্পষ্ট করে দেয় না।

আবার সম্পূর্ণ অন্ধকারেও ডুবিয়ে রাখে না।

শুধু কোথাও এক টুকরো মৃদু আলো রেখে যায়।

যার দিকে তাকালে মনে হয়, পথটা হয়তো এখানেই শেষ নয়।

আর সেই ভাবনাটুকুই অরিন্দমের বহুদিনের নিস্তব্ধ জীবনে অদ্ভুত এক আলোড়ন তুলে দিল।

মোবাইলটা পাশে রেখে সে আকাশের দিকে তাকাল।

তারারাও কি সবসময় এত উজ্জ্বল ছিল?

নাকি আজ তার চোখেই বদল এসেছে?

উত্তর সে পেল না।

তবে এতটুকু অনুভব করল—

কখনও কখনও মানুষের জীবনে কিছু মানুষ আসে, যারা কোনো ঘোষণা ছাড়াই, কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই, নিঃশব্দে তার একাকীত্বের ভেতরে আলো-আঁধারির একটি দীর্ঘ ছায়াপথ এঁকে দিয়ে যায়।

আর সেই পথের শেষ কোথায়, তা তখনও কেউ জানে না।

```

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

উপন্যাস অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভো র পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, বরং শরীরটাই সময়ের আগেই বুঝে যায়—আরও একটা দিনের শুরু হয়েছে। ঘুম ভাঙার পরেও সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশির শব্দ ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের কাছে জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। দিনটা আবার শুরু হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা গতকাল রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলারটা একটু পুরোনো, হাতার কাছে হালকা রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ -ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না। তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। রান্নাঘর থেকে মা ডাকলেন, ...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

অফিস নামের আরেক সংসার

দ্বিতীয় অধ্যায় পরদিনও সকালটা যেন আগের দিনেরই পুনরাবৃত্তি। স্টেশনের বাইরে গোপাল কাকুর চায়ের দোকানটা তখন ধোঁয়া ওঠা কেটলির গন্ধে ভরে গেছে। ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে গোপাল কাকু দূর থেকেই হেসে বললেন— — এসো বাবা, আজও কম চিনি তো? অনির্বাণ হেসে মাথা নাড়ল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে সে প্রতিদিনের মতোই বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল। কেন জানি না, বসার পর থেকেই তার চোখ দুটো অজান্তেই দোকানের সামনের রাস্তার দিকে চলে গেল। সে জানে, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আসবে। ঠিক যেমন প্রতিদিন আসে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই নীল রঙের ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে মেয়েটি দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। গোপাল কাকু যেন আগেই প্রস্তুত ছিলেন। — দিদিমণি, আজও লিকার চা... চিনি অল্প? মেয়েটি মৃদু হেসে বলল— — হ্যাঁ কাকু। চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে সে আগের মতোই বেঞ্চের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল। মাঝখানে সেই একই দূরত্ব। কথা আজও হলো না। তবু এই নীরবতাটুকুই যেন দুজনের অদ্ভুত এক রোজকার পরিচয়। কখনও আড়চোখে তাকানো... চোখাচোখি হতেই আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া... এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে। অনির্বাণ কখনও নিজের কাছেও স্বীক...