পর্ব – ৪ : আকাশের ডানায়
ঈশিতার সঙ্গে দেখা হওয়ার তিনদিন পর।
সকালে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। উঠোনে ঝরে পড়া জবা ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বারান্দার থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল অরিন্দম।
মানুষের জীবনের সঙ্গে এই ঝরে পড়া ফুলগুলোর কী আশ্চর্য মিল!
জীবনের শুরুটা যেন কুঁড়ির মতো। ধীরে ধীরে সে প্রস্ফুটিত হয়, রূপ-রস-গন্ধে ভরে ওঠে। তারপর একদিন অদৃশ্য কোনো নিয়মে রং বদলায়, সৌন্দর্য ম্লান হয়, আর নীরবে বৃন্ত থেকে ঝরে পড়ে।
হঠাৎ মোবাইলের স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠল।
মেঘলার মেসেজ।
— "আজ শান্তিনিকেতনের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করতে যাচ্ছি। আপনার সঙ্গ পেলে মন্দ হয় না।"
অরিন্দম কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শুধু লিখল—
— "কখন?"
ওপাশ থেকে উত্তর এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।
— "এগারোটায়। আম্রকুঞ্জে অপেক্ষা করব।"
শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জ।
রবীন্দ্রনাথের পদচিহ্নে ধন্য সেই মাটি। গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ নেমে এসেছে সোনালি সুতোর মতো। দূরে কোপাই নদীর বালুচরে কয়েকটি শিশু খেলছে।
একটি ছোট টিনের চালের স্কুলঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল মেঘলা।
পরনে হালকা হলুদ সুতির শাড়ি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। চারপাশে পনেরো-কুড়িটি বাচ্চা তাকে ঘিরে "দিদি, দিদি" বলে ডাকছে। কারও হাতে স্লেট, কারও হাতে খাতা।
অরিন্দমকে দেখে মেঘলা মৃদু হেসে বলল,
— "এসেছেন? ভাবিনি এত সহজে রাজি হবেন।"
— "ডাকলে না এসে পারি?"
মেঘলা কিছু বলল না। শুধু হাসল।
স্কুলঘরের ভেতরে ঢুকতেই অরিন্দম দেখল, মাটির মেঝে, দেওয়ালে রঙিন ছবি, বাংলা বর্ণমালা, রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি। এক কোণে রান্না হচ্ছে বাচ্চাদের দুপুরের খাবার।
একটা ছোট মেয়ে এসে অরিন্দমের হাত টানল।
— "কাকু, আপনি চাঁদ দেখতে পারেন?"
অরিন্দম হেসে হাঁটু গেড়ে বসল।
— "এখন তো দিন। চাঁদ কোথায়?"
মেয়েটা গম্ভীর মুখে বলল,
— "দিদি বলে, চাঁদ না থাকলেও আকাশ দেখতে হয়।"
পাশ থেকে মেঘলা হেসে উঠল।
— "শুনলেন? ওরাই আমাকে শেখায়।"
অরিন্দম মুগ্ধ হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।
দুপুরের দিকে তারা কোপাই নদীর ধারে গিয়ে বসল।
নদীর জল ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। হাওয়ায় শালপাতা উড়ছে। দূরে এক বাউল একতারা হাতে গান গাইছে।
মেঘলা বালিতে আঙুল দিয়ে অকারণে কিছু রেখা আঁকছিল।
হঠাৎ বলল,
— "জানেন, আমার খুব ইচ্ছে করে আকাশে পাখি হয়ে উড়তে।"
অরিন্দম মৃদু হেসে বলল,
— "তারপর?"
— "তারপর ডানায় শীতল হাওয়া মেখে দূর দূরান্তে ঘুরে বেড়াতে।"
একটু থেমে আবার বলল,
— "কোনো হিসাব থাকবে না, কোনো প্রতিযোগিতা থাকবে না। শুধু আকাশ থাকবে, আর পথ থাকবে।"
অরিন্দম চুপচাপ শুনছিল।
মেঘলা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আমরা বড় হতে হতে অনেক কিছু জমাই—অর্থ, পরিচয়, সাফল্য, দায়িত্ব। কিন্তু কখন যে সেইসবের ভিড়ে নিজের ভেতরের মানুষটাকে হারিয়ে ফেলি, বুঝতেই পারি না।"
— "সব ছেড়ে দিয়ে কি বাঁচা যায়?"
মেঘলা মাথা নাড়ল।
— "না। সব ছেড়ে নয়। কিন্তু সবকিছুর মালিক হয়েও তার দাস না হয়ে।"
কথাটা শুনে অরিন্দমের মনে অদ্ভুত একটা আলোড়ন উঠল।
বিকেলের দিকে স্কুলে ফিরে এলো তারা।
বাচ্চাদের খাওয়ানো, পড়ানো, হাসাহাসি—সবকিছুর মধ্যে মেঘলা এমনভাবে মিশে ছিল, যেন এটাই তার পৃথিবী।
বিদায়ের সময় মেঘলা বলল,
— "আমি কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না, অরিন্দমবাবু।"
অরিন্দম তাকিয়ে রইল।
— "কেন?"
— "কারণ জীবনকে আমি খুব শক্ত করে বেঁধে রাখতে শিখিনি।"
একটু হেসে আবার বলল,
— "শুধু এটুকু বলতে পারি—আমার আকাশে কেউ যদি পাখি হয়ে আসে, তার ডানায় শীতল হতে আমার আপত্তি নেই।"
কথাটা বলেই সে অন্যদিকে তাকাল।
অরিন্দম উত্তর দিল না।
কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথাও যেন অচেনা একটা শব্দ জন্ম নিল।
```
Comments
Post a Comment