গাড়ির ড্রাইভারকে বিদায় দিয়ে হাওড়া স্টেশনের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল অরিন্দম। বহু বছর পর ট্রেনে করে গ্রামের দিকে যাচ্ছে সে। ইচ্ছে করলেই নিজের গাড়িতে যেতে পারত, কিন্তু জানি না কেন, আজ ট্রেনযাত্রার পুরোনো স্বাদটা আবার অনুভব করতে ইচ্ছে করছিল।
স্টেশনের সেই চিরচেনা কোলাহল আজও বদলায়নি। চায়ের কাপে ধোঁয়া উড়ছে, কাঁধে মালপত্র নিয়ে ছুটে চলেছে কুলি, লাউডস্পিকারে ভেসে আসছে ট্রেনের ঘোষণা। এই ব্যস্ততার মধ্যেও যেন একটা আলাদা প্রাণ আছে।
নির্ধারিত সময়ে বন্দে ভারত এক্সপ্রেস প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল।
নিজের আসনে গিয়ে বসে পড়ল অরিন্দম। ট্রেন ছাড়তেই জানালার বাইরে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল হাওড়া শহর। কিছুক্ষণ পর ব্যাগ থেকে একটি বই বের করে পড়তে শুরু করল।
ঠিক তখনই পাশের আসনের ভদ্রলোকের সঙ্গে সামান্য ধাক্কা লাগল।
— "ওহ, সরি।"
— "না না, কোনো সমস্যা নেই।"
ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে হবে। পরিপাটি পোশাক, চোখে ফ্রেমের চশমা, মুখে এক ধরনের শান্ত অথচ আত্মবিশ্বাসী অভিব্যক্তি।
নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে রাখতে রাখতে ভদ্রলোক হেসে বললেন,
— "বোলপুর?"
অরিন্দম অবাক হয়ে তাকাল।
— "কী করে বুঝলেন?"
— "বেশিরভাগ মানুষ বন্দে ভারতে উঠে হয় অফিসের কাজে যায়, নয়তো শান্তিনিকেতন বা বীরভূমের দিকে। আপনার হাতে যে ব্যাগটা, তাতে বেড়ানোর চেয়ে বাড়ি ফেরার গন্ধ বেশি।"
কথাটা শুনে অরিন্দমও হেসে ফেলল।
— "বাড়ি বলা যায়। মামার বাড়ি।"
— "তাহলে তো আরও ভালো।"
এরপর দুজনের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কথাবার্তা শুরু হলো।
ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন।
— "আমি অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়। বিশ্বভারতীর সঙ্গে যুক্ত আছি। সমাজবিজ্ঞান পড়াই।"
অরিন্দমও নিজের পরিচয় দিল।
— "অরিন্দম সেন। কর্পোরেট সেক্টরে কাজ করি।"
— "কর্পোরেট আর সমাজবিজ্ঞান—দুই ভিন্ন জগতের মানুষ পাশাপাশি বসেছি মনে হচ্ছে।"
— "হতে পারে। আবার হয়তো এতটাও ভিন্ন নয়।"
অনির্বাণবাবু মৃদু হেসে জানালার বাইরে তাকালেন। ট্রেন তখন শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলে এসেছে। ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট।
ট্রেন তখন বর্ধমান ছেড়ে অনেকটা এগিয়ে এসেছে। জানালার বাইরে সবুজ মাঠ, মাঝেমধ্যে ছোট ছোট গ্রাম পিছিয়ে যাচ্ছে।
কথার ফাঁকে ভদ্রলোক হঠাৎ বললেন,
— "আপনাদের কর্পোরেট জগতে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় বোধহয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা?"
অরিন্দম হেসে মাথা নাড়ল।
— "প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মিটিংয়ে বিষয়টা উঠে আসে।"
— "মানুষের চাকরি খেয়ে নেবে বলে যে এত আলোচনা, আপনি কি সেটা বিশ্বাস করেন?"
অরিন্দম কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— "চাকরি খেয়ে নেবে কিনা জানি না, তবে চাকরির ধরন বদলে দেবে।"
ভদ্রলোক সন্তুষ্টির হাসি হাসলেন।
— "আমি বিশ্বভারতীতে পড়াই। গত কয়েক বছরে ছাত্রদের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখছি। অনেকেই ভাবছে প্রযুক্তি সব সমস্যার সমাধান করে দেবে।"
— "করবে না?"
— "প্রযুক্তি উত্তর দিতে পারে, কিন্তু বোধশক্তি দিতে পারে না।"
অরিন্দম চুপ করে রইল।
ভদ্রলোক জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
— "ধরুন, একটা যন্ত্র কবিতা লিখল, ছবি আঁকল, গবেষণাপত্র লিখল। কিন্তু মানুষের চোখের জল, মানুষের ভালোবাসা, মানুষের ত্যাগ—এসব কি কোনো অ্যালগরিদম সত্যিই বুঝতে পারে?"
— "সম্ভবত না।"
— "এই জন্যই আমি আমার ছাত্রদের বলি, প্রযুক্তিকে ভয় পেও না। কিন্তু নিজের চিন্তা করার ক্ষমতাটাকে হারিয়ে ফেলো না।"
ট্রেন তখন অজয় নদ পার হচ্ছিল।
ভদ্রলোক আবার বললেন,
— "আজকাল সবাই দ্রুত উত্তর চায়। মোবাইল খুললেই উত্তর। AI-কে প্রশ্ন করলেই উত্তর। কিন্তু জীবনের বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর কি এত সহজে পাওয়া যায়?"
অরিন্দম মৃদু হেসে বলল,
— "পাওয়া যায় না বলেই বোধহয় মানুষ এখনও বই পড়ে, গল্প লেখে, প্রেমে পড়ে।"
ভদ্রলোক এবার হেসে উঠলেন।
— "ঠিক বলেছেন। মানুষ যত উন্নতই হোক, তার সবচেয়ে বড় শক্তি এখনও তার মানবিকতা।"
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
ট্রেনের জানালার বাইরে তখন লাল মাটির আভাস দেখা যাচ্ছে। বীরভূম আর বেশি দূরে নয়।
ভদ্রলোক ধীরে ধীরে বললেন,
— "যন্ত্র হয়তো মানুষের কাজ করতে শিখবে। কিন্তু মানুষের মতো মানুষ হওয়া—সেটা এখনও সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা।"
অরিন্দমের মনে হলো, কথাটা শুধু প্রযুক্তির জন্য নয়, গোটা সমাজের জন্যই সত্য।
মানুষের জীবন যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। একেকটি ঢেউ মানুষকে আরেকজন মানুষের কাছে নিয়ে আসে, আবার পরের ঢেউই তাকে দূরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মাঝখানে থেকে যায় কিছু স্মৃতি, কিছু কথা, কিছু মুখ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোও আবছা হয়ে আসে, তবু সম্পূর্ণ মুছে যায় না।
অরিন্দম তার এই জীবনপরিসরে কত মানুষকেই না দেখেছে। কর্মসূত্রে, বন্ধুত্বে, প্রয়োজনে কিংবা নিছক ঘটনাচক্রে। কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কত মানুষ আবার হারিয়েও গেছে। কেউ কেউ স্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে, আবার কেউ বহু বছর পরে হঠাৎ করেই ফিরে এসেছে জীবনের কোনো অপ্রত্যাশিত মোড়ে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝেছে, মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়তো অভিজ্ঞতা। জীবন যত এগোয়, ততই সেই ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়।
কখনও কখনও তার মনে হয়, সব পরিচিত বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে পড়ে। অচেনা পথের ধারে দাঁড়ায়, অজানা মানুষের সঙ্গে গল্প করে। কারণ প্রত্যেক মানুষের জীবনেই এমন কিছু গল্প থাকে, যা কোনো বইয়ে লেখা থাকে না।
ট্রেন তখন ধীরে ধীরে বোলপুর স্টেশনে ঢুকছিল।
ঘোষণার শব্দ ভেসে এলো। যাত্রীরা ব্যস্ত হয়ে উঠল নিজেদের মালপত্র গুছিয়ে নিতে।
ট্রেন থামতেই অরিন্দম নেমে পড়ল।
Comments
Post a Comment