Skip to main content

পর্ব – ১৪ : আকাশের ডানায়

পর্ব – ৪ : আকাশের ডানায়

ঈশিতার সঙ্গে দেখা হওয়ার তিনদিন পর।

সকালে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। উঠোনে ঝরে পড়া জবা ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বারান্দার থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল অরিন্দম।

মানুষের জীবনের সঙ্গে এই ঝরে পড়া ফুলগুলোর কী আশ্চর্য মিল!

জীবনের শুরুটা যেন কুঁড়ির মতো। ধীরে ধীরে সে প্রস্ফুটিত হয়, রূপ-রস-গন্ধে ভরে ওঠে। তারপর একদিন অদৃশ্য কোনো নিয়মে রং বদলায়, সৌন্দর্য ম্লান হয়, আর নীরবে বৃন্ত থেকে ঝরে পড়ে।

হঠাৎ মোবাইলের স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠল।

মেঘলার মেসেজ।

— "আজ শান্তিনিকেতনের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করতে যাচ্ছি। আপনার সঙ্গ পেলে মন্দ হয় না।"

অরিন্দম কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর শুধু লিখল—

— "কখন?"

ওপাশ থেকে উত্তর এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

— "এগারোটায়। আম্রকুঞ্জে অপেক্ষা করব।"

শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জ।

রবীন্দ্রনাথের পদচিহ্নে ধন্য সেই মাটি। গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ নেমে এসেছে সোনালি সুতোর মতো। দূরে কোপাই নদীর বালুচরে কয়েকটি শিশু খেলছে।

একটি ছোট টিনের চালের স্কুলঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল মেঘলা।

পরনে হালকা হলুদ সুতির শাড়ি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। চারপাশে পনেরো-কুড়িটি বাচ্চা তাকে ঘিরে "দিদি, দিদি" বলে ডাকছে। কারও হাতে স্লেট, কারও হাতে খাতা।

অরিন্দমকে দেখে মেঘলা মৃদু হেসে বলল,

— "এসেছেন? ভাবিনি এত সহজে রাজি হবেন।"

— "ডাকলে না এসে পারি?"

মেঘলা কিছু বলল না। শুধু হাসল।

স্কুলঘরের ভেতরে ঢুকতেই অরিন্দম দেখল, মাটির মেঝে, দেওয়ালে রঙিন ছবি, বাংলা বর্ণমালা, রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি। এক কোণে রান্না হচ্ছে বাচ্চাদের দুপুরের খাবার।

একটা ছোট মেয়ে এসে অরিন্দমের হাত টানল।

— "কাকু, আপনি চাঁদ দেখতে পারেন?"

অরিন্দম হেসে হাঁটু গেড়ে বসল।

— "এখন তো দিন। চাঁদ কোথায়?"

মেয়েটা গম্ভীর মুখে বলল,

— "দিদি বলে, চাঁদ না থাকলেও আকাশ দেখতে হয়।"

পাশ থেকে মেঘলা হেসে উঠল।

— "শুনলেন? ওরাই আমাকে শেখায়।"

অরিন্দম মুগ্ধ হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।

দুপুরের দিকে তারা কোপাই নদীর ধারে গিয়ে বসল।

নদীর জল ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। হাওয়ায় শালপাতা উড়ছে। দূরে এক বাউল একতারা হাতে গান গাইছে।

মেঘলা বালিতে আঙুল দিয়ে অকারণে কিছু রেখা আঁকছিল।

হঠাৎ বলল,

— "জানেন, আমার খুব ইচ্ছে করে আকাশে পাখি হয়ে উড়তে।"

অরিন্দম মৃদু হেসে বলল,

— "তারপর?"

— "তারপর ডানায় শীতল হাওয়া মেখে দূর দূরান্তে ঘুরে বেড়াতে।"

একটু থেমে আবার বলল,

— "কোনো হিসাব থাকবে না, কোনো প্রতিযোগিতা থাকবে না। শুধু আকাশ থাকবে, আর পথ থাকবে।"

অরিন্দম চুপচাপ শুনছিল।

মেঘলা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

— "আমরা বড় হতে হতে অনেক কিছু জমাই—অর্থ, পরিচয়, সাফল্য, দায়িত্ব। কিন্তু কখন যে সেইসবের ভিড়ে নিজের ভেতরের মানুষটাকে হারিয়ে ফেলি, বুঝতেই পারি না।"

— "সব ছেড়ে দিয়ে কি বাঁচা যায়?"

মেঘলা মাথা নাড়ল।

— "না। সব ছেড়ে নয়। কিন্তু সবকিছুর মালিক হয়েও তার দাস না হয়ে।"

কথাটা শুনে অরিন্দমের মনে অদ্ভুত একটা আলোড়ন উঠল।

বিকেলের দিকে স্কুলে ফিরে এলো তারা।

বাচ্চাদের খাওয়ানো, পড়ানো, হাসাহাসি—সবকিছুর মধ্যে মেঘলা এমনভাবে মিশে ছিল, যেন এটাই তার পৃথিবী।

বিদায়ের সময় মেঘলা বলল,

— "আমি কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না, অরিন্দমবাবু।"

অরিন্দম তাকিয়ে রইল।

— "কেন?"

— "কারণ জীবনকে আমি খুব শক্ত করে বেঁধে রাখতে শিখিনি।"

একটু হেসে আবার বলল,

— "শুধু এটুকু বলতে পারি—আমার আকাশে কেউ যদি পাখি হয়ে আসে, তার ডানায় শীতল হতে আমার আপত্তি নেই।"

কথাটা বলেই সে অন্যদিকে তাকাল।

অরিন্দম উত্তর দিল না।

কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথাও যেন অচেনা একটা শব্দ জন্ম নিল।

```

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...

পর্ব – ১৮ : সাহসের সকাল

পর্ব – ৮ : সাহসের সকাল ইন্টারভিউয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ঈশিতার ফোন কলের সংখ্যা ততই একটু একটু করে বাড়ছিল। খুব দীর্ঘ কথা নয়। নিতান্তই প্রয়োজনের কথা। কখনো কোনো নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন, কখনো যাতায়াতের সময় নিয়ে আলোচনা, কখনো বা শুধু নিশ্চিত হওয়া— — "আপনি তো আসছেন, তাই না?" প্রতিবারই অরিন্দমের একই উত্তর— — "হ্যাঁ, আসছি।" ইন্টারভিউয়ের তিন দিন আগেই সে অফিসে ছুটির আবেদন করে রেখেছিল। কারণ হিসেবে লিখেছিল— 'Personal Work'। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় তার নিজেরই মনে হয়েছিল, বহু বছর পর কোনো ছুটি সে সত্যিই নিজের ইচ্ছায় নিচ্ছে। ইন্টারভিউয়ের আগের দিন দুপুরে অফিসে কাজ করছিল অরিন্দম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "ঈশিতা"। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। তবে আজ সেই কণ্ঠে যেন এক অচেনা অস্থিরতা মিশে আছে। — "ব্যস্ত আছেন?" — "না, বলুন।" কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ঈশিতা ধীরে বলল— — "জানেন, আজ বড় অদ্ভুত লাগছে। এতদিন এই দিনটার জন্যই তো প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন দিনটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আর মনে হচ্ছে সব যেন গু...