পর্ব – ৮ : সাহসের সকাল
ইন্টারভিউয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ঈশিতার ফোন কলের সংখ্যা ততই একটু একটু করে বাড়ছিল।
খুব দীর্ঘ কথা নয়। নিতান্তই প্রয়োজনের কথা। কখনো কোনো নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন, কখনো যাতায়াতের সময় নিয়ে আলোচনা, কখনো বা শুধু নিশ্চিত হওয়া—
— "আপনি তো আসছেন, তাই না?"
প্রতিবারই অরিন্দমের একই উত্তর—
— "হ্যাঁ, আসছি।"
ইন্টারভিউয়ের তিন দিন আগেই সে অফিসে ছুটির আবেদন করে রেখেছিল। কারণ হিসেবে লিখেছিল— 'Personal Work'।
আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় তার নিজেরই মনে হয়েছিল, বহু বছর পর কোনো ছুটি সে সত্যিই নিজের ইচ্ছায় নিচ্ছে।
ইন্টারভিউয়ের আগের দিন দুপুরে অফিসে কাজ করছিল অরিন্দম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "ঈশিতা"।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। তবে আজ সেই কণ্ঠে যেন এক অচেনা অস্থিরতা মিশে আছে।
— "ব্যস্ত আছেন?"
— "না, বলুন।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর ঈশিতা ধীরে বলল—
— "জানেন, আজ বড় অদ্ভুত লাগছে। এতদিন এই দিনটার জন্যই তো প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন দিনটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আর মনে হচ্ছে সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।"
অরিন্দম মৃদু হেসে বলল—
— "আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ের আগের রাতেও ঠিক এমনই হয়েছিল।"
ঈশিতা একটু অবাক হলো।
— "আপনারও ভয় করেছিল?"
— "খুব।"
— "আপনাকে দেখে তো কখনো মনে হয় না।"
— "মানুষের ভয়গুলো বাইরে থেকে দেখা যায় না, ঈশিতা।"
ওপাশে নীরবতা।
অরিন্দম বলল—
— "সেদিন মনে হয়েছিল, যদি না হয়? যদি আটকে যাই? যদি সবাই বুঝে ফেলে আমি আসলে ততটা যোগ্য নই?"
ঈশিতা হালকা হেসে ফেলল।
— "আমারও তো এখন ঠিক তাই মনে হচ্ছে।"
— "তাই বলছি। ভয়টা অস্বাভাবিক কিছু নয়।"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঈশিতা বলল—
— "তবু যদি ভালো না হয়?"
অরিন্দম চেয়ারে হেলান দিল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল—
— "তোমার হারানোর কী আছে?"
— "মানে?"
— "তুমি এত বড় একটা পরীক্ষার লিখিত পর্ব পেরিয়ে এখানে পৌঁছেছ। হাজার হাজার মানুষের মধ্যে থেকে। কাল যদি কোনো কারণে না-ও হয়, তাহলেও তুমি সেই মানুষই থাকবে, যে এতদূর এসেছে।"
ঈশিতা চুপ করে শুনছিল।
অরিন্দম আবার বলল—
— "আর যদি হয়?"
— "তাহলে?"
— "তাহলে নতুন একটা পথ খুলবে।"
একটু থেমে সে হেসে বলল—
— "দেখো, কালকের দিনটা তোমার কাছ থেকে খুব বেশি কিছু কেড়ে নিতে পারবে না। কিন্তু অনেক কিছু দিতে পারে।"
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
মনে হলো কথাগুলো কোথাও গিয়ে পৌঁছেছে।
ঈশিতা ধীরে বলল—
— "জানেন, আমি কখনো এভাবে ভাবিনি।"
— "আমরা সাধারণত যা হারাতে পারি সেটা নিয়েই বেশি ভাবি। যা পেতে পারি, সেটা নিয়ে কম ভাবি।"
তারপর অরিন্দম একটু থেমে বলল—
— "আর একটা কথা।"
— "বলুন।"
— "কাল বোর্ডের সামনে এমনভাবে বসবে, যেন কাউকে কিছু প্রমাণ করতে যাওনি। তুমি সেখানে গিয়েছ নিজের পরিচয় দিতে, নিজের সেরাটা দিতে।"
— "যদি কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানি?"
— "তাহলে বলবে জানি না।"
— "এত সহজ?"
— "হ্যাঁ। কারণ সততা মনে রাখার জন্য আলাদা করে কিছু মুখস্থ করতে হয় না।"
ঈশিতা এবার হেসে ফেলল।
সেই হাসিতে আগের অস্থিরতা অনেকটাই কমে গেছে।
তারপর হঠাৎ সে নিচু স্বরে বলল—
— "জানেন, আমার বাবা ছোটবেলা থেকে সব গুরুত্বপূর্ণ দিনে আমার পাশে থেকেছেন। কালই প্রথমবার তিনি পাশে থাকবেন না।"
কথাটা শুনে অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
এবার সে বুঝতে পারল, ভয়টা ইন্টারভিউ নিয়ে নয়।
ভয়টা একা হয়ে যাওয়ার।
সে ধীরে বলল—
— "সবসময় একই মানুষ পাশে থাকবে না, ঈশিতা। এটাই জীবনের নিয়ম।"
— "হয়তো।"
— "কিন্তু তাই বলে মানুষ একা হয়ে যায় না।"
— "মানে?"
— "মানে, কাল যখন তুমি ইন্টারভিউ রুমে ঢুকবে, তখন তোমার সঙ্গে থাকবে তোমার পরিশ্রম, তোমার প্রস্তুতি, তোমার বাবা-মায়ের আশীর্বাদ।"
একটু থেমে সে যোগ করল—
— "আর বাইরে আমি থাকব।"
ওপাশে আর কোনো শব্দ শোনা গেল না।
শুধু নিঃশ্বাসের মৃদু শব্দ।
তারপর খুব আস্তে ঈশিতা বলল—
— "ধন্যবাদ।"
অরিন্দম হেসে ফেলল।
— "ধন্যবাদটা কাল দিও। আগে ইন্টারভিউটা দিয়ে এসো।"
ফোনটা কেটে গেল।
অরিন্দম কিছুক্ষণ মোবাইলটা হাতে নিয়েই বসে রইল।
Comments
Post a Comment