পর্ব – ৩ : ফেরার ডাক
বাড়ি ফিরে অরিন্দম আর কোনো কাজের কথা ভাবতে পারল না।
সারাদিনের ঘটনাগুলো অদ্ভুতভাবে তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল। গঙ্গার ধারের নির্জন সকাল, বহু বছর পর সৌমেনের সঙ্গে দেখা, তার বাড়ির আন্তরিক পরিবেশ, আর সেই শ্যামবর্ণ শান্ত মুখটি—সব মিলিয়ে দিনটা যেন সাধারণ কোনো রবিবারের মতো ছিল না।
সোফায় আধশোয়া অবস্থায় কখন যে তার চোখ লেগে এসেছিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
ঘুম ভাঙল মোবাইলের রিংটোনে।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল— "মামা"।
অরিন্দম তাড়াতাড়ি ফোনটা রিসিভ করল।
গত দু'দিন কাজের চাপে ফোন করা হয়নি। এমনিতে সপ্তাহে অন্তত দু-তিনবার ফোন করাই তার অভ্যাস। ওপ্রান্ত থেকে মামার কণ্ঠস্বর শুনেই বুকের ভেতর একটা পরিচিত উষ্ণতা অনুভব করল সে।
এই বিশাল পৃথিবীতে নিজের বলতে আসলে খুব বেশি কেউ নেই অরিন্দমের।
তার বাবা-মা দু'জনেই মারা গিয়েছিলেন যখন সে খুব ছোট। এতটাই ছোট যে আজ আর তাদের মুখও স্পষ্ট মনে পড়ে না। পুরোনো কয়েকটা ছবি আর কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
তারপর থেকেই মামা আর মামিমাই ছিলেন তার আশ্রয়, তার ভরসা, তার পৃথিবী।
তাদের নিজেদের সংসার ছিল, সন্তান ছিল, দায়িত্ব ছিল। তবু সেই সংসারে অরিন্দম কোনোদিন আশ্রিত হয়ে থাকেনি; থেকেছে নিজের সন্তানের মতোই। নিজের ছেলে মেয়ের সঙ্গে যে স্নেহ, যে শাসন, যে মমতা ভাগ করে নিয়েছিলেন তারা, অরিন্দমও তার সমান অংশীদার ছিল।
স্কুলে প্রথম দিন হাত ধরে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে পরীক্ষার আগের রাতের উদ্বেগ, অসুস্থতার সময় জেগে থাকা, কলেজে ভর্তি, চাকরির প্রস্তুতি—জীবনের প্রতিটি বাঁকে তারা তার পাশে দাঁড়িয়েছেন অবলম্বনের মতো।
অরিন্দম কখনও ভাবেনি যে সে বাবা-মা হারা।
কারণ জগতে একজন সন্তান যতটুকু স্নেহ, যতটুকু ভালোবাসা, যতটুকু নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রাখে, তার চেয়েও বেশি সে পেয়েছে মামা-মামিমার কাছে।
রক্তের সম্পর্ক সবসময় ভালোবাসার গভীরতা মাপতে পারে না।
কিছু মানুষ সম্পর্কের সংজ্ঞা ছাড়িয়ে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন।
মামা আর মামিমা অরিন্দমের কাছে ঠিক তেমনই।
— "কেমন আছিস বাবা?" ওপ্রান্ত থেকে মামার কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
বেয়াল্লিশ বছরের সফল কর্পোরেট অফিসার অরিন্দম সেনের কাছে এই একটি সম্বোধন আজও শৈশবের মতোই শোনায়।
কিছুক্ষণ খোঁজখবর নেওয়ার পর মামা বললেন,
— "সময় করে একবার চলে আয়। অনেকদিন তো আসিস না। তোর মামিমাও রোজ তোর কথা বলে।"
অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
সত্যিই অনেকদিন যাওয়া হয়নি।
কাজ, মিটিং, দায়িত্ব আর ব্যস্ততার অজুহাতে কত গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে যে মানুষ পিছনে ফেলে আসে, তা সে আজকাল আরও বেশি করে উপলব্ধি করে।
জানালার ওপারে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
শহরের একের পর এক আলো জ্বলে উঠছে।
অরিন্দম ধীরে ধীরে বলল,
— "এই সপ্তাহেই আসব মামা। কথা দিলাম।"
ওপ্রান্তে বৃদ্ধ মানুষটার কণ্ঠে যে আনন্দ ধরা পড়ল, তা কোনো বড় সাফল্য বা পদোন্নতির আনন্দের চেয়েও অনেক বেশি নির্মল।
ফোন কেটে যাওয়ার পর অরিন্দম অনেকক্ষণ নীরবে বসে রইল।
জীবনে অনেক কিছু অর্জন করেছে সে।
সম্মান, প্রতিষ্ঠা, অর্থ—কিছুই তার অজানা নয়।
তবু গভীরভাবে ভাবলে সে জানে, তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনো পদমর্যাদা নয়, কোনো ব্যাংক ব্যালান্স নয়।
তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো কিছু মানুষ, যারা তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে।
শুধু তার সাফল্যকে নয়—
মানুষ অরিন্দমকে।
কাজের মেয়েটি চা দিয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণ আগেই।
অরিন্দম কাপটা হাতে তুলে নিল। ধোঁয়া ওঠা চায়ে আস্তে করে চুমুক দিতে দিতে আবার মনে পড়ল মামার কথা।
মনে পড়ল তাদের জীবনের দীর্ঘ দুঃখের ইতিহাস।
ঈশ্বর বোধহয় কিছু কিছু মানুষকে একটু বেশি পরীক্ষা নেন। এক আঘাতের ক্ষত শুকিয়ে ওঠার আগেই আরেকটি আঘাত এসে হাজির হয়।
তার বড়ো মামাতো ভাই অর্ণব ছিল অসম্ভব মেধাবী। উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় গিয়েছিল। পরে একটি খ্যাতনামা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
সেই ছেলেটাই একদিন হঠাৎ নিজের জীবন শেষ করে দিল।
কোনো পূর্বাভাস ছিল না।
কোনো অভিযোগ ছিল না।
কোনো বিদায়বাণীও নয়।
একটি ছোট্ট বার্তা, কিছু অসমাপ্ত প্রশ্ন আর অসংখ্য উত্তরহীনতার মধ্যে শেষ হয়ে গেল একটি সম্ভাবনাময় জীবন।
আজও কেউ জানে না কেন।
কী এমন যন্ত্রণা ছিল তার ভেতরে, যা সে কাউকে বলতে পারেনি?
কী এমন অন্ধকার তাকে গ্রাস করেছিল?
প্রশ্নগুলো আজও প্রশ্ন হয়েই রয়ে গেছে।
সেদিনের পর মামা-মামিমার জীবনে যে নীরবতা নেমে এসেছিল, তার গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
সন্তানের মৃত্যু পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী শোক—আর সে শোক যদি এমন আকস্মিক হয়, তবে তার ভার বহন করা আরও কঠিন।
তাদের আর একমাত্র মেয়ে ঐশী এখন নেদারল্যান্ডসে কর্মরত। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ডেটা সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করছে। মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়, ভিডিও কলে খোঁজখবর নেওয়া হয়। ভালোবাসার কোনো অভাব নেই।
অভাব শুধু উপস্থিতির।
ফোনের ওপারে কণ্ঠস্বর শোনা যায়, মুখ দেখা যায়, কিন্তু মানুষটাকে ছুঁয়ে দেখা যায় না।
ব্যস্ততার পৃথিবীতে ছুটি মেলে না সহজে।
মাস পেরিয়ে বছর কেটে যায়।
ফিরে আসা আর হয়ে ওঠে না।
চায়ের কাপে আরেকটি চুমুক দিল অরিন্দম।
মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত।
সারাজীবন পরিশ্রম করে সংসার গড়ে তোলে মানুষ। কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা, কত সঞ্চয়। মনে মনে ভাবে, একদিন ঘর ভরে উঠবে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনির হাসিতে। বার্ধক্যের বিকেলটা কাটবে তাদের কোলাহলে।
কিন্তু জীবন সবসময় মানুষের পরিকল্পনা মেনে চলে না।
অনেক সময় ঘর থাকে, মানুষ থাকে, স্মৃতি থাকে—
শুধু সেই কোলাহলটা আর ফিরে আসে না।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, এত কিছু হারিয়েও মামার মধ্যে কোনো অভিযোগ ছিল না।
অরিন্দম বহুবার দেখেছে, তিনি অন্যদের মতো ভাবেন না।
তার বিশ্বাস ছিল, সন্তানকে বড় করা কোনো বিনিয়োগ নয়, যার প্রতিদান একদিন সুদে-আসলে ফেরত আসবে।
সন্তানকে মানুষ করার অর্থ তাকে নিজের মতো করে বাঁচতে শেখানো।
তার সুখের পথ তৈরি করে দেওয়া।
নিজের সুখের জন্য তাকে আটকে রাখা নয়।
তাই মেয়ের বিয়ের পর যখন বিদেশে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ এল, তখন একবারও আপত্তি করেননি তিনি।
আবার অর্ণব যখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চেয়েছিল, তখনও বুকের ভেতরের সমস্ত দুশ্চিন্তা চাপা দিয়ে হাসিমুখেই তাকে বিদায় জানিয়েছিলেন।
মামা প্রায়ই বলতেন,
— "সন্তানকে নিজের কাছে রাখার জন্য মানুষ করিনি। ওরা যেখানে ভালো থাকবে, সেখানেই আমার সুখ।"
কথাগুলো শুনতে খুব সহজ।
কিন্তু সেগুলো সত্যি করে বাঁচতে পারে খুব কম মানুষই।
জানালার ওপারে সন্ধ্যা আরও ঘন হয়ে এসেছে।
অরিন্দমের হঠাৎ মনে হলো, পৃথিবীতে বড় হওয়া আর মহান হওয়া এক জিনিস নয়।
তার মামা হয়তো কোনোদিন বড় মানুষ হননি।
কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি অনেক বড়।
পরের দিন সকালে অফিসে এসে অরিন্দম নিজেই নিজের পরিবর্তনে বিস্মিত হলো।
এত বছর ধরে কাজই ছিল তার একমাত্র আশ্রয়। কাজের চাপে ব্যক্তিগত দুঃখ, একাকীত্ব, অপূর্ণতা—সবকিছুকেই সে আড়াল করে রাখতে শিখেছিল। অথচ আজ বারবার মন অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।
কম্পিউটারের স্ক্রিনে খোলা রিপোর্ট, মিটিংয়ের নোট, জরুরি ই-মেইল—কোনো কিছুতেই মন বসছে না।
মাঝে মাঝেই মনে পড়ে যাচ্ছে মামার কথা।
মামিমার কথা।
বয়স হয়েছে দু'জনেরই।
যারা নিজের সন্তানের মতো করে তাকে মানুষ করেছেন, তাদের কাছে অনেকদিন যাওয়া হয়নি।
হঠাৎ করেই মনটা কেমন আকুল হয়ে উঠল।
অবশেষে দুপুরের দিকে কয়েক দিনের ছুটির আবেদন করে একটি মেইল পাঠিয়ে দিল সে।
মেইলটা পাঠানোর পর বুকের ভেতর যেন অদ্ভুত এক স্বস্তি অনুভব করল।
```
Comments
Post a Comment