Skip to main content

পর্ব – ১৮ : সাহসের সকাল

পর্ব – ৮ : সাহসের সকাল

ইন্টারভিউয়ের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ঈশিতার ফোন কলের সংখ্যা ততই একটু একটু করে বাড়ছিল।

খুব দীর্ঘ কথা নয়। নিতান্তই প্রয়োজনের কথা। কখনো কোনো নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন, কখনো যাতায়াতের সময় নিয়ে আলোচনা, কখনো বা শুধু নিশ্চিত হওয়া—

— "আপনি তো আসছেন, তাই না?"

প্রতিবারই অরিন্দমের একই উত্তর—

— "হ্যাঁ, আসছি।"

ইন্টারভিউয়ের তিন দিন আগেই সে অফিসে ছুটির আবেদন করে রেখেছিল। কারণ হিসেবে লিখেছিল— 'Personal Work'।

আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় তার নিজেরই মনে হয়েছিল, বহু বছর পর কোনো ছুটি সে সত্যিই নিজের ইচ্ছায় নিচ্ছে।

ইন্টারভিউয়ের আগের দিন দুপুরে অফিসে কাজ করছিল অরিন্দম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "ঈশিতা"।

ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। তবে আজ সেই কণ্ঠে যেন এক অচেনা অস্থিরতা মিশে আছে।

— "ব্যস্ত আছেন?"

— "না, বলুন।"

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর ঈশিতা ধীরে বলল—

— "জানেন, আজ বড় অদ্ভুত লাগছে। এতদিন এই দিনটার জন্যই তো প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন দিনটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আর মনে হচ্ছে সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।"

অরিন্দম মৃদু হেসে বলল—

— "আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ের আগের রাতেও ঠিক এমনই হয়েছিল।"

ঈশিতা একটু অবাক হলো।

— "আপনারও ভয় করেছিল?"

— "খুব।"

— "আপনাকে দেখে তো কখনো মনে হয় না।"

— "মানুষের ভয়গুলো বাইরে থেকে দেখা যায় না, ঈশিতা।"

ওপাশে নীরবতা।

অরিন্দম বলল—

— "সেদিন মনে হয়েছিল, যদি না হয়? যদি আটকে যাই? যদি সবাই বুঝে ফেলে আমি আসলে ততটা যোগ্য নই?"

ঈশিতা হালকা হেসে ফেলল।

— "আমারও তো এখন ঠিক তাই মনে হচ্ছে।"

— "তাই বলছি। ভয়টা অস্বাভাবিক কিছু নয়।"

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঈশিতা বলল—

— "তবু যদি ভালো না হয়?"

অরিন্দম চেয়ারে হেলান দিল।

তারপর খুব শান্ত গলায় বলল—

— "তোমার হারানোর কী আছে?"

— "মানে?"

— "তুমি এত বড় একটা পরীক্ষার লিখিত পর্ব পেরিয়ে এখানে পৌঁছেছ। হাজার হাজার মানুষের মধ্যে থেকে। কাল যদি কোনো কারণে না-ও হয়, তাহলেও তুমি সেই মানুষই থাকবে, যে এতদূর এসেছে।"

ঈশিতা চুপ করে শুনছিল।

অরিন্দম আবার বলল—

— "আর যদি হয়?"

— "তাহলে?"

— "তাহলে নতুন একটা পথ খুলবে।"

একটু থেমে সে হেসে বলল—

— "দেখো, কালকের দিনটা তোমার কাছ থেকে খুব বেশি কিছু কেড়ে নিতে পারবে না। কিন্তু অনেক কিছু দিতে পারে।"

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

মনে হলো কথাগুলো কোথাও গিয়ে পৌঁছেছে।

ঈশিতা ধীরে বলল—

— "জানেন, আমি কখনো এভাবে ভাবিনি।"

— "আমরা সাধারণত যা হারাতে পারি সেটা নিয়েই বেশি ভাবি। যা পেতে পারি, সেটা নিয়ে কম ভাবি।"

তারপর অরিন্দম একটু থেমে বলল—

— "আর একটা কথা।"

— "বলুন।"

— "কাল বোর্ডের সামনে এমনভাবে বসবে, যেন কাউকে কিছু প্রমাণ করতে যাওনি। তুমি সেখানে গিয়েছ নিজের পরিচয় দিতে, নিজের সেরাটা দিতে।"

— "যদি কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানি?"

— "তাহলে বলবে জানি না।"

— "এত সহজ?"

— "হ্যাঁ। কারণ সততা মনে রাখার জন্য আলাদা করে কিছু মুখস্থ করতে হয় না।"

ঈশিতা এবার হেসে ফেলল।

সেই হাসিতে আগের অস্থিরতা অনেকটাই কমে গেছে।

তারপর হঠাৎ সে নিচু স্বরে বলল—

— "জানেন, আমার বাবা ছোটবেলা থেকে সব গুরুত্বপূর্ণ দিনে আমার পাশে থেকেছেন। কালই প্রথমবার তিনি পাশে থাকবেন না।"

কথাটা শুনে অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

এবার সে বুঝতে পারল, ভয়টা ইন্টারভিউ নিয়ে নয়।

ভয়টা একা হয়ে যাওয়ার।

সে ধীরে বলল—

— "সবসময় একই মানুষ পাশে থাকবে না, ঈশিতা। এটাই জীবনের নিয়ম।"

— "হয়তো।"

— "কিন্তু তাই বলে মানুষ একা হয়ে যায় না।"

— "মানে?"

— "মানে, কাল যখন তুমি ইন্টারভিউ রুমে ঢুকবে, তখন তোমার সঙ্গে থাকবে তোমার পরিশ্রম, তোমার প্রস্তুতি, তোমার বাবা-মায়ের আশীর্বাদ।"

একটু থেমে সে যোগ করল—

— "আর বাইরে আমি থাকব।"

ওপাশে আর কোনো শব্দ শোনা গেল না।

শুধু নিঃশ্বাসের মৃদু শব্দ।

তারপর খুব আস্তে ঈশিতা বলল—

— "ধন্যবাদ।"

অরিন্দম হেসে ফেলল।

— "ধন্যবাদটা কাল দিও। আগে ইন্টারভিউটা দিয়ে এসো।"

ফোনটা কেটে গেল।

অরিন্দম কিছুক্ষণ মোবাইলটা হাতে নিয়েই বসে রইল।

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা

অপেক্ষার স্টেশন ও এক কাপ চা মধ্যবিত্তের জীবন, অপেক্ষা এবং ভালোবাসার গল্প প্রথম অধ্যায় ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই অনির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। বহু বছরের অভ্যাস। এখন আর অ্যালার্ম তাকে জাগায় না, শরীরটাই সময়ের আগে বুঝে যায়— আরও একটা দিন শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে সে। পাশের ঘর থেকে বাবার শুকনো কাশি ভেসে আসে। রান্নাঘরে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ। উঠোনে কলের জল ভরার আওয়াজ। এই শব্দগুলোই তার প্রতিদিনের সকাল। জানালাটা খুলতেই ভোরের ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা লোকাল ট্রেনের হুইসেল ভেসে এল। পূর্ব আকাশে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাড়ার দু-একটা বাড়ির দরজা খুলছে, কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চায়ের কেটলিতে প্রথম জল চাপানোর শব্দ।  আয়নার সামনে দাঁড়াল অনির্বাণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে ধুয়ে শুকিয়েছে। কলার একটু পুরোনো, হাতার কাছে রং উঠে গেছে। তবু যত্ন করে ইস্ত্রি করা। সরকারি অফিসের গ্রুপ-ডি চাকরিতে মানুষ ধনী হয় না, তবে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখার অভ্যাসটা এখনও যায়নি। আলমারির ওপর রাখা পুরোনো হাতঘড়িটা হাতে পরল সে। ঘড...

নন্দিতার নীরবতা

পঞ্চম অধ্যায় প্রতিদিন ভোরে স্টেশনের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তার নাম নন্দিতা । বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। চাকরিটা পেয়েছিল অনেকের তুলনায় বেশ অল্প বয়সেই। পাড়ার লোকজন বলত— — "মেয়েটার ভাগ্য ভালো।" নন্দিতা শুধু মৃদু হেসে যেত। মানুষ সাফল্য দেখে। সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কত ভোর বই খুলে শুরু হয়েছে, কত পরীক্ষার হল থেকে বুক ধড়ফড় করতে করতে বেরিয়েছে—সেসব কেউ দেখে না। চাকরিটা পাওয়ার দিনটা শুধু তার নিজের ছিল না। সেদিন যেন পুরো সংসার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিল। বাড়িতে বাবা আছেন। মা আছেন। একজন বড় দাদা।বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো ঈষান... আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। সংসারের সবচেয়ে নিশ্চিত আয় এখন নন্দিতার বেতন। তাই বাড়িতে কেউ খুব একটা তাড়া দেয় না তার বিয়ের জন্য। মুখে অবশ্য সবাই একই কথা বলে— — "ভালো ছেলে পেলে তখন দেখা যাবে।" পাত্রপক্ষ আসে। চা-জলখাবার হয়। কথাবার্তাও এগোয়। কখনও কখনও বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে ইঙ্গিতও পাওয়া...